অগোছালো শহরের মানুষ: কলকাতার হকার আন্দোলন, রাষ্ট্র ও জীবিকার রাজনীতি: দ্বিতীয় পর্ব
প্রথম অংশে কলকাতার হকার অর্থনীতির সামাজিক ইতিহাস, উদ্বাস্তু শহরের গড়ে ওঠা, জনপরিসর, অনানুষ্ঠানিক জীবন, আইন এবং আন্দোলনের নিজস্ব রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। এই দ্বিতীয় অংশ সেই সূত্র ধরেই রেল ও স্টেশনের অর্থনীতি, উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, এবং শেষ পর্যন্ত শহরের ওপর মানুষের অধিকার—এই বৃহত্তর প্রশ্নগুলির দিকে ফিরে যায়।
রেললাইনও একটা অর্থনৈতিক জগৎ
রেলস্টেশন ও প্ল্যাটফর্মের হকারদের জীবনেও এই সামাজিক সম্পর্কের চেহারা দেখা যায়।
রেল শুধু ট্রেন চলার জায়গা নয়।
তার চারপাশে একটা বিশাল অর্থনীতি তৈরি হয়।
একজন যাত্রী প্রতিদিন একই হকারের কাছ থেকে জিনিস কেনেন।
কেউ ট্রেনে ওঠার আগে কাউকে একটা জিনিস দিয়ে যেতে বলেন।
কেউ বলেন, “ওটা অমুককে দিয়ে দিও।”
হকার জানেন কার কী দরকার।
কখনও টাকা পরে দেওয়া হয়।
কখনও পরিচয়ের ওপর লেনদেন হয়।
এটা নিছক বাজার নয়।
এটা সামাজিক আস্থার অর্থনীতি।
এই সম্পর্কের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। এখানে ব্যাংক নেই। ক্রেডিট কার্ড নেই। চুক্তিপত্র নেই। কিন্তু আস্থা আছে।
রাষ্ট্র যখন এই ব্যবস্থাকে শুধু ‘অনুমোদনহীন বিক্রি’ হিসেবে দেখে, তখন এই সামাজিক অর্থনীতির কোনও অংশই তার চোখে পড়ে না।
রেল যদি হকার উচ্ছেদ করে, প্রশাসনিকভাবে একটা জায়গা খালি হয়।
কিন্তু সেই জায়গার সঙ্গে যুক্ত সামাজিক অর্থনীতির কী হয়?
এই প্রশ্নটাই আসল।

বস্তি উচ্ছেদ: শুধু বাড়ি ভাঙা নয়
বস্তি উচ্ছেদের ক্ষেত্রেও একই কথা।
একটা বসতি ‘অবৈধ’ ঘোষণা করা হল।
মানুষকে সরিয়ে দেওয়া হল।
তারপর বলা হল, পুনর্বাসন দেওয়া হবে।
কিন্তু পুনর্বাসন কি শুধু একটা ঘর?
মানুষ কোথায় কাজ করবে?
বাজার কোথায়?
স্কুল কোথায়?
ডাক্তার কোথায়?
পরিচিত মানুষ কোথায়?
যে হকারের কাছ থেকে প্রতিদিন বাজার করত, সে কোথায়?
যে রিকশাচালককে প্রতিদিন চিনত, সে কোথায়?
যে প্রতিবেশী অসুস্থ হলে ডাক্তার ডেকে আনত, সে কোথায়?
নোনাডাঙ্গার মতো পুনর্বাসনের অভিজ্ঞতা আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। মানুষকে শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে দিলেই পুনর্বাসন হয় না।
মানুষ একটা সামাজিক ভূগোলের মধ্যে বাস করে।
তার কাজ আছে।
তার বাজার আছে।
তার স্কুল আছে।
তার চিকিৎসা আছে।
তার আত্মীয় আছে।
তার প্রতিবেশী আছে।
তার রাজনৈতিক সম্পর্ক আছে।
তার সামাজিক নিরাপত্তা আছে।
এই পুরো জালটা ভেঙে দিয়ে শুধু একটা ঘর দিলে সেটা পুনর্বাসন নয়। সেটা স্থানান্তর।
রাস্তার স্কুল, টিউশন এবং সামাজিক জীবন
এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি শুধু বাজার তৈরি করে না।
সমাজও তৈরি করে।
কোথাও বিকেলে টিউশন হয়।
পাড়ার বাচ্চারা পড়ে।
কেউ হয়তো কম টাকায় পড়ান।
কোথাও রাস্তার স্কুল তৈরি হয়।
কেউ অসুস্থ হলে পাশের মানুষ ডাক্তার জোগাড় করেন।
ওষুধ কিনতে টাকা লাগে, কেউ সাহায্য করেন।
এইসব সম্পর্ক কোনও সরকারি নথিতে থাকে না।
কিন্তু এগুলোই সমাজ।
আমরা অনেক সময় সমাজ বলতে শুধু নিবন্ধিত সংগঠন বুঝি।
কিন্তু বাস্তবে সমাজ তৈরি হয় মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্ক থেকে।
একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়ায়।
একজন আরেকজনকে চেনে।
একজন আরেকজনকে ধার দেয়।
একজন আরেকজনের সন্তানের পড়াশোনায় সাহায্য করে।
একজন অসুস্থ হলে আরেকজন ডাক্তার ডেকে আনে।
এইসব অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের বিকল্প নয়। কিন্তু রাষ্ট্র যেখানে পৌঁছয় না, সেখানে এগুলো মানুষের জীবনকে ধরে রাখে।
উচ্ছেদ যখন এই সামাজিক ভূগোলকে ভেঙে দেয়, তখন শুধু ঘর বা দোকান ভাঙে না।
সম্পর্ক ভাঙে।
রাষ্ট্র কি তাহলে সবসময় খারাপ?
এখানে একটা সতর্কতা দরকার।
রাষ্ট্রকে শুধু খারাপ এবং অনিয়মকে শুধু ভালো বললে সমস্যাটা খুব সহজ হয়ে যায়।
রাস্তা চলাচলের জন্য দরকার।
পথচারীর নিরাপত্তা দরকার।
অগ্নিনিরাপত্তা দরকার।
স্বাস্থ্যবিধি দরকার।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দরকার।
শিশু, বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধী মানুষের চলাচলের অধিকার আছে।
একজন হকারের অধিকার যেমন আছে, তেমনই একজন পথচারীরও অধিকার আছে।
তাই প্রশ্নটা হকার থাকবে কি থাকবে না, এত সরল নয়।
প্রশ্নটা হল, আমরা কীভাবে এমন একটা শহর তৈরি করব যেখানে দুটো অধিকার পাশাপাশি থাকতে পারে?
ফুটপাতের একটা অংশ পথচারীর জন্য খোলা রাখা যায়।
নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় হকার বসতে পারেন।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যায়।
অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম করা যায়।
পথচারী চলাচলের ন্যূনতম প্রস্থ নিশ্চিত করা যায়।
হকারদের সঙ্গে বসে অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করা যায়।
সমস্যা হল, আমরা প্রায়ই পরিকল্পনা করি হকারদের বাদ দিয়ে।
যাদের জীবন নিয়ে পরিকল্পনা, তাদের পরিকল্পনার টেবিলে ডাকা হয় না।
এটা বদলাতে হবে।

বর্তমান কলকাতা এবং নতুন উচ্ছেদের আতঙ্ক
আজ কলকাতায় আবার হকার উচ্ছেদের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
রেল তার জমি থেকে হকারদের সরানোর উদ্যোগ নিয়েছে। রাজ্য সরকারের জমি নিয়েও বিভিন্ন জায়গায় নোটিস এবং উচ্ছেদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে পুজোর আগে উচ্ছেদ না করার কথা বলা হলেও, পুজোর পরে কী হবে, সেই প্রশ্নে বহু হকারের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে।
এই মুহূর্তে তাই আমাদের প্রশ্ন শুধু হওয়া উচিত নয়, কতজন হকারকে সরানো হবে।
প্রশ্ন হওয়া উচিত, তাঁরা কোথায় যাবেন?
তাঁদের পণ্য কোথায় বিক্রি হবে?
তাঁদের ক্রেতারা কোথায় যাবেন?
যে ছোট উৎপাদক তাঁদের কাছে পণ্য সরবরাহ করতেন, তিনি কোথায় বিক্রি করবেন?
যে শ্রমিক সস্তায় বাজার করতেন, তিনি কোথা থেকে কিনবেন?
যে বস্তির সঙ্গে তাঁদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল, সেটা কীভাবে চলবে?
রেলস্টেশনের হকারকে সরালে রেলস্টেশনের আশেপাশের ছোট অর্থনীতির কী হবে?
একজন হকারকে সরানোর সিদ্ধান্ত কাগজে একটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।
বাস্তবে সেটা বহু মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।
তাই উচ্ছেদ অনেক সময় সমস্যার সমাধান নয়।
সমস্যার স্থানান্তর।
তৃণমূল আমল এবং অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ
হকার উচ্ছেদের প্রশ্নে তৃণমূল সরকারের ভূমিকাও সরলভাবে দেখা যাবে না।
এই সময়ে বিভিন্ন জায়গায় হকার উচ্ছেদ হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এটাকে সবসময় একটি সুসংগঠিত রাজ্য নীতি হিসেবে সামনে আনা হয়নি। বরং স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক লেনদেন, বসার অধিকার, বিভিন্ন ধরনের বন্দোবস্তের মাধ্যমে হকারদের সঙ্গে প্রশাসন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ একদিকে উচ্ছেদ।
অন্যদিকে বসার অনুমতি।
কোথাও টাকা।
কোথাও স্থানীয় রাজনৈতিক মধ্যস্থতা।
কোথাও সমঝোতা।
কোথাও নোটিস।
কোথাও আন্দোলন।
এই পুরো ব্যবস্থাকে বুঝতে হবে।
কারণ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি যেমন রাষ্ট্রের নিয়মের বাইরে থাকে, তেমনই অনেক সময় রাজনৈতিক ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও থাকে।
এখানে হকার কখনও রাষ্ট্রের শিকার।
কখনও স্থানীয় ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।
কখনও রাজনৈতিক সংগঠনের অংশ।
কখনও আন্দোলনকারী।
কখনও দরকষাকষি করে সুবিধা নেওয়া মানুষ।
এই জটিলতাকে বাদ দিলে হকার আন্দোলনের বাস্তব ইতিহাস বোঝা যাবে না।
‘স্টেট ইজ গুড’, কিন্তু রাষ্ট্র কার?
রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে একটা কথা মনে পড়ে, ‘স্টেট ইজ গুড’।
এই কথার মধ্যে সত্য আছে।
রাষ্ট্র দরকার।
রাষ্ট্র শিক্ষা দিতে পারে।
রাষ্ট্র স্বাস্থ্যব্যবস্থা দিতে পারে।
রাষ্ট্র সামাজিক সুরক্ষা দিতে পারে।
রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে পারে।
রাষ্ট্র নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে পারে।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন রাষ্ট্র মানুষের জীবন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পত্তির প্রশাসকে পরিণত হয়।
তখন সে বলতে থাকে,
এই জমি আমার।
এই ফুটপাত আমার।
এই রাস্তা আমার।
এই পার্ক আমার।
এই বাজার আমার।
তুমি ব্যবহার করবে আমার অনুমতি নিয়ে।
কিন্তু রাষ্ট্রের জমি যদি মানুষের জন্য হয়, তাহলে মানুষকে বাদ দিয়ে সেই জমির ব্যবস্থাপনা কেন?
রাষ্ট্রের কাজ মানুষের জীবনকে অদৃশ্য করা নয়।
রাষ্ট্রের কাজ মানুষের জীবনকে মর্যাদাপূর্ণ করা।
তৃতীয় বিশ্বের শহর এবং ইউরোপীয় মডেল
আমাদের শহরকে অনেক সময় ইউরোপীয় শহরের মডেল দিয়ে বিচার করা হয়।
রাস্তা সোজা।
ফুটপাত খালি।
দোকান নির্দিষ্ট জায়গায়।
বসতি নির্দিষ্ট অঞ্চলে।
সবকিছুর নথি আছে।
কাজের সময় নির্দিষ্ট।
জীবনও যেন একটা নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ছকে চলছে।
কিন্তু কলকাতার ইতিহাস অন্যরকম।
কলকাতা তৈরি হয়েছে দেশভাগের উদ্বাস্তুদের দিয়ে।
গ্রাম থেকে আসা মানুষের দিয়ে।
ছোট উৎপাদকের দিয়ে।
হকারের দিয়ে।
বস্তিবাসীর দিয়ে।
রিকশাচালকের দিয়ে।
ছোট দোকানদারের দিয়ে।
রাস্তার শ্রমিকের দিয়ে।
এই ‘অগোছালো’ জীবনই কলকাতার আধুনিকতার একটা অংশ।
অর্থাৎ অগোছালোত্ব এখানে শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়।
এটা সামাজিক বাস্তবতা।
তৃতীয় বিশ্বের শহরে অনিয়ম অনেক সময় নিয়মেরই আরেক রূপ।
মানুষ রাষ্ট্রের নিয়মের বাইরে বাঁচে কারণ তার বেঁচে থাকার জন্য সেটাই বাস্তব পথ।
এই জীবনকে শুধু ইউরোপীয় শহরের মানদণ্ডে বিচার করলে আমরা শহরের মানুষকেই ভুল বুঝব।
অনাগরিকের রাজনীতি
এই অনানুষ্ঠানিক জীবন রাষ্ট্রের কাছে অস্বস্তিকরও হতে পারে।
কারণ রাষ্ট্র সাধারণত মানুষকে শ্রেণিবদ্ধ করতে চায়।
তোমার নাম কী?
ঠিকানা কী?
পেশা কী?
লাইসেন্স কোথায়?
জন্মতারিখ কী?
নথি কোথায়?
কর কোথায়?
কোন জায়গায় থাকবে?
কোন সময়ে কাজ করবে?
কোন জায়গায় বসবে?
কিন্তু যে মানুষের জীবন এইসব শ্রেণিবিভাগের মধ্যে পুরোপুরি ঢোকে না, সে রাষ্ট্রের কাছে একটা সমস্যা।
এই মানুষগুলোই কখনও হকার।
কখনও বস্তিবাসী।
কখনও ফুটপাতবাসী।
কখনও রাস্তার শ্রমিক।
কখনও ছোট উৎপাদক।
তাদের একটা জিনিস সাধারণ।
তারা নিজেদের জীবন নিজেরাই তৈরি করে।
এবং সেই জীবন যখন রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, তখন তারা মিছিলে আসে।
যে মানুষের কোনও বড় রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই, সে হাজার মানুষের মিছিলে হাঁটে।
যে মানুষকে সমাজ অনেক সময় ‘বিনাগরিক’ করে রেখেছে, সে আন্দোলনের সামনের সারিতে দাঁড়ায়।
এটা রাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর।
কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতা শুধু সংসদে বা বিধানসভায় তৈরি হয় না।
রাজনৈতিক ক্ষমতা তৈরি হয় মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্কের মধ্যেও।
রাজনীতি আকাশ থেকে পড়ে না
রাজনীতি আকাশ থেকে হঠাৎ পড়ে না।
কয়েকজন মানুষ একটা মাইক নিয়ে এসে বলল, “চলো, রাজনীতি করি”, আর মানুষ রাজনীতিতে চলে এল, ব্যাপারটা এমন নয়।
রাজনীতির সামাজিক ভিত্তি আছে।
অর্থনৈতিক ভিত্তি আছে।
একজন হকার আর একজন ক্রেতার সম্পর্ক আছে।
হকার আর ছোট উৎপাদকের সম্পর্ক আছে।
হকার আর রিকশাচালকের সম্পর্ক আছে।
হকার আর বস্তিবাসীর সম্পর্ক আছে।
এই সম্পর্কগুলির ওপর দাঁড়িয়ে একটা রাজনৈতিক চেতনা তৈরি হতে পারে।
আজ আমি হকার।
তুমি বস্তিবাসী।
ও রিকশাচালক।
ও ছোট উৎপাদক।
আমাদের পেশা আলাদা।
কিন্তু আমাদের সমস্যা একই ধরনের।
আমাদের সবার জনপরিসর দরকার।
আমাদের সবার কাজ দরকার।
আমাদের সবার সস্তা বাজার দরকার।
আমাদের সবার শহরে থাকার অধিকার দরকার।
এই উপলব্ধিই একটা শ্রেণিগত রাজনীতির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
হকার আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা
তবে হকার আন্দোলনের নিজের সীমাবদ্ধতাও আছে।
অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি সবসময় রোমান্টিক নয়।
সেখানে দাদাগিরি আছে।
চাঁদা আছে।
স্থানীয় ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক আছে।
রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দরকষাকষি আছে।
কেউ প্রশাসনের সঙ্গে আপস করে।
কেউ আন্দোলন করে।
কেউ ব্যক্তিগত সুবিধা পায়।
কেউ পিছিয়ে পড়ে।
সংগঠনের মধ্যে বিভাজন থাকে।
এসব বাস্তবতা অস্বীকার করলে আন্দোলনকে বুঝতে ভুল হবে।
কিন্তু এই সমস্যাগুলিকে দেখিয়ে যদি আমরা পুরো অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকেই অবৈধ বলে দিই, সেটাও ভুল।
কারণ সংগঠনের দুর্বলতা আর জীবিকার অধিকার এক জিনিস নয়।
কোনও হকার সংগঠনে দুর্নীতি থাকলে তার মানে এই নয় যে হকারের জীবিকার অধিকার নেই।
কোনও বস্তিতে রাজনৈতিক দাদাগিরি থাকলে তার মানে এই নয় যে বস্তিবাসী শহরের নাগরিক নয়।
রাষ্ট্রের কাজ এই জটিলতাকে বুঝে গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করা।
উচ্ছেদ নয়, পুনর্বিন্যাস
তাই হকারদের প্রশ্নে উচ্ছেদকে একমাত্র নীতি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা দরকার।
কিন্তু তার মানে বিশৃঙ্খলাকে চিরস্থায়ী করার দাবি নয়।
বরং দরকার আরও উন্নত পরিকল্পনা।
হকার জোন থাকতে পারে।
সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে।
পথচারীর জন্য নির্দিষ্ট প্রশস্ত পথ রাখা যেতে পারে।
অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যেতে পারে।
হকারদের নিবন্ধন হতে পারে।
স্থানীয় হকার কমিটি থাকতে পারে।
নারী হকারদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকতে পারে।
প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী হকারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকতে পারে।
রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার জন্য আলাদা পরিকল্পনা হতে পারে।
কিন্তু পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত একটা।
হকারদের বাদ দিয়ে হকারদের জন্য পরিকল্পনা করা যাবে না।
যার জীবন নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তাকে পরিকল্পনার টেবিলে বসাতে হবে।
পথচারীর সঙ্গে হকারকে শত্রু বানানোরও দরকার নেই।
দুটো পক্ষের অধিকারকে একসঙ্গে দেখা দরকার।

শহরের অধিকার কার?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সাধারণ।
রাস্তা কার?
ফুটপাত কার?
পার্ক কার?
বাজার কার?
শহর কার?
রাষ্ট্র বলবে, জমির মালিকানা রাষ্ট্রের।
রেল বলবে, রেলের জমি রেলের।
কর্পোরেশন বলবে, কর্পোরেশনের সম্পত্তি কর্পোরেশনের।
আইন সেটাই বলতে পারে।
কিন্তু সমাজের প্রশ্ন অন্য।
মানুষ যে জায়গা ব্যবহার করে, তার ওপর কি মানুষের কোনও সামাজিক অধিকার তৈরি হয় না?
যে মানুষ প্রতিদিন সেই জায়গায় শ্রম দেয়, তার কি কোনও দাবি নেই?
যে মানুষ সেই জায়গায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম জীবন তৈরি করেছে, তার কি শহরের ওপর কোনও অধিকার নেই?
যে মানুষ শহরের অর্থনীতিকে চালিয়ে রাখে, তার কি শহরের জনপরিসরে থাকার অধিকার নেই?
এখানে আইনি মালিকানা আর সামাজিক অধিকার এক জিনিস নয়।
আইন সম্পত্তি বোঝে।
সমাজ ব্যবহার বোঝে।
আইন মালিকানা বোঝে।
মানুষ জীবন বোঝে।
এই দুইয়ের মধ্যে একটা গণতান্ত্রিক ভারসাম্য তৈরি করাই রাষ্ট্রের কাজ।
একটা ফুটপাতের মধ্যে যে শহর
একটা ফুটপাতের কথা ভাবুন।
সকালে একজন সবজি নিয়ে বসেছেন।
তার পাশ দিয়ে একজন অফিসযাত্রী যাচ্ছেন।
কেউ সবজি কিনলেন।
একজন রিকশাচালক দাঁড়িয়ে চা খেলেন।
একজন ছাত্র খাতা কিনল।
একজন মহিলা ট্রেন ধরার আগে কিছু কিনে নিলেন।
বিকেলে একজন বই বিক্রি করতে এলেন।
সন্ধ্যায় চা বিক্রি হচ্ছে।
রাতে কোনও শ্রমিক সেখানে বসে একটু বিশ্রাম নিলেন।
একটা ছোট ফুটপাত।
কিন্তু তার মধ্যে কতগুলো অর্থনৈতিক সম্পর্ক!
কতগুলো সামাজিক সম্পর্ক!
কতগুলো জীবনের গল্প!
এখন প্রশাসন এসে বলল, “এই জায়গা খালি করতে হবে।”
কাগজে সেটা একটা লাইন।
বাস্তবে সেটা বহু মানুষের জীবনের ওপর আঘাত।
এই পার্থক্যটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কলকাতার অগোছালোত্বের মধ্যে একটা ইতিহাস আছে
আমরা শহরকে শুধু তার রাস্তার নকশা দিয়ে দেখি।
কিন্তু শহরের আসল ইতিহাস রাস্তার ওপর লেখা থাকে।
কোথায় বাজার বসে, সেটা একটা ইতিহাস।
কোথায় উদ্বাস্তু এসে বসতি গড়েছে, সেটা একটা ইতিহাস।
কোথায় হকার বসে, সেটা একটা ইতিহাস।
কোথায় রিকশাওয়ালা রাতে ঘুমায়, সেটাও একটা ইতিহাস।
কোথায় বস্তি তৈরি হয়েছে, সেটাও একটা ইতিহাস।
কোথায় ছোট উৎপাদন হয়, সেটাও একটা ইতিহাস।
কোথায় মানুষ সস্তায় বাজার করে, সেটাও একটা ইতিহাস।
এইসব ইতিহাস একসঙ্গে মিলে কলকাতা।
তাই শহরকে ‘গুছিয়ে’ তোলার আগে আমাদের জিজ্ঞেস করতে হবে, কী গুছিয়ে তুলছি?
মানুষের জীবন?
নাকি মানুষের জীবন থেকে শহরকে পরিষ্কার করছি?
হকার আন্দোলনের আসল প্রশ্ন
হকার আন্দোলনকে যদি শুধু জীবিকার আন্দোলন বলি, তাহলে তার অর্ধেক দেখি।
এটা অর্থনৈতিক আন্দোলন, কারণ মানুষ তার আয় রক্ষা করতে চায়।
এটা সামাজিক আন্দোলন, কারণ হকারের সঙ্গে ক্রেতা, উৎপাদক, বস্তিবাসী, রিকশাচালকের সম্পর্ক আছে।
এটা নাগরিক আন্দোলন, কারণ জনপরিসরের ওপর মানুষের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন আছে।
এটা রাজনৈতিক আন্দোলন, কারণ রাষ্ট্রের নিয়ম এবং মানুষের জীবন মুখোমুখি দাঁড়ায়।
এটা সাংস্কৃতিক আন্দোলনও, কারণ পথের ওপর মানুষের অধিকার মানে পথের ওপর গান, নাটক, সভা, আড্ডার অধিকারও।
অর্থাৎ হকার আন্দোলনকে শুধু ‘হকারদের সমস্যা’ বলা যায় না।
এটা শহরের চরিত্রের প্রশ্ন।
এটা শহর কাদের জন্য তৈরি হবে, সেই প্রশ্ন।
মানুষকে শহর থেকে উচ্ছেদ করা যায় না
হকারকে সরানো যায়।
ফুটপাত খালি করা যায়।
ঠেলাগাড়ি ভেঙে ফেলা যায়।
বাজার তুলে দেওয়া যায়।
বস্তি উচ্ছেদ করা যায়।
রেললাইনের ধার থেকে মানুষকে সরিয়ে দেওয়া যায়।
কিন্তু মানুষের জীবিকার প্রয়োজনকে উচ্ছেদ করা যায় না।
মানুষকে কাজ করতেই হবে।
মানুষকে বাজার করতেই হবে।
মানুষকে বাস করতেই হবে।
মানুষকে সম্পর্ক তৈরি করতেই হবে।
রাষ্ট্র যদি একটা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা ভেঙে দেয়, মানুষ অন্য একটা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি করবে।
কারণ জীবন নিয়মের অপেক্ষায় থাকে না।
জীবন নিজের পথ তৈরি করে।
শহরকে মানুষের কাছ থেকে শিখতে হবে
সমস্যাটা আসলে এখানেই।
আমরা শহরকে উপরে থেকে দেখতে অভ্যস্ত।
মানচিত্রের ওপর শহর দেখি।
রাস্তার ওপর লাইন টানি।
ফুটপাতের প্রস্থ মাপি।
জমির মালিকানা দেখি।
আইন দেখি।
নথি দেখি।
কিন্তু শহরের ভেতরের জীবন দেখি না।
একজন হকারের সঙ্গে বসে কথা বলি না।
একজন রিকশাচালক রাতে কোথায় ঘুমান, সেটা দেখি না।
একজন বস্তিবাসী কোথা থেকে বাজার করেন, সেটা দেখি না।
একজন ছোট উৎপাদক তার পণ্য কার কাছে বিক্রি করেন, সেটা দেখি না।
একজন মহিলা কেন স্টেশন যাওয়ার পথে ফুটপাতের বাজার থেকে সবজি কিনতে বাধ্য হন, সেটা দেখি না।
এই অদৃশ্য সম্পর্কগুলো না বুঝলে শহরের পরিকল্পনা কাগজে খুব সুন্দর হতে পারে।
বাস্তবে তা মানুষের জীবনের বিরুদ্ধে যেতে পারে।
শহরকে তাই শুধু পরিকল্পনাবিদদের কাছ থেকে নয়, শহরের মানুষদের কাছ থেকেও শিখতে হবে।
শেষ কথা: অগোছালো শহরকে গুছিয়ে তোলার আগে
শেষ পর্যন্ত আবার সেই প্রশ্নে ফিরতে হয়।
শহর কার?
রাষ্ট্রের?
কর্পোরেশনের?
রেলের?
বড় সম্পত্তির মালিকদের?
নাকি মানুষের?
হয়তো উত্তরটা আরও জটিল।
শহর কারও একার নয়।
শহর তার মানুষের।
যে মানুষ দেশভাগের পরে এখানে এসেছে।
যে মানুষ গ্রাম থেকে কাজের খোঁজে এসেছে।
যে মানুষ রিকশা চালায়।
যে মানুষ ফুটপাতে মাছ বিক্রি করে।
যে মানুষ সেই হকারের কাছ থেকে মাছ কেনে।
যে মানুষ বস্তিতে থাকে।
যে মানুষ পথে নাটক করে।
যে মানুষ পার্কের এক কোণে রাতে ঘুমিয়ে পড়ে।
যে মানুষ সকালে উঠে আবার শহরের কাজে বেরিয়ে যায়।
এই মানুষগুলোর জীবনকে বাদ দিয়ে একটা ‘সুন্দর শহর’ বানানো সম্ভব।
রাস্তা পরিষ্কার করা সম্ভব।
ফুটপাত খালি করা সম্ভব।
বাজার সরিয়ে দেওয়া সম্ভব।
বস্তি ভেঙে দেওয়া সম্ভব।
শহরকে হয়তো আরও চকচকে দেখাবে।
কিন্তু সেই শহর মানুষের শহর হবে কি?
হকারকে জিজ্ঞেস করতে হবে, সে কোথায় বসবে।
পথচারীকে জিজ্ঞেস করতে হবে, সে কীভাবে হাঁটবে।
রিকশাচালককে জিজ্ঞেস করতে হবে, সে কোথায় দাঁড়াবে।
বস্তিবাসীকে জিজ্ঞেস করতে হবে, পুনর্বাসন বলতে সে কী বোঝে।
ছোট উৎপাদককে জিজ্ঞেস করতে হবে, তার বাজার কোথায়।
নারী শ্রমিককে জিজ্ঞেস করতে হবে, নিরাপদ কাজের জায়গা কোথায়।
এই কথোপকথন ছাড়া শহর পরিকল্পনা আসলে শহরের ওপর শাসন।
মানুষের সঙ্গে শহর তৈরি করা আর মানুষের ওপর শহর চাপিয়ে দেওয়া এক জিনিস নয়।
আজ কলকাতার হকার উচ্ছেদের প্রশ্ন তাই আমাদের সামনে আবার সেই পুরনো কিন্তু অসমাপ্ত প্রশ্নটা এনে দাঁড় করিয়েছে।
রাষ্ট্র কি মানুষের জন্য?
নাকি মানুষ রাষ্ট্রের সম্পত্তির ব্যবহারের অনুমতির অপেক্ষায় থাকবে?
ফুটপাত কি শুধু হাঁটার জন্য?
হ্যাঁ, হাঁটার জন্য।
কিন্তু সেখানে কি জীবিকার কোনও জায়গা নেই?
রাস্তা কি শুধু গাড়ির জন্য?
পার্ক কি শুধু দিনের নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টার জন্য?
রেলস্টেশন কি শুধু যাত্রীর জন্য?
শহর কি শুধু যাদের কাছে জমির কাগজ আছে তাদের জন্য?
যে মানুষ শহরকে প্রতিদিন শ্রম দিয়ে চালায়, তার কি শহরের ওপর কোনও অধিকার নেই?
এই প্রশ্নগুলির সহজ উত্তর নেই।
কিন্তু প্রশ্নগুলো না করলে শহরের গণতন্ত্রও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কারণ শহরের গণতন্ত্র শুধু ভোটের বাক্সে নির্ধারিত হয় না।
শহরের গণতন্ত্র নির্ধারিত হয় কে কোথায় দাঁড়াতে পারবে, কে কোথায় বসতে পারবে, কে কোথায় কাজ করতে পারবে, কে কোথায় ঘুমাতে পারবে, কে কোথায় বিক্রি করতে পারবে, কে কোথায় সভা করতে পারবে, কে কোথায় গান গাইতে পারবে, এবং শেষ পর্যন্ত কে শহরের দৃশ্যমান অংশ হয়ে থাকতে পারবে, সেই প্রশ্নে।
হকার আন্দোলন সেই দৃশ্যমানতার জন্যও লড়াই।
একজন হকার বলছে, আমি এখানে আছি।
আমি এই শহরের বাইরে নই।
আমার শ্রম এই শহরের অর্থনীতির অংশ।
আমার ক্রেতা এই শহরের মানুষ।
আমার সন্তান এই শহরে বড় হয়।
আমার জীবিকা এই শহরের সঙ্গে জড়িত।
আমাকে সরিয়ে শহরকে সুন্দর করা যায়, কিন্তু আমাকে অদৃশ্য করে শহরের বাস্তবতা বদলানো যায় না।
এই কথাটাই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষকে শহর থেকে উচ্ছেদ করা যায় না।
একটা জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়।
একটা বাজার ভেঙে দেওয়া যায়।
একটা ফুটপাত খালি করা যায়।
কিন্তু মানুষের প্রয়োজন, শ্রম, বাজার এবং সামাজিক সম্পর্ককে মুছে ফেলা যায় না।
জীবন আবার অন্য কোথাও নিজের জায়গা তৈরি করবে।
আবার কোনও ফুটপাতের পাশে বাজার বসবে।
আবার কোনও রেললাইনের ধারে চা বিক্রি হবে।
আবার কোনও বস্তির পাশে ছোট দোকান তৈরি হবে।
আবার কোনও মানুষ তার পরিচিত হকারকে খুঁজবে।
আবার কোনও বিক্রেতা তার পুরনো ক্রেতার জন্য অপেক্ষা করবে।
কারণ শহর শুধু ইট, কংক্রিট, রাস্তা এবং জমির মালিকানার নাম নয়।
শহর মানুষের সম্পর্কের নাম।
আলোকচিত্র: কুশল কর
