সওয়াল কেন?

লেখক সম্পাদকমণ্ডলী · 11 Sep 2026, 02:46 PM
সওয়াল কেন?

সওয়াল মানে প্রশ্ন। নামটা আলংকারিক নয়। যে কথাটা মেনে নিতে বলা হচ্ছে, তাকে আর একবার দেখে নেওয়া; ‘কেন’ জিজ্ঞেস করা—গণতন্ত্রের শুরু এখানেই হতে পারে।

বন কার? নদী, রাস্তা, জল কার? শহরে কে থাকবে, কে পথে কাজ করবে, কাকে নাগরিক বলা হবে, দেশের হয়ে কথা বলার অধিকার কার—এসব কেতাবি প্রশ্ন নয়। রোজকার জীবনের প্রশ্ন।

সওয়ালের প্রথম সংখ্যায় লেখা আছে জাতীয়তাবাদ নিয়ে, নাগরিকত্ব নিয়ে, হকার ও উচ্ছেদ নিয়ে, বন ও সাধারণভূমি বা কমন্স নিয়ে, পরিবেশের সঙ্কট নিয়ে, ফ্যাসিবাদ নিয়ে। বিষয় আলাদা। আলাদা হয়েও বারবার একই জায়গায় এসে প্রশ্নগুলোকে একরকম দেখায়: কে ঠিক করবে কে আপন, কে পর; অধিকার কার; সাধারণ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কার; শেষ কথা বলবে কে?

আমরা যে ধরণের গণতন্ত্রে অভ্যস্ত, নির্বাচন ও সংসদ তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অবশ্যই। কিন্তু পাঁচ বছর অন্তর বোতাম টেপার মধ্যেই গণতন্ত্র নিহিত, এরকম ভেবে নিলে মুশকিল। ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, সংগঠিত হওয়া, বিরোধিতা করা, অধিকার দাবি করা, নিজের জীবন ও জীবিকা বদলে দেয় এমন সিদ্ধান্তে নিজের কথা বলার জায়গা—এসবও গণতন্ত্র। না হলে ‘জনগণ’ নেহায়েত ভোটের দিনের সংখ্যা, বাকি সময়ে পায়ের তলায় থাকা শাসিত প্রজা।

এই তফাতটা এখন বিশেষ করে মনে রাখা দরকার। সরকার দেশ নয়। শাসক দল জাতি নয়। সরকারকে, এমনকি রাষ্ট্রের কোনও প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করা মানেই ভারতবর্ষকে অস্বীকার করা নয়। উল্টে, দেশটাকে নিজের বলে ভাবি বলেই সে দেশ কেমন হবে তা নিয়ে ঝগড়া করব, প্রশ্ন করব।

জাতীয়তাবাদ নিয়ে গণ্ডগোলটা এখানেই। জাতি এমন এক রাজনৈতিক যৌথ হতে পারে যার মধ্যে অমিল থাকবে, বহু ভাষা, বহু ইতিহাস, বহু বিশ্বাস থাকবে। আবার জাতির নামে জবরদস্তি এমন ভাষাও বানানো যায় যাতে সমস্ত বহুত্ব বা অমিল মুছে যায়, বিরুদ্ধতাকে দেশদ্রোহ বানিয়ে ফেলা যায়, নাগরিকদের খাঁটি, অর্ধেক, সন্দেহভাজন, আইনি, বেআইনি, এমন সব ছাঁচ-পংক্তিতে ঢেলে তাঁদের জীবন ও অস্তিত্বকে বিলুপ্ত করে ফেলা যায়। কোন জাতীয়তাবাদ সামনে রাখা হচ্ছে, প্রশ্ন তোলা ভারতবিরোধিতা নয়। ভারতবর্ষ নিয়েই প্রশ্ন।

নাগরিকত্বেও একই গোলমাল অন্য চেহারায়। নাগরিকত্ব শুধু আইনের ঘরে লেখা পরিচয় নয়; কে নিশ্চিন্তে বলতে পারে ‘এই দেশ আমার’, আর কার পায়ের নীচের মাটি যে কোনও সময় সরে যেতে পারে, তারও প্রশ্ন।

শহরে এসে প্রশ্নটা আরও মাটির কাছাকাছি। হকার মানেই যানজট, দখল, অগোছালো শহর—এভাবে বলা সহজ। কিন্তু ফুটপাত নিয়ে ঝগড়ার নীচে আর একটা প্রশ্ন থাকে: শহর কার? পথচারীর চলার অধিকার আছে, নিরাপত্তা দরকার, নিয়ম দরকার। হকারেরও জীবিকা আছে। গণতান্ত্রিক শহরকে দুটোই দেখতে হবে। শহর পরিষ্কার করার নামে শহরের মানুষকেই যদি অদৃশ্য করে দেওয়া হয়, সে পরিচ্ছন্নতা কার জন্য?

পরিবেশের প্রশ্নে আমরা একই জায়গায় পৌঁছই। বন, নদী, জমি, জল—সবই বাজারে বিক্রী ধরার ‘রিসোর্স’ নয়। এগুলো মানুষের যৌথ জীবনের বস্তুগত ভিত, বহু ক্ষেত্রে সাধারণভূমি, কমন্স। যে মানুষের জীবন সেগুলোর সঙ্গে জড়ানো, তাকে বাদ দিয়ে বন-নদী-জমির ভবিষ্যৎ ঠিক হলে পরিবেশনীতি আর নিছক পরিবেশের ব্যাপার থাকে না। তখন প্রশ্ন: সিদ্ধান্ত কার, জ্ঞান কার, লাভ কার, খেসারত দেবে কে?

এবং ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদকে শুধু ভোট, দল, নেতা বা সরকারের গল্প ভাবলে অর্ধেক দেখা হয়। ভয়কে ঘৃণায়, অনিশ্চয়তাকে বর্জনে বদলে দেওয়া, হিংসা ও সামাজিক অসমতাকে স্বাভাবিক করে তোলা, কী বলা চলবে আর কী চলবে না তার সীমানা ক্রমশ ছোট করা, মানুষ যাতে নিজেরা একত্র হয়ে কথা বলতে ও কাজ করতে না পারে সেই সামাজিক পরিসর ভেঙে দেওয়া—ফ্যাসিবাদ সমাজেও তৈরি হয়। সুতরাং গণতন্ত্র রক্ষার কাজ শুধু প্রতিষ্ঠান বাঁচানো নয়; সমাজে গণতন্ত্র তৈরি ও চালু রাখাও।

গণতন্ত্র অনুশীলনের জিনিস। কর্মক্ষেত্রে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, পাড়ায়, গ্রামে, শহরে, বনে। অধিকার, মর্যাদা, জবাবদিহি দরকার; তার সঙ্গে দরকার একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিরক্তিকর, কঠিন অভ্যাস।

এইখানেই বিরুদ্ধতার কথা আসে। বিরুদ্ধতা মানে যে-কোনও কিছুর প্রশ্নহীন বিরোধিতা নয়, এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেই যে কোনও আন্দোলন নিজে নিজে গণতান্ত্রিক হয়ে যায়, তাও নয়। সমাজ নানা দিকে নড়ে, যায়, চলাচল করে। আন্দোলনও সংখ্যাগুরুবাদ, বর্জন, কর্তৃত্ববাদ তৈরি করতে পারে। আবার লড়াইয়ের মধ্যেই নতুন সংহতি জন্মাতে পারে, পুরোনো আধিপত্যে ফাটল ধরতে পারে, একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নতুন রাস্তাও খুলতে পারে।

ফলে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী রাজনীতি জীবিকা, নাগরিকত্ব, শ্রম, জনপরিসর, পরিবেশ, মর্যাদা—এসবের বাইরে আলাদা কোনও মহৎ রাজনীতি নয়। ‘আসল রাজনীতি’ শুরু হওয়ার অপেক্ষায় পড়ে থাকা ছোটখাটো বিষয়ও নয় এগুলো। গণতান্ত্রিক রাজনীতির মাটি তৈরি হয় এখানেই। সওয়াল সেই মাটির কিছুটা জায়গা খুলে রাখতে চায়।

বড় মিডিয়া সংস্থা নই, হওয়ার দাবিও নেই। দেশের সব কণ্ঠস্বর সওয়ালের পাতায় থাকবে না, দেশটার সম্পূর্ণ ছবি আমরা দেখাতে পারব না। চেষ্টা করবো এমন কিছু অভিজ্ঞতা ও যুক্তিকে জায়গা দিতে, যা চালু মিডিয়ায় কম শোনা যায়। আন্দোলনের কথা শুনবো, আন্দোলনকে দেবতা না বানিয়ে। প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করবো, কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানকে জন্মগত শত্রু ধরে না নিয়ে। ক্ষমতাকে দেখতে, কিন্তু মানুষকে হারিয়ে না ফেলে। মতভেদ রাখতে, এবং ভিন্নমতকেই শত্রু না বানিয়ে।

এই সংখ্যার লেখাগুলো এক কথা বলছে না। বলার দরকারও নেই। বরং আলাদা লেখা পাশাপাশি রাখলে যে যোগসূত্রগুলো দেখা যায়, সেগুলোই জরুরি: জাতীয়তাবাদ ও নাগরিকত্ব, নাগরিকত্ব ও আপন হওয়া, নগরায়ণ ও উচ্ছেদ, হকার ও জীবিকা, পরিবেশ ও কমন্স, ফ্যাসিবাদ ও গণতান্ত্রিক পরিসর। সব মিলিয়ে প্রশ্নটা বড় সোজা, আবার মোটেই সোজা নয়: গণতন্ত্রে সমান নাগরিক হয়ে বাঁচা মানে কী?

উত্তর শুধু ভোটের দিনে পাওয়া যাবে না। মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলার অধিকার যে সব লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তৈরি করে, উত্তর সেখানেও। কী? কার? কে? শহরের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে কে? কাজ, কথা বলা, সংগঠন করা, আপন হয়ে থাকা—এই অধিকার কার? ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলতে কী বোঝানো হবে, ঠিক করবে কে? কেমন ভারতবর্ষ আমরা চাই?

সওয়াল শুরু করছে এই জায়গা থেকে। সব উত্তর নেই। থাকা সম্ভবও নয়। অথচ প্রশ্ন করা বন্ধ হয়ে গেলে গণতন্ত্র বলতে খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?

তা হলে, করতে চাইছিটা কী? সওয়ালকে কোনওদিনই মুনাফাদার ব্যবসা হিসেবে ভাবা হয়নি। চালু অর্থে আর একটা ‘মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম’ও নয়। বরং ছোট, সীমিত, সচেতনভাবে রাজনৈতিক একটা সামাজিক পরিসর—যেখানে মিডিয়া নাকি পৃথিবীর বাইরে দাঁড়িয়ে নিরপেক্ষ চোখে সব দেখে, বহুব্যবহারে ধ্বস্ত এই পুরোনো ভানটা না করলেও চলে।

পৃথিবীকে ভিতর থেকে দেখতে চাই। দূরে দাঁড়িয়ে জীবনযাত্রার ধারাভাষ্য নয়; যে জগৎ নিয়ে লিখছি তারই অংশ হিসেবে। সে কারণেই পাঠক-দর্শক শুধু আমাদের লেখা, ছবি, বলা, এসব খাবেন-গিলবেন, কনটেন্ট-ক্রিয়েটার এবং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারির বাজারচালু এই সম্পর্ক চাই না। তর্ক করুন, ভুল ধরুন, প্রশ্ন করুন।

আপাতত আমাদের লেখালিখির ক্ষমতা সীমিত। ইউটিউব চ্যানেল চালু হয়েছে, তাকে আরও নিয়মিত করার ইচ্ছে আছে। ওয়েবসাইটে মাসে অন্তত একটি সংখ্যা বেরুবে। আপত্তি, সমালোচনা, মতভেদ—সবই স্বাগত।

সওয়ালকে আমরা একটি দ্বিভাষিক পোর্টাল হিসেবে ভেবেছি। অর্থাৎ, এখানে বাংলা এবং ইংরেজি, দুই ভাষাতেই প্রবন্ধ প্রকাশিত হবে।

যে ভাষায় মূল প্রবন্ধটি লেখা, দ্বিতীয় ভাষায় সেটি অনুবাদ করে দেওয়া হয়েছে। অনুবাদের ক্ষেত্রে অনেকসময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়েছি আমরা। কিন্তু সঙ্গে যথাসাধ্য সম্পাদনাও করা হয়েছে।

যে মাধ্যমে কাজ করছি তার বিপদও অজানা নয়: তাড়াহুড়ো, দৃশ্যমান থাকার নেশা, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার চাপ, কোন লেখা দেখা যাবে আর কোনটা হারিয়ে যাবে তা ঠিক করে দেওয়া প্ল্যাটফর্মের নিয়ম। এই যুক্তির কাছে পুরো আত্মসমর্পণ না করার সিদ্ধান্ত সচেতন।

ধীরে চলারও দাম আছে। কিছু বলার আগে কথাটা আদৌ বলা দরকার কি না ভাববারও দায় আছে। এবং প্রশ্ন করে যাওয়ার দায়—সমালোচনা দস্তুর বলে নয়, ক্ষমতা যাতে প্রশ্নের বাইরে চলে না যায় সেই কারণে।

যাঁরা এই ছোট পরীক্ষাকে উৎসাহ দিয়েছেন, বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী, পাঠক-দর্শক—সবাইকে ধন্যবাদ। আমরা চাই সওয়াল ঘিরে মানুষ বাড়ুক। তার চাইতেও বেশি চাই, প্রশ্ন বাড়ুক।

প্রশ্ন থাক। গণতন্ত্র বেঁচে থাক।