আজকের পৃথিবী ও পুঁজির রাজনীতি: প্রথম পর্ব

লেখক ও. পি. রানা · 20 Sep 2026, 11:42 AM
আজকের পৃথিবী ও পুঁজির রাজনীতি: প্রথম পর্ব

(মূল ইংরেজি রচনা অবলম্বনে বাংলা ভাষান্তর)

ইরানে আমেরিকা (এবং ইজরায়েল)-র মাঝেমধ্যেই হামলা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরন্তর বুক চাপড়ানো, গাজা উপত্যকায় ইজরায়েলের চলতি গণহত্যা, ওয়েস্ট ব্যাংক ও লেবাননে আক্রমণ—সবকিছুরই অনেক দিক থাকতে পারে। তথাপি, ট্রাম্প আর বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে চালাচ্ছে যে দুই শক্তি, তাদের প্রধান দুই পছন্দসই ধারণা হচ্ছে ইসলামোফোবিয়া এবং ভূরাজনীতি বা জিওপলিটিক্স —কোনটা আগে কোনটা পরে বলা মুশকিল। পুঁজির ভূরাজনীতি, বিশেষত তেল উৎপাদন ও বাজার বিস্তারের রাজনীতি। বিশ্বাধিপত্যের লড়াইয়ে আমেরিকা (এবং আরও বহু পশ্চিমি রাষ্ট্র)-র যাবতীয় নীতি ও কাজকর্ম প্রধানত যে বাজার বাড়ানোর তাগিদেই চলে, সন্দেহ নেই। ইরান আক্রমণ এবং প্যালেস্তিনীয় গণহত্যাকে একুশ শতকের ‘ক্রুসেড’ বলেও দেখা যায়। যে পশ্চিম এশীয় নেতাদের ‘অশুভ’ বলে দাগানো হয়, তাঁদের খুন করে মনোবল ভেঙে দেওয়া, রাষ্ট্রকে পঙ্গু করে দেওয়া—পুরোনো সব কৌশল আমেরিকা ও ইজরায়েল ফের কাজে লাগিয়েছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বিশ্বশক্তিরা বলেছিল, এই যুদ্ধেই সব যুদ্ধের শেষ। মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র একুশ বছর পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো। ফের বলা হলো, এ যুদ্ধের পরে যুদ্ধ থাকবে না। ১৯৪৫-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই বিজয়ী-পরাজিত নির্বিশেষে ইউরোপীয় শক্তিগুলি মহাদেশের অর্থনৈতিক সংহতির কাজ শুরু করল। উদ্দেশ্য, যুদ্ধকে ‘ভাবাই অসম্ভব এবং কার্যত অসম্ভব’ করে তোলা, এবং প্রস্তাবিত ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’-এর সদস্যদেশে গণতন্ত্রকে মজবুত করা। একের পর এক ঘোষণা, কমিটি ও চুক্তির পরে ১৯৫৭-র রোম চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপিয়ান ইকনমিক কমিউনিটি এবং ইউরোপিয়ান অ্যাটমিক এনার্জি কমিউনিটি তৈরি হয়। ১৯৯২-তে মাস্ট্রিখ্ট সন্ধি স্বাক্ষর হবার পর ১৯৯৩-তে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাস্তব রূপ পায়; ১৯৯৯-এ ইউরো ই-ইউ-র সাধারণ মুদ্রা হিসেবে চালু হয়, নোট ও খুচরো বাজারে আসে ২০০২-এ—যদিও সব সদস্যরাষ্ট্র ইউরো নেয়নি; যথা ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য।

কথা ছিল, ইউরোপ অর্থনৈতিক ইউনিয়ন সদস্যদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক ভালো করবে, নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ ঠেকাবে। অথচ একই ইউরোপীয় শক্তিরা আটলান্টিক এলাকার সামরিক জোট, নর্থ অ্যাটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটো-তেও বাঁধা পড়ল। মাস্ট্রিখ্ট সন্ধি-র সদস্য ই-ইউ দেশগুলির মধ্যে যুদ্ধ হয়নি বটে। তবু, তাদের অনেকেই ন্যাটো-র সদস্য হয়ে অ-ইউরোপীয় শক্তি (প্রধানত আমেরিকার) শুরু করা অ-ন্যাটো রাষ্ট্র বিরোধী যুদ্ধে স্বেচ্ছায় শরিক হয়েছে। এই স্ববিরোধকেই মার্কিন-ইউরোপীয় পুঁজি কাজে লাগিয়েছে পশ্চিমের সমরশিল্পের মুনাফা বাড়াতে। পুঁজিলগ্নির “স্বাভাবিক” মুনাফাবৃদ্ধিতে সমস্যা হলেই যুদ্ধ, যুদ্ধরত পক্ষকে অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি। ন্যাটো-র ক্রমাগত পুবমুখী বিস্তার নিয়ে রাশিয়া বহুদিন ধরে চেঁচাচ্ছিল, ন্যাটো সে দেশের সীমানায় পৌঁছলে নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। রুশ নেতৃত্বের দাবি, পশ্চিম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ন্যাটো পূর্বদিকে আর বাড়বে না; ইতিহাসে সে দাবি নিয়ে তীব্র বিতর্ক আছে, কোনো চুক্তিতেও তা লেখা হয়নি। রাশিয়া বলে, ন্যাটোর এলাকাবিস্তারের কারণেই ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ আদৌ সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু পশ্চিমি ভূরাজনৈতিক কৌশল তলিয়ে দেখতেবুঝতে গেলে ন্যাটোর এলাকাবিস্তার নিয়ে ওই বিতর্কিত আশ্বাস, এবং পরে ইউক্রেনকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম দেওয়ার পশ্চিমি প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতও মাথায় রাখতে হবে। ফল সবার দৃষ্টিগোচর: হাজার হাজার ইউক্রেনীয় ও রুশ মানুষের মৃত্যু, বিশেষত ইউক্রেনে(রাশিয়াতেও), কোটি কোটি ডলারের পরিকাঠামো ধ্বংস। লাভ কার? প্রত্যাশামতোই, পশ্চিমি রাষ্ট্রের, প্রধানত আমেরিকা ও ইউরোপের, যারা অস্ত্র ও অন্য সমরসরঞ্জাম বিক্রি করছে, ইউক্রেনকে ধার দিচ্ছে।

অন্য দেশে অস্ত্রশস্ত্র ও নজরদারি সরঞ্জাম বেচে মুনাফাবৃদ্ধি, নতুন বাজার দখল এবং পুঁজির ক্ষমতা বাড়ানো যখন এমন খাসা ব্যবসা হয়ে দাঁড়ায়, তাকে কি আর সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিতন্ত্রের ব্যর্থতার লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়? সে কথায় পরে আসছি।

“
বাস্তবে এই প্রযুক্তি পৃথিবীজুড়ে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাকে আরও শক্ত করেছে; কর্মীছাঁটাই ও শ্রমের অবমূল্যায়নে ভূমিকা নিয়েছে, ভবিষ্যতে কাজ হারানোর ভয় বাড়িয়েছে; সেসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সামাজিক হতাশা। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে, সন্দেহ নেই। কিছু কিছু দেশের একাধিক শিল্পক্ষেত্রে তার ফল অতিউৎপাদন বা ওভারক্যাপাসিটি।

আজকের পৃথিবীর চেহারা

অর্থনীতির ধীরগতি, অবারিত দারিদ্র্য, আয় ও সম্পদের বিপুল বৈষম্য, অসম্পূর্ণ কর্মসংস্থান, ক্রমশ খারাপ হতে থাকা পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র—আজকের পৃথিবীর পরিচয়চিহ্ন। গলন্ত হিমবাহে তৈরি হ্রদ ফেটে নেপালের ভয়াবহ বন্যা, ইউরোপ-সহ নানা দেশে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ, পৃথিবীজোড়া দাবানল, দ্রুত উবে যেতে থাকা হিমবাহ ও মেরু-বরফ—বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব চোখের সামনে। তথাপি, কোনো কোনো রাষ্ট্র ও নেতা এখনও উষ্ণায়ণ মানতে নারাজ। সত্যিটাকে মেনে নিলে ইচ্ছেমতো ব্যবসা বা ‘বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল’ বন্ধ করতে হয়; পুঁজির অবাধ জয়যাত্রায় বাধা পড়ে।

ডিজিটাল ও কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব। তামাম মহাকর্পোরেট ও দুনিয়ার যাবতীয় পয়সাওলারা দিব্যি একে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, কিংবা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বলে চালিয়ে দেয়—যেন মুক্ত, অবাধ যোগাযোগ তৈরিই নতুন প্রযুক্তির একমাত্র কাজ। বাস্তবে এই প্রযুক্তি পৃথিবীজুড়ে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাকে আরও শক্ত করেছে; কর্মীছাঁটাই ও শ্রমের অবমূল্যায়নে ভূমিকা নিয়েছে, ভবিষ্যতে কাজ হারানোর ভয় বাড়িয়েছে; সেসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সামাজিক হতাশা। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে, সন্দেহ নেই। কিছু কিছু দেশের একাধিক শিল্পক্ষেত্রে তার ফল অতিউৎপাদন বা ওভারক্যাপাসিটি। মার্কসের মতে পুঁজিতন্ত্রে এটা অনিবার্য: প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা বাড়লে ব্যবহারমূল্য, অর্থাৎ ইউস ভ্যালু বাড়ে, অথচ সেই সম্পদের অর্থনৈতিক মূল্য কমতে থাকে। এখান থেকেই উদ্বৃত্ত শ্রম বা‘রিজার্ভ আর্মি অব লেবার’ আর ‘প্রাচুর্যের মধ্যে দারিদ্র্য’-র স্ববিরোধ। দারিদ্র্য ও বেকারি টিঁকে থাকলে ভোগ কমে; অতিউৎপাদনই পুঁজিপতির বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, নতুন বাজার খোঁজার মরিয়া তাগিদ বাড়ে।

কম ভোগ এবং ২০২৬-এ বিশ্ববাণিজ্যের বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার ফলে সমরশিল্পে কর্পোরেট পুঁজির নজর বেশি। আজকের যুদ্ধ ও সংঘাত—বিশেষত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধ, গাজা ও পশ্চিম তীরে নেতানিয়াহুর গণহত্যা—উৎপাদনশীলতাবৃদ্ধি এবং উৎপাদিত সম্পদের ক্রমহ্রাসমান অর্থনৈতিক মূল্যের প্রেক্ষিতেও দেখা দরকার। অবশ্য যুদ্ধ চালিয়ে যাবার পক্ষে দস্যু(রোগ) পুঁজিরাষ্ট্রের আরো বহুবিধ কারণ আছে।

অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, জলবায়ু—সব ক্ষেত্রে পৃথিবীর অবস্থা ভয়াবহ। অথচ, সবচেয়ে ক্ষমতাবান শক্তিসমূহ—সরকার, বড় কর্পোরেশন, আর্ন্তজাতিক অর্থপ্রতিষ্ঠান ও তাদের তথাকথিত বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা-- ঘোঁট বা অলিগার্কি—বিশ্বের মানুষের দুর্দশা, বিশেষ প্যালেস্তিনীয় ও অন্য বিপন্ন জনগোষ্ঠীর দুর্দশা, এবং পরিবেশের সর্বনাশ, সবকিছুকেই প্রায় বেমালুম অস্বীকার করে চলেছে।

সরকার ও কর্পোরেটদৈত্যদের মূল লক্ষ্য, সমাজের ওপর দখলদারি পোক্ত করতে মুনাফা বাড়ানো, বাড়িয়ে চলা। মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং সমাজমাধ্যমের একাংশ সে আগুনে ইন্ধন জোগাচ্ছে। ধনী ও ক্ষমতাবানদের মহাঘোঁট, ডান ও উগ্র-ডান শক্তির সমর্থনে, ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলছে সমস্ত তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। মজাটা হচ্ছে, এগুলোকে একদিন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রই তৈরি করেছিল। ভারত-সহ বহু দেশের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাও ভাঙা হচ্ছে, তার জায়গায় বানানো হচ্ছে এলিট শিক্ষা—যার কাঠামোতেই “অনাকাঙ্ক্ষিত” মানুষকে, অর্থাৎ গরিব ও স্বাধীনচিন্তার মানুষকে, বাইরে রাখার ব্যবস্থা। শিক্ষা এমনভাবে পুনর্গঠিত হচ্ছে, যাতে সরকারের সমালোচকের কাছেও বেসরকারিকরণ শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক, অবধারিত বলে মনে হয়; তৈরি হয় এমন শিক্ষিত শ্রেণি, যারা পৃথিবীকে দেখে অলিগার্কির বানানো চশমা দিয়ে। রাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন শিক্ষার এই খুব-একটা-গোপন-না-থাকা বেসরকারিকরণ ও কর্পোরেটকরণের ফলে পৃথিবীর যাবতীয় ছোটদের প্রয়োজন ক্রমশ পণ্যবাজারের টাকা-কেন্দ্রিক যুক্তির অধীন। অধিকাংশ দেশে মানুষকে শাসন করে যে নীতি, তা অজ্ঞতা, ঔদ্ধত্য, স্বার্থ আর নিয়ন্ত্রণ দিয়ে তৈরি।

“
অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, জলবায়ু—সব ক্ষেত্রে পৃথিবীর অবস্থা ভয়াবহ। অথচ, সবচেয়ে ক্ষমতাবান শক্তিসমূহ—সরকার, বড় কর্পোরেশন, আর্ন্তজাতিক অর্থপ্রতিষ্ঠান ও তাদের তথাকথিত বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা-- ঘোঁট বা অলিগার্কি—বিশ্বের মানুষের দুর্দশা, বিশেষ প্যালেস্তিনীয় ও অন্য বিপন্ন জনগোষ্ঠীর দুর্দশা, এবং পরিবেশের সর্বনাশ, সবকিছুকেই প্রায় বেমালুম অস্বীকার করে চলেছে।

বয়ান ও কারসাজি

জাল খবর, পোস্ট-ট্রুথ, কল্পিত ‘সোনালি’ অতীত, সত্যি বা বানানো ভিতর-বাইরের শত্রু, দুই-মেরুর রাজনীতি, নজরদারি ও অলিগার্কির শিকার মানুষদের নাম ধরে অপমান—সব মিলিয়ে শাসকশ্রেণির বয়ানকে প্রচারের সত্যে পরিণত করা হচ্ছে। বিশেষ ধর্ম, জাত ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণাও ছড়াচ্ছে। মহাঘোঁটের অংশ হিসেবে গণমাধ্যম যে প্রচার ও মিথ্যা ছড়ায়, তার বড় অংশ সমাজমাধ্যম-নির্ভর বয়ানের সঙ্গে মিশে গেছে। সমাজমাধ্যম তুলনায় ছিদ্রময়, কম-নিয়ন্ত্রিত, অনেক বেশি সর্বব্যাপী—তথাপি সেখানেও টাকা ও ক্ষমতার শাসন ক্রমশ স্পষ্ট। উন্নত বাজারতৈরি ও নজরদারি প্রযুক্তি দিয়ে স্বার্থান্বেষী শক্তি—ধরা যাক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ—ক্রমশ প্রায় বাধাহীনভাবে নিজেদের পক্ষের কর্মসূচি ছড়াচ্ছে। দেশ-দেশান্তরে অসংখ্য ব্যবসা গজিয়েছে, যারা সর্বোচ্চ দরদাতাকে পরিষেবা দিয়ে স্রেফ প্রযুক্তির সাহায্যে ভোটারদের প্রভাবিত করছে। নিজেদের বয়ান আরো ছড়াতে বড় কর্পোরেশন পুরোনো স্বাধীন গণমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমের প্রতিষ্ঠান কিনে নিচ্ছে।

এগুলো কি মহাঘোঁটের মরিয়া অবস্থা এবং পুঁজিতন্ত্র ধ্বংসের লক্ষণ? মহাঘোট মরিয়া, পুঁজিতন্ত্র ব্যর্থ—হ্যাঁ। কিন্তু পুঁজিতন্ত্র ভেঙে যাচ্ছে, ধরে নেওয়া নির্বুদ্ধিতা। ‘উদার’ গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান ভাঙছে, পুঁজিতন্ত্রের সমর্থক বাহিনী—ডানপন্থীরা—শক্তি বাড়াচ্ছে, সংঘাত আর বর্ণবিদ্বেষ উসকে দিচ্ছে। তথাপি পুঁজিতন্ত্র এখনো পৃথিবীর অতিশোষিত মানুষের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত মূল্য থেকে রক্তমাংস চুষছে, বিশেষত উন্নয়নশীল ও অতি-দরিদ্র দেশের মানুষের। এর পিছনে পশ্চিমিদের তৈরি করা আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজনের বড় ভূমিকা আছে। বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র—শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলি—আরও দ্রুত, আরও প্রবলভাবে সম্পদ জমিয়েছে। অন্যদিকে, প্রান্তে, অর্থাৎ প্রধানত উন্নয়নশীল ও অতি-দরিদ্র দেশে, দারিদ্র্য বেড়েছে।

মহাঘোঁটের কারসাজির অন্যতম মারাত্মক ফল, বহু দেশে নির্বাচন নিয়ে কারচুপি। কর্পোরেশন ও বিত্তশালীদের ‘কালো টাকা’ ঢোকার ফলে গোটা নির্বাচন-প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই কার্যত একতরফা খেলায় পরিণত হচ্ছে।

পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় শক্তি আমেরিকা ও অন্য বড় রাষ্ট্রের কৌশলে ও ইচ্ছায়, পশ্চিম এশিয়ার দেশে-দেশে যে যুদ্ধ হয়, পশ্চিমি সংবাদমাধ্যম তাকে হামেশা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বাভাবিক ফল বলে দেখায়। অনেকে এখনো মার্কিন রাষ্ট্রপতি ও তাঁর বিদেশনীতিজনিত সিদ্ধান্তের প্রশ্নে বারাক ওবামাকে ভালো প্রেসিডেন্ট বলে দেখান—ট্রাম্পের নীতি পৃথিবীর বাকি অংশের পক্ষে কত ধ্বংসাত্মক, বোঝানোর জন্য। ওবামা আমলে ওয়াশিংটন সাতটি দেশে যুদ্ধে জড়িয়েছিল বা হামলা চালিয়েছিল—আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও পাকিস্তান। ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসন এখন অন্য দেশের নেতাকে খুন ও অপহরণকে ফের যুদ্ধের হাতিয়ার করেছে—যেসব রাষ্ট্র, তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদী তৈরি করে বা সে উদ্দেশ্যে অর্থ জোগায়, অথবা দমনমূলক নীতি চালানোর দায়ে দোষী। উদাহরণ, ইরানকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ রাষ্ট্র বলে দাগিয়ে, সে দেশে বোমা মারবার অজুহাত তৈরি করা।

আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে ট্রাম্পের ‘টাফ গাই’ ভাবমূর্তিতে বড় ফাটল ধরে। তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের পরে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে গোপনে সামরিক বিমানে দেশ ছাড়তে হয়েছিল, অথচ হোয়াইট হাউস প্রকাশ্যে জানিয়েছিল তিনি এয়ার ফোর্স ওয়ান-এই উড়ছেন। ট্রাম্প-সহ আমেরিকানদের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার, তাঁর রীতিমতো বেঁকেচুরে যাওয়া বিদেশনীতি, ও পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার এক চমৎকার ছবি। গোটা ব্যাপারটা হুবহু নাটক: ক্যামেরার সামনে ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ান-এ উঠলেন, তারপর সিক্রেট সার্ভিস-এর পাহারায় গোপনে একটি খাবার দেবার ট্রাকে উঠে গেলেন; সাংবাদিক তো বটেই, এয়ার ফোর্স ওয়ান-এ থেকে যাওয়া হোয়াইট হাউস-এর কিছু কর্মীও জানলেন না, তিনি অন্য সামরিক বিমানে উঠে যুক্তরাজ্যে উড়ে গেছেন। লজ্জাজনক এই কসরতের দরকার পড়ল কেন? ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের জন্য—ঘোষিত-অঘোষিতভাবে নেতানিয়াহুর সেই কর্মসূচিকে সফল করার জন্য, যেখানে প্যালেস্তিনীয়দের ‘পৃথিবীর বুক থেকে’ মুছে দিয়ে প্যালেস্তাইন প্রশ্নকে কবর দেওয়া হবে, ইরানকে এমন আঘাত করা হবে যেখান থেকে সে ‘কখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না’। মার্কিন কর্মকর্তারা ছলনার পথ নেন, কারণ তাঁদের ভয় ছিল ইরান ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে—যে বিচ্ছিরি কায়দা ট্রাম্প নিজেই নতুন করে রাষ্ট্রনীতিতে ফিরিয়েছেন। অস্ত্রের ঝনঝন এবং অসাধারণ বারফট্টাই-এর পরেও, আমেরিকানদের ভাষায় ট্রাম্পের ভিতরে ‘ইয়েলো-বেলি’—ভীতু কাপুরুষ—রয়েই গেছে। ওই অভিধায় কাছাকাছি কারুর কথা মনে পড়ে গেলে তা নিছক কাকতালীয় নয়; এ রোগ বর্তমানের বা অতীতের একনায়কদের চিরকালীন।

আরো বড় কথা, ঘটনাটা বিশেষত ইরান-যুদ্ধে ট্রাম্পের ব্যর্থতা, সামগ্রিকভাবে তাঁর অসঙ্গত একদেশদর্শী বিদেশনীতির ব্যর্থতা দেখিয়ে দেয়। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিধ্বংসী বিমানহামলার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, ইরানের ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রবল গণআন্দোলন সে দেশের শাসকেরা নির্মমভাবে দমন করেছেন। ট্রাম্পের দাবিমতো, ইরানের সামরিক ক্ষমতা ও পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করে সেই শাসনকে কমজোর করা দূরস্থান, সেই ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রই পরে সমাজের ওপর দখল আরও শক্ত করেছে, দমন বাড়িয়েছে।

(চলবে)