শুধুই ‘অধিকার’ নয়: বন অধিকার আইনের কুড়ি বছর: দ্বিতীয় পর্ব

লেখক সৌমিত্র ঘোষ · 17 Sep 2026, 08:00 PM
শুধুই ‘অধিকার’ নয়: বন অধিকার আইনের কুড়ি বছর: দ্বিতীয় পর্ব

(মূল ইংরেজি রচনা অবলম্বনে বাংলা ভাষান্তর)

প্রথম পর্বে ফিরে দেখা হয়েছিলো ঔপনিবেশিক বন-শাসন, আন্দোলন থেকে বন অধিকার আইনের জন্ম, অধিকারের পরিসংখ্যান, উন্নয়নের নামে বনের ওপর আক্রমণ, এবং “সবুজ” সংরক্ষণের নতুন ঘেরাবন্দি। এই পর্বে প্রশ্ন: গ্রামসভা যখন সত্যিই বন চালাতে চায়, তখন কী ঘটে?

গ্রাম যখন নিজেই বন চালাতে চাইল

এ প্রশ্ন বোঝার জন্য উত্তরবঙ্গ বিশেষ উপযোগী, কারণ এখানকার গল্প আদৌ ছিমছাম নয়। নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে যে বন-আন্দোলন তৈরি হচ্ছিলো, তার শুরু এফআরএ দিয়ে নয়—আইন তখন ছিলোই না। বনগ্রামের মানুষ লড়ছিলেন আরো পুরোনো এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে তাঁদের গ্রাম, বাস্তুজমি, চাষজমি ও বন--সবটাই আইন ও প্রশাসনের চোখে বনবিভাগের অধীন।

বেগার থেকে বন-স্বশাসনের দাবি

‘বনগ্রাম’ নামটায় গ্রাম আছে, অথচ এগুলো প্রথমাবধি সাধারণ গ্রাম ছিল না। ঔপনিবেশিক ‘বৈজ্ঞানিক বনশিল্প’-এর আওতায় বনগ্রাম ও টঙিয়া গ্রাম ছিল মূলত শ্রমিক-বসতি। সার্ভিস জাগির বা টঙিয়ার নানা বন্দোবস্তে পরিবারকে সামান্য চাষজমি, বসতির জায়গা আর বনের কিছু ‘সুবিধা’ দেওয়া হতো; বদলে বনবিভাগকে দিতে হতো বাধ্যতামূলক বিনা মজুরির শ্রম। বনে থাকা, জমিতে থাকা, এমনকি পরের প্রজন্মের সেখানে টিঁকে থাকাও বিভাগের কাজের সঙ্গে বাঁধা। স্বাধীনতা এলো; সম্পর্কের মূল কাঠামো গেলো না। সাহেব বদলালো। বন-শাসনের চরিত্র বদলালো না।

ষাটের দশকের শেষ এবং সত্তরের গোড়ার বেগার-বিরোধী আন্দোলনে এই বন্দোবস্তে প্রথম ফাটল ধরে। বনগ্রামের মানুষ প্ল্যান্টেশানের কাজ বন্ধ করেন, মজুরি দাবি করেন, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান; অনেক জায়গায় সাফ-কাটাই ও ঠিকাদারি বনশিল্প নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। আন্দোলনের ধাক্কায় বেগার উঠে যায়, দিন-হাজিরা চালু হয়, ইচ্ছামতো উচ্ছেদের ওপর কিছু রাশ পড়ে। কিন্তু বন কার, বন চালাবে কে—এ প্রশ্নের উত্তর বদলায় না। বন ও বনভূমির কর্তৃত্ব বনবিভাগের হাতেই থাকে।

এর পরে আবার বনশিল্প বদলালো। কাঠের কাজ কমলো, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের এলাকা বাড়লো, যৌথ বন পরিচালনা বা জেএফএম এলো। বনগ্রামের মানুষ একসময় বিভাগের বিনা-মজুরির শ্রমিক; পরে তাঁরা ‘বন্যপ্রাণের চাপ’, কখনও ‘ইকো-ডেভেলপমেন্ট’-এর উপভোক্তা। ভাষা বদলেছে, কর্তৃত্বের জায়গাটা নয়। জেএফএম কিছু সুবিধা দিয়েছে, কিন্তু ওয়ার্কিং প্ল্যান, বনকাটাই, বাগিচা, সংরক্ষণ—শেষ কথা বলেছে দপ্তরই। ফলে, শতকের শেষ নাগাদ আন্দোলনের দাবিও বদলাতে শুরু করে: শুধু কাজ বা মজুরি নয়, বাস্তু ও চাষজমির স্থায়ী স্বীকৃতি, বনগ্রামকে রাজস্ব গ্রামে রূপান্তর, বনের ওপর গণতান্ত্রিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ। উত্তরবঙ্গ বনবাসী সমিতি, পরে রাষ্ট্রীয় বন-জন শ্রমজীবী মঞ্চ এবং উত্তরবঙ্গ বন-জন শ্রমজীবী মঞ্চের ভিতর দিয়ে এই দাবি সর্বভারতীয় বনাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে যায়।

আইনের ‘গণ-রূপায়ণ’

বন অধিকার আইন পাস হবার পর উত্তরবঙ্গের গ্রামবাসীরা এমন সব কথাশব্দ পেলেন যা আগে ছিলোই না: সামুদায়িক বন-সম্পদ, গ্রামসভার কর্তৃত্ব, বন রক্ষা ও পরিচালনার অধিকার। তথাপি, পশ্চিমবঙ্গে সরকারি রূপায়ণ শুরু হতেই পুরোনো রোগ ফিরে এলো। বহু জায়গায় বন অধিকার কমিটি গ্রামের বদলে ওপরের স্তরে বানানো হলো, বনকর্তা ও সরকার-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়লেন, সময়সীমা চাপানো হলো, গ্রামের সাক্ষ্য-প্রমাণকে আমল দেওয়া হলো না, সামুদায়িক বন-সম্পদের দাবি পড়ে রইলো। আইন কে ব্যাখ্যা করবে—গ্রামসভা, না আমলাতন্ত্র—রূপায়ণের লড়াই দ্রুত সেই প্রশ্নে গিয়ে ঠেকলো।

বহু গ্রাম সরকারি অনুমতির অপেক্ষায় বসে থাকেনি। আন্দোলনের ভাষায় শুরু হলো আইনের ‘গণ-রূপায়ণ’। গ্রামসভা নিজেদের পারম্পরিক বন-সীমানা চিহ্নিত করলো, সিএফআর দাবি জমা দিলো, বোর্ড লাগালো, রেজিস্টার রাখলো, বন পাহারা শুরু করলো। চিলাপাতা ও লাগোয়া অঞ্চলে কোথাও বনবিভাগের সাফ-কাটাই আটকে দেওয়া হলো, কোথাও কাঠ, বালি, পাথর তোলা ও শিকার ঠেকানো হলো। ২০১১ নাগাদ তিন জেলার প্রায় ২০০ বনগ্রাম সিএফআর দাবি জমা দিয়েছে বলে আন্দোলনের নথি ও পরবর্তী গবেষণায় পাওয়া যায়; চিলাপাতার আটটি গ্রাম মিলিয়ে দাবি ছিল প্রায় ২,৯৮৫ হেক্টর।[৫] দাবি তখন আর শুধু স্বীকৃতির নয়; আইনানুযায়ী যে কর্তৃত্ব ইতিমধ্যে গ্রামসভার, মানুষ সেটাই ব্যবহার করে দেখতে চাইছিলেন।

“
আইন এ কাজের জায়গা খুলে দিতে পারে; কাজটা করে না। যেমন পাট্টা হাতে পেলেই কমন্স তৈরি হয় না, তেমনি ‘গ্রামসভা’ শব্দটা আইনে থাকলেই গণতন্ত্র নেমে আসে না। গ্রামসভাকে বারবার বানাতে হয়, গণতান্ত্রিক করতে হয়, ভিতরের বৈষম্যের সঙ্গে লড়তে হয়, বাইরের দখল ঠেকাতে হয়। এই শ্রমটাই কমনিং।

“কমন্স” বা সাধারণভূমি—আপাত বিমূর্ত শব্দটিকে এখানেই বোঝা যায়। সরকার কাগজে “কমিউনিটি ফরেস্ট” লিখে দিলেই কমন্স তৈরি হয় না। মানুষ যখন যৌথভাবে একটি সাধারণ, সবার মধ্যে ভাগ-করা সম্পদ টিকিয়ে রাখে, তখন তা কমন্স। ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে দরকষাকষি হয়, নিয়ম মানা হয়; কেউ দিনের মজুরি ছেড়ে বন পাহারা দেয়; ব্যবহার নিয়ে ঝামেলা হলে মীমাংসা হয়; কেউ ব্যক্তিগত লাভের জন্য গাছ কাটতে পারলেও মেনে নেয় যে গাছটা তার একার বিক্রির বস্তু নয়।

কিছু গ্রামসভা শুধু পাহারা দেয়নি; নিয়ম করেছে, হিসেব রেখেছে, জব্দ হওয়া বা পড়ে থাকা কাঠ কীভাবে ব্যবহার হবে ঠিক করেছে, জরিমানা করেছে, ঠিকাদার ও চোরাশিকারিদের সঙ্গে ঝামেলায় গেছে। মহিলাদের ভূমিকা বহু জায়গায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিলো—জ্বালানি, পশুখাদ্য, মাছ, শাকপাতা, চাষ, এ সবের সঙ্গে তাঁদের প্রতিদিনের কাজ সরাসরি যুক্ত। মানচিত্র আঁকা, সীমানা নিয়ে তর্ক, সভার খাতা রাখা, বনকর্তার সামনে আইনের ধারা পড়া—এসবও এক ধরনের রাজনৈতিক শিক্ষা। কমনিং মানে শুধু “আমাদের বন” বলা নয়; বন চালাতে শেখা।

উত্তরবঙ্গের আন্দোলনে বনাধিকার আইনের গুরুত্ব তাই অপরিসীম। বনকর্তারা আগের মতো সহজে গ্রামবাসীকে অবৈধ দখলদার বলে উড়িয়ে দিতে পারলেন না। বনবিভাগের আধিকারিকের সামনে গ্রামসভা এখন সংসদে পাশ হওয়া আইনের ধারা বলতে পারে। কিন্তু আইন তো আর বন পাহারা দেয়নি, সভায় যায়নি, ঝগড়া মেটায়নি। যে মানুষ একদিনের মজুরি নষ্ট করে বন পাহারা দিলেন, তার ক্ষতিপূরণও আইন দেয়নি।

বনবিভাগও উধাও হয়নি। পুরোনো যৌথ বন পরিচালনার কাঠামো আবার ফিরে এসেছে। সরকারি উন্নয়নের টাকা পার্টি-অনুগত স্থানীয় গোষ্ঠীকে পুরস্কৃত করার কাজে লেগেছে। ঠিকাদার ও পার্টির নেটওয়ার্ক গ্রামের রাজনীতিতে ঢুকেছে। গ্রামসভার সঙ্গে কথা না বলে বাছাই করা নেতার সঙ্গে বোঝাপড়ার নতুন রাস্তা আমলারা খুঁজে নিয়েছেন। কোথাও ফৌজদারি মামলা, কোথাও জেএফএমের টাকা, কোথাও স্থানীয় দালাল—কর্তৃত্ব ফিরে পাওয়ার রাস্তা সোজা ছিলো না।

ভিতরের সমস্যাও ছিলো। বন পাহারা দিতে গেলে মজুরি নষ্ট হয়; সংসারের চাপ বাড়লে স্বেচ্ছাশ্রম টিঁকিয়ে রাখা কঠিন। টাকা দলাদলি তৈরি করতে পারে, স্থানীয় নেতার জবাবদিহির দায় থাকে না। আন্দোলনে জোয়ারের সময় যে প্রতিষ্ঠান গণতান্ত্রিক ছিলো, আন্দোলন দুর্বল হলে তা শুকিয়ে যেতে পারে। এখানেই এক অস্বস্তিকর, জরুরি প্রশ্ন।

“
সরকার কাগজে “কমিউনিটি ফরেস্ট” লিখে দিলেই কমন্স তৈরি হয় না। মানুষ যখন যৌথভাবে একটি সাধারণ, সবার মধ্যে ভাগ-করা সম্পদ টিকিয়ে রাখে, তখন তা কমন্স। ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে দরকষাকষি হয়, নিয়ম মানা হয়; কেউ দিনের মজুরি ছেড়ে বন পাহারা দেয়; ব্যবহার নিয়ে ঝামেলা হলে মীমাংসা হয়; কেউ ব্যক্তিগত লাভের জন্য গাছ কাটতে পারলেও মেনে নেয় যে গাছটা তার একার বিক্রির বস্তু নয়।

“সমুদায় বা গোষ্ঠী” কি সবসময় গণতান্ত্রিক?

না। বনবাসীরা দখলদার—এই আমলাতান্ত্রিক মিথের বিরুদ্ধে লড়াই চলেছে বলেই অন্য একটা মিথ আমদানি করা যায় না: ‘সমুদায়’ মাত্রেই স্বভাবত গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, পরিবেশবন্ধু। গ্রামের ভিতরে ক্ষমতা-সম্পর্ক, ক্ষমতা-দ্বন্দ্ব আছে। জাতপাত বনে এসে উধাও হয়ে যায় না, পিতৃতন্ত্র বা শ্রেণিও না। যার অনেক গরু আছে, সে গোচারণভূমিকে ভূমিহীন পরিবারের মতো দেখবে না। ব্যবসায়ী একটি গাছে কাঠ দেখবেন, অন্য কেউ দেখবেন জ্বালানি, খাদ্য, ছায়া। পুরুষ ও মহিলা একই বন সম্পূর্ণ আলাদা ভাবে ব্যবহার করতে পারেন। দলীয় রাজনীতি, পরিযান, ভোগ্যপণ্য, বাণিজ্যিক বাজার গ্রামের বাইরে থাকে না।

অতএব, ‘রাষ্ট্র’-র হাত থেকে কর্তৃত্ব ‘সমুদায়’-এর হাতে গেলেই কমন্স পুনর্গঠিত হয় না। উমর খালিদের সদ্য-প্রকাশিত গবেষনাগ্রন্থ ‘ফ্র্যাকচার্ড কমিউনিটিস’ এই জায়গায় কাজে লাগে। এই লেখা আদিবাসী সমাজকে সমসত্ব, অবিভক্ত সত্তা হিসেবে দেখতে অস্বীকার করে। সমাজ ভিতর থেকে বদলায়; রাষ্ট্র ও পুঁজি শুধু বাইরে থেকে আঘাত করে না, তাদের সম্পর্ক গ্রামের ভিতরেও পুনরুৎপাদিত হতে পারে।

বন-আন্দোলনের সঙ্গে কাজ করলে কথাটা হাতে-কলমে জানা হয়। গ্রামসভা খনি-কোম্পানিকে ঠেকাতে পারে; আবার নিজেই মাতব্বরদের কব্জায় চলে যেতে পারে। গোষ্ঠী বন বাঁচাতে পারে; আবার বিক্রিযোগ্য যা আছে বিক্রি করার সিদ্ধান্তও নিতে পারে। এতে করে রাষ্ট্রীয় বনশাসন শ্রেয় প্রমাণ হয় না। বরং কঠিনতর সত্য সামনে আসে: গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আইনের খোপে বন্দী থাকে না, এটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। কমন্স বাঁচে কমনিংয়ে—সাধারণভূমিকে প্রতিদিন যৌথভাবে তৈরি, ব্যবহার, রক্ষা ও আবার তৈরি করার কাজে।

আইনের ভিত নড়বড়ে

আর একটা অসুবিধা হচ্ছে, আইন নিজেও একরকম কথা বলে না। ২০১৩-র নিয়মগিরি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট গ্রামসভাকে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামুদায়িক অধিকার নির্ধারণের অধিকার দেয়; গ্রামসভা খনিপ্রকল্প প্রত্যাখ্যান করে। ২০১৯-এর ওয়াইল্ডলাইফ ফাস্ট মামলায় যাঁদের বনাধিকারের দাবি খারিজ হয়েছে তাঁদের উচ্ছেদের নির্দেশ চলে আসে—পরে অবশ্য নির্দেশ স্থগিত হয়, দাবি খারিজের প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার জন্য। ২০২৬-এ তামিলনাড়ুর এ জন কেনেডি মামলায় সংরক্ষিত এলাকা থেকে “দখল” সরানোর সময়বদ্ধ নির্দেশে বনাধিকারের দাবির বা তা নিষ্পত্তির প্রসঙ্গমাত্র ছিল না।[৬]

অর্থাৎ, একই আইনি দুনিয়ায় বনাধিকার আইন কখনো গ্রামসভার হাতে কার্যকর অস্ত্র, অথচ খারিজ হওয়া দাবির সঙ্গে উচ্ছেদের খাঁড়া জুড়ে যায়, কখনো আলোচনায় আইন থাকেই না। বিভিন্ন সরকারিও মন্ত্রকও এক সুরে কথা বলে না। আইন ও প্রশাসনের ফাঁকফোকর আন্দোলনের কাজে লাগে—নিয়ামগিরি তার বড় উদাহরণ। কিন্তু প্রতিবার যদি একই দাবি ফের তুলতে হয়, খাতা ঠিক করাতে হয়, আইনের নিজের জায়গাটাই বাঁচাতে হয়, আইনকে রক্ষা করতে রাজনৈতিক শক্তির বড় অংশ খরচ হয়ে যায়। যে স্বশাসনের রাজনীতি থেকে আইনের জন্ম, তাকে তাহলে এগিয়ে নেওয়া যায় কী করে?

তাহলে বন অধিকার আইন কিসের জন্য?

এতক্ষণ যা বলা হলো, কোনোটাই বন অধিকার আইনের বিরুদ্ধের যুক্তি নয়। উল্টো। স্বাধীন ভারতে বন বিষয়ে যত আইন হয়েছে, এফআরএ সম্ভবত তার মধ্যে সবচেয়ে গণতান্ত্রিক। আইন না থাকলে লক্ষ লক্ষ মানুষ উচ্ছেদ ও প্রশাসনিক হিংসার সামনে আরও অনেক বেশি অসহায় থাকতেন। বন-আমলাতন্ত্র যে দাবি দীর্ঘকাল অস্বীকার করেছে, এফআরএ সে দাবিকে যুগপৎ রাজনৈতিক ও আইনি শক্তি দিয়েছে। রাষ্ট্রের দেয়ালে এমন সব ফাঁক খুলেছে যা আগে ছিলো না।

তথাপি, আইনের বড় শক্তি পাট্টায় বা কাগুজে অধিকারে নয়, ক্ষমতায়, কর্তৃত্বে। সামুদায়িক বন-সম্পদ, পারম্পরিক আবাসভূমি, বনগ্রামকে রাজস্ব গ্রামে রূপান্তর, গ্রামসভার বনরক্ষা ও পরিচালনার ক্ষমতা—এ সবের ভিতরে এক অন্য বন-রাজনীতির সম্ভাবনা আছে। বনে থাকা মানুষ সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তা মাত্র নয়; নিজেদের ভূখণ্ড নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক কর্তা। এই কথাটা যদি বাদ যায়, স্রেফ “রূপায়ণ” শব্দটা দিয়ে আইনের খুব ক্ষুদ্র অংশ ধরা পড়ে।

আধিকারিক দাবিপত্র জমা নিলেন না বা স্বীকার করলেন না—রূপায়ণ ব্যর্থ। দাবি মঞ্জুর হওয়ার পরে একই বন খনির হাতে গেলে? সামুদায়িক বনভূমির পাট্টা আছে, অথচ টাকা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কতৃত্ব জেএফএম কমিটির? সংরক্ষণের নামে গ্রামকে স্থানান্তরের দিকে ঠেলা হলে? শহরে বসে কার্বন বা বাগিচা প্রকল্পের জন্য গ্রামের বন ঠিক করে দেওয়া হলে? এসব তো রূপায়ণের ফাঁক নয়, ক্ষমতার প্রশ্নপ্রসঙ্গ।

তফাতটা মনে রাখা দরকার। লক্ষ্য কখনোই শুধু আইনের ভিতরে ঢোকা ছিলো না; লক্ষ্য ছিলো বনের ভিতরের সামাজিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক বদলানো। কখনো আইন সে কাজে সাহায্য করে। কখনো যে রাষ্ট্র অধিকার স্বীকার করে, সেই রাষ্ট্রই অন্য আইন, নীতি, প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে খর্ব করে। কখনো বিপদ সরাসরি রাষ্ট্র থেকে নয়—পুঁজি, বাজার, পার্টি, স্থানীয় মাতব্বর, এবং গ্রামের, গোষ্ঠীর ভিতরকার বৈষম্য থেকেও আসে। কাজেই বনাধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নের চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি হবে, হওয়া সম্ভব, আশা করবার কারণ নেই।

স্বশাসনও অভ্যাসে তৈরি হয়

এই জায়গায় উত্তরবঙ্গের সাম্প্রতিক আর একটা অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে আন্দোলনের কাজ ৩৫টি গ্রামসভায় মহিলাদের নেতৃত্বে ছোট ছোট শেখার কেন্দ্র বা ‘লার্নিং সেন্টার’-এ ছড়িয়েছে।[৭] এগুলো সরকারি প্রশিক্ষণ শিবির গোছের নয়, বাইরে থেকে এসে আইন বুঝিয়ে দেওয়ার ক্লাসও নয়। নিজেদের জীবন, বন, গ্রামসভা ও আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে একসঙ্গে শেখার জায়গা—পাওলো ফ্রেইরির ভাষায়, ওপর থেকে জ্ঞান ঢেলে দেওয়া নয়, কথোপকথনের ভিতর দিয়ে নিজেদের জ্ঞান তৈরি করা।

আলোচনা হয় নতুন ঘেরাটোপ বা এনক্লোজার নিয়ে, বনাধিকার আইন কোথায় কাজে লাগে এবং কোথায় আটকে যায়, গ্রামসভা কী পারে, কী পারে না, বন ব্যবহারে নারী-পুরুষের তফাত কোথায়, গ্রামের ভিতরে ক্ষমতা কার হাতে, কমন্স বলতে কী বোঝায়। কাজের তাৎপর্য হয়তো এখানেই: স্বশাসন রাষ্ট্রের দেওয়া আর একটা ‘সুবিধা’ নয়। সিদ্ধান্ত নিতে, তর্ক করতে, হিসেব চাইতে, নিজের ভুল ধরতে, নতুন নেতা তৈরি করতে—এসব করতে করতে যে সামাজিক ক্ষমতা তৈরি হয়, স্বশাসন তার নাম।

আইন এ কাজের জায়গা খুলে দিতে পারে; কাজটা করে না। যেমন পাট্টা হাতে পেলেই কমন্স তৈরি হয় না, তেমনি ‘গ্রামসভা’ শব্দটা আইনে থাকলেই গণতন্ত্র নেমে আসে না। গ্রামসভাকে বারবার বানাতে হয়, গণতান্ত্রিক করতে হয়, ভিতরের বৈষম্যের সঙ্গে লড়তে হয়, বাইরের দখল ঠেকাতে হয়। এই শ্রমটাই কমনিং।

আইন দরজা, গন্তব্য নয়

বনাধিকার আইন তাই এখনো অস্ত্র, দরজা। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি স্বশাসন নয়, আইনি জয়ও লড়াইয়ের শেষ নয়। আইন যখন উচ্ছেদ ঠেকায়, গ্রামসভার হাতে ক্ষমতা দেয়, তাকে ব্যবহার করতে হবে। অন্য আইন যখন একই বন কেড়ে নিতে চায়, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। আবার, যেখানে আইন জীবনজীবিকা বাঁচাতে পারে না, আইনের ভাষার বাইরে সামাজিক শক্তি তৈরি করতেও হবে।

সাধারনভূমি বাঁচবে সেখানেই, যেখানে মানুষ তাকে বারবার তৈরি করে—প্রতিষ্ঠান বানিয়ে, সঙ্ঘায়ন করে, তর্ক করে, প্রতিরোধে, বনরক্ষায়, নিজেদের ভিতরের ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়েও লড়াই করে, একই ভূখণ্ড ভাগ করে নেওয়ার দৈনন্দিন শ্রমে। বনাধিকার আইন এই কাজের জন্য শক্তিশালী আইনি জমি দিয়েছে। সে জমিতে দাঁড়িয়ে কতদূর যাওয়া যাবে, তা আইনের ধারা দিয়ে ঠিক করবে না। করবে সংগঠিত মানুষ।

টীকা ও সূত্র

৫. উত্তরবঙ্গের ‘people’s implementation’, সিএফআর দাবি, চিলাপাতার আট গ্রামের প্রায় ২,৯৮৫ হেক্টর দাবি এবং গ্রামসভাভিত্তিক বনরক্ষার বিবরণের জন্য দেখুন G U, Nishok, Tom Lazlo Guha and Meenal Tatpati (2018), Community Based Conservation amidst Conflict in the Dooars Region of North Bengal; Sourish Jha (2010), “Process Betrays the Spirit” এবং “The Struggle for Democratizing Forests”।

৬. Orissa Mining Corporation v Ministry of Environment and Forests (2013); Wildlife First v Ministry of Forest and Environment (2019); A John Kennedy and Others v State of Tamil Nadu and Others (2026), 2026 INSC 605।

৭. ৩৫টি গ্রামসভায় মহিলা-নেতৃত্বাধীন শেখার কেন্দ্রগুলির বিবরণ লেখকের ২০২৫–২৬ ক্ষেত্র-অভিজ্ঞতা এবং EPW-তে জমা দেওয়া “Reproducing the Commons: Beyond the Juridical Imagination of the Forest Rights Act” প্রবন্ধের ভিত্তিতে।

গ্রন্থপঞ্জি

Asher, Manshi. “Evolution of the Forest Rights Act: A Historical Perspective.” The Indian Journal of Social Work, 2019.

Banerjee, Ajit, Soumitra Ghosh and Oliver Springate-Baginski. Obstructed Access to Forest Justice in West Bengal: State Violations in the Mis-Implementation of the Forest Rights Act 2006. IPPG Discussion Paper, 2010.

Caffentzis, George and Silvia Federici. “Commons Against and Beyond Capitalism.” Community Development Journal, 2014.

Choudhury, Govinda. “Land Tenure and Forest Conservation in the Dooars of the Eastern Himalaya.” Review of Agrarian Studies, 2015.

Freire, Paulo. Pedagogy of the Oppressed. 1970.

G U, Nishok, Tom Lazlo Guha and Meenal Tatpati. Community Based Conservation amidst Conflict in the Dooars Region of North Bengal. Kalpavriksh, 2018.

Gadgil, Madhav and Ramachandra Guha. This Fissured Land: An Ecological History of India. Oxford University Press, 1992.

Ghosh, Soumitra. “Selling Nature: The Case of Forest Villages of Northern Bengal,” in Kanchi Kohli and Manju Menon, eds., Business Interests and the Environmental Crisis. Sage, 2016.

Guha, Ramachandra. The Unquiet Woods. Oxford University Press.

Jha, Sourish. “Process Betrays the Spirit: Forest Rights Act in Bengal.” Economic & Political Weekly, 2010.

Jha, Sourish. “The Struggle for Democratizing Forests: The Forest Rights Movement in North Bengal, India.” Social Movement Studies, 2010.

Karlsson, Bengt G. Contested Belonging: An Indigenous People’s Struggle for Forest and Identity in Sub-Himalayan Bengal. Curzon Press, 2000.

Khalid, Umar. Fractured Communities. Juggernaut, 2026.

Lele, Sharachchandra and Ajit Menon, eds. Democratizing Forest Governance in India. Oxford University Press, 2014.

Sarin, Madhu. “Undoing Historical Injustice: Reclaiming Citizenship Rights and Democratic Forest Governance through the Forest Rights Act,” in Lele and Menon, Democratizing Forest Governance in India, 2014.

Sivaramakrishnan, K. Modern Forests: Statemaking and Environmental Change in Colonial Eastern India. Stanford University Press, 1999.

Springate-Baginski, Oliver et al. Redressing “Historical Injustice” through the Indian Forest Rights Act 2006: A Historical Institutional Analysis of Contemporary Forest Rights Reform. IPPG Discussion Paper 27, 2009.

আলোকচিত্র: অনিতেশ চক্রবর্তী