ফাসিবাদ, গণতন্ত্র এবং বিরুদ্ধতার দীর্ঘ লড়াই : দ্বিতীয় পর্ব
প্রথম পর্বে আলোচনা ছিল বঙ্গভোটের তাৎপর্য, ফাসিবাদকে একটি বৃহত্তর সামাজিক বন্দোবস্ত হিসেবে দেখা, ডিজিটাল ও খাজনাদার পুঁজির ভূমিকা, আরএসএস-এর দীর্ঘ সামাজিক সংগঠন, এবং রাস্তার আন্দোলন ও সঙ্ঘায়নের তফাত নিয়ে। এই পর্বে প্রশ্ন এগোয়: ফাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক সামাজিক ক্ষমতা তৈরি হবে কীভাবে?
গণতন্ত্র মানে পাঁচ বছরে একবার নয়
আমাদের রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে গণতন্ত্রকে ভোটের সমার্থক করেছে। ভোট আছে মানে গণতন্ত্র আছে। ভোটে জিতেছি মানে মানুষ সঙ্গে আছে। হেরেছি মানে নেই। বড় অদ্ভুত যুক্তি। একটি গ্রামের মানুষ গ্রামের জল, বন, জমি, স্কুল, হাসপাতাল নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে, সে অধিকার তাদের নেই; পাঁচ বছরে একদিন বুথে গিয়ে একটা বোতাম টেপার অধিকার আছে। এইটুকুতে তারা সার্বভৌম নাগরিক হয়ে গেলো? শহরের মহল্লায় কোথায় পার্ক থাকবে, কোথায় বহুতল হবে, কারা উচ্ছেদ হবে, পুরসভার বাজেট কোথায় খরচ হবে—সিদ্ধান্ত নেয় আমলা, প্রোমোটার, কাউন্সিলর। স্থানীয় মানুষ পরে জানেন। অথচ ভোটের দিন তাঁরা গণতন্ত্রের মালিক। পাঁচ বছরের লিজের মালিকানা। ফাসিবাদবিরোধী আন্দোলনকে যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি হতে হয়, প্রথম কাজ গণতন্ত্রকে ভোটের খাঁচা থেকে বার করা। গণতন্ত্রকে অভ্যাস বানানো।
গ্রামে গ্রামসভা। শহরে মহল্লাসভা। কারখানায় শ্রমিক কমিটি। স্কুলে শিক্ষক-অভিভাবক-ছাত্রের যৌথ সভা। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন ছাত্রসমিতি। গিগ শ্রমিকদের স্থানীয় সংগঠন। বস্তি বা কলোনিতে উচ্ছেদবিরোধী সমিতি। বাজারে ছোট ব্যবসায়ীদের যৌথ। যেখানে মানুষ আছে, সেখানে মানুষের নিজেদের বিষয়ে নিজেরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা। এসব শুনলে অনেকে বলবেন, সে তো নাগরিক সমাজ, এনজিও, পাড়ার ক্লাব গোছের ব্যাপার। বিপ্লব কোথায়? বিপ্লব সম্ভবত এখানেই।
একজন মানুষ সারাজীবন ওপর থেকে নির্দেশ পেতে অভ্যস্ত—বাড়িতে, স্কুলে, অফিসে, পার্টিতে, ইউনিয়নে, পঞ্চায়েতে, রাষ্ট্রে। তিনি হঠাৎ ভোটের দিন গণতান্ত্রিক হয়ে উঠবেন কোন জাদুতে? গণতন্ত্র শিখতে হয়। যেমন গান শেখা হয়, চাষ শেখা হয়, সংগঠন শেখা হয়। কথা বলতে হয়, শুনতে হয়। হারতে হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও সংখ্যালঘুর কথা মানতে হয়, দায়িত্ব নিতে হয়, দায়িত্ব ছাড়তে হয়। ফাসিবাদ উল্টো শেখায়। নেতা, রাষ্ট্র, দেশ, সেনা, বাবা, গুরু জানে। প্রশ্ন কোরো না।
সুতরাং ফাসিবাদবিরোধী গণতন্ত্রের কাজ সাংবিধানিক মূল্যবোধ নিয়ে বছরে দুটো সভা নয়। মানুষের প্রতিদিনের জীবনে এমন পরিসর বানানো, যেখানে তারা নির্দেশ না মেনে সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত হয়। এটাই ভিত বানানো, সঙ্ঘায়নের বুনিয়াদী প্রক্রিয়াকে শুরু করা। কতজন সদস্য হলেন সেটা নয়। কতটা সামাজিক ক্ষমতা তৈরি হলো।
গণতন্ত্র, ভুল করেও শিখতে হয়
এই কথাটার মধ্যে একটা অস্বস্তিকর ব্যাপার আছে। স্থানীয় মানুষ সিদ্ধান্ত নিলেই ভালো হবে—নিশ্চয়তা নেই। গ্রামসভা ভুল করতে পারে, মহল্লাসভা সংখ্যালঘুকে চেপে ধরতে পারে, শ্রমিক কমিটিতে নারী বা দলিতের কথা উপেক্ষিত হতে পারে। স্থানীয় সমাজেও জাতপাত, পিতৃতন্ত্র, ধর্মীয় বিদ্বেষ, টাকার ক্ষমতা আছে। বিকেন্দ্রীকরণকে রোমান্টিক বানালে চলবে না। কিন্তু এই যুক্তিতে সব সিদ্ধান্ত আমলা, আদালত, পার্টি-নেতা বা বিশেষজ্ঞের কাছে ফেরত পাঠালে গণতন্ত্র শেখার পথ বন্ধ হয়। ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল, সংখ্যালঘুর অধিকার, প্রকাশ্য হিসেব, নেতৃত্বের পরিবর্তন, নারীর স্বতন্ত্র সংগঠন—এই সব রক্ষাকবচ বানাতে হয়। গণতন্ত্র নিখুঁত ব্যবস্থা নয়; নিজের ভুল সংশোধনের সামাজিক ক্ষমতা তৈরি করার ব্যবস্থা।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই জায়গাটা প্রায় অনুপস্থিত। সভা মানে বক্তা বলবেন, বাকিরা শুনবেন। কমিটি মানে কয়েকজন জানবেন, বাকিরা মানবেন। আন্দোলনের মধ্যেও একই অভ্যাস ঢুকে থাকে। ফাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যদি আমরা নিজের সংগঠনের ভিতরেই প্রশ্ন অপছন্দ করি, নেতৃত্বকে অ-চ্যুত ভাবি, মতভেদকে বিশ্বাসঘাতকতা বলি, শত্রুর রাজনৈতিক সংস্কৃতির ছোট সংস্করণ তৈরি হয়। বিরুদ্ধতার রাজনীতি শুধু অন্য কথা বলবে না; অন্যভাবে চলার অভ্যাসও তৈরি করবে।
কেন্দ্র নয়, বহু কেন্দ্র
বিকেন্দ্রীকরণের প্রসঙ্গটা আসতে বাধ্য। বিকেন্দ্রীকরণ মানে দিল্লির মন্ত্রকের কিছু টাকা পঞ্চায়েতে পাঠানো নয়। ক্ষমতা নিচে নামানো। নিচে মানে, আবার পঞ্চায়েত প্রধানের হাতে নয়। সমাজের হাতে। কোন এলাকায় কী ধরনের স্কুল দরকার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র দরকার কি না, জমি কোথায় কী কাজে যাবে, বন কীভাবে ব্যবহৃত হবে, স্থানীয় বাজেট কোথায় খরচ হবে—সে সিদ্ধান্ত যতদূর সম্ভব স্থানীয় মানুষের। গ্রামসভা, মহল্লাসভা, শ্রমিকসভা সিদ্ধান্ত নেবে। ওপরের স্তর প্রয়োজনমতো সমন্বয় করবে, নির্দেশ নয়।
ভারতবর্ষে এ কথাগুলো নিছক কল্পগল্প নয়। আদিবাসী এলাকায় বহুদিনের স্বশাসনের সামাজিক স্মৃতি আছে; বনাধিকার আইন বা পেসা জাতীয় আইনে গ্রামসভার ক্ষমতার কিছু আইনগত স্বীকৃতিও আছে। বহু আন্দোলন সেই আইনি জায়গাটুকুকে বাস্তব সামাজিক ক্ষমতায় বদলানোর চেষ্টা করেছে। কোথাও সফল, কোথাও ব্যর্থ। আসল কথাটা আইন নয়। মানুষ নিজেদের সম্পদ নিয়ে নিজেরা কথা বলছে, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সরকারের সঙ্গে দর কষাকষি করছে—এই অনুশীলন।
মেক্সিকোর জাপাতিস্তারা এ কাজ কয়েক দশক ধরে করছেন। সেখানে স্বশাসিত সমাজব্যবস্থা আকাশ থেকে পড়েনি। ১৯৯৪-এ বন্দুক হাতে জঙ্গল থেকে লোক বেরিয়ে এসে পরদিন ‘হরাইজন্টাল’ গণতন্ত্র চালু করে ফেলেছিল, এমন নয়। তার পিছনে বহু বছরের গোপন রাজনৈতিক কাজ, আদিবাসী সমাজের নিজস্ব সংগঠন, বিতর্ক, ভুল, শেখা, পুরোনো ভ্যানগার্ড ধারণাকে ভেঙে নতুন সম্পর্ক তৈরির ইতিহাস আছে। পুরোনো বিপ্লবী সংগঠন শেষ পর্যন্ত স্থানীয় আদিবাসী নেতৃত্বের অধীন হয়েছে। নেতৃত্বের বিখ্যাত কথাটা মনে রাখা ভালো—command by obeying। আদেশ করে নেতৃত্ব নয়, শুনে নেতৃত্ব।
রোজাভার ক্ষেত্রেও অনুরূপ শিক্ষা আছে। স্থানীয় কমিউন, কাউন্সিল, নারীদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, পরপর স্তরের মহাসঙ্ঘ বা কনফেডারেশান—রাষ্ট্রহীন সমাজ তৈরি হয়ে গেছে এমন দাবি মূর্খামি, কিন্তু রাষ্ট্রকে কেন্দ্র না করে সামাজিক ক্ষমতা তৈরির বাস্তব পরীক্ষা চলছে। এই উদাহরণ টুকলি করার জন্য নয়। উত্তরবঙ্গের গ্রামে চিয়াপাস বসানো যাবে না, কলকাতার ওয়ার্ডে রোজাভা হবে না। ইতিহাস Xerox মেশিন নয়। শিক্ষাটা অন্য।
হরাইজন্টালিটি মানে সংগঠন নেই, তা নয়। নেতা নেই, মানে রাজনৈতিক শ্রম নেই তা নয়। স্বতঃস্ফূর্ততা মানে, কাল সকালে ফেসবুক ইভেন্ট খুলে বিপ্লব নয়। বরং উল্টো। বিকেন্দ্রীভূত গণতন্ত্র চালানো কেন্দ্রীয় নির্দেশ পাঠানোর চাইতে অনেক কঠিন। তার জন্য অনেক বেশি কাজ, অনেক বেশি সামাজিক সম্পর্ক, অনেক বেশি রাজনৈতিক শিক্ষা দরকার।
বহুকেন্দ্রিকতা মানে ছড়িয়ে পড়া দায়িত্ব
বহু কেন্দ্রের কথা শুনলে কেন্দ্রহীনতার ছবি মনে পড়ে, যেন যার যা ইচ্ছে সে তাই করবে। উল্টো। শক্তিশালী কেন্দ্র থাকলে অধিকাংশ মানুষের দায়িত্ব কম—আদেশ আসবে, পালন করা হবে। বহু কেন্দ্র মানে সিদ্ধান্তের দায়িত্বও ছড়িয়ে যায়। স্থানীয় কমিটিকে হিসেব দিতে হবে, ভুলের জবাব দিতে হবে, পাশের এলাকার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে, বড় প্রশ্নে প্রতিনিধিকে পাঠাতে হবে এবং প্রতিনিধিকে ফিরিয়ে আনতেও জানতে হবে। এ কাঠামো নৈরাজ্য নয়; বরং অনেক বেশি সংগঠিত গণতন্ত্র। উপর থেকে নির্দেশ পাঠানো সহজ। নীচে শত জায়গায় আলোচনা চালিয়ে, মতভেদ সামলে, যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন। কঠিন কাজটাই রাজনৈতিক শিক্ষা।
পুরোনো ফাসিবাদবিরোধীরা একটা কথা জানতেন
ঐতিহাসিক ফাসিবাদের সময় কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী, অ্যানার্কিস্ট, লিবারেল, গণতন্ত্রী—বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাবে লড়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রবল মতবিরোধ ছিল, পরস্পরকে বিশ্বাস করতেন না, বহু ভুল করেছেন। তথাপি একটা কথা তখনকার বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির বড় অংশ জানত: ফাসিবাদবিরোধিতা নিছক নির্বাচন-প্রচার নয়। ফাসিস্তরা যদি পাড়ায় থাকে, নিজেদের সংগঠনও লাগবে। কারখানায় থাকলে, ইউনিয়ন। ছাত্রদের মধ্যে থাকলে, ছাত্র সংগঠন। সংস্কৃতিতে থাকলে গান, থিয়েটার, পত্রিকা। রাষ্ট্র সংবাদ বন্ধ করলে গোপন সংবাদব্যবস্থা। আক্রান্ত মানুষকে বাঁচাতে আশ্রয়, খাবার, চিকিৎসা। কোথাও সশস্ত্র প্রতিরোধ, কোথাও জনমোর্চা, কোথাও অপ্রকাশ্য সাংগঠনিক কাজ।
অর্থাৎ যুদ্ধ সামাজিক। নির্বাচন তার অংশ হতে পারে। হিটলারকে ভোটে হারানো গেলে ভোট দেওয়া হত না, এমন কথা কে বলবে? বিজেপিকে নির্বাচনে হারানোর দরকার নেই, এ কথাও বলা হচ্ছে না। দরকার। যেখানে সম্ভব বিরোধী প্রার্থীকে জেতাতে হবে, নির্বাচনী জালিয়াতির বিরুদ্ধে লড়তে হবে, ভোটাধিকার রক্ষা করতে হবে। কিন্তু, সেটাই যদি রাজনীতি হয়, পাঁচ বছর পরে একই জায়গায় ফিরতে হবে।
ফাসিবাদীরা আজ হারলেও যে সমাজ তাদের তৈরি করেছে, থেকে যাবে। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থাকবে, শাখা থাকবে, মন্দিরকেন্দ্রিক সংগঠন থাকবে, মুসলমানবিদ্বেষ থাকবে, জাতপাত থাকবে, নারীঘৃণা থাকবে, চাকরিহীন ছেলের ক্রোধ থাকবে, কর্পোরেট মিডিয়া থাকবে, প্ল্যাটফর্ম-পুঁজি থাকবে। অন্য সরকার সেই সমাজের ওপর বসবে। পাঁচ বছর পরে আবার? চক্র ভাঙতে হয় নিচ থেকে।
স্মৃতি থেকে যে কথাটা হারিয়ে গেছে
পুরোনো ফাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের ইতিহাসে বন্দুক, ব্যারিকেড, গোপন পার্টি, নির্বাচনী জোট—এসবের ছবি বেশি থাকে। কম থাকে দৈনন্দিন জীবনচর্যার ইতিহাস। শ্রমিক ক্লাব, পাঠাগার, সহায়তা তহবিল, পাড়ার সংবাদপত্র, নাটকের দল, নারী সংগঠন, বেকারদের রান্নাঘর, ধর্মঘটী পরিবারের জন্য খাবার—এসবও রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ ছিলো। মানুষকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখতে শুধু মতাদর্শ নয়, সামাজিক ভর দরকার। রাষ্ট্র যদি মামলা দেয়, আইনজীবী লাগবে; কাজ গেলে সহায়তা লাগবে; ঘৃণার প্রচারের বিরুদ্ধে নিজের সংবাদব্যবস্থা লাগবে; আক্রান্ত মানুষের নিরাপদ আশ্রয় লাগবে। এই কাজকে ‘সামাজিক কাজ’ বলে রাজনীতি থেকে আলাদা করলে ফাসিবাদই লাভবান হয়। সে তো ঠিক এই সব ফাঁকফোকরে ঢুকেই সেবা, পরিচয়, নিরাপত্তা ও সম্প্রদায় সরবরাহ করতে থাকে।
কাজ তাহলে কী?
এখানে এসে সাধারণত বিপ্লবী লেখার বড় মুশকিল হয়। বিশ্লেষণ শেষ, অতঃকিম? তারপর দশ দফা কর্মসূচি। সে সাহস করছি না। কোন পাড়ায় কী করতে হবে, সে পাড়ার মানুষ না জানলে কলকাতায় বসে লেখক জানবে কেন? কোন কারখানা বা চা-বাগিচায় কী সংগঠন হবে, কোন বস্তিতে কোন প্রশ্নে মানুষ এক হবে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সঙ্গে অস্থায়ী শিক্ষক বা কর্মচারীদের যোগ হবে কীভাবে—এক উত্তর হয় না।
কয়েকটা সাধারণ কথা হয়তো বলা যায়। প্রথমত, সমাজে ফিরতে হবে। এ ছাড়া উপায় নেই। যে লোক বিজেপিকে ভোট দিয়েছে, তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাকে আগে ফাসিস্ট বলে গাল দিলে কথাই শুরু হবে না। কেন দিয়েছে? চাকরি? তৃণমূলের দাদার ওপর রাগ? মুসলমানবিদ্বেষ? মোদী? নিরাপত্তা? অনুপ্রবেশ? হিন্দু হিসেবে বিপন্ন বোধ? শুনতে হবে। শোনা মানে মেনে নেওয়া নয়। মানুষ কী ভাবে তা না জেনে মানুষের ভাবনা বদলানো যায় না।
দ্বিতীয়ত, দাবির রাজনীতিকে ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে জুড়তে হবে। শুধু সরকারকে স্কুল দাও বলা নয়; স্কুল কীভাবে চলবে তাতে স্থানীয় মানুষের কথা থাকবে। শুধু কাজ চাই নয়; কাজের জায়গায় শ্রমিকের সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা চাই। শুধু বনাধিকার নয়; বন নিয়ে সিদ্ধান্তের অধিকার। শুধু পঞ্চায়েত নির্বাচন নয়; কার্যকর গ্রামসভা। শুধু পুরসভা নয়; মহল্লাসভা। অর্থাৎ, প্রতি দাবি একই সঙ্গে গণতন্ত্রের দাবি।
দাবি থেকে সিদ্ধান্তক্ষমতা
দাবির রাজনীতি দরকার, কিন্তু দাবির গন্তব্য যদি কেবল দাতা-রাষ্ট্র হয়, মানুষ পুনরপি প্রাপক হয়ে থাকে। স্কুল চাই—হ্যাঁ। কিন্তু স্কুলের শিক্ষক আছে কি না, বাজেট কোথায় গেল, স্থানীয় ভাষায় পড়ানো হবে কি না, এসব নিয়ে অভিভাবক-শিক্ষক-ছাত্রের সিদ্ধান্তের জায়গা চাই। বনাধিকার চাই—হ্যাঁ। কিন্তু কোন জমিতে কী হবে, বন থেকে কে কী নেবে, বাইরের কোম্পানি ঢুকবে কি না, সে সিদ্ধান্তও গ্রামসভার। স্বাস্থ্যকেন্দ্র চাই—কিন্তু ওষুধ নেই কেন, ডাক্তার আসে কি না, স্থানীয় মানুষের নজরদারি থাকবে। অর্থাৎ, কল্যাণের দাবিকে স্বশাসনের দাবির সঙ্গে জোড়া। রাষ্ট্রের কাছ থেকে সম্পদ নেওয়া এবং রাষ্ট্রকে সব সিদ্ধান্তের মালিক না মানা—দুটো একসঙ্গে শিখতে হবে।
তৃতীয়ত, সংগঠক দরকার। পার্টির সর্বজ্ঞ ক্যাডার নয়, পেশাদার বিপ্লবী না হলেও চলে। এমন মানুষ যাঁরা কথা বলতে পারেন, আরও বেশি শুনতে পারেন, ঝগড়া সামলাতে পারেন, সভা ডাকতে পারেন, হিসেব রাখতে পারেন, দুজন বিচ্ছিন্ন মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন, নতুন নেতৃত্ব তৈরি হলে নিজে পিছিয়ে যেতে পারেন। এ কাজ গ্ল্যামারাস নয়। লাইভ ভিডিও হয় না। দশ বছরেও নাম হয় না। ফাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘকালীন লড়াইতে সম্ভবত এই বিরক্তিকর কাজই সবচাইতে জরুরি।
চতুর্থত, নতুন নতুন স্বাধীন সামাজিক পরিসর দরকার—রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ বাইরে থাকা সবসময় সম্ভব নয়, বাজারের বাইরে থাকাও নয়, তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যতটা সম্ভব। পাঠচক্র, ইউনিয়ন, কমিউনিটি কিচেন, সমবায়, আইনি সহায়তার দল, স্থানীয় সংবাদব্যবস্থা, স্বাস্থ্য উদ্যোগ, মহিলা সমিতি, পরিবেশ কমিটি—যা প্রয়োজন সেখান থেকে শুরু। এসব আলাদা আলাদা ‘প্রজেক্ট’ নয়। পরস্পরকে যুক্ত করতে হবে। জাপাতিস্তাদের ভাষায় এক পৃথিবীর মধ্যে বহু পৃথিবী। আমাদের ভাষায়, বহু বিরুদ্ধ পরিসর।
বিরুদ্ধ পরিসর: রাষ্ট্রের বাইরে নয়, রাষ্ট্রের অধীনও নয়
এই জায়গাটাকে কেউ interstitial politics, কেউ prefigurative politics, কেউ commons-এর রাজনীতি বলেন। নাম নিয়ে মাথাব্যথা কম। মূল কথা, বর্তমান সমাজের ভিতরেই এমন কিছু পরিসর তৈরি করা যেখানে অন্য সামাজিক সম্পর্কের অনুশীলন হয়। সমবায়ে লাভের নিয়ম আলাদা হতে পারে; কমিউনিটি কিচেনে খাবার পণ্য না হয়ে ভাগাভাগির বস্তু; স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে খবর ওপর থেকে নেমে আসে না, মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা লেখে; মহিলা সমিতিতে পরিবারের ‘ব্যক্তিগত’ অত্যাচার সামাজিক প্রশ্ন হয়; বন কমিটিতে কাঠের বাজারদর নয়, জল, খাদ্য, পশুচারণ, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়েও সিদ্ধান্ত হয়। এই ছোট পরিসরগুলি রাষ্ট্রকে আগামীকাল উধাও করে না। মানুষকে অন্যভাবে সম্পর্ক বানানোর অভিজ্ঞতা দেয়। বিপ্লব দূরের ভবিষ্যৎ না হয়ে বর্তমানের মধ্যে ছোট ছোট রাজনৈতিক অনুশীলন হয়ে ওঠে।
শেষ কথা
ফাসিবাদ শক্তিশালী রাষ্ট্র ভালোবাসে। শক্তিশালী নেতা ভালোবাসে। এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম, এক ইতিহাস, এক সত্য ভালোবাসে। পুঁজিও কেন্দ্রীকরণ ভালোবাসে—বড় বাজার, বড় কোম্পানি, বড় ডেটাবেস, একচেটিয়া মালিকানা। তার বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকে যদি শুধু সংবিধানের পাতায় রেখে দিই, বিপদ। গণতন্ত্রের জায়গা মানুষের জীবনে। বহু মত, বহু কেন্দ্র, বহু সমিতি, বহু স্বশাসিত পরিসর। রাষ্ট্রের ক্ষমতার পাশে নয়, বিপরীতে সামাজিক ক্ষমতা।
এ কাজ একদিনে হবে না। পরের ভোটের আগেও শেষ হবে না। সম্ভবত আমাদের জীবদ্দশাতেও নয়। তাতে কী? আরএসএস একশো বছর কাজ করতে পারে, আমরা পাঁচ বছরেও অধৈর্য হয়ে যাই কেন? আরশোলারা আজ রাস্তা দেখিয়েছে। কাল অন্য কেউ দেখাবে। রাস্তা ভরা দরকার, প্রতিবাদ দরকার, নির্বাচনেও লড়া দরকার। কিন্তু রাস্তা ফাঁকা হওয়ার পর যে কাজ শুরু হয়, সেটাই সম্ভবত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পাড়ায় ফিরতে হবে। গ্রামে ফিরতে হবে। কারখানা, কলেজ, বস্তি, বন, চা বাগান, বাজারে ফিরতে হবে। মানুষের সঙ্গে মানুষকে জোড়া দিতে হবে। নিজেদের জীবনের বিষয়ে নিজেরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। শাসকের জ্ঞান ও শাসকের সত্যের বিপরীতে বিরুদ্ধ জ্ঞান তৈরি করতে হবে। ভাঙতে ভাঙতে গড়তে হবে। দূরাগত মহাবিপ্লবের অপেক্ষায় নয়, রাষ্ট্রদখলের শুভদিনের অপেক্ষাতেও নয়। প্রতিদিনের কাজে।
কেননা, শেষ পর্যন্ত ফাসিবাদের বিরুদ্ধে সবচাইতে শক্তিশালী ব্যারিকেড আর একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র নয়। শক্তিশালী, বিরুদ্ধতাময় সমাজ।
আলোকচিত্র: কুশল কর
