শুধুই ‘অধিকার’ নয়: বন অধিকার আইনের কুড়ি বছর: প্রথম পর্ব
(মূল ইংরেজি রচনা অবলম্বনে বাংলা ভাষান্তর)
বননিবাসী মানুষদের ওপর ঘটে চলা ‘ঐতিহাসিক অন্যায়’ কে ভারতবর্ষ স্বীকার করেছিল কুড়ি বছর আগে। তথাপি, মূল প্রশ্নটি অদ্যাবধি অমীমাংসিত: বন কার? বন অধিকার আইন বা এফআরএ পাস হওয়ার প্রায় কুড়ি বছর পরে, আইন নিয়ে অধিকাংশ আলোচনার শুরু ও শেষ হয় রূপায়ণ বা ইমপ্লিমেন্টেশানে। কত দাবি জমা পড়েছে, কত পাট্টা বা স্বত্বপত্র দেওয়া হয়েছে, কোন রাজ্য ভালো কাজ করছে, কোথায় আমলারা দাবি আটকে দিচ্ছেন, কতগুলো সামুদায়িক বন-সম্পদ বা কমিউনিটি ফরেস্ট রিসোর্স (সিএফআর) অধিকার স্বীকৃত হয়েছে? এই প্রশ্নগুচ্ছ জরুরি। উচ্ছেদসন্ত্রাস তাড়িত যে মানুষেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম সরকারি স্বীকৃতির অপেক্ষায় থেকেছেন, তাঁদের কাছে বনের অধিকার বিমূর্ত বিষয় নয়। তা সত্ত্বেও, বন অধিকার আইনকে যদি শুধু রূপায়ণের সমস্যা বানিয়ে দেওয়া হয়, খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার চোখের আড়াল হয়ে যায়।
২০০৬ সালে ভারতীয় রাষ্ট্র হুট করে আবিষ্কার করল বননিবাসীদেরও অধিকার আছে, সে উপলব্ধি থেকে বনাধিকার আইন এসে পড়লো—ইতিহাস বলে না। আইনের পিছনে ছিল বন নিয়ে অনেক পুরোনো একটা লড়াই: বন কার, কে বন ব্যবহার করবে, বনের ভিতরে কী হবে সে সিদ্ধান্ত কে নেবে, শেষ বিচারে, বন কিসের জন্য? যে আন্দোলন থেকে আইনের জন্ম, তার দাবি নিছক জমির পাট্টা ছিল না। ঔপনিবেশিক শাসনকালে তৈরি হওয়া, অথচ ইংরেজ চলে যাওয়ার বহু পরেও অক্ষত থেকে যাওয়া ঔপনিবেশিক বন-শাসনের গোটা ব্যবস্থাকেই প্রশ্ন করেছিল নতুন বনাধিকার আইন।
আইনের প্রস্তাবনায় এই ইতিহাস খোলাখুলি স্বীকার করা হয়। বলা হয়, ঔপনিবেশিক ও স্বাধীন—দুই সময়েই বননিবাসীদের অধিকার যথাযথভাবে নথিভুক্ত হয়নি, ফলে ঘটেছে ‘ঐতিহাসিক অন্যায়’। এই সরকারি স্বীকারোক্তি উড়িয়ে দেবার মত নয়। একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বন-আমলাশাহি দেশের বিরাট ভূখণ্ডকে সরকারি বন বলে চালিয়েছে, বনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসা বননির্ভর মানুষকে ‘বেআইনি দখলদার’ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে অবলীলায়, অথচ ঔপনিবেশিক বন-নিসর্গ তৈরি ও তাকে টিঁকিয়ে রাখার ইতিহাসেও তাঁদের শ্রম, ব্যবহার ও সামাজিক সম্পর্ক মিশে আছে। ফলে, সরকারের তরফে অন্যায় স্বীকার করে নেওয়াটা নেহাৎ ছোটখাটো ব্যাপার নয়। কথাটা হল, রাষ্ট্র অন্যায় স্বীকার করার পরে কী ঘটল?
বন কী করে সরকারি সম্পত্তি হল
ভারতবর্ষের বন কোনোকালেই জনশূন্য ছিল না। একইসঙ্গে, পুরোনো রোমান্টিক সাহিত্যে যেমন দেখানো হতো, সে বন আবহমান ও স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-গণরাজ্যও ছিল না, যেখানে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়-নিখুঁত সাম্যে বাস করত। বন-সমাজ বাণিজ্য করেছে, চাষ করেছে, শিকার করেছে, পশু চরিয়েছে, প্রতিবেশী গোষ্ঠীর সঙ্গে লড়েছে, উদ্বৃত্ত তৈরি করেছে, রাজাকে খাজনা দিয়েছে, বাজার ও রাষ্ট্রের সঙ্গে নানা রকম সম্পর্কে জড়িয়েছে। বনসমাজের ভিতরেও জাতপাত, শ্রেণি, লিঙ্গ ও ক্ষমতার বিভাজন ছিল। ঔপনিবেশিক কালে যে বদল নির্ণায়ক, তা হল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ধরণধাঁচ, বিশেষত আইনি চরিত্র।
বন মাপামাপি হল, বনের শ্রেণিবিভাজন হল, এবং বন ঘেরাবন্দিতে ঢুকল। মানে, ব্যাপার এমন দাঁড়ালো, যে বনের প্রথাগত কোনো ব্যবহারকে যদি সরকারি স্বীকৃতি পেতেই হয়, তাকে নতুন প্রশাসনের বোধগম্য ভাষায় অনুবাদ করতে হবে। একটি গোষ্ঠী হয়তো শতাব্দীর পর শতাব্দী মনে রেখেছে―কোন পথে গরু যায়, কোথায় জুম হয়, কোথায় মাছ ধরা হয়, কোনটা দেবতার বন, কোন ঋতুতে কোথা থেকে খাবার আসে। অথচ, বন-বন্দোবস্তের আধিকারিক চাইছেন ‘অধিকার’-এর দলিল। যা প্রমাণ করা গেল না, খাতায় তা নেই। আর খাতায় না থাকলে বহু পুরোনো ব্যবহারও একদিন অপরাধ হয়ে গেল।
এটা শুধু আইনের গল্প নয়। বনকে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের উৎপাদনশীল সম্পদ হিসেবে পুনর্গঠন করা হচ্ছিল। কাঠ গেল রেললাইনে, জাহাজঘাটায়, খনিতে, শহরে। প্রাকৃতিক বন বদলে হল বাণিজ্যিক বাগিচাবন। যেখানে বনশিল্পের অসুবিধা, সেখানে আগুন, পশুচারণ, জুমচাষ বন্ধ; মানুষ উচ্ছেদ হল, শৃঙ্খলাবদ্ধ হল, অথবা বনশ্রমিক হিসেবে কাজে লাগল।
উত্তরবঙ্গের বন এ ইতিহাসের উদাহরণ। বনগ্রাম ও টঙিয়া গ্রাম বহু জায়গায় শ্রমিক-বসতি হিসেবেই তৈরি হয়েছিল। যারা আগে তুলনায় স্বাধীনভাবে বন থেকে জীবন চালাতেন, তাঁরা এখন সেখানে থাকতে পারবে এই শর্তে, যে বনবিভাগের কাজ করবেন। বেগার প্রথা—অর্থাৎ বাধ্যতামূলক বিনা মজুরির শ্রম—স্বাধীনতার পরেও বহু জায়গায় টিকে ছিল। বন দামী হল; কিমাশ্চর্যম, বন তৈরি করা মানুষের শ্রম দামী হল না।
স্বাধীন ভারত বন-প্রশাসনের ভূগোলের বেশিরভাগটাই উত্তরাধিকার সূত্রে নেয়। সেই সঙ্গে, রাজনৈতিক ভাবনাও। বন এমন বস্তু, যা ওপর থেকে চালানো হবে। নীতি বদলেছে, সরকারি কথায় “অংশগ্রহণ” এসেছে, যৌথ বন পরিচালনা বা Joint Forest Management-এর কমিটি হয়েছে। কিন্তু বন কী, কে ব্যবহার করবে, কী শর্তে করবে—শেষ কথা বলার প্রতিষ্ঠান হিসেবে থেকে গেছে বনবিভাগই।
এই শতকের গোড়ায় এসে স্ববিরোধ এত প্রকট হয়, ঢাকা সম্ভব ছিল না। লক্ষ লক্ষ মানুষ বনভূমিতে থাকেন, চাষ করেন, অথচ তাঁদের প্রথানুগ ব্যবহার বা ‘কাস্টমারি ইউজ’ কদাচ নথিভুক্ত হয়নি। সরকারি খাতায় তাঁরা অবৈধ দখলদার। ২০০২ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের নির্দেশের পর যে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়, তা এই স্ববিরোধকে হিংস্রভাবে সামনে আনে। বহু রাজ্যে বননির্ভর মানুষদের ঘর ভাঙা হয়, ফসল নষ্ট করা হয়। বনে থাকা মানুষ আইনের চোখে ‘দখলদার’ হওয়ার আসল অর্থ বুঝলেন।
তার পরে যা ঘটল, তা এক উল্লেখযোগ্য গণ-সঙ্ঘায়ন।
আন্দোলন থেকে আইনের জন্ম
২০০২-২০০৩ নাগাদ সরকারি উচ্ছেদ-অভিযান পুরোদস্তুর শুরু হল। প্রতিরোধে, বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, বনশ্রমিক আন্দোলন এবং নানা গণসংগঠন বিভিন্ন জোটে একত্রিত হতে থাকে। এদের মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান ছিল ক্যাম্পেইন ফর সারভাইভাল অ্যান্ড ডিগনিটি (Campaign for Survival and Dignity), সংক্ষেপে সিএসডি। আমরা অনেকেই তখন যে রাষ্ট্রীয় বন-জন শ্রমজীবী মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, সেটিও এই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। যদিও ভবিষ্যতের আইন কী বলবে, কী কৌশল নেওয়া হবে, এ নিয়ে সংগঠনগুলির মধ্যে তীব্র মতভেদও ছিল। প্রথম দাবি ছিল উচ্ছেদ বন্ধ। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি বনের, বন আন্দোলনের রাজনীতি এর বাইরে চলে যায়।
মানুষ দাবি করেন কৃষিযোগ্য বনভূমি ও বসতির স্বীকৃতি, সামুদায়িক বন, গোচারণভূমি, অ-কাষ্ঠ বনজ দ্রব্য, জল, পারম্পরিক আবাসভূমি বা habitat, এবং বনগ্রামকে রাজস্ব গ্রামে রূপান্তরের অধিকার। দাবির নীচে আরও গভীর কথা সুপ্ত ছিল: যে ভূখণ্ডে মানুষ বাস করে, যে বন মানুষ ব্যবহার করে, সেই ভূখণ্ডের বা বনের ওপর বন-আমলাদের প্রশ্নাতীত কর্তৃত্ব আর চলবে না। এই কারণেই, গ্রামসভা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
বনাধিকার বলতে চাষের জমির দখল স্বীকার করে নেওয়া একখানা সরকারি কাগজ মাত্র নয়। পুরোনো বন-শাসন যদি মানুষের সামাজিক কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়ে থাকে, সে ইতিহাসকে উল্টোপথে হাঁটাতে হলে এমন প্রতিষ্ঠান দরকার যার মাধ্যমে মানুষ নিজেরাই নিজেদের বনকে বাঁচাবে, চালাবে।
২০০৬ সালের ডিসেম্বরে যে বন অধিকার আইন শেষ পর্যন্ত এল, আন্দোলনের এই রাজনীতির অনেকটাই তার মধ্যে ছিল। ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত/সামুদায়িক নানান অধিকার, সামুদায়িক বন-সম্পদ, পারম্পরিক বাসস্থান বা habitat-এর ওপর অধিকার, বনগ্রাম থেকে রাজস্বগ্রামে রূপান্তরণের অধিকার, এবং বন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র রক্ষায় গ্রামসভা ও অধিকারীদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব—সবই আইনে জায়গা পেল। আগেকার ভারতীয় বন আইনের সঙ্গে তুলনা করলে, ব্যাপারটা সত্যিই অসাধারণ, প্রায় অবিশ্বাস্য।
কিন্তু কোনো আইনই যে আন্দোলন থেকে জন্ম নেয়, সেই আন্দোলনের সমার্থক হয় না।
আইনের খসড়া তৈরি নিয়ে সরকার ও আন্দোলনের লম্বা লড়াই যখন চলছে, ছোট্ট একটা শব্দের তফাত গোটা সমস্যাটার প্রতীক হয়ে ওঠে। আন্দোলনের খসড়ায় বলা হয়েছিল, বন-অধিকার নির্ধারণ করবে গ্রামসভা। ২০০৬-এর চূড়ান্ত আইনে, গ্রামসভা শুধু নির্ধারণের প্রক্রিয়া ‘শুরু’ করবে। দাবি যাবে মহকুমা ও জেলা স্তরের কমিটির কাছে।
এক একটা শব্দে কখনো গোটা রাজনৈতিক ইতিহাস ধরা থাকে। গোষ্ঠীকে, গোষ্ঠী-অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হল, কিন্তু গোষ্ঠীর মাথার ওপর চেপে বসে থাকা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো অটুট। বনের যে অধিকার ব্যবহার, স্মৃতি ও সামাজিক অনুশীলনের মধ্য দিয়ে বেঁচে ছিল, তা এখন কাগজে লিখে দাবি করতে হবে, মানচিত্রে আঁকতে হবে, প্রমাণ দিতে হবে, যাচাই পেরোতে হবে, তাকে সরকারি খাতায় ঢুকতে হবে।
অস্বাভাবিক নয়; আইন এমন কাজই করে। কেতাবি ভাষায় একে ‘জুরিডিফিকেশান’, অর্থাৎ সামাজিক-রাজনৈতিক সম্পর্কের ‘আইনীকরণ’ বলা যায়। সরল করে বললে, জীবন্ত আন্দোলন যখন সরকারি ফর্ম, মানচিত্র, দাবি প্রমাণের নিয়ম, সরকারি কমিটি, ফাইল আর আদালত, এসবের গোলকধাঁধায় ঢোকে, তখন যা ঘটে। অথচ, পুরোটা এড়ানোর উপায়ও ছিল না। আইন না থাকলে, উচ্ছেদের মুখে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে আদিবাসী-বননিবাসীদের রক্ষাকবচ প্রায় কিছুই ছিল না। সুতরাং মেনে নিতে হবে, বনাধিকার আইন এমন ‘আইনি’ অস্ত্র তৈরি করেছে, যা ইতিপূর্বে ছিল না। এর অর্থ যদি দাঁড়ায়, অস্ত্র পাওয়া গেছে বলেই যে রাজনৈতিক লড়াই থেকে তার জন্ম, সেটাও শেষ, ভুল হবে।
অধিকার যখন পরিসংখ্যান
২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত FRA-তে প্রায় ৫৪ লক্ষ দাবি জমা পড়েছে, প্রায় ২৫.৪ লক্ষ স্বত্বপত্র দেওয়া হয়েছে। এর গরিষ্ঠাংশ ব্যক্তিগত অধিকারের স্বীকৃতি; সরকারি হিসাবে সামুদায়িক স্বত্বপত্র প্রায় ১.২৪ লক্ষ। সংখ্যা নিশ্চয় কিছু বলে, তবে সচরাচর যা বলা হয় তার চাইতে অনেক কম।
চাষের জমি ও বাস্তুর ওপর ব্যক্তিগত পাট্টা একটা পরিবারকে উচ্ছেদ থেকে বাঁচাতে পারে—এ অর্জন ছোট নয়। একটা CFR স্বত্বপত্র থেকে গণতান্ত্রিক বন-শাসনের গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত তৈরি হয়ে উঠতে পারে। তথাপি, কত পাট্টা হল গুনে বনের আসল নিয়ন্ত্রণ কার হাতে তা জানা যায় না।
গাছ কাটা হবে কী না, সে সিদ্ধান্ত কী গ্রামসভা নেয়? খনি প্রকল্প ঠেকাতে পারে? বনবিভাগ কাজ শুরু করার আগে গ্রামসভার অনুমতি নেয়? যে মহিলারা জ্বালানি কাঠ, শাকপাতা, বনখাদ্য সংগ্রহ করেন, গ্রামসভার সিদ্ধান্তে তাঁদের সমান অংশ আছে? কোনও গ্রাম বাগিচা-প্রকল্প(প্ল্যান্টেশান) প্রত্যাখ্যান করতে পারে? বনজ দ্রব্য থেকে পাওয়া আয় কার নিয়ন্ত্রণে? ‘সংরক্ষণ’ বলতে কী বোঝাবে, ঠিক করে কে? পরিসংখ্যান এসবের কোনও উত্তর দেয় না।
এফআরএ-পরবর্তী সময়ের বড় পরিহাস, একদিকে আইনি অধিকার আদায়ের জন্য বিপুল রাজনৈতিক শক্তি খরচ হয়েছে, অন্যদিকে একই সময়ে বনভূমির ওপর বাইরে থেকে আসা নতুন নতুন চাপ আছড়ে পড়ছে। কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৪–১৫ থেকে ২০২৩–২৪-এর মধ্যে ১,৭৩,৩৯৬.৮৭ হেক্টর বনভূমি বন-বহির্ভূত কাজে ব্যবহারের ছাড় দিয়েছে। রাস্তা, খনি, বিদ্যুৎ-পরিবাহী লাইন, বাঁধ, রেল, অন্য পরিকাঠামো—সবই তৈরি হচ্ছে বন-নিসর্গ ধ্বংস করে। বলা হচ্ছে না, প্রতি হেক্টর জমি হস্তান্তর মানেই বনাধিকার আইনের লঙ্ঘন। কথাটা অন্য। বনাধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া এবং বনের নতুন ঘেরাটোপ—দুটি প্রক্রিয়া একই সঙ্গে চলছে।
সামুদায়িক বন-সম্পদের সরকারি স্বীকৃতির কাগজ বার করাতে একটি গ্রামের বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে, অথচ একই বা লাগোয়া বন অন্য কাজের জন্য দিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবে সরকারের অন্য একটি দফতর দিব্যি হ্যাঁ বলতে পারে। প্রশাসনিক দুনিয়ায় দুটি আলাদা পথ; মাটিতে একই জমি। ফলত, এক বিচিত্র রাজনীতি: মানুষকে বারবার নিজের অধিকার প্রমাণ করতে হয়, অথচ পুঁজি ও রাষ্ট্র নতুন নতুন প্রকল্প নিয়ে এসে হাজির হতে থাকে।
নতুন সবুজ ঘেরাবন্দি
চাপ শুধু তথাকথিত উন্নয়ন থেকে আসে না। ভারতবর্ষের বন-আন্দোলন বহুদিন ধরে বলে এসেছে, সংরক্ষণও উচ্ছেদ ঘটাতে পারে। এক সময় কথাটাকে বন্যপ্রাণ-বিরোধী বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। উচিত নয়। বননিবাসী মানুষ নিজেরাই বহু জায়গায় বাণিজ্যিক বনকাটাই, শিকার ও ধ্বংসাত্মক আহরণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা করেছেন।
বাঘ থাকবে কী না, বন থাকবে কী না—প্রশ্ন সেটা নয়। অবশ্যই থাকবে। প্রশ্ন হল, সংরক্ষণের শুরুতেই বনে যারা আছে তাদের কেন সমস্যা হিসেবে দেখা হবে? সংখ্যাটাও ছোট নয়। জাতীয় বাঘ সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের ২০২৬-এর এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাঘ প্রকল্পের কোর এলাকায় ৭৪২টি গ্রামে ৯৭,৭৮৬টি পরিবার এখনও বাস করে। বনাধিকার আইনে গুরুত্বপূর্ণ বনপ্রাণ এলাকা বা ‘ক্রিটিক্যাল ওয়াইল্ডলাইফ হ্যাবিট্যাট’ থেকে স্থানান্তরের আগে অধিকার-নিষ্পত্তি, সম্মতি ও পুনর্বাসন নিয়ে কঠোর শর্ত আছে। তা সত্ত্বেও “inviolate” বা মানুষশূন্য পরিসর তৈরির প্রশাসনিক-রাজনৈতিক চাপ কমে না।
সংরক্ষণের এই পুরোনো ঘেরাটোপের সঙ্গে এখন জুড়েছে নতুন জলবায়ু-অর্থনীতি। বনে এমন সব ‘সম্পদ’ এবং ‘মূল্য’ বা ভ্যালু খুঁজে বার করা হচ্ছে যা ঔপনিবেশিক বনকর্তারা কল্পনাও করতে পারতেন না। বনে জমা পড়া, জমতে থাকা কার্বন মাপা হচ্ছে, তা কেনাবেচা হচ্ছে, যথা বন নষ্ট করে ‘নতুন বন’ তৈরির ‘এধার-ওধার’ বা ‘অফসেট’ ব্যবসা; যেমন কোথাও বনধ্বংস করে বা চাষজমি নষ্ট করে দূষণ সৃষ্টিকারি লোহা কারখানা বসছে, সেই দূষণ বা বনধ্বংসের ক্ষতিপূরণে “অবক্ষয়িত” বনভূমিতে কমপেনসেটরি য়্যাফরেস্টেশানের নামে গাছ পোঁতা হচ্ছে, বা হচ্ছে না; গাছ লাগানোর বদলে বড় কোম্পানি গুলো পাচ্ছে গ্রীন ক্রেডিট বা কার্বন ক্রেডিট, যা কিনা বাজারে বিক্রি করা যায়।
এমনিতে, গাছ লাগানো হচ্ছে, এতে আপত্তির কিছু নেই; বহু ক্ষেত্রে প্ল্যান্টেশান প্রয়োজনীয়ও। কিন্তু ভারতীয় বনশিল্পের ইতিহাস জানলে বোঝা যায়,বাগিচা বা ‘প্ল্যান্টেশান’ এবং বন বা ‘ফরেস্ট’ এক জিনিস নয়। বন বলতে শুধু দাঁড়িয়ে থাকা গাছপালা লতাগুল্মের পরিমাণ নয়। খাদ্য, ওষুধ, জল, পশুচারণ, পোকামাকড়, মাছ, মরা কাঠ, ছত্রাক, পশুপাখি, পবিত্র জায়গা, স্মৃতি, চলাচলের পথ, বন বলতে এসবও। এবং, সামাজিক সম্পর্ক।
একটা বাগিচাবন কার্বন তৈরি করতে পারে, একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের সাধারণভূমি বা ‘কমন্স’ ধ্বংসও করতে পারে। তাই, প্রশ্নটা এইটা নয় যে প্রকল্প সবুজ না বাদামি, পরিবেশবন্ধু না পরিবেশবিরোধী। প্রশ্ন: সিদ্ধান্ত নিল কে, কার জমিতে, কী উদ্দেশ্যে, এবং শেষত, নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
টীকা ও সূত্র-সংযোগ
১. ২০০২-এর উচ্ছেদ-সঙ্কট এবং FRA-পূর্ব প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের জন্য দেখুন Springate-Baginski et al., Redressing “Historical Injustice” through the Indian Forest Rights Act 2006. UK government research archive | Forest Rights Act, 2006
২. ভারত সরকার, জনজাতি বিষয়ক মন্ত্রক, FRA Monthly Progress Reports, মার্চ ২০২৬-সহ। Ministry of Tribal Affairs FRA portal
৩. পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক; লোকসভা Starred Question No. 333, উত্তর ২৪ মার্চ ২০২৫। ২০১৪–১৫ থেকে ২০২৩–২৪-এ বনভূমি অন্য কাজে ব্যবহারের অনুমোদিত মোট পরিমাণ ১,৭৩,৩৯৬.৮৭ হেক্টর। Lok Sabha answer and state-wise data
৪. NTCA-র STRIDES 2026 মূল্যায়নে critical tiger habitat-এর ৭৪২টি গ্রামে ৯৭,৭৮৬টি পরিবার বসবাসের কথা নথিভুক্ত। Summary of STRIDES 2026 findings
গ্রন্থপঞ্জি
অ্যাশার, মানশি। “বনাধিকার আইনের বিবর্তন: একটি ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত।” দ্য ইন্ডিয়ান জার্নাল অব সোশ্যাল ওয়ার্ক, ২০১৯।
ব্যানার্জি, অজিত, সৌমিত্র ঘোষ এবং অলিভার স্প্রিংগেট-বাগিনস্কি। পশ্চিমবঙ্গে বন-ন্যায়বিচারে বাধাপ্রাপ্ত প্রবেশাধিকার: বনাধিকার আইন ২০০৬-এর ভুল প্রয়োগে রাষ্ট্রের লঙ্ঘন। আইপিপিজি ডিসকাশন পেপার, ২০১০।
ক্যাফেন্তজিস, জর্জ এবং সিলভিয়া ফেদেরিচি। “পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এবং তার বাইরে কমনস।” কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট জার্নাল, ২০১৪।
গ্যাডগিল, মাধব এবং রামচন্দ্র গুহ। এই বিভক্ত ভূমি: ভারতের একটি পরিবেশগত ইতিহাস। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯২।
ঘোষ, সৌমিত্র। “প্রকৃতি বিক্রি: উত্তরবঙ্গের বনগ্রামগুলির প্রসঙ্গ,” কাঞ্চি কোহলি এবং মঞ্জু মেনন সম্পাদিত ব্যবসায়িক স্বার্থ ও পরিবেশগত সংকট গ্রন্থে। সেজ, ২০১৬।
গুহ, রামচন্দ্র। অশান্ত অরণ্য। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।
খালিদ, উমর। বিভক্ত সম্প্রদায়। জাগারনট, ২০২৬।
লেলে, শরচ্চন্দ্র এবং অজিত মেনন, সম্পা। ভারতে বনশাসনের গণতন্ত্রীকরণ। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১৪।
সারিন, মধু। “ঐতিহাসিক অন্যায়ের অবসান: বনাধিকার আইনের মাধ্যমে নাগরিকত্বের অধিকার ও গণতান্ত্রিক বনশাসন পুনরুদ্ধার,” লেলে এবং মেনন সম্পাদিত ভারতে বনশাসনের গণতন্ত্রীকরণ গ্রন্থে, ২০১৪।
শিবরামকৃষ্ণন, কে। আধুনিক অরণ্য: ঔপনিবেশিক পূর্ব ভারতে রাষ্ট্রগঠন ও পরিবেশগত পরিবর্তন। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৯।
স্প্রিংগেট-বাগিনস্কি, অলিভার প্রমুখ। ভারতের বনাধিকার আইন ২০০৬-এর মাধ্যমে “ঐতিহাসিক অন্যায়”-এর প্রতিকার: সমকালীন বনাধিকার সংস্কারের একটি ঐতিহাসিক প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ। আইপিপিজি ডিসকাশন পেপার ২৭, ২০০৯।
(চলবে)
আলোকচিত্র: অনিতেশ চক্রবর্তী
