ফাসিবাদ, গণতন্ত্র এবং বিরুদ্ধতার দীর্ঘ লড়াই : প্রথম পর্ব
২০২৬-এর বঙ্গভোট শেষ হয়েছে মাস তিনেক আগে। বিজেপি ২০৭টি আসন নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায়, তৃণমূল নেমেছে ৮০-তে। ভোটের হিসেবে বিজেপির ৪৫.৮৪ শতাংশ, তৃণমূলের ৪০.৮০। অর্থাৎ, পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি ভোটের ব্যবধানে আসনের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে একশো সাতাশ। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটের পরে এই লেখক প্রশ্ন তুলেছিল, এতদিনের ‘লাল’ বাংলা এমন হুড়মুড়িয়ে গেরুয়া হচ্ছে কী করে? সাত বছর পরে প্রশ্নটার মধ্যে বিশেষ কৌতুক আর নেই। গেরুয়া বাংলা এখন শুধু সম্ভাবনা, ভয় বা চিহ্ন নয়, রীতিমতো ও দোর্ডন্ডপ্রতাপ সরকারি বাস্তব। কী করে এমন হল?
সহজ উত্তর আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের পনেরো বছরের শাসনে মানুষ বিরক্ত হয়েছিলেন, দুর্নীতি, দাদাগিরি, চাকরি নিয়ে কেলেঙ্কারি এসব ছিল, তৎসহ বিজেপির সংগঠন, প্রচুর টাকা, মোদী-শা, হিন্দুত্ব, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের গল্প। ভোট হয়েছে, মানুষ ভোট দিয়েছে, তৃণমূল হেরেছে, বিজেপি জিতেছে। গণতন্ত্রে এমন হয়। নিশ্চয়। কিন্তু শুধু এটুকুই কি হয়েছে?
ভোটের আগের বিশেষ নিবিড় সংশোধন, অর্থাৎ Special Intensive Revision (SIR)-এ প্রথমে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম প্রশ্নের মুখে পড়ে; শেষমেষ ‘বিচারাধীন’ বলে দাগিয়ে দেওয়া ২৭ লক্ষেরও বেশি ভোটার বেমালুম বাদ যান। তাঁদের বিপুল অংশের আপিল যেমন কে তেমন পড়ে, ভোটের আগে তো দূরস্থান, আজ অবধি তাদের নিষ্পত্তি হয়নি, কবে হবে কে জানে? শেষ পর্যন্ত অন্তত ৪৯টি আসনে বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল। অর্থ এই নয় যে ওই সমস্ত আসনে ফল নিশ্চিতভাবে অন্যরকম হত, বা ২০৭ আসনের বিজেপি জয়ের পুরোটাকেই স্রেফ কারচুপি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়। যায় না। কিন্তু নির্বাচন নামক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি যে নিটোল, নিরপেক্ষ, সকলের জন্য সমান ছিল, সে গল্প বিশ্বাস করাও কঠিন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনকে বিজেপির কমিশন বলেছেন, ভোট লুঠের অভিযোগ করেছেন। নির্বাচন কমিশন অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অভিযোগ প্রমাণিত কী অপ্রমাণিত, তা নিয়ে আদালত, কমিশন, দলগুলি কাজ করুক। আমাদের প্রশ্ন অন্য। গত দশ-বারো বছরে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, তদন্ত সংস্থা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম থেকে নির্বাচন-ব্যবস্থা, কী ভাবে একটি সর্বব্যাপী রাষ্ট্রবাদী আধিপত্যের অংশ হয়ে উঠেছে, সেই বড় ছবির মধ্যে বঙ্গভোটকে রাখব কি রাখব না?
রাখতেই হবে। কেননা ফাসিবাদ বলতে যদি শুধু পুলিশি অত্যাচার, জেল, সেন্সরশিপ, সংখ্যালঘু নিপীড়ন বা একনায়কের ছবি ইত্যাদি বুঝি, বিপদ যখন আসে তখন তাকে চিনতে দেরি হয়ে যায়। ইতিহাসে দেরি হয়েছে। এখনও হচ্ছে।
ফাসিবাদ সরকার নয়, সামাজিক বন্দোবস্ত
ফাসিবাদী দল সরকারে এলেই ফাসিবাদ শুরু, ভোটে হারলেই শেষ—ব্যাপারটা এত সরল হলে বিশেষ চিন্তা ছিল না। পাঁচ বছর অন্তর বোতাম টিপে সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। হয় না।
ঐতিহাসিক ফাসিবাদও নিছক হিটলার-মুসোলিনি-ফ্রাঙ্কোর গল্প নয়। বহু আগে থেকে সমাজে কাজ চলেছে। শ্রমিকের ক্ষোভকে অন্যদিকে ঘোরানো হয়েছে, ইহুদি, কমিউনিস্ট, বিদেশি, অভিবাসী, অন্যধর্মী মানুষকে শত্রু বানানো হয়েছে, অতীতের কাল্পনিক গৌরবগাথা তৈরি হয়েছে, জাতি ও রাষ্ট্রকে একাকার করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুঁজি, বিশেষত বড় পুঁজি, স্থিতিশীল শাসন চেয়েছে, শ্রমিক আন্দোলন ভাঙতে চেয়েছে, সম্পত্তি ও মুনাফার নিশ্চয়তা চেয়েছে। রাস্তায় বাদামি বা কালো জামা ছিল, তার পিছনে ব্যাঙ্কার-শিল্পপতি-আমলাশাহিও ছিলেন।
আজকের ফাসিবাদ হুবহু সেই পোশাক পরে আসবে, এমন আশা করার কারণ নেই। সময় বদলেছে, পুঁজিও বদলেছে। কারখানা আছে, শ্রমিক আছে, শোষণ আছে, কিন্তু সঙ্গে এসেছে অর্থপুঁজি বা ফিনান্স, দেদার নানা কিসিমের ঋণ, জমি-সম্পত্তির খাজনা, এবং চোখ-ধাঁধানো সব প্রযুক্তি ও তথ্যপুঁজি--পেটেন্ট, প্ল্যাটফর্ম, ডেটা। মুনাফা শুধু জিনিস তৈরি করে হয় না; অন্যের তৈরি জিনিস দখল করে, অন্যের শ্রম ও জীবন থেকে নিরন্তর খাজনা নিয়েও হয়। বাড়ির মালিক ভাড়া নেয়, ব্যাঙ্ক সুদ নেয়, অ্যাপ কমিশন নেয়, প্ল্যাটফর্ম আমাদের লেখা-ছবি-বন্ধুত্ব-রাগ-ভয়-অভ্যাস নিয়ে বাজার বসায়। এ এক নতুন খাজনাদার বা রেন্টিয়ার বাস্তবতা। এখানে মালিকানা মানে শুধু কারখানা নয়; মালিকানা মানে রাস্তা, নেটওয়ার্ক, তথ্য, সফটওয়্যার, বাজারে ঢোকার দরজা। দরজাটা যার, খাজনাটা তার।
খাজনা, ঋণ, প্ল্যাটফর্ম: পুঁজির নতুন দেহ
এই নতুন বাস্তবটাকে শুধু প্রযুক্তির বিস্ময় বলে দেখলে ভুল হবে। পুঁজির পুরোনো মুনাফার সঙ্গে নতুন খাজনার সম্পর্কটা ধরতে হবে। উৎপাদন চলছে, কারখানাও চলছে, কিন্তু মুনাফার বড় অংশ ক্রমশ আসছে নিয়ন্ত্রণ থেকে—জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ, ঋণের ওপর, যোগাযোগের রাস্তার ওপর, সফটওয়্যারের ওপর, তথ্যের ওপর। শহরে বাড়ির দাম বাড়ে, ভাড়া বাড়ে; কৃষক ঋণের সুদ দেয়; ছোট ব্যবসায়ী ডিজিটাল পেমেন্ট বা প্ল্যাটফর্মকে কমিশন দেয়; গিগ শ্রমিক যে অ্যাপ দিয়ে কাজ পায়, সেই অ্যাপই তার কাজের সময়, মজুরি, রেটিং, এমনকি অদৃশ্য শাস্তির নিয়মও ঠিক করে। মালিকের কারখানা চোখে দেখা যায়; প্ল্যাটফর্মের মালিকানা প্রায়শই দেখা যায় না। অথচ দৈনন্দিন জীবনের দরজা তার হাতে। এই অদৃশ্য মালিকানাই আজকের ক্ষমতার একটা বড় উৎস।
ফাসিবাদী রাজনীতির সঙ্গে এর যোগ এখানেই। যে সমাজে অধিকাংশ মানুষ নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে, সেখানে ক্ষোভ জন্মায়, অপমান জন্মায়, অনিশ্চয়তা জন্মায়। চাকরি নেই, থাকলেও স্থায়ী নয়; পড়াশোনার খরচ বাড়ে; চিকিৎসা খুঁজতে চেয়ে বাজারে যেতে হয়; বাসস্থান ঋণের ওপর নির্ভর; ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ব্যবস্থাবিরোধী ক্ষোভ পুঁজির বিরুদ্ধে সংগঠিত হবেই, এমন কোনও স্বয়ংক্রিয় নিয়ম নেই। বরং, তুলনায় সহজ তাকে অন্যদিকে ঘোরানো। তোমার জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ব্যাংক, কোম্পানি, বাজার, প্ল্যাটফর্ম—কিন্তু বলা হল, তোমার দুর্দশার কারণ পাশের মুসলমান পড়শি, সীমান্তপারের বাংলাদেশি, সংরক্ষণ-পাওয়া দলিত, শহরে আসা পরিযায়ী, কিংবা ‘দেশবিরোধী’ ছাত্র। বাস্তব ক্ষমতা অদৃশ্য থাকে; দৃশ্যমান শত্রু তৈরি হয়।
আমরা ফেসবুকে ঢুকি বিনি পয়সায়। গুগল ঘাঁটি বিনি পয়সায়। হোয়াটসঅ্যাপে গল্প করি বিনি পয়সায়। কিন্তু আমরা সেখানে শুধু ক্রেতা নই, পণ্যও। শ্রমিকও। প্রতি ক্লিক, প্রতি স্ক্রল, প্রতি রাগ, প্রতি ভালোবাসা, বন্ধু কে, শত্রু কে, রাতে কটা পর্যন্ত জেগে থাকি, কোন খবরে আঁতকে উঠি—সব জমতে থাকে। ওই জমা জীবন থেকে তৈরি হয় তথ্য, তথ্য থেকে পুঁজি। কাজেই, ডিজিটাল পুঁজির সঙ্গে ফাসিবাদের যোগাযোগটা দুর্ঘটনাজনিত নয়।
ফাসিবাদের সামাজিক কাজ হচ্ছে শত্রু তৈরি করা। ডিজিটাল বাজারের ব্যবসা হচ্ছে উত্তেজনা ধরে রাখা। শান্ত, ধীর, যুক্তিপূর্ণ কথা মানুষ কম শেয়ার করে; ভয়, ঘৃণা, চমক, কেচ্ছা, অপমান বেশি ছড়ায়। অ্যালগরিদমের কোনো গেরুয়া গামছা নেই, সে আরএসএস-এর শাখায় যায় না। তার কাজ মানুষকে পর্দায় আটকে রাখা, যাতে বিজ্ঞাপন দেখা হয়, ডেটা তৈরি হয়, মুনাফা বাড়ে। কিন্তু যে প্রযুক্তির অর্থনীতি উত্তেজনা, আসক্তি ও নিরন্তর প্রতিক্রিয়ার ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে ফাসিবাদী রাজনীতির সুবিধা হয়। খুব হয়।
মিথ্যা বানাতে সময় লাগে না। ‘ওরা’ এসে আপনার চাকরি নিয়ে যাচ্ছে, আপনার মেয়েকে নিয়ে যাবে, আপনার ধর্ম শেষ করবে, দেশ ভেঙে দেবে—দু’লাইন লিখে, একটা পুরোনো ছবি লাগিয়ে, হাজার গ্রুপে ছেড়ে দিন। কয়েক ঘণ্টায় সত্যি। তার বিরুদ্ধে ইতিহাস, পরিসংখ্যান, যুক্তি, মানুষের দীর্ঘ সামাজিক অভিজ্ঞতা? সে সব ধীরে আসে। অনেক সময় আসেই না।
এখানেই ফাসিবাদ বড় সুবিধা পায়। সে সমাজকে বুঝিয়ে বদলাতে চায় না, বরং সমাজের ভয় ও ক্ষোভকে সংগঠিত করে। সাম্য শেখাতে হয়; ঘৃণা উসকে দিলেই চলে।
ডিজিটাল বাজার শুধু খবর বেচে না, সাধারণ বোধও বানায়
এখানে আর একটা জিনিস মনে রাখা দরকার। ফাসিবাদের জয় মানুষকে একদিনের মধ্যে চটজলদি মত বদল করিয়ে হয় না। বরং, নানান কথা বারবার শুনতে শুনতে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। আগে প্রকাশ্যে যা বলা লজ্জার ছিল, পরে তা মজা; তার পরে মতামত; শেষে সাধারণ বোধ। এক সম্প্রদায় নাকি বেশি সন্তান তৈরি করে, অমুকেরা নাকি দেশপ্রেমিক নয়, মানবাধিকার মানে নাকি অপরাধীর পক্ষ নেওয়া, প্রতিবাদী ছাত্র মানেই নষ্ট ছেলে—এই সব আপ্তবাক্য প্রথমটায় আসে কৌতুক, মিম, ফরওয়ার্ড, ছোট ভিডিও, কেচ্ছার মাধ্যমে। রাজনীতি তখন ভাষণমঞ্চে নয়, সকালের চায়ের কাপে, পারিবারিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে, স্কুলের অভিভাবক-আড্ডায় ঢুকে পড়ে। হেজিমনি বা আধিপত্য সম্ভবত এভাবেই কাজ করে: শাসকের কথাকে মানুষ নিজের কথা বলে ভাবতে শুরু করে।
তাই কেবল ভুয়ো খবর যাচাই করে করে সত্যিটা বের করে আনা যথেষ্ট নয়। মিথ্যা খবর ফাঁস করা, তথ্য যাচাই, একতরফা প্রচার ভাঙা, দরকার। কিন্তু মানুষ যদি ইতিমধ্যেই এমন এক পৃথিবীতে বাস করতে শুরু করে যেখানে ‘ওরা’ কম মানুষ, ‘ওদের’ অধিকার কম, ‘ওদের’ ওপর রাষ্ট্রের বাড়তি দমন ন্যায্য—তাহলে স্রেফ ফ্যাক্টচেক দিয়ে কাজ হবে না। লড়াইটা যেমন তথ্যের, তেমনি অনুভূতির, নৈতিকতার, দৈনন্দিন সম্পর্কের। মানুষ কার সঙ্গে মেশে, কাকে বিশ্বাস করে, কার দুঃখকে নিজের দুঃখ ভাবে—রাজনীতির ভিত সেখানে।
আরএসএস কেন আছে, আমরা কেন নেই
কথাটা অস্বস্তিকর, তথাপি বলা দরকার। ফেসবুক বিজেপিকে বানায়নি। হোয়াটসঅ্যাপ আদিকে আরএসএস তৈরি করেনি। বিজেপি-সঙ্ঘ আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহার করতে পারে, কারণ ডিজিটাল প্রযুক্তি আসার বহু বহু আগে থেকে তাদের সামাজিক সংগঠন ছিল। শাখা ছিল, স্কুল ছিল, মন্দির ছিল, উৎসব, শিক্ষক, প্রচারক, সেবা-সংগঠন, পাড়া-মহল্লায় লোক ইত্যাদি ছিল। প্রায় একশো বছর ধরে ঘসটেছে তারা। বহু জায়গায় ব্যর্থ হয়েছে, হাসির পাত্র হয়েছে, আবার কাজ করেছে।
অর্থাৎ, জ্বলজ্বলে স্ক্রিনের পিছনে মাটি ছিল। আমাদের? আমরা প্রায়শই উল্টো পথে চলেছি। মাটি শুকিয়ে গেছে, স্ক্রিন বেড়েছে। একসময় বাংলায় বামপন্থা বলতে শুধু পার্টি অফিস বোঝাত না। কৃষকসভা ছিল, ইউনিয়ন ছিল, ছাত্রদের সংগঠন ছিল, পাড়ায় পাঠচক্র ছিল, নাটক-গান ছিল, উদ্বাস্তু কলোনির লড়াই ছিল, খাদ্য আন্দোলন ছিল, জমির লড়াই ছিল। অর্থাৎ মানুষ শুধুমাত্র ভোটের দিন বামপন্থার সঙ্গে দেখা করত না। জীবনের নানা সময়ে দেখা হত। মজুরি কম? দেখা হত। জমিদার-জোতদার ধান কাটছে? দেখা হত। স্কুলে সমস্যা? দেখা হত। পুলিশ ধরেছে? দেখা হত। পাড়ায় লাইব্রেরি? সেখানেও দেখা হত। দেখা হওয়ার নানান ধরণ, বা দীর্ঘ সঙ্ঘায়ন থেকেই ভোটের শক্তি এসেছিল। ভোট থেকে সঙ্ঘায়ন নয়। তারপর উল্টোটা হল।
ক্ষমতায় থাকার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের সংগঠন রাষ্ট্রের সংগঠনে বদলাতে থাকলো। পঞ্চায়েত সামাজিক স্বশাসনের জায়গা না হয়ে পার্টির প্রশাসনিক দাঁড়া হয়ে উঠল, আন্দোলনের বদলে মধ্যস্থতা ও দালালি করতে শিখল ইউনিয়ন, সমাজকে সংগঠিত না করে পার্টি সমাজের ওপর বসে পড়ল। ভোটে জেতা ক্রমে রাজনীতির প্রধান, প্রায় একমাত্র, উদ্দেশ্য হয়ে উঠল। যে বামপন্থার জন্ম রাষ্ট্র ও পুঁজির আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধ সামাজিক কাজ থেকে, সে নিজেই রাষ্ট্রের ভাষায় কথা বলতে শিখল।
সামাজিক সংগঠন থেকে প্রশাসনিক যন্ত্র
এই রূপান্তরটাকে শুধু নেতৃত্বের নৈতিক পতন বললে ইতিহাস সহজ হয়ে যায়। দীর্ঘকাল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা যে কোনও বাম শক্তির সামনে একটি গভীর দ্বন্দ্ব আসে। একদিকে তাকে প্রশাসন চালাতে হয়—বাজেট, পুলিশ, আমলা, উন্নয়ন, জমি, শিল্প, নির্বাচনের অঙ্ক। অন্যদিকে যে সামাজিক শক্তি তাকে ক্ষমতায় এনেছিল, তার স্বাধীনতা বজায় থাকলে সে শক্তি সরকারকেও প্রশ্ন করবে। এখানেই বিপদ। স্বশাসিত কৃষকসভা, স্বাধীন ইউনিয়ন, পাড়ার সংগঠন, ছাত্রসমিতি—এসব যদি সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে, সহজ পথ হল তাদের পার্টির শাখায় নামিয়ে আনা। তখন সমাজের সঙ্গে পার্টির সম্পর্ক বদলায়: আগে পার্টি মানুষের লড়াইয়ের ভিতর ছিল, পরে মানুষ পার্টির প্রশাসনিক নেটওয়ার্কের ভিতর। বিরোধিতা কমে, নির্ভরতা বাড়ে। এই পরিবর্তনের মাশুল ভোট হারানোর দিনেই শুধু দিতে হয় না; বহু আগে থেকেই সমাজের ভিতরকার বিরুদ্ধতা বা রাজনৈতিক প্রাণশক্তি ক্ষয়ে যেতে থাকে।
২০১১-য় পুরোনো বন্দোবস্ত ভাঙলো, সমাজ মুক্ত হল না। এক পার্টির সামাজিক-রাষ্ট্রীয় দখলের জায়গায় আর এক পার্টি ঢুকলো। তৃণমূলের পনেরো বছরে পাড়ার দাদা বদলেছে, পতাকার রং বদলেছে, রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যের সম্পর্ক বিশেষ বদলায়নি। উন্নয়ন ওপর থেকে এসেছে, অনুদান ওপর থেকে, চাকরি ওপর থেকে, পুলিশ ওপর থেকে, নেতা ওপর থেকে। মানুষ নাগরিক কম, সুবিধাভোগী বেশি। সংগঠিত সামাজিক ক্ষমতার জায়গায় সরকারি প্রকল্প ও পার্টি-নির্ভরতা।
২০২৬-এ আবার পালাবদল। এবার যে দল এসেছে, তার পিছনে শুধু রাজ্য পার্টি নেই; কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের বিপুল ক্ষমতা, হিন্দুত্বের জাতীয় সংগঠন, পুঁজি, মিডিয়া এবং এক বিশাল ডিজিটাল যন্ত্র আছে। ফলে ‘পরিবর্তন’ শব্দটা এবার অন্য অর্থের বাহক। বিপদটা বোঝা এখন সহজ, অন্তত তাই-ই হবার কথা। হচ্ছে কি?
রাস্তা কাঁপে, তার পর?
গত পনেরো বছরে পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য অভ্যুত্থান, চক বা স্কোয়ার আন্দোলন, রাস্তার বিদ্রোহ হয়েছে। তহরির, অক্যুপাই, গেজি, ইনডিগনাডোস, হংকং, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল। কোথাও সরকার পড়েছে, কোথাও প্রেসিডেন্ট গেছে, কোথাও সংসদ আক্রান্ত হয়েছে। ক্যামেরায় চমৎকার দেখায়। লক্ষ মানুষ রাস্তায়, পুলিশ পিছু হটছে, শাসক পালাচ্ছে। তার পর?
প্রশ্ন এখানেই। রাষ্ট্রের মাথাটা সরলো, শরীরটা? পুলিশ, আমলাতন্ত্র, জমি-মালিকানা, পুঁজি, ব্যাঙ্ক, বাজার, বহুজাতিক কোম্পানি সব থেকে গেল, সমাজে পুরোনো ক্ষমতা-সম্পর্ক বাহাল রইলো। রাষ্ট্রের মাথায় নতুন মুখ বসিয়ে দিলেই সমাজ বদলায় কী? বদলায় না।
এই লেখক অনেকদিন ধরে বলার চেষ্টা করছে, সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে সংগঠন বা organisation এবং সংঘায়ন বা organising-কে আলাদা করে দেখা দরকার। সংগঠন মানে পার্টি হতে পারে, ইউনিয়ন হতে পারে, কমিটি, এনজিও, ফেডারেশন হতে পারে। নাম আছে, অফিস আছে, পদ আছে। সঙ্ঘায়ন অন্য ব্যাপার। মানুষকে একসঙ্গে এনে নিজেদের জীবন নিয়ে যৌথভাবে ভাবা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, লড়াই করা শেখা। একে অন্যের ওপর ভরসা করা। ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার পাশাপাশি নিজেদের সামাজিক ক্ষমতা তৈরি করা। সংগঠন বানানো যায় কাগজে। সঙ্ঘায়ন হয় সমাজে। ধীরে।
এই ধীর সময়টাকেই সামাজিক মাধ্যম ভুলিয়ে দিয়েছে। একটা পোস্ট ভাইরাল, দশ হাজার শেয়ার, পরদিন মিছিল। মনে হয় সমাজ তৈরি হয়ে গেল। কিন্তু দশ হাজার শেয়ার দশ হাজার সম্পর্ক নয়। দশ হাজার ফলোয়ার দশ হাজার সংগঠক নয়। এমনকি দশ হাজার লোকের মিছিলও দশ হাজার মানুষের সংগঠিত রাজনৈতিক যৌথ নয়।
ইভেন্ট আর সম্পর্ক এক জিনিস নয়
সামাজিক মাধ্যম আমাদের আর একটি বদভ্যাস দিয়েছে—দৃশ্যমানতাকে শক্তি বলে ভুল করা। কোনও হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করল, কয়েক লক্ষ মানুষ একটি ভিডিও দেখলো, বড় মিছিল হল—এই সব অবশ্যই রাজনৈতিক ঘটনা। শাসকও এগুলোকে ভয় পায়। কিন্তু শক্তি এবং দৃশ্যমানতা এক নয়। শক্তি হল এমন সামাজিক সম্পর্ক, যা ক্যামেরা চলে যাওয়ার জীবন্ত থাকে।
কোন পাড়ায় কার বাড়িতে পুলিশ গেছে খবর রাখা, কার মামলা চালাতে টাকা লাগবে জানা, কোন শ্রমিককে কাজ থেকে বার করলে দশজন কীভাবে তার পাশে দাঁড়াবে তার ব্যবস্থা করা, কোন মহল্লায় সাম্প্রদায়িক গুজব ছড়ালে কারা দরজায় দরজায় গিয়ে কথা বলবে সেই মানুষদের জানা—এই নেটওয়ার্ক চোখে পড়ে কম, কিন্তু সংকটে কাজ করে বেশি। সংগঠন যদি শুধু কেন্দ্রীয় মঞ্চের ডাকের ওপর নির্ভর করে, মঞ্চ নিস্তব্ধ হলেই মানুষ বিচ্ছিন্ন। সঙ্ঘায়ন মানে বিচ্ছিন্ন মানুষদের মধ্যে এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যা থেকে নিজে থেকে কথা বলতে, সিদ্ধান্ত নিতে, কাজ করতে শেখা যায়।
মানুষ রাস্তায় নেমেছে, চমৎকার, ভালো। কিন্তু পরদিন তারা সব কোথায় গেল? কার সঙ্গে কথা বললো? পাড়ায় ফিরল? দেখা করল নিজেদের মধ্যে? নিজেদের সমস্যার সঙ্গে আন্দোলনের বড় দাবির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করল? সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরি হল? নতুন লোক সংগঠিত করা গেল? পুলিশ কাউকে ধরলে বাকিরা গেল? কারুর চাকরি গেলে পাশে দাঁড়াল? মুসলমান প্রতিবেশীর ওপর হামলা হলে হিন্দু প্রতিবেশী কিছু করল? এই সব আটপৌরে অথচ দরকারি কাজ না হলে, মিছিল মানে নিছক ইভেন্ট। ইভেন্ট শেষ হয়, এবং ফাসিবাদ অপেক্ষা করতে জানে।
আরশোলারা: একটা দরজা খুলেছে, কিন্তু দরজার পরে রাস্তা কতদূর?
এইখানে সাম্প্রতিক ‘আরশোলা জনতা দল’ (Cockroach Janta Party, CJP)-এর আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ।
পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা ব্যবস্থার অবিশ্বাস্য দুর্নীতি, চাকরিহীন তরুণদের দীর্ঘ হতাশা থেকে শুরু হয়ে আন্দোলনটা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়েছে। দিল্লিতে হাজার হাজার ছাত্র-যুবকের জমায়েত, সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, পরীক্ষা-ব্যবস্থা সংস্কারের ঘোষণা—অর্থাৎ প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ফলও হয়েছে। কলকাতায় জুলাইয়ের মিছিল সাম্প্রতিক কালে মূলধারার কোনো রাজনৈতিক দলের ডাক ছাড়া সঙ্ঘটিত বৃহত্তম মিছিলগুলির একটি।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ, আপাতত CJP ভোটের দল হতে চাইছে না। তার প্রতিষ্ঠাতারা বলছেন, সামাজিক আন্দোলন হিসেবেই কাজ করতে চান। খুব ভালো। কিন্তু তার পরেই আসল প্রশ্ন। কাজ হবে কী করে? বড় জমায়েত ভেঙে গেলে, ভাইরাল ভিডিও পুরোনো হলে, টেলিভিশনের ক্যামেরা অন্য খবরের দিকে ঘুরে গেলে হাতে কী থাকবে?
কলকাতার কথাই ধরা যাক। বড় জমায়েত হল, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হল, লাঠি চলল, গ্রেপ্তার হল; রাজ্যের নতুন সরকার ‘গুন্ডা’ আইন প্রয়োগের কথা বললো। এর আগেই, সরকার প্রতিবাদে সম্পত্তির ক্ষতি হলে আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং ‘সমাজবিরোধী’ বলে চিহ্নিত মানুষকে জেলা থেকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা বাড়ানোর আইন আনতে উদ্যোগী হয়েছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র তার কাজ জানে। আন্দোলন জানে কী?
আরশোলাদের প্রসঙ্গে, এ প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। তারা যদি আরও একটি সমাজমাধ্যমে জন্ম নেওয়া, দুর্দান্ত, রাস্তা-কাঁপানো, কয়েক মাসের আন্দোলন হয়ে থাকে, ইতিহাসে পাদটীকা হবে। যদি ছাত্র-যুবকদের স্থানীয় সমিতি হয়, পরীক্ষার্থী থেকে বেকার, বেকার থেকে গিগ শ্রমিক, গিগ শ্রমিক থেকে পাড়া-মহল্লা, সরকারি স্কুল-কলেজ, শিক্ষক-অভিভাবক, কাজের অধিকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এই সব জায়গায় ঢুকে পড়ে, তাহলে অন্য কথা। তখন CJP থাকবে কি থাকবে না, নাম বদলাবে কি না, তাও খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। আন্দোলন যদি সমাজে থেকে যায়, সেটাই আসল।
আরশোলাদের সামনে দ্বিতীয় পরীক্ষা
এই কারণেই CJP-র সামনে দ্বিতীয় পরীক্ষা প্রথম পরীক্ষার চাইতে কঠিন। প্রথম পরীক্ষা ছিল রাস্তায় মানুষ নামাতে পারা, রাষ্ট্রকে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করা। দ্বিতীয় পরীক্ষা হবে আন্দোলনের বহু কেন্দ্র তৈরি করা। কেন্দ্রীয় মুখ, প্রতিষ্ঠাতা, জনপ্রিয় বিস্তর ভিউ-ওলা ভিডিও বা বড় শহরের বড় সমাবেশের বাইরে স্থানীয় স্তরে এমন জায়গা তৈরি, যেখানে মানুষ নিজেদের সমস্যা নিয়ে নিজেরাই বসবে। কথা বলবে। এক জায়গায় পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন, অন্য জায়গায় গিগ শ্রমিকের মজুরি, কোথাও কলেজের ফি, কোথাও বস্তি উচ্ছেদ, কোথাও ধর্মীয় মেরুকরণ। সব সমস্যার উত্তরে কী প্রতিবাদে এক স্লোগান উঠবে না, দরকারও নেই। দরকার সমস্যা ও প্রতিবাদী আন্দোলনের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হওয়া। আন্দোলনকে দীর্ঘজীবী হতে হলে, নামের চাইতে তার প্রক্রিয়া-পদ্ধতিকে বেশি ছড়াতে হয়।
(চলবে)
