যন্তর-মন্তরের আন্দোলন: ক্ষোভের জয়, অসমাপ্ত রাজনীতি : প্রথম পর্ব
দিল্লি-কাঁপানো ৪৯ দিন! যন্তর-মন্তরের সাম্প্রতিক আন্দোলনকে এই নামে ডাকছেন দেখলাম কেউ কেউ। সে ভালোই, মজার ব্যাপার। তবে, শুধু দিল্লি-কাঁপানো বললে এই আন্দোলনকে বোধহয় খানিক খাটো করে দেখানো হবে। ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এই আন্দোলনকে নজিরবিহীন বললে বিন্দুমাত্র বাড়িয়ে বলা হয় না। তার নানা কারণ আছে। তথাকথিত ‘জেন জি’-র তরুণ-তরুণীরা এই আন্দোলনের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিলেন, আন্দোলনের ভাষা, সংগঠন এবং বিস্তারের ধরন অনেকটাই চেনা রাজনৈতিক ছকের বাইরে ছিল— এসবের বাইরেও নানা কারণ আছে। সে কথায় ক্রমে আসা যাবে।
আপাতত খাতায়কলমে আন্দোলনের প্রাপ্তির হিসেবটা মিলিয়ে নেওয়া যাক। আন্দোলনের চাপে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন, শিক্ষা-দুর্নীতি সংক্রান্ত আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবিও পূরণ হয়েছে। সোনম ওয়াংচুক-সহ বাকিরা তাই অনশন তুলে নিয়েছেন। ফলে আপাত হিসাবে যন্তর-মন্তরের সাফল্য নিয়ে খুব বেশি সংশয়ের জায়গা থাকার কথা নয়।
নির্দ্বিধায় বলা যায়, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এই আন্দোলনের বড়সড় রাজনৈতিক সাফল্য। শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারকে রাস্তায় তৈরি হওয়া চাপের সামনে পিছু হটতে হচ্ছে, গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক আবহ মাথায় রাখলে, এ ঘটনাকে ছোট করে দেখা যাবে না। তবু, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকেই যদি যন্তর-মন্তরের আন্দোলনের সর্বোচ্চ সাফল্য বলে ধরে নিই, তাহলে আন্দোলনটা যে আরও বড় একটা রাজনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, সম্ভবত চোখ এড়িয়ে যাবে।
কারণ, যন্তর-মন্তরের আন্দোলন গুটিয়ে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে দেশের ছাত্র-যুবদের ক্ষোভ স্তিমিত হয়নি। বরং, দেশের নানা প্রান্তে পরীক্ষা, নিয়োগ, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানকে ঘিরে ক্ষোভ বারবার রাস্তায় আছড়ে পড়েছে। বিহারে নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে লাগাতার আন্দোলন। ঝাড়খণ্ডেও নিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের প্রশ্নে ছাত্র-যুবদের ক্ষোভ। বিহার, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান কী হরিয়ানায় স্কুলপড়ুয়াদের(জেন আলফা) অভিনব আন্দোলন। জায়গা আলাদা, দাবি আলাদা, সংগঠনও আলাদা, ফলে সবকিছুকে যন্তর-মন্তরের সরাসরি ধারাবাহিকতা বলে দাগিয়ে দেওয়ার কারণ নেই। তাহলেও, একই সময়পর্বে একটা প্রজন্মের ক্ষোভ যে বারবার পরীক্ষা, নিয়োগ, শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন ধরে রাস্তায় বেরিয়ে আসছে, সেই মিল উপেক্ষা করা মুশকিল।
ফলে, যন্তর-মন্তরকে ফিরে দেখতে গেলে শুধু কী কী দাবি পূরণ হল, সে হিসেব দিয়ে দেখা চলবে না। দেখতে হবে, আন্দোলন ঠিক কী কী করল! নিছক একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করল? নাকি, ভারতের দমবন্ধকরা রাজনৈতিক পরিসরে, বিরোধিতার একটা জানলাও খুলে দিল আবার? দেশের বৃহদাংশ জুড়ে বিজেপির আপাত বিজয়রথ ছুটছে, রাষ্ট্র, আর এস এস, পুজি, প্রযুক্তি, সব মিলিয়ে আধিপত্যের দুর্ভেদ্য নিশ্ছিদ্র ব্যুহ। সেই ব্যুহে ফাঁক ও ফাটল তৈরি করে নতুন আন্দোলন ঢুকে এল অবলীলায়, জন্ম দিল নতুন সম্ভাবনার। মনে করিয়ে দিল, কোনও শক্তিই অপরাজেয় নয়, অভেদ্য নয়। শুধু চ্যালেঞ্জ জানানোটা জরুরি।
ভিড়ের রাজনীতি
নির্বিচার ভিড় দেখলে খানিক সংশয় হয়। ভিড়ের রাজনীতিতে প্রশ্নহীন বিশ্বাস রাখা কঠিন।
আন্না হাজারের সপক্ষে ভিড় দেখেছি, নির্ভয়াকাণ্ডে ভিড় দেখেছি। সেই ভিড় দেশে কোন পটপরিবর্তন এনেছে, তাও দেখেছি। গত দেড় দশকে পৃথিবীর নানা প্রান্তে আরও অনেক ভিড় তৈরি হয়েছে। আরব বসন্ত থেকে অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট, হংকং থেকে চিলি, শ্রীলঙ্কা থেকে সাম্প্রতিক বাংলাদেশ, রাস্তায় লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতি বহুবার এমন মুহূর্ত তৈরি করেছে, যখন মনে হয়েছে ইতিহাসের চাকা এই বুঝি অন্য দিকে ঘুরল। অধিকাংশক্ষেত্রেই ঘোরেনি। অন্তত, আন্দোলনকারীরা যে দিকে চেয়েছিলেন, সে দিকে তো নয়ই।
ভিনসেন্ট বেভিন্স তাঁর ‘ইফ উই বার্ন’ বইয়ে গত দশকের এই গণআন্দোলনগুলোর ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলেছেন। বিপুল মানুষকে দ্রুত রাস্তায় নামানো, একটা সরকারকে অচল করে দেওয়া অথবা পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে মুহূর্তের মধ্যে কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আন্দোলনগুলোর ছিল। তারপর? রাস্তায় তৈরি বিপুল জনশক্তিকে স্থায়ী রাজনৈতিক পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে কে, কারা, কিভাবে? আপাত নেতৃত্বহীনতা বা আলগা সংগঠন যদি আন্দোলনের শক্তি হয়, রাষ্ট্র বা সরকারবিরোধী রাজনীতির প্রশ্ন সামনে এলে সেটাই কি দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায় না?
বেভিন্সের বইয়ের উপশিরোনামেই রয়েছে ‘দ্য মাস প্রোটেস্ট ডেকেড অ্যান্ড দ্য মিসিং রেভোলিউশন’। বিপ্লবটা যেন হওয়ার কথা ছিল। হল না। কোথাও পুরনো বন্দোবস্ত অন্য চেহারায় ফিরে এসেছে, কোথাও আন্দোলনের তৈরি রাজনৈতিক শূন্যস্থান দখল করেছে এমন সব শক্তি, যাদের ক্ষমতায় আনার জন্য মানুষ রাস্তায় নামেনি। কোথাও কোথাও, গোটা রাজনৈতিক বন্দোবস্তটাই আরও ডানদিকে, বলা ভালো অতি-দক্ষিণে সরে গিয়েছে।
যন্তর-মন্তরের সাম্প্রতিক আন্দোলনকে অন্তত এই মুহূর্তে আগের সমস্ত অভিজ্ঞতার সঙ্গে এক পঙ্ক্তিতে বসাতে তাই অসুবিধা হচ্ছে। কারণ ভিড় এই মুহূর্তে কাকে প্রশ্ন করছে, কোন প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছে, প্রশ্নের পর কী ঘটছে, সেসবও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের রাজনীতি গত কয়েক বছরে যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে বিজেপি শুধু একটা নির্বাচন-জেতা রাজনৈতিক দল নয়। একের পর এক ব্যাখ্যাতীত নির্বাচনী সাফল্য, ভোট ব্যবস্থাটা নিয়েই অনায়াস ছিনিমিনি খেলা, বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষমতা, কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সংবাদমাধ্যমের একটা বড় অংশের চরিত্রবদল করে ফেলা, বিরোধী দল ভাঙানো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আপাদমস্তক কব্জা করে ফেলা, সব মিলিয়ে তার গায়ে একটা প্রায় অপ্রতিরোধ্য তকমা লেগে গেছিল। বিরোধিতার পরিসরও সেই সঙ্গে ক্রমশ সংকুচিত। এমন একটা সময়ে যন্তর-মন্তরের ভিড় সরাসরি সেই ক্ষমতাকেই প্রশ্ন করছে, শেষ পর্যন্ত পিছু হটতেও বাধ্য করেছে। তথাকথিত সংগঠিত কোনো রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে না থেকেও। দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এ ঘটনা নজিরবিহীন। সুতরাং, বাংলাদেশে কোনও ‘জেন জি’ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত অতিদক্ষিণপন্থী শক্তির হাত শক্ত করেছে বলে দিল্লির আন্দোলনেরও এক পরিণতি হবে, এমন নিয়ম রাজনীতিতে অচল। আজকের অভিমুখ আগামী গন্তব্য নিশ্চিত করে না, ঠিক। কিন্তু আজকের অভিমুখটাও তো অস্বীকার করা যায় না।
যা নিয়ে সূত্রপাতঃ নিট কেলেঙ্কারি
যন্তর-মন্তরের এহেন বিস্ফোরণের তাৎক্ষণিক কারণটা অবশ্য বেশ নির্দিষ্ট। নিট নামক সর্বভারতীয় পরীক্ষা। নিট-কে সাধারণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হিসেবে দেখা ভুল হবে। তা ভারতের চিকিৎসা-শিক্ষায় প্রবেশের অন্যতম প্রধান দরজা, লক্ষ লক্ষ তরুণের ভবিষ্যৎ পরীক্ষার ফলের সঙ্গে জড়িয়ে। অতএব, পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটা নিছক প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্ন থাকে না। রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা, সামাজিক ন্যায় এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একজন নাগরিকের বিশ্বাসের প্রশ্নও তার সঙ্গে জুড়ে যায়।
নিট পরীক্ষার্থী শুধু একটা পরীক্ষা দেন না। তার পিছনে থাকে কয়েক বছরের প্রস্তুতি, পরিবারের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, কোচিং, বই, মক টেস্ট, অনলাইন কোর্স, যাতায়াত, কখনও অন্য শহরে গিয়ে থাকার খরচ। বহু মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার নিজেদের অন্য চাহিদা কমিয়ে সন্তানের পড়াশোনায় অকাতরে টাকা ঢালে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে শুধু একটা পরীক্ষার নিরপেক্ষতা নষ্ট হয় না। বহু পরিবারের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, ছাত্রদের বহু বছরের শ্রম জলে যায়। ‘নিয়ম মেনে চললে তার ফল পাওয়া যাবে’, রাষ্ট্রে ন্যস্ত রাখা সরল এই বিশ্বাসও ধাক্কা খায়। পরীক্ষার্থীর কাছে প্রশ্নটা খুব সরল। নিয়ম মেনে খেলছি অথচ খেলাটাই নিয়ম মেনে হচ্ছে না, তাহলে আমার পরিশ্রমের মূল্য কোথায়?
এই জায়গা থেকেই মেধার নৈতিক ভিত্তি নড়ে ওঠে, মেধা আর শুধু ব্যক্তিগত পরিশ্রমের ফসল হয়ে থাকে না। প্রতিষ্ঠান কতটা ন্যায্য, রাষ্ট্র কতটা নির্ভরযোগ্য এবং প্রতিযোগিতার নিয়ম সকলের জন্য সত্যিই এক কি না, সে প্রশ্নগুলোও অতিকায় হয়ে উঠতে শুরু করে।
প্রশ্নপত্র-ফাঁসকে আলাদা অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা অসম্ভব। শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের মাঝের সেতু বলতে পরীক্ষা, অন্তত আমাদের দেশে। স্কুলের পরে কোচিং, কোচিংয়ের পরে পরীক্ষা, পরীক্ষার পরে ফল, তারপর আবার পরীক্ষা। নিট, জেইই, এসএসসি, ইউপিএসসি, ব্যাংকিং, রেল, রাজ্যস্তরের নিয়োগ পরীক্ষা, সর্বত্র মোটামুটি এক ছবি।
তরুণদের জীবনের বড় অংশ খরচা হচ্ছে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে। মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যাও রয়েছে। পর্যাপ্ত সংখ্যায় স্থায়ী, নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ কাজ তৈরি না হলে বিপুল সংখ্যক তরুণকে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতেই হবে। পরীক্ষা তখন শিক্ষার পদ্ধতি নয়, ক্রমশ সামাজিক বাছাইয়ের যন্ত্র। প্রশ্নপত্র ফাঁস, বাছাই প্রক্রিয়ার চরম বিকৃতিগুলোর মধ্যে একটা।
অতএব, আন্দোলনের প্রশ্নটা শুধু ‘পরীক্ষা সৎভাবে নেওয়া হোক’-এ থেমে থাকলে রাজনৈতিক সম্ভাবনাও অর্ধেক থেকে যায়। পরের প্রশ্ন আরো বড়। তরুণের ভবিষ্যৎ এত অল্প কিছু পরীক্ষা, আবোলতাবোল কিছু র্যাঙ্ক আর কয়েকটা আসনের উপর নির্ভর করবে কেন?
নিট সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ। পরীক্ষা ঘিরে ক্রমাগত অভিযোগ, প্রযুক্তিগত সমস্যা, প্রশ্নপত্র সংক্রান্ত বিতর্ক, পুনঃপরীক্ষা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা ইত্যাদির ফল, এনটিএ-র বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুতর প্রশ্নের মুখে। একই ধরনের অভিযোগ বারবার উঠলে, নিছক কর্মী, পরীক্ষাকেন্দ্র অথবা অপরাধচক্রকে দায়ী করে থেমে থাকা যায় না। প্রতিষ্ঠানের কাঠামো, সক্ষমতা, সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া, এসবও প্রশ্নের মধ্যে চলে আসে। এই কারণেই, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি রাজনৈতিকভাবে অযৌক্তিক ছিল না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের রাজনৈতিক প্রধান হিসেবে তাঁর উপর দায় বর্তায়। রাজনৈতিক দায় মানে মন্ত্রী নিজে বসে প্রশ্নপত্র পাহারা দেবেন, এমন নয়। কিন্তু যে ব্যবস্থা তাঁর অধীনস্থ, তার ধারাবাহিক ব্যর্থতার দায় যে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের, গণতন্ত্রে এটাই তো স্বাভাবিক। যন্তর-মন্তরের আন্দোলন যদি ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের সঙ্গে সমার্থক হয়ে ওঠে, তাহলে সম্ভবত আন্দোলন থেকে যে রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হল, হচ্ছে, চোখ এড়িয়ে যাবে।
একদিকে, মন্ত্রীর পদত্যাগের নির্দিষ্ট দাবি, সরকারের পিছু হটা। অন্যদিকে যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তার অনেকটা এখনও অক্ষত। যন্তর-মন্তরের সাফল্য সম্ভবত এই দুইয়ের মাঝখানেও কোথাও, বলা ভালো, দুইয়ের থেকে সমদূরত্বে, অন্য কোথাও।
আগেই বলা হয়েছে, শাসকের নিশ্ছিদ্র আধিপত্যের ধারণায় যন্তর-মন্তর রীতিমত জোরালো ধাক্কা। ধাক্কার রাজনৈতিক অভিঘাতে ভারতের ‘মৃতপ্রায়' সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন ঘটবে কিনা, বলার সময় আসেনি, আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিঘাতকে ভোটের ফলাফল দিয়ে এক্ষুনি এক্ষুনি মাপাটাও ভুল হবে।
আন্দোলন কেমন ছিল
জেন জি-রা এমনিতেই মজাদার, ক্ষেত্রবিশেষে, অস্বস্তিকর-গোছের মজাদার। আন্দোলনের ভাষা এবং সংগঠনের পদ্ধতিতে বদলটা স্পষ্টতর। সামাজিক মাধ্যম, মিম, ব্যঙ্গ, লাইভস্ট্রিম এবং দ্রুত ডিজিটাল যোগাযোগ আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিয়েছে। এই প্রজন্ম প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার সঙ্গে সবসময় স্বচ্ছন্দ নয়। পুরনো স্লোগান ব্যবহার না করেও তারা রাজনৈতিক হতে পারে, দলীয় পতাকা না ধরেও রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে পারে।
রাজনীতিতে আগ্রহ না থাকা এবং প্রচলিত দলীয় রাজনীতির প্রতি অনাস্থা এক নয়। একজন তরুণ রাজনৈতিক দলের সদস্য নাও হতে পারেন, তবু এতদ্বারা তাঁর চাকরির প্রয়োজন মুছে যায় না। মতাদর্শগত তর্কে আগ্রহী না হয়েও হয়তো তিনি চান, পরীক্ষাটা ঠিক ভাবে হোক। পুরনো রাজনৈতিক ভাষায় কথা না বললেও শিক্ষা, কাজ, সামাজিক নিরাপত্তা চান। একটা কথা না বললেই নয়, ‘জেন জি আন্দোলন’ শব্দবন্ধের মধ্যে বেশ সমস্যা আছে। আন্দোলনের সামাজিক-অর্থনৈতিক চরিত্র আড়াল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যন্তর-মন্তর বা দেশের অন্যত্র জড়ো হওয়া তরুণরা রহস্যময় ও প্রজন্মজনিত বৈশিষ্ট্যতাড়িত হয়ে রাস্তায় নামেননি। বাস্তব জীবনে সংকট আছে বলে নেমেছেন। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, শিক্ষা ব্যয়বহুল, চাকরি সীমিত, পরীক্ষায় বিশ্বাস নেই এবং সামাজিক বৈষম্য গভীর। ডিজিটাল ভাষা ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম মাত্র, ক্ষোভের কারণ নয়।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি, আন্দোলনের আর একটা মজাদার নতুন উপাদান। রহস্যময়ও বটে৷ নামের মধ্যেই প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ। ‘ককরোচ’ শব্দকে অপমান থেকে রাজনৈতিক পরিচয়ে বদলে দেওয়া, মিম ও ব্যঙ্গকে রাজনৈতিক যোগাযোগের হাতিয়ার করা, প্রতিষ্ঠিত দলীয় কাঠামো থেকে দূরত্ব রাখা, এসবই প্রচলিত ছাত্র রাজনীতির থেকে আলাদা। এই অর্থে, সিজেপি আমাদের সময়ের রাজনৈতিক শূন্যতাকে ধরতে পেরেছে। তা সত্ত্বেও, মানুষকে দ্রুত রাস্তায় টেনে আনা, এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা এক কাজ নয়। বেভিন্সের প্রশ্নটা আবার ফিরে আসে।
মিম মানুষকে আন্দোলনে আনতে পারে, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র তৈরি করতে পারে না। ব্যঙ্গ রাষ্ট্রকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচির বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না। ভাইরাল হওয়া এবং নিচুতলায় সংগঠন তৈরি করার মধ্যেও বিস্তর ফারাক। সদস্যদের অংশগ্রহণ, গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নেতৃত্বের জবাবদিহি, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়া নতুন রাজনৈতিক ভাষা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, পূর্বনির্ধারিত উত্তর নেই। সম্ভবত, সিজেপি-র সামনে এখন সেই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড়। সরকারের চোখে চোখ রেখে আন্দোলন তৈরির ক্ষমতা তারা দেখিয়েছে। আন্দোলনের তৈরি করা রাজনৈতিক ভাষা ও ভাষ্যকে তারা কীভাবে, কোন দিকে চালিত করতে পারে, কতদিন বহন করতে পারে, সে পরীক্ষা বাকি।
আন্দোলনের ধাঁচধরণ
রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাইতে গেলে নিজেদের ঘরের ভিতরেও খানিক আলো ফেলতে হয়। সিজেপি-র ভিতরে নেতৃত্ব, পক্ষপাতিত্ব এবং নিচুতলার সদস্যদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে দূরে রাখা নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিছক ব্যক্তিগত বিবাদ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। সদস্যদের ভূমিকা কী? নেতৃত্ব ঠিক হবে কীভাবে? কোনও নেতা বা মুখপাত্রকে প্রশ্ন করার অধিকার কার? আন্দোলনের তহবিল কোথা থেকে আসছে? কর্মসূচি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তই বা কে নেবেন? প্রশ্ন নতুন নয়। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অনাস্থা থেকে জন্ম নেওয়া প্রায় প্রত্যেক নতুন সংগঠনকেই কোনো না কোনো সময়ে পরীক্ষার সামনে দাঁড়াতে হয়। পুরনো দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেই নতুন সংগঠন নিজে নিজেই গণতান্ত্রিক হয়ে যায় না। বরং, সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হলে ব্যক্তিনির্ভরতা দ্রুত তৈরি হতে পারে।
এ জায়গাতেই রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর থেকে দূরত্ব বজায় রাখা আন্দোলনের সচেতন সিদ্ধান্ত হতেই পারে, হয়তো অনেক সময়ে জরুরিও। অথচ, রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য এবং রাজনৈতিক শূন্যতা এক নয়। দলের অধীনে না থাকলেও আন্দোলনকে শেষ অবধি ঠিক করতে হয়, সে কোন সমাজ চায়, কোন অর্থনীতির পক্ষে দাঁড়ানো দরকার, রাষ্ট্রের কাছে তার দাবি কী, সে দাবি আদায়ের জন্য কোন পথে সে যেতে চায়!
নিট নিয়ে প্রশ্নেই ব্যাপারটা স্পষ্ট। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা যায়। মুশকিল হচ্ছে, খানিক এগোলেই সরকারি শিক্ষার ব্যর্থতা, পরীক্কা-প্রস্তুতির সুযোগে বৈষম্য, শিক্ষার বেসরকারিকরণ, বেকারত্ব, শ্রেণি এবং সামাজিক অসমতার প্রশ্ন আসবে, নিছক পরীক্ষার প্রশ্নে আন্দোলন আটকে থাকবে না। অতএব, রাজনীতি থেকে দূরে থাকার ঘোষণা করেও, শেষ পর্যন্ত রাজনীতি থেকে বেরিয়ে যাওয়া যায় না। গত দশকের বহু আন্দোলন পুরনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে অবিশ্বাস করেছে, হয়তো ন্যায্য কারণেই। সমস্যা এইখানে যে পুরনো প্রতিষ্ঠানকে প্রত্যাখ্যান করা এবং তার বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা এক ব্যাপার নয়। প্রথমটা, দ্রুত হতে পারে। দ্বিতীয়টা, ধীর, ক্লান্তিকর, রোমাঞ্চহীন। আন্দোলনের আঁচে হাজার হাজার মানুষকে রাস্তায় জড়ো করে ফেলে সেঁকা যায়, সংগঠনের বৈঠকে মানুষের বহুস্বরকে একটাই সিদ্ধান্তে নিয়ে যাওয়া যায় না সহজে। অথচ, দ্বিতীয় কাজটা না করলে প্রথম কাজে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শক্তিও বেশিদিন নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
সুতরাং, গণতন্ত্র নিয়ে ওঠা সিজেপি-র ভিতরের প্রশ্নগুলো আন্দোলনের বাইরে থাকা নিছক খুচরো বিতর্ক নয়। যে আন্দোলন রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাইছে, তার নিজের ভিতরেও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা দরকার, নতুবা একসময় আন্দোলনের নৈতিক কর্তৃত্বেও ফাটল ধরতে পারে। আর কে না জানে, গণতন্ত্র শুধু দাবি করার বিষয় নয়, চর্চারও।
(চলবে)
(আলোকচিত্র: সংগৃহীত)
