উগ্র জাতীয়তাবাদ, নয়া-ফ্যাসিবাদ ও পরিবেশ-ধ্বংস: দ্বিতীয় পর্ব

লেখক তিথি রায় · 14 Sep 2026, 09:19 PM
উগ্র জাতীয়তাবাদ, নয়া-ফ্যাসিবাদ ও পরিবেশ-ধ্বংস: দ্বিতীয় পর্ব

[প্রথম পর্বে আলোচনা করা হয়েছে, পুঁজিবাদ প্রকৃতিকে শুধু ব্যবহার করে না; মুনাফার প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। উপনিবেশবাদ সেই দখলের ভূগোল ঠিক করে দেয়, নয়া-উদারবাদ তাকে ব্যাপক ও বিশ্বায়িত করে তোলে, সামরিকীকরণ সম্পদ ও ভূখণ্ডের সীমা মজবুত করে। এই পর্বে প্রশ্নটি বর্তমানের: ‘জাতীয় উন্নয়ন’, ‘সবুজ শক্তি’, ‘ডিজিটাল ভবিষ্যৎ’ এবং ‘নিরাপত্তা’র ভাষায় একইভাবে সম্পদ আহরণ, প্রকৃতি-পরিবেশ দখল কীভাবে নতুন রূপ নিচ্ছে?]

জাতীয় প্রয়োজনে বর্তমান খনননীতি

ভারতে, বর্তমান শাসকদলের ভাষণে প্রাচীন সভ্যতার গর্ব, নদী, বন, বন্যপ্রাণী, জৈব কৃষি ও প্রকৃতি-সংলগ্ন সংস্কৃতির কথা বারবার আসে। অথচ বন, বন্যপ্রাণ, শক্তি ও খনিজের আইনগত কাঠামো দ্রুত বদলে যাচ্ছে দেশের ভিতরেই — বন্যপ্রাণ (সংরক্ষণ) সংশোধনী আইন, ২০২২; শক্তি সংরক্ষণ সংশোধনী আইন, ২০২২; বন (সংরক্ষণ) সংশোধনী আইন, ২০২৩; এবং খনি ও খনিজ (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধনী আইন, ২০২৩। সব আইন এক নয়, উদ্দেশ্যও ভিন্ন; তবু পাশাপাশি রাখলে সরকারি নীতি ইত্যাদির বৃহত্তর অভিমুখ স্পষ্ট। কর্পোরেট ও রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের জন্য জমি, বন, খনিজ ও শক্তিকে দ্রুত ব্যবহারযোগ্য করে তোলা। (১)

বিষয়টি স্পষ্টতর হয় কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর নির্দেশে। পারমাণবিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যান্য কৌশলগত খনিজের খনি প্রকল্পকে ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিবেচনা’র যুক্তিতে বাধ্যতামূলক জনশুনানি থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। ইউরেনিয়াম-থোরিয়াম থেকে লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল ও বিরল মৃত্তিকা—সামরিক প্রযুক্তি, পারমাণবিক শক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও ডিজিটাল পরিকাঠামোর জন্য দরকারি খনিজ এখন একই সঙ্গে তথাকথিত ‘সবুজ’ ও ‘কৌশলগত’ সম্পদ। ফলে খনি প্রকল্পকে শুধুমাত্র উন্নয়ন বা জীবিকার প্রশ্ন না বলে নিরাপত্তার প্রশ্নে বদলে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প-অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও মতামতকে অতএব ‘জাতীয় স্বার্থের’ কারণে উপেক্ষা করাটাই দস্তুর হয়ে উঠেছে। (২)

এদিকে বন-ধ্বংস থেমে নেই। গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের হিসেব, ২০০২ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে ভারত প্রায় ৩.৭ লক্ষ হেক্টর আর্দ্র প্রাথমিক বন হারিয়েছে। ২০০১-এর পরিসংখ্যানের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। শুধু ২০২৫-এই প্রাকৃতিক বন হারিয়েছে প্রায় ১.৪ লক্ষ হেক্টর। পরিসংখ্যান সব ধরনের বন-ক্ষয়কে সমীক্ষার আওতায় আনতে না পারলেও, বনাঞ্চল নষ্ট হওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। বনকে একদিকে কার্বন-সিঙ্ক ও বন্যপ্রাণের আবাসভূমি বলে প্রচার করা হচ্ছে, অন্যদিকে খনি, রাস্তা, শিল্প, পর্যটন ও পরিকাঠামোর জন্য তার ভৌগোলিক সীমানা ইচ্ছেমতো বদলে দেওয়া হচ্ছে। (৩)

সামরিকীকরণও এই নীতির বাইরে নয়। ২০২৬–২৭ কেন্দ্রীয় বাজেটে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বরাদ্দ ৭.৮৫ লক্ষ কোটি টাকা—পূর্ববর্তী বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৫.১৯ শতাংশ বেশি। ‘আত্মনির্ভরতা’, 'আধুনিকীকরণ' ও 'জাতীয় নিরাপত্তা'র নামে প্রতিরক্ষা, উৎপাদন ব্যবস্থা, বিরল খনিজ, ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং, নজরদারি এবং মহাকাশ প্রযুক্তি একই অর্থনৈতিক শৃঙ্খলে ঢুকে পড়ছে। (৪)

ফ্যাসিবাদী বা কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি সবসময় পরিবেশ-সংকট অস্বীকার করে না। কখনও সে প্রকৃতিকে জাতীয় ঐতিহ্য বানায়; কখনও জলবায়ু-সংকটকে 'ভাঁওতা' বলে; আবার কখনও সংকটের সমাধানকে কর্পোরেট বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র করে তোলে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে থাকা প্রশাসনের সিদ্ধান্তে, আমেরিকা প্যারিস চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে ২০২৬-এ। জলবায়ুবিজ্ঞান অস্বীকার করা, জীবাশ্ম জ্বালানির উত্তোলন বাড়ানো এবং পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার রাজনীতি এখন সরাসরি জাতীয়তাবাদী অর্থনীতির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে বিশ্বজুড়ে। (৫)

ব্রাজিলে, বলসোনারোর শাসনকালে জলবায়ু সংকটের প্রশ্ন একইরকম, হয়তো তীব্রতর বিরোধিতা হয়েছে। জাতীয় উন্নয়ন ও কৃষিবাণিজ্যের নামে অ্যামাজনের জঙ্গলে কোম্পানি-নিয়ন্ত্রিত খনি, কাঠব্যবসা ও পশুপালনের সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা হয়েছে পরিবেশ-রক্ষার যাবতীয় নিয়ম-নীতি আলগা করে। এক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৯–২০২১ এ, ব্রাজিলে আদিবাসী ভূখণ্ডের ভিতরে বন-ধ্বংস ২০১৩–২০১৮ সময়কালের তুলনায় ১৯৫ শতাংশ বেশি। প্রকৃতি-পরিবেশের জাতীয় মালিকানা ঘোষণা করে তার ওপর কর্পোরেট দখল বাড়ানো—উগ্র জাতীয়তাবাদী শাসকদলগুলির দ্বিচারিতা ভারত, আমেরিকা বা ব্রাজিলের মতো দেশগুলিতে আলাদা আলাদা ভাষায় ফিরে আসছে। (৫)

‘সবুজ’ রূপান্তরের নামে প্রকৃতি লুঠ

জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো জরুরি। কিন্তু কয়লা-তেল-গ্যাসের বদলে সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, ব্যাটারি বা বৈদ্যুতিক গাড়ি বানালেই মানব-সমাজের সঙ্গে শক্তির সম্পর্ক পাল্টায় না। সৌরপ্যানেল, হাওয়াকল বা উইন্ড টারবাইন, বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য ট্রান্সমিশন লাইন, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ি ইত্যাদির জন্য দরকার জমি, জল, খনিজ, পরিকাঠামো, শ্রম। শক্তির চাহিদা যদি অনন্ত শিল্পবৃদ্ধি ও কর্পোরেট মুনাফার প্রয়োজনে বাড়তেই থাকে, তাহলে নতুন প্রযুক্তি মারফত সম্পদ আহরণের পুরনো চলকেই আরেকবার নতুন কায়দায় প্রতিষ্ঠা করে।

আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার হিসেব, ২০২৫ সালে বিশ্বে বিদ্যুতের চাহিদা মোট শক্তির চাহিদার তুলনায় প্রায় ২.৩ গুণ দ্রুত বেড়েছে। সৌরশক্তির বিস্তার ঘটেছে ঠিকই, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালেও ভারতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার প্রায় ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ শক্তির ইতিহাসে, নতুন শক্তি উৎস পুরনো ব্যবস্থাকে মুছে দেয় না; বেশির ভাগ সময়ে তার ওপরই নতুন স্তর যোগ করে। (৬)

ভারতের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি প্রকল্প নিয়ে ল্যান্ড কনফ্লিক্ট ওয়াচের অনুসন্ধান বলছে, বহু সৌর ও বায়ুশক্তি প্রকল্প সাধারণভূমি (কমন্স), চারণভূমি এবং গ্রামীণ জীবিকার পরিসরকে মুছে দিয়ে তৈরি হচ্ছে; স্থানীয় মানুষের সঙ্গে পরামর্শ না করে জমি ব্যবহারের শর্ত বদলাচ্ছে। সমস্যাটি পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির নয়, বরং কর্পোরেট-নিয়ন্ত্রিত এমন রূপান্তরের, যেখানে শক্তি কার জন্য, কতখানি, কার জমিতে এবং কার ক্ষতির বিনিময়ে তৈরি হবে—সে প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়। (৭)

কার্বন বাজারের ক্ষেত্রেও একই দ্বন্দ্ব। বন, গাছ বা মাটির কার্বন ধারণক্ষমতাকে বিক্রিযোগ্য ক্রেডিট পণ্যে পরিণত করে বাজারে কেনাবেচা শুরু হয়েছে। যে শিল্প-অর্থনীতি কার্বন নির্গমন ঘটায়, সে-ই কার্বন বাণিজ্য-বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে জলবায়ু-সংকট পুঁজি-মুনাফার আরেকটি ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। এক অঞ্চলের দূষণ অন্য অঞ্চলে গাছ লাগানোর হিসাব দিয়ে ‘সমন্বয়’ করা হয়, অথচ উৎপাদন ও ভোগের সম্পর্ক, মাত্রা অক্ষুণ্ণ থাকে। গাছ তখন আর বন-জঙ্গলের নিসর্গের অংশ নয়, কার্বন বেচা-কেনার হিসেবে তাকে দেখা হয়। সেখানে না মানুষ থাকে, না জৈববৈচিত্র্য। বাজারশাসিত এই 'পরিষেবা'-য় মানুষের বনব্যবহারের অধিকার থাকে না। থাকে কিছু নথি, ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে কিছু টাকাপয়সা।

ব্যক্তিগত বন-বাগিচাকে আইনে বন বলে গণ্য করা, সর্বসাধারণের জমিকে সৌরপার্কে বদলানো কিংবা গাছের কার্বন-মূল্য ঠিক করতে গিয়ে স্থানীয় মানুষের বন ব্যবহার ও বনাধিকার অস্বীকার করা—এসব ক্ষেত্রে প্রকৃতিকে পুনরায় ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়, পরিমাপযোগ্য ও লেনদেনযোগ্য করা হয়। পুঁজিবাদী পরিবেশ-সমাধান অনেক সময় তাই সংকটের কারণকে নয়, সংকট থেকে মুনাফা করার কৌশলকে আধুনিক যুক্তি হিসাবে হাজির করে।

“
পারমাণবিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যান্য কৌশলগত খনিজের খনি প্রকল্পকে ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিবেচনা’র যুক্তিতে বাধ্যতামূলক জনশুনানি থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। ইউরেনিয়াম-থোরিয়াম থেকে লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল ও বিরল মৃত্তিকা—সামরিক প্রযুক্তি, পারমাণবিক শক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও ডিজিটাল পরিকাঠামোর জন্য দরকারি খনিজ এখন একই সঙ্গে তথাকথিত ‘সবুজ’ ও ‘কৌশলগত’ সম্পদ।

তথ্যকারখানা: এআই-এর শেষহীন জমি, জল, বিদ্যুৎক্ষিদে

ডিজিটাল জগৎকে প্রায়শই ‘বস্তুহীন’, বিমূর্ত বলে ভাবা হয়। বাস্তবে মোবাইল, ল্যাপটপ, সার্ভার, ব্যাটারি ও আঁশতার বা অপটিক্যাল ফাইবারের জন্য লিথিয়াম, কোবাল্ট, তামা, নিকেল এবং ‘বিরল মৃত্তিকা’ বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট লাগে। ডেটা সেন্টারে সারি সারি সার্ভার, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, সাব-স্টেশন, জল ও জমি লাগে। সমুদ্রের নীচে এবং মহাদেশ জুড়ে ফাইবার নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। সার্ভার থেকে উৎপন্ন তাপ কমাতে বায়ু বা জল-নির্ভর কুলিং ব্যবস্থা চাই; নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবার জন্য ব্যাক-আপ জেনারেটর ও নতুন গ্রিডও প্রয়োজন হয়।

ডিজিটাল জগতের বস্তুগত চাহিদাকে বহুগুণ বাড়াচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। শোজানা জুবফ যে তথ্যপুঁজির কথা বলেছেন, তার কারখানা হল ডেটা সেন্টার—পণ্য দৃশ্যত তথ্য, কিন্তু তার ভিতরে পুঁজি, খনিজ, বিদ্যুৎ, জল, জমি ও শ্রমেরই এক সঘন বিন্যাস তৈরি হয়ে যাচ্ছে ক্রমে। তথব্যবহারকারীর আচরণ, পছন্দ ও যোগাযোগও এখানে কাঁচামাল; তথ্য সংগ্রহ ও বিক্রি করে নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণ ও মুনাফা তৈরি হচ্ছে। (৮)

২০২৫ সালে বিশ্বে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎচাহিদা প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে। আমেরিকায় মোট বিদ্যুৎচাহিদা বৃদ্ধির প্রায় অর্ধেকই এসেছে ডেটা সেন্টার থেকে। ভারতে এই বিস্তারের বড় উদাহরণ বিশাখাপত্তনমের গুগল এআই হাব। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ভিত্তিপ্রস্তর পোঁতা প্রকল্পে প্রায় ৬০০ একর জমিতে ১ গিগাওয়াট ক্ষমতার ডেটা সেন্টার, সাগরের গভীরে বা সাবমেরিন তার-যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোর পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্পে বিনিয়োগের ঘোষিত অঙ্ক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গুগলের সঙ্গে রয়েছে আদানি-কনেক্স ও এয়ারটেল নেক্সট্রা। অথচ, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি এই মাপের প্রকল্প স্থানীয় জল, জমি ও জীবন-জীবিকার কী ক্ষতি করবে — সেই হিসাব সংস্থা বা সরকারের পক্ষ থেকে জনসমক্ষে রাখা হয়নি। (৯) এআই তাই পরিবেশগত বিরোধ থেকে পালাবার পথ নয়; শক্তি-নিবিড় পুঁজি-মুনাফার নতুন দিগন্ত। সুতরাং, তাকে নিয়ে প্রশ্ন ঘুরে-ফিরে একই: বিদ্যুৎ কার, জল কার, জমি কার? খনিজ কোথা থেকে আসছে, শ্রম কে দিচ্ছে, মুনাফা কার কাছে যাচ্ছে?

জলবায়ু-সংকট ও উগ্র-জাতীয়তাবাদ

জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে। আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার কমিশান বা ইউএনএইচসিআর-এর ২০২৫-এর রিপোর্ট বলছে, আগের দশ বছরে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ জলবায়ু-সম্পর্কিত বিপর্যয়ে বাস্তুচ্যুত (এই হিসাবে ২৫ কোটি আলাদা মানুষ নয়, অনেক ক্ষেত্রে একই মানূষ বা পরিবারের বারবার উচ্ছেদের ঘটনাও আছে)। পৃথিবীতে যুদ্ধ ও শোষণ-নিপীড়নে বাস্তুচ্যুত মানুষের চার ভাগের তিন ভাগই এমন দেশে বাস করেন বা ঠাঁই নেন, যেখানে জলবায়ু বিপর্যয়ের ঝুঁকি অত্যধিক বেশি। (১০)

মানুষের বেঁচে থাকার এই অনিশ্চয়তা নিজে থেকে সমাজের ভিতরে সংহতি তৈরি করতে পারে না। কাজ, খাদ্য, জল, বাসস্থান ও নিরাপত্তা হারানো মানুষের ক্ষোভকে অভিবাসী, সংখ্যালঘু বা প্রতিবাদীর বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দেয় জাতীয়তাবাদী, কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক মতাদর্শ। রাষ্ট্র তখন নিজেকে শাসন, শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের একমাত্র রক্ষক হিসেবে হাজির করে। জলবায়ু-দুর্যোগ, সীমান্ত-সঙ্কট ও জনসংখ্যার ভয়কে মিলিয়েমিশিয়ে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র নিশ্ছিদ্র আখ্যান তৈরি হয়। সংকটের জন্য দায়ী পুঁজির কাঠামো আড়ালেই থেকে যায়; সামনে আসে কল্পিত শত্রু। এটাই উগ্র-জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক শক্তি।

প্রতিরোধকে নিরাপত্তা-সমস্যা বানানো

পরিবেশ আন্দোলনকে নিছক গাছপালা বা বন্যপ্রাণ বাঁচানোর প্রচার হিসেবে দেখানো হয়। অথচ সমকালীন অধিকাংশ লড়াই জমি, শ্রম, জীবিকা, স্বশাসন, সামাজিক পুনরুৎপাদন এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াই। পরিবেশের প্রশ্নে কে সিদ্ধান্ত নেবে—দূরের মন্ত্রক ও কর্পোরেশন, না সেই নিসর্গে বসবাসকারী মানুষ—এই সংঘাতই আন্দোলনের কেন্দ্রে থাকে। ফলে আন্দোলন যখন প্রকল্প, কর্পোরেট স্বার্থ বা রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দাবির মুখোমুখি দাঁড়ায়, তাকে সহজেই আইনশৃঙ্খলা বা জাতীয় নিরাপত্তার সমস্যা বানানো যায়।

লাদাখের ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতি, রাজ্যের মর্যাদা ও ষষ্ঠ তফসিলের দাবিকে একসূত্রে বেঁধে সোনম ওয়াংচুক দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছেন। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক করা হয়েছিল; প্রায় ছয় মাস পরে, ১৪ মার্চ ২০২৬ কেন্দ্রীয় সরকার সেই আটকাদেশ প্রত্যাহার করে। আদিবাসীদের জঙ্গল ও অধিকার আন্দোলনে শরিক স্ট্যান স্বামীকে ইউএপিএ-তে বন্দি করা হয়েছিল; বয়স ও অসুস্থতা সত্ত্বেও জামিন পাননি এবং ২০২১ সালে বিচারাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। কৃষক আন্দোলনের ‘টুলকিট’ মামলায় ২০২১ সালে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল দিশা রবিকে; পরে আদালত তাঁকে জামিন দেয়। ঘটনা এক নয়, কিন্তু প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিরোধী বানিয়ে তোলার একই প্রবণতা সর্বত্র। (১১)

“
মানুষের বেঁচে থাকার এই অনিশ্চয়তা নিজে থেকে সমাজের ভিতরে সংহতি তৈরি করতে পারে না। কাজ, খাদ্য, জল, বাসস্থান ও নিরাপত্তা হারানো মানুষের ক্ষোভকে অভিবাসী, সংখ্যালঘু বা প্রতিবাদীর বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দেয় জাতীয়তাবাদী, কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক মতাদর্শ। রাষ্ট্র তখন নিজেকে শাসন, শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের একমাত্র রক্ষক হিসেবে হাজির করে।

এই প্রবণতার সাম্প্রতিকতর উদাহরণ অসমের আদিবাসী ও ভূমি-অধিকার কর্মী প্রণব দোলের গ্রেপ্তার। কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের কাছে প্রস্তাবিত বিলাসবহুল হোটেল প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্র ধরে তাঁকে ২০২৬-এর ১২ই জুলাই গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত জামিন দেওয়ার পরপরই অসম সরকার তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক করে। তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্পের বিরোধিতাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে দেখানোর প্রক্রিয়া খুব পরিষ্কার। (১২) হাঁসদেও অরণ্যে কয়লাখনির বিরুদ্ধে আদিবাসী মানুষের প্রতিরোধ, ওড়িশার সিজিমালি ও কুত্রুমালিতে বক্সাইট খনির বিরোধিতা, কিংবা সংরক্ষণের নামে বনবাসীদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সবই ঢুকে পড়ে একই বন্ধনীর ভিতর। আসলে, প্রকৃতি ও সমাজকে আলাদা করা যায় না। বন পাহাড় নদী শুধু ‘সম্পদ’ নয়; খাদ্য, সংস্কৃতি, সম্পর্ক ও জীবনধারণের ভিত্তি। এই ভিত্তি রক্ষার লড়াইকে অপরাধে পরিণত করা মানে পরিবেশ-সংঘাতকে নিরাপত্তা-সংঘাতে বদলে দেওয়া। (১৩)

পাশাপাশি পরিবেশ ধ্বংসের সত্য জানানোও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। ইউনেস্কোর ২০২৪-এর রিপোর্টে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সময়কালে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা অন্তত ৭৪৯ সাংবাদিক, সংবাদমাধ্যম বা রিপোর্টিং দলের ওপর আক্রমণের নথি রয়েছে; ৪৪ জন পরিবেশ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং শারীরিক আক্রমণের ৩৫৩টি ঘটনা ধরা পড়েছে।(১৪)

পুঁজি ও ফ্যাসিবাদ: জোট, দ্বন্দ্ব, ফাটল

পুঁজিবাদ ও ফ্যাসিবাদ এক নয়; তাদের সম্পর্কও নিখুঁত বা স্থির নয়। পুঁজির দরকার সম্পত্তি, বাজার, পরিকাঠামো ও মুনাফা রক্ষাকারী রাষ্ট্র। কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের দরকার কর্পোরেট অর্থ, প্রযুক্তি, তথ্য ও উৎপাদনক্ষমতা। তাই তাদের মধ্যে গভীর জোট তৈরি হয়। আবার প্ল্যাটফর্ম, তথ্য, নিয়ন্ত্রণ, কর, সার্বভৌম ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে রাষ্ট্র এবং প্রযুক্তি-কর্পোরেশনের সংঘাতও ঘটে। ফলত একটিমাত্র অখণ্ড ‘পুঁজিবাদী-ফ্যাসিবাদী ব্লক’ টিকে থাকতে পারে না বেশিদিন। ধীরে ধীরে জোট, নির্ভরতা পেরিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক পরিবর্তনশীল ক্ষেত্র তৈরি হয়।

এই দ্বন্দ্ব রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে ফাটল কোথায়, কোন প্রকল্পে কর্পোরেট ও রাষ্ট্রের স্বার্থ এক, কোথায় সংঘাত—পরিবেশ আন্দোলনকে তা বুঝতে হবে। কর্পোরেট পুঁজি অনেক সময় দ্রুত অনুমতি, সস্তা জমি ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণ চায়; রাষ্ট্র নিজের হাতে রাখতে চায় তথ্য, প্ল্যাটফর্ম ও সার্বভৌম কর্তৃত্ব। তাদের সংঘাত জনস্বার্থে ঘটে না, তথাপি রাজনৈতিক সংঘর্ষের অবকাশ তৈরি করতে পারে। পরিবেশ-রাজনীতিতে নৈতিক আবেদনমাত্র নয়, জমি ও সম্পদের মালিকানা, সিদ্ধান্তের অধিকার, শ্রম, শক্তি এবং সামাজিক পুনরুৎপাদনের প্রশ্নকে একসঙ্গে রাজনৈতিক দাবি করে তুলতে হবে।

উপসংহার: রাজনৈতিক-বাস্তুতান্ত্রিক লড়াইয়ের দিকে

পরিবেশ-সংকট শুধু প্রকৃতির সংকট নয়; প্রকৃতি, শ্রম ও জীবনকে যে সামাজিক সম্পর্ক সংগঠিত করে, তার সংকট। পুঁজি-মুনাফা, কর্পোরেট সম্পদ-নিয়ন্ত্রণ, সাম্রাজ্যবাদ, সামরিকীকরণ, পিতৃতন্ত্র এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ পরস্পরের সঙ্গে জড়ানো এক আধিপত্য-ব্যবস্থা। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, বা কারখানা থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—প্রযুক্তি বদলালেই এই সম্পর্ক বদলায় না।

কাজেই লক্ষ্য শুধু পরিবেশ-ধ্বংস কমানো নয়; কে জমির মালিক, কে শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে, বন ও খনিজের ব্যবহার কে ঠিক করে, ‘উন্নয়ন’-এর লাভ কে পায় এবং খরচ কে বহন করে—সেই কাঠামো বদলানো। সামাজিক পুনরুৎপাদন, শ্রম, স্থানীয় বাস্তুজ্ঞান এবং সমষ্টিগত বেঁচে থাকাকে পরিবেশ-রাজনীতির কেন্দ্রে আনতে হবে।

আশু প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন লড়াইগুলিকে যুক্ত করা—খনি ও উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে পুঁজিবাদ, পিতৃতন্ত্র, সামরিকীকরণ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সঙ্গে মেলানো। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সামনের দুটি পথ। পরিবেশের বিপর্যয় ও জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তাকে উগ্র জাতীয়তাবাদ, সামরিকীকরণ ও আরও নিবিড় পুঁজি-মুনাফা গ্রাস করবে; অথবা সেই অনিশ্চয়তা নতুন সংহতি, স্থানীয় গণতন্ত্র ও সামাজিক রূপান্তরের ভিত্তি হয়ে উঠবে।

তথ্যসূত্র

১. Wildlife (Protection) Amendment Act, 2022; Energy Conservation (Amendment) Act, 2022; Forest (Conservation) Amendment Act, 2023; MMDR Amendment Act, 2023; Roy, T. (2023), “New Forest Law”.

২. MoEFCC, Office Memorandum IA-Z-11013/136/2025-IA-I, 8 September 2025; Down to Earth, 11 September 2025.

৩. Global Forest Watch (2026), India Dashboard.

৪. Press Information Bureau (2026), Defence in Union Budget 2026–27.

৫. UNFCCC, US Paris Agreement Status; Silva Junior, C. H. L. et al. (2023), “Brazilian Amazon Indigenous Territories under Deforestation Pressure”.

৬. International Energy Agency (2026), Global Energy Review 2026.

৭. Land Conflict Watch (2024), The Hidden Cost of Green Growth.

৮. Zuboff, S. (2019), The Age of Surveillance Capitalism; Lohmann, L. (2022), Labour, Energy and the Colonial Geography of AI.

৯. Akashvani News and Adani Group, Google India AI Hub, 28 April 2026; GroundXero, 18 October 2025.

১০. UNHCR (2025), Extreme Weather and Repeated Displacement.

১১. Indian Express, Sonam Wangchuk, 23 March 2026; The Hindu, Stan Swamy, 2022; BBC News, Disha Ravi, 15 February 2021.

১২. Hindustan Times, Pranab Doley, 12 July 2026; Scroll, NSA Detention, August 2026.

১৩. GroundXero, Hasdeo, 17 October 2024; GroundXero, Sijimali, 16 February 2024.

১৪. UNESCO (2024), Press and Planet in Danger; UNESCO (2026), World Press Freedom Day Update.