উগ্র জাতীয়তাবাদ, নয়া-ফ্যাসিবাদ ও পরিবেশ-ধ্বংস: প্রথম পর্ব
পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের বদল, মানুষের জীবনে তার প্রভাব— আজকের দুনিয়ায় আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। জলবায়ু-সংকটকালে মানুষসহ পৃথিবীর অন্যান্য জীবও ভুক্তভোগী। জলবায়ু-সংকটকে কেবল ‘প্রকৃতির বিপর্যয়’ বলে দেখলে মূল সমস্যা আড়ালে চলে যায়।
সংকটের পিছনে রয়েছে এমন এক উৎপাদনব্যবস্থা ও উন্নয়নভাবনা, যা বনকে কাঠ, পাহাড়কে খনিজভাণ্ডার, নদীকে বিদ্যুৎ, জমিকে পরিকাঠামো বা রিয়েল এস্টেট এবং জীবাশ্ম জ্বালানিকে মুনাফা-বাড়ানোর শক্তিতে পরিণত করে। পরিবেশ-ধ্বংস কোনো দুর্ঘটনা নয়; পুঁজিবাদী উৎপাদন, রাষ্ট্রক্ষমতা, শ্রম ও প্রকৃতির মধ্যেকার সম্পর্কের ফল। (১)
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আধিপত্যকামী রাজনৈতিক মতাদর্শ। ফ্যাসিবাদী ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতাসম্পন্ন রাষ্ট্র নাগরিকদের ওপর শোষণ-নিয়ন্ত্রণেই থেমে থাকেনি; ভূখণ্ড, শ্রম, সম্পদ ও নিসর্গকেও যুদ্ধ, দখল, সামরিকীকরণ এবং খনিজ উত্তোলনের প্রয়োজনে নতুন করে সাজিয়ে নিয়েছে। অস্ত্রশিল্প, সামরিক ঘাঁটি, যুদ্ধ ও দখলদারিত্ব পরিবেশ-ধ্বংসের বড় উৎস। সুতরাং, ফ্যাসিবাদ শুধু ‘প্রকৃতি ধ্বংস করে’—বিষয়টি এত সরল নয়। আসল প্রশ্ন, পুঁজি, রাষ্ট্র, উপনিবেশবাদ, সামরিকীকরণ ও পরিবেশ-ধ্বংস কীভাবে পরস্পরকে পুষ্ট করে।
একুশ শতকে প্রশ্ন আরো জরুরি, আরো তীব্র। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনীতির প্রতি অবিশ্বাস থেকে বহু দেশে অতি-ডান ও কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, জলবায়ু-সংকটের কারণে বাড়ছে উচ্ছেদ, খাদ্য ও জলের অনিশ্চয়তা; জীবিকার ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের দখলদারি নিয়ে লড়াই চলছে। দুই প্রক্রিয়াকে কখনই আলাদা আলাদা করে বোঝা যায় না। পুঁজি প্রকৃতিকে খনিজ আহরণের জায়গা বানায়; রাষ্ট্র সেই আহরণের জন্য জমি, আইন ও প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত করে; সামরিকীকরণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভূখণ্ড সুরক্ষিত করে; আর উগ্র জাতীয়তাবাদ একাংশের মানুষকে উচ্ছেদ ও দমন করাকে ‘জাতীয় প্রয়োজন’ বলে বৈধতা দেয়।
প্রকৃতিকে পণ্যে বদলের ইতিহাস
উনিশ শতকের ইউরোপে, পুঁজিশিল্পের অগ্রগতি সমাজ ও প্রকৃতির মধ্যের সম্পর্কের ঐতিহাসিক বাঁকবদল ঘটিয়ে ফেলে। কয়লা, কাঠ এবং পরে তেল শিল্পশক্তির বা ইনডাস্ট্রিয়াল এনার্জির কেন্দ্রে চলে আসে। স্টিম ইঞ্জিন বা বাষ্পশক্তি, কারখানা ও পরিবহণকে তার পুরোনো ভৌগোলিক ও জৈবিক সীমা ছাড়িয়ে বিস্তারিত হতে সাহায্য করে। ইতিহাসবিদ ই. এ. রিজলে দেখিয়েছেন, শিল্পসভ্যতা ক্রমে স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদে সীমাবদ্ধ সমাজ-অর্থনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে, ভূগর্ভে সঞ্চিত শক্তিভান্ডারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। (২)
এই সময়েই, তাপগতিবিদ্যা বা থার্মোডায়নামিকসের বিকাশ শক্তিকে এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরযোগ্য, এবং পরিমাপযোগ্য এক বিমূর্ত উৎপাদনশক্তি হিসেবে দেখতে শেখায়। তাপ যান্ত্রিক কাজে, রাসায়নিক শক্তি বিদ্যুতে, নদীর প্রবাহ জলবিদ্যুতে বদলানো যায়—এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে পুঁজি তার নিজস্ব সামাজিক ভাষা দেয়। বন, নদী, খনিজ ও কয়লা ও তেলজাতীয় জীবাশ্ম-জ্বালানি মানচিত্রে চিহ্নিত হতে থাকে। এদের মাপামাপি, খোঁড়াখুঁড়ি ও পরিবহন শুরু হয়। প্রকৃতির মূল্য ক্রমশ নির্ধারিত হতে শুরু করে পণ্য-উৎপাদনের শিল্পে তার ব্যবহার ও গুরুত্ব অনুযায়ী। (৩)
এতে কেবল নতুন শক্তিব্যবস্থা তৈরি হল না; বরং, মানুষকে তার বিভিন্ন সামাজিক ও বাস্তুতান্ত্রিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়াও জোরদার হয়ে উঠল। যে বন খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি, চারণ, সংস্কৃতি ও সামাজিক পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্র ছিল, তা রাষ্ট্র ও পুঁজির কাছে কাঠের আড়ত বা খনিজভাণ্ডার হয়ে উঠল। শ্রমিকের সঙ্গে যন্ত্রের সম্পর্কও বদলাল: উৎপাদনের নিজস্ব ছন্দ ও সামাজিকতা ভেঙে শ্রমকে একঘেয়ে, পরিমাপযোগ্য এবং উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরির প্রক্রিয়ায় টেনে আনা হল।
শিল্পবিপ্লবের আগেকার সমাজ বা উৎপাদন প্রক্রিয়া যে একেবারে প্রকৃতি-বান্ধব ছিল— তা নয়। সেখানেও নানান ধরনের শোষণ, জঙ্গল কাটাকাটি, বড় জমিদার বা জমি-মালিকের বেশি জমি ছিল, পরিবেশের ক্ষতি হত। নতুন প্রক্রিয়ায় তফাত হল পরিমাপের ও সম্পর্কের। স্থানীয় জ্বালানি, ঋতুচক্র, নদীপ্রবাহ, মানুষের শরীর বা পেশীশক্তির সঙ্গে উৎপাদনের একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক-সীমা তৈরি হয়েছিল। পুঁজিশিল্প সেই সীমাকে ছাড়িয়ে গেল। বিশ্বের নানা প্রান্তে পণ্য-বাজার তৈরি হতে থাকল। পণ্য ও বাজারের প্রয়োজনে মাটির নিচে থাকা কয়লা-তেল, প্রাকৃতিক সম্পদ ও শক্তিকে স্থানীয় জীবনের অংশ হিসেবে না দেখে বিক্রিযোগ্য পণ্য হিসেবে সংগঠিত করা হল, মাপা হল।
পুঁজিবাদ ‘বেশি সম্পদ’ ব্যবহার করে বলে নয়; সমস্যা হল, পুঁজিবাদী মূল্য-সম্পর্ক প্রকৃতিকে মানুষের জীবন ও সমাজের বাইরে থাকা, মুনাফা সঞ্চয়ের জন্য অবাধে ব্যবহারযোগ্য এক ক্ষেত্র হিসাবে চেনাতে শুরু করল।
জীবাশ্ম পুঁজি ও জলবায়ুর পরিবর্তন
পুঁজিশিল্পে শক্তির ভিত্তি হয়ে উঠেছিল কয়লা। বাষ্পশক্তি ব্যবহারের ফলে কারখানাকে নদী সংলগ্ন এলাকা বা স্থানীয় শক্তির উৎসের কাছেই গড়ে উঠতে হবে এমন সীমাবদ্ধতা রইল না। শহর, বন্দর ও শ্রমিক-বস্তি এলাকায় কেন্দ্রীভূত হতে থাকল বড় কল-কারখানা। আন্দ্রেয়াস মাল্ম এই ব্যবস্থাকে বলেছেন ‘ফসিল ক্যাপিটাল’, যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানি শুধু অধিকমাত্রায় শক্তিই যোগায় না, উৎপাদন ও শ্রমের ওপর পুঁজির নিয়ন্ত্রণ আরো কেন্দ্রীভূত করে তোলে। একে একে কয়লাখনি বদলে দিতে থাকে বন ও বন-সংলগ্ন জনবসতি; রেল ও বন্দর তৈরি হতে থাকে সম্পদ আহরণ ও পরিবহণের জন্য; তেল ও গ্যাস উত্তোলনের জন্য সংগঠিত হতে থাকে নতুন নতুন ভূ-রাজনৈতিক এলাকা। (৪) এই ইতিহাস মনে রাখলে বোঝা যায়, জলবায়ু-সংকট আধুনিক উন্নয়ন থেকে উঠে আসা ভুঁইফোড় কোনো সমস্যা নয়। যে শক্তিব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে পুঁজিশিল্পের বিস্তার হয়ে চলেছে, জলবায়ু-সংকট তারই দীর্ঘকালীন ফলাফল।
ঐতিহাসিকভাবে, জলবায়ু সংকটে সব জাতি-রাষ্ট্রের দায় সমান নয়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার শিল্পায়ন বাতাসে কার্বনের পরিমাণ বাড়ানোর জন্যে দায়ী সবচেয়ে বেশি। অথচ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও ক্ষতির ভার বহন করছে তুলনামূলকভাবে কম শিল্প-প্রসারী দক্ষিণের নানা ছোট-বড় দেশ ও জনগোষ্ঠী। ২০২৪ সালে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের গড় ঘনত্ব পৌঁছেছে ৪২৩.৯ পিপিএমে—শিল্পপূর্ব স্তরের চেয়ে প্রায় ৫২ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালে পৃথিবীর গড় পৃষ্ঠতাপমাত্রা(সারফেস টেম্পারেচার) ১৮৫০–১৯০০-এর গড়ের চেয়ে ১.৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল; ২০১৫ থেকে ২০২৫—এই এগারো বছরই আধুনিক সময়কালে রেকর্ড ছোঁয়া উষ্ণতম এগারো বছর। (৫)
উপনিবেশ, সাম্রাজ্য ও প্রকৃতি-লুঠ
ইউরোপের বাইরে পুঁজিশিল্প বিস্তারের জন্য দরকার ছিল জমি, শ্রম, খনিজ, বন ও বাজার। উপনিবেশবাদ সেই দখলের উপযুক্ত রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছিল। ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে যে উপনিবেশ বানায়, তা কেবল মানুষের ওপর বিদেশি শাসন চাপিয়ে দেওয়া নয়; প্রকৃতিকে নতুন করে তৈরি করার বিশাল প্রকল্প হয়ে ওঠে। আলফ্রেড ডব্লিউ. ক্রসবি একেই বলেছেন ‘বাস্তুতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদ’। (৬)
ভারতে ব্রিটিশ শাসন বাণিজ্যিক বনব্যবস্থা, খনি, চা-কফির বাগান, রেলপথ ও অন্যান্য পরিকাঠামোর মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের জমি ও বন ব্যবহারের পরিচিত নিয়ম-নীতি-প্রথা চিরতরে বদলে দেয়। রামচন্দ্র গুহ ও মাধব গাডগিল দেখিয়েছেন, সাম্রাজ্যিক বননীতি, বন-জঙ্গলকে স্থানীয় সমাজের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির চৌহদ্দি থেকে সরিয়ে কাঠব্যবসা, রাজস্ব ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের এক সুবিশাল ক্ষেত্রে রূপান্তরিত করে। রেললাইনের স্লিপার, জাহাজ, খনি ও সামরিক পরিকাঠামোর জন্য কাঠ দরকার ছিল। ফলে, ‘সংরক্ষিত বনভূমি (রিজার্ভড ফরেস্ট)’ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে নদী ও জঙ্গল ব্যবহারের বহু প্রথাগত ও পুরনো পদ্ধতিকে (যেমন- জুম চাষ) অপরাধে পরিণত করা হয়। ব্রিটিশ পরবর্তী সময়ে, স্বাধীন রাষ্ট্রেও রাস্তা, রেল, খনি ও বাগিচার জন্য প্রাকৃতিক বন যত কাটা হয়েছে; তত বননির্ভর মানুষের অধিকার ও বন-জঙ্গল-নদীকে নিয়ে সমষ্টিগতভাবে বেঁচে থাকার পরিসর দুর্বল হয়েছে।
ঔপনিবেশিক মানচিত্র ও জরিপের মাধ্যমে একদিকে যেমন জমিব্যবস্থাপনার নতুন নিয়ম-কানুন তৈরি হয়েছে; অন্যদিকে, প্রকৃতিকে তার সার্বিক অস্তিত্বের বাইরে, কোন পাহাড়ে কী খনিজ, কোন নদীতে কত জলশক্তি, কোন বন কত রাজস্ব দিতে পারে— এইভাবে দেখার এক ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি ও জ্ঞান তৈরি হয়েছে। আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রও সেই দৃষ্টিভঙ্গি, জ্ঞান ও নিয়ম বহাল রেখেছে। উপনিবেশ দেশগুলির স্বাধীনতার পর, উন্নয়নের ভাষা বদলেছে, প্রকৃতির দখল ও সম্পদ আহরণের কাঠামো পুরোপুরি বদলায়নি। (৭)
পুঁজিবাদ মানুষকে প্রকৃতি থেকে এবং শ্রমকে তার সামাজিক-বাস্তুতান্ত্রিক শর্ত থেকে আলাদা করেছে; উপনিবেশবাদ সেই বিচ্ছিন্নতাকে বারবার আইন-কানুন, মানচিত্র, জরিপব্যবস্থার নানা ফন্দি-ফিকির দিয়ে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। রাষ্ট্র প্রকৃতির সংজ্ঞা ও তার ব্যবহার নির্ধারণ করেছে, পুঁজি বিনিময়মূল্য দিয়েছে। ফলস্বরূপ, পৃথিবী জুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর সরাসরি নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীগুলিকে, তাঁদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশে থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। আজকের খনি, বাঁধ, শিল্পকরিডর, পর্যটন ও সংরক্ষণ প্রকল্পেও উচ্ছেদের সেই এক যুক্তি ফিরে ফিরে আসে।
নয়া-উদারবাদ, বিশ্বায়ন ও পুঁজি-রাষ্ট্র
বিশ শতকের শেষভাগে নিওলিবরল অর্থনীতি বা নয়া-উদারবাদ পুঁজি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককে ঢেলে সাজায়। রাষ্ট্রের ধারণা বদলায় না। রাষ্ট্রের মধ্যে থাকা বহুজাতিক কর্পোরেশনের দল, বিশ্বব্যাপী সরবরাহ-শৃঙ্খল(সাপ্লাই চেন) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের(যথা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ) সংযোগে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাতে কাঁচামাল এক দেশে তোলা, অন্য দেশে প্রক্রিয়াকরণ, আরেক দেশে জোড়া লাগানো এবং সারা পৃথিবীতে বিক্রি করা সম্ভব হয়। রাষ্ট্র ক্রমে বিনিয়োগ, জমি, পরিকাঠামো, কর ছাড় দেওয়া ও আইনি অনুমতির ব্যবস্থা করে দেয়, পুঁজি-মুনাফা-সঞ্চয়-লগ্নির প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী এক প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। এই পুনর্গঠনে, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-চুক্তি ও ঋণনীতিরও ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তেল, গ্যাস, খনিজ ও পরিবহণ— এসবই আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও যুদ্ধের কেন্দ্র হিসাবে দেখা দিতে শুরু করল।
ঠিক একই সময় পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে আন্তর্জাতিক নীতি-পরিসরও গড়ে উঠল—১৯৯২-এর আর্থ সামিট, ইউএনএফসিসি, পরে কিয়োটো প্রোটোকল তৈরি হল। অথচ, পরিবেশ-সংকটের সামাজিক উৎসে মৌলিক বদল আনার বদলে সংকটের ‘সমাধান’কে আটকে রাখা হল কার্বন নির্গমনের হিসাব-নিকাশ, বাজার, প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রের প্রশাসনিক মেরামতির মধ্যে। একদিকে উৎপাদন ও পণ্য-চলাচল বিশ্বব্যাপী বিস্তৃততর, অন্যদিকে সেই বিস্তারের ক্ষতি ‘ম্যানেজ’ করার জন্য নতুন বাজার ও বিশেষজ্ঞ-ব্যবস্থা তৈরি হল।
সুতরাং, ১৯৯১-এর গাল্ফের যুদ্ধ এবং ২০০৩-এর ইরাক আক্রমণকে নিছক সামরিক কৌশল দিয়ে বোঝা যায় না। তেল, ভূখণ্ড, সামরিক ঘাঁটি এবং মার্কিন সাম্রাজ্যের ক্ষমতার প্রশ্নও সেখানে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে। আনুষ্ঠানিকভাবে, উপনিবেশ বানানোর পুরোনো চাল বদলালো। সামরিক জোট, কর্পোরেট স্বার্থ, ঋণ, অর্থনৈতিক ফতোয়া এবং প্রাকৃতিক সম্পদ-কেন্দ্রিক রাজনীতি বা ন্যাচুরাল রিসোর্স পলিটিক্সের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ নতুন এক চেহারা নিল। (৮)
যুদ্ধের রাজনৈতিক বাস্তুতন্ত্র
সামরিকীকরণের পরিবেশগত ফলাফল, কোন একটা যুদ্ধের ফলমাত্র নয়। দেশ কিংবা ভৌগোলিক অঞ্চল দখল-বদল করতে গেলে, অস্ত্র তৈরির আগে দরকার খনিজ, জ্বালানি, ইস্পাত, রাসায়নিক, কারখানা, বিপুল অর্থ। তা বাদে, সেনাঘাঁটি, মহড়া, বিমানবন্দর ও নজরদারি-ব্যবস্থা। তা ছাড়া যুদ্ধের পরে ধ্বংসস্তূপেও তৈরি হয় নতুন বাজার। ধ্বংসস্তূপ সরানো, পুনর্নির্মাণ, কংক্রিট-সিমেন্ট, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি— এসবের জন্য আসে নতুন নতুন প্রকল্প ও লগ্নি, বিদেশি ঋণ। অর্থাৎ, ধ্বংস নিজেই পরবর্তী বাজার-পণ্য-মুনাফার জায়গা হয়ে যায়।
সম্প্রতি, ইউক্রেনের যুদ্ধ বন, কৃষিজমি, জলসরবরাহ ও মানুষের জীবন-জীবিকার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করেছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির ২০২৫-এর রিপোর্ট জানাচ্ছে, গাজায় যুদ্ধের ফলে প্রায় ৬ কোটি ১০ লক্ষ টন ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়েছে। মাটি, পানীয় জল ও উপকূল বাস্তুতন্ত্রের নজিরবিহীন ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধে সরাসরি ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও, বিষাক্ত ধুলো, জলের দূষণ, মাটির দূষণ এবং পরিকাঠামো ধ্বংসের প্রভাব বহু বছর ধরে মানুষের শরীর ও পরিবেশে থেকে যাচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানার বাইরেও। (৯)
যুদ্ধের রাজনৈতিক অর্থনীতি ফুলে-ফেঁপে উঠছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক হিসেব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের সামরিক ব্যয় পৌঁছেছে ২.৮৮৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে; টানা এগারো বছর ধরে ব্যয় বেড়েই চলেছে। যুদ্ধ, অস্ত্র উৎপাদন, স্ট্র্যাটেজিক মিনারেলস বা কৌশলগত খনিজ, জ্বালানি-নিরাপত্তা এবং ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। অথচ জলবায়ু-আলোচনায় সামরিকীকরণের প্রসঙ্গ উঠে আসে খুব সামান্যই। অতএব, কারখানা ও যানবাহন থেকে বেরুনো কার্বনের হিসাব করলেই হবে না; কোন রাষ্ট্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, কোন কোম্পানি যুদ্ধ থেকে লাভ করছে, কোন ভূখণ্ড দখল বা খননের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে এবং কার জীবন ও বাস্তুতন্ত্র কার উন্নতির স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে—সে প্রশ্ন তোলাও অত্যন্ত জরুরি। (১০)
নয়া-ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক ক্ষেত্র
নয়া-উদারবাদ শুধু অর্থনীতিকে বদলায়নি; রাষ্ট্রের রাজনৈতিক মধ্যস্থতার পুরনো ব্যবস্থাকেও দুর্বল করেছে। রাষ্ট্রের তথাকথিত কল্যাণকামী বা ওয়েলফেয়ারপন্থি 'সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক' কাঠামো এক সময় সম্পদের কল্যাণমুখী পুনর্বণ্টন, শ্রমিক-অধিকার ও সরকারি পরিষেবার মাধ্যমে সমাজের ওপর পুঁজিবাদের অভিঘাত কিয়দংশে সামলাতে পারত। ধীরে ধীরে, রাষ্ট্র ক্রমে অর্থপুঁজি ও কর্পোরেট নীতির সঙ্গে আপস করে। সংগঠিত শ্রম দুর্বল হতে থাকে, সম্পদ পুনর্বণ্টনে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও ক্ষমতা দুইই কমতে থাকে। আর্থিক অনিশ্চয়তা ও বৈষম্য দিন দিন বাড়তেই ত্থাকে। অথচ, মানুষের মধ্যে জমতে থাকা অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষ, তার বুনিয়াদি বা ব্যবস্থাগত কারণ রাজনৈতিক ভাষায় প্রকাশ করবার পরিসর দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। (১১)
এহেন রাজনীতি শূন্য-অবস্থা, বা বলা ভালো রাজনৈতিক অস্পষ্টতা অতি-ডান রাজনীতিকে বড়-সড় সুযোগ করে দেয় অর্থনৈতিক অসন্তোষকে কল্পিত ‘ভিতরের শত্রু’র দিকে ঘুরিয়ে দিতে। ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি পুঁজির বিরুদ্ধে না গিয়ে, অভিবাসী, সংখ্যালঘু, প্রতিরোধকারীদের ‘দেশদ্রোহী’ বা ষড়যন্ত্রকারী হিসাবে চিহ্নিত করে। তাঁদেরই জনসাধারণের জাতশত্রু, তাঁদের দুরবস্থার হিসাবে দাগিয়ে দেয়। কাজ হারানো, মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি পরিষেবার সংকট বা জলবায়ুজনিত উচ্ছেদের ব্যবস্থাগত বা সিস্টেমিক কারণকে আড়াল করে সাংস্কৃতিক অসূয়া ও বিদেশি জনসংখ্যার চাপের ভীতি সামনে আনা হয়। রিচার্ড সেয়মুর যাকে বলছেন ‘ডিজাস্টার ন্যাশনালিজম’—সেখানে বিপর্যয়, সামাজিক হতাশা ও সভ্যতার অবক্ষয়ের ভয়কে জাতীয়তাবাদী মানসিকতায় ছকে ফেলা হয়।
তবে, 'সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি'-র দুর্বলতা থেকে ফ্যাসিবাদ অবধারিতভাবে জন্মাবে এমন সরল কথা বলা যায় না। প্রতিটি দেশের ইতিহাস ও সেই ইতিহাসের ভিতরকার শ্রেণি-সম্পর্ক আলাদা। তা সত্ত্বেও বলা যায়, সম্পদের পুনর্বণ্টন, সংগঠিত শ্রম ও গণতান্ত্রিক মধ্যস্থতা ভেঙে পড়লে কর্তৃত্ববাদী জাতীয়তাবাদের(অথরিটারিয়ান ন্যাশনালিজম) জন্য রাজনৈতিক ক্ষেত্র প্রশস্ত হয়। এবং, জলবায়ু-সংকটও নিজে থেকে কোনো প্রগতিশীল পরিবেশ-রাজনীতি তৈরি করতে পারে না; একই সংকট বেশিরভাগ সময় কর্তৃত্ববাদী, উগ্র-জাতীয়তাবাদী এবং অপরায়নের রাজনীতিকে পুষ্ট করে। (১২)
ফ্যাসিবাদ ও প্রকৃতির সম্পর্ক তাই দ্বন্দ্বপূর্ণ। নাৎসি জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেছিল ‘রক্ত ও মাটি’-র লব্জ ব্যবহার করে। কৃষিজমি ও জার্মান ভূ-প্রকৃতির রোমান্টিকতা ব্যবহার করেছিল নাৎসি মতাদর্শ। একই সঙ্গে রাস্তা, মোটরগাড়ি, রাসায়নিক শিল্প, অস্ত্র, বিমান এবং যুদ্ধের সরঞ্জামের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল তৎকালীন জার্মানিতেই। তাই, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়; প্রকৃতিকে জাতীয় প্রতীক হিসেবে বন্দনা করা এবং বাস্তবে, বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করা—দুইই পাশাপাশি চলতে পারে। সভ্যতা, নদী, বন বা প্রাচীন কৃষির নামে জাতিবন্দনা করেও রাষ্ট্র অনায়াসে খনি, শিল্পাঞ্চল, সামরিক পরিকাঠামো ও কর্পোরেট প্রকল্পের জন্য প্রকৃতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। (১৩)
তথ্যসূত্র
১. Foster, J. B. (2002), Ecology Against Capitalism; Malm, A. (2013), “The Origins of Fossil Capital”; Saito, K. (2017), Karl Marx’s Ecosocialism.
২. Wrigley, E. A. (2010), Energy and the Industrial Revolution.
৩. Lohmann, L. & Hildyard, N. (2014), Energy, Work and Finance; Caffentzis, G. & Federici, S. (2014), “Commons Against and Beyond Capitalism”.
৪. Malm, A. (2013), পূর্বোক্ত।
৫. WMO (2025), Greenhouse Gas Bulletin No. 21; WMO (2026), 2025 Global Temperature Assessment; Carbon Brief, Historical Responsibility for Climate Change.
৬. Crosby, A. W. (2004), Ecological Imperialism.
৭. Gadgil, M. & Guha, R. (2004), The Use and Abuse of Nature; Ghosh, S. (2016), “Selling Nature”; Tian, H. et al. (2014), “History of Land Use in India, 1880–2010”.
৮. Research Unit for Political Economy (2003), Behind the War on Iraq.
৯. UNEP (2022), Environmental Impact of the Conflict in Ukraine; UNEP (2025), Environmental Impact of the Conflict in Gaza.
১০. Liang, X. et al. (2026), Trends in World Military Expenditure, 2025, SIPRI.
১১. Fraser, N. (2017), “The End of Progressive Neoliberalism”; Fraser (2019), The Old Is Dying and the New Cannot Be Born; Streeck, W. (2016), How Will Capitalism End?
১২. Seymour, R. (2025), Disaster Nationalism; Mudde, C. (2019), The Far Right Today.
১৩. Guha, R. (2016), Environmentalism.
(চলবে)
আলোকচিত্র: কুশল কর
