কে এই দেশের নাগরিক? ভারতে নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির ধারণা, স্ববিরোধ ও লড়াই: দ্বিতীয় পর্ব
(মূল ইংরেজি রচনা অবলম্বনে বাংলা ভাষান্তর)
এই লেখার প্রথম পর্বে আমরা ভারতীয় নাগরিকত্বের ধারণার ঐতিহাসিক বিবর্তন দেখেছিলাম—গণপরিষদের বিতর্ক ও সাংবিধানিক বিধান থেকে শুরু করে নাগরিকত্ব আইনের একের পর এক সংশোধন পর্যন্ত। দেখা গিয়েছিল, ভারতে নাগরিকত্ব বিষয়টি কখনই নিছক আইনের ব্যাপার ছিল না; সংবিধানের আদর্শ, জাতিগঠন, অভিবাসন এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষের সংযোগস্থলেই তার জন্ম ও বদল।
তবে আইনে নাগরিক কাকে বলে, এতেই গল্প শেষ হয় না। রাষ্ট্র কাকে ‘আপন’ বলে মানছে, কাকে থাকতে দিচ্ছে, কাকে ‘বাইরের লোক’ বানাচ্ছে—সমান গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রশ্নও। দেশভাগ, পরপর উদ্বাস্তু-স্রোত, ছিদ্রবহুল সীমান্ত, জাতিগত সংঘাত এবং অভিবাসন নিয়ে আঞ্চলিক উদ্বেগ, এই এতকিছুর সমাহারে গঠিত আমাদের এই দেশে এ প্রশ্ন সহজ হওয়ার কথা নয়।
গত কয়েক দশকে প্রশ্ন আরো জোরালো, বিস্ফোরক। ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস বা এনআরসি, নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন বা সিএএ, ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার বা এনপিআর, ডিটেনশন সেন্টার, ‘অবৈধ অভিবাসী’ নিয়ে অভিযোগ, সীমান্ত পেরিয়ে অনানুষ্ঠানিক ‘পুশ-ব্যাক’—সব মিলিয়ে নাগরিকত্ব নিছক ‘আইনি পরিচয়ের’ গন্ডি পেরিয়ে সমকালীন ভারতের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে।
এই পর্বে ঘটনাগুলিকে দেখা হবে সাংবিধানিক, আইনি ও ঐতিহাসিক দিক থেকে। অভিবাসনকে নিছক নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখলে আলোচনার বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। গভীরতর গণতান্ত্রিক প্রশ্ন: সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র কীভাবে নাগরিক, অভিবাসী, উদ্বাস্তু ও রাষ্ট্রহীন মানুষকে মধ্যে ফারাক করবে? সেই কাজ করতে গিয়ে যুগপৎ আইনের শাসন ও মৌলিক অধিকারের প্রতি দায় কীভাবে বজায় রাখবে?
অভিবাসন, উদ্বাস্তু ও ভারতীয় রাষ্ট্র
পৃথিবীর ইতিহাসের সবচাইতে মর্মান্তিক স্থানান্তরণের ঘটনার মধ্যে, দেশভাগের সময় প্রায় দেড় কোটি দেশ হারানো বাস্তু হারানো ছিন্নমূল মানুষের ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত পারাপার। তথাপি, হালের বহু উদ্বাস্তু-সঙ্কটের সঙ্গে এ ঘটনার একটা বড় তফাত ছিল। নতুন দুই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এই বিপুল জনসংখ্যার বৃহদাংশ শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সমাজে ঢুকে এসেছিলেন।
পরের দশকগুলিতে বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসনের ছবি একরকম নয়। ১৯৫৯ থেকে তিব্বতি উদ্বাস্তুদের আসা; ষাটের দশকের সাম্প্রদায়িক হিংসার সময় পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা মানুষের ভিড়; ১৯৭১-এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি উদ্বাস্তু; গৃহযুদ্ধ থেকে পালানো শ্রীলঙ্কার তামিল; পরপর যুদ্ধ থেকে আসা আফগান; এবং সাম্প্রতিককালে মিয়ানমার থেকে পালানো রোহিঙ্গা—প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আইনি, রাজনৈতিক ও মানবিক সমস্যা আলাদা।
উদ্বাস্তু আছেন, উদ্বাস্তু আইন নেই
দশকের পর দশক ভারত লক্ষ লক্ষ বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। অথচ আশ্চর্য, ভারতীয় উদ্বাস্তু-নীতিতে আজও কোনও পূর্ণাঙ্গ উদ্বাস্তু আইন নেই। ১৯৫১-এর রিফিউজি কনভেনশান বা ১৯৬৭-এর প্রোটোকল—ভারত কোনোটিরই সদস্য নয়।
ফলে উদ্বাস্তু প্রসঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা চলে জোড়াতালি মেরে: কখনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কখনও আদালতের হস্তক্ষেপ, কখনও রাজনৈতিক সমঝোতা, সঙ্গে বিদেশি নিয়ন্ত্রণকারী সাধারণ আইন। এই সেদিন পর্যন্ত এই ব্যবস্থার মূল ভিত ছিল বিদেশি আইন বা ফরেনার্স য়্যাক্ট, ১৯৪৬ এবং পাসপোর্ট (এন্ট্রি ইনটু ইন্ডিয়া) আইন, ১৯২০। অন্য দুই সংশ্লিষ্ট আইন-সহ এগুলো বাতিল করে আনা হয় ইমিগ্রেশান য়্যান্ড ফরেনার্স য়্যাক্ট, ২০২৫। ২০২৫-এর ১লা সেপ্টেম্বর থেকে এই আইন কার্যকর হয়েছে।
আগের ব্যবস্থা ছিল নমনীয়; সেসঙ্গে চূড়ান্তভাবে অসমঞ্জস। তিব্বতি উদ্বাস্তুরা বহু দশক ধরে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পেয়েছেন। শ্রীলঙ্কার তামিলদের সংগঠিত শিবিরে রাখা হয়েছে, কল্যাণ-সহায়তাও দেওয়া হয়েছে। বহু আফগান উদ্বাস্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘ-প্রদত্ত নথি পেয়েছেন। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে উল্টো, রাষ্ট্র তাঁদের দেখেছে নিরাপত্তাজনিত বিপদ হিসেবে। সব উদ্বাস্তর জন্য একই ভাবে প্রযোজ্য অভিন্ন ও আইনগ্রাহ্য অধিকার এবং নির্দিষ্ট উদ্বাস্তু-সুরক্ষা আইন না থাকার ফল, কোন উদ্বাস্তু-গোষ্ঠী কতখানি সুরক্ষা পাবেন, তা অনেকটাই চলতি সরকারের নীতির ওপর নির্ভরশীল।
‘অবৈধ’ অভিবাসন ও অসমের রাজনীতি
ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে কথা হবে, অসম বাদ যাবে—সম্ভব নয়। আগের পর্বে আমরা দেখেছি অসমে অভিবাসনের প্রশ্ন স্বাধীনতারও আগেকার, এবং ১৯৭৯-১৯৮৫-র অসম আন্দোলনের প্রধান মুখ অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা আসু, ‘অবৈধ অভিবাসী’দের খুঁজে বার করে তাদের বহিষ্কারের দাবি তোলে। ১৯৮৫-র অসম চুক্তি মারফত আন্দোলনের নিষ্পত্তি হয়। পরে নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫-এর ৬ক ধারায় প্রতিফলিত এই বন্দোবস্ত অনুযায়ী ঠিক হয়, একাত্তরের চব্বিশে মার্চ হচ্ছে কাট-অফ; অর্থাৎ পঁচিশে মার্চ বা তার পরে দেশের বাইরে থেকে যে মানুষেরা অসমে এসেছেন, তাঁদের আইনানুযায়ী চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইএমডিটি আইন ও তার বিলোপ
অসমে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বিতর্কিত আইনি অস্ত্রগুলির একটি ছিল ইল্লিগ্যাল মাইগ্রান্টস (ডিটারমিনেশান বাই ট্রাইব্যুনালস য়্যাক্ট), ১৯৮৩—সংক্ষেপে আইএমডিটি আইন।
তখনকার ফরেনার্স য়্যাক্ট, ১৯৪৬ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বিদেশি নন, তা প্রমাণ করার দায় সাধারণত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর পড়ত। আইএমডিটি-তে অভিযোগকারী ও প্রশাসনের চাইতে তুলনায় অনেক বেশি দায় ছিল অভিযুক্তের, কাউকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে দাগানো হলে তাকেই অভিযোগ প্রমাণ করতে হত। আইন-সমর্থকদের বক্তব্য, এতে সংখ্যালঘু মানুষ খামখেয়ালি হয়রানি থেকে সুরক্ষা পান। বিরোধীদের যুক্তি, এই কাঠামোয় ‘অবৈধ অভিবাসী’ শনাক্ত করাই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ‘সর্বানন্দ সোনোয়াল বনাম ভারত সরকার(২০০৫)’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আইএমডিটি আইন বাতিল করে। আদালতের মতে, ‘অবৈধ অভিবাসন’ ঠেকাতে এ আইন ব্যর্থ; অসমে বিপুল পরিমাণ অনথিভুক্ত অভিবাসনকে আদালত গুরুতর জনবিন্যাসগত ও নিরাপত্তা-সমস্যা হিসেবেও দেখে। ভারতের নাগরিকত্ব-বিষয়ক সাংবিধানিক রায়গুলির মধ্যে এই রায় সবচেয়ে প্রভাবশালী, এবং বিতর্কিত। অনেকেই অসম চুক্তি কার্যকর করার লক্ষ্যে এই রায়কে জরুরি বলে স্বাগত জানান। অন্যরা বিপুল অভিবাসনকে ‘এক্সটারন্যাল য়্যাগ্রেশান’ বা ‘বহিরাগতদের আগ্রাসন’ বলার সমালোচনা করেন—তাঁদের আশঙ্কা, অভিবাসনের মানবিক প্রশ্ন সহজেই জাতীয় নিরাপত্তার ভাষ্যে ঢাকা পড়তে পারে।
এনআরসি: প্রতিশ্রুতি ও সমস্যা
অসমের ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস বা এনআরসি নিবন্ধিকরণের উদ্দেশ্য ছিল অসম চুক্তি থেকে তৈরি হওয়া নাগরিকত্ব-বন্দোবস্ত কার্যকর করা। সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে বহু বছরে ধরে মামলা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলার পর, চূড়ান্ত এনআরসি প্রকাশিত হয় ৩১ আগস্ট ২০১৯। চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েন প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষ।
নাগরিকত্ব যখন কাগজপত্র
তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষদের সবাই আদৌ বাংলাভাষী মুসলমান নন। হিন্দু, মুসলমান, স্থানীয় জনজাতি, চা-বাগানের শ্রমিক—বহু গোষ্ঠীর মানুষ প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রমাণাদি না দিতে পেরে তালিকার বাইরে চলে যান। অনেকে দশকের পর দশক ভোট দিয়েছেন, সম্পত্তির মালিক ছিলেন, কর দিয়েছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজও করেছেন—হঠাৎ তাঁদের আইনি পরিচয়ই অনিশ্চিত হয়ে গেল। দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, বাস্তুচ্যুতি এসবের সঙ্গে প্রশাসনিক নথিপত্র থাকা না থাকার সম্পর্ক কত নিগুঢ়, এনআরসি নগ্ন করে দেখাল। ভোটার তালিকায় ভুল, নামের বানান এক নথি থেকে আর এক নথিতে না-মেলা, জন্মের রেকর্ড না থাকা, প্রজন্মের মাঝের কাগজের ফাঁক—ছোটখাটো আমলাতান্ত্রিক ত্রুটি মানুষের জীবনের প্রধান প্রশ্ন বা প্রসঙ্গ হয়ে উঠল। বোঝা গেল, নাগরিকত্বকে স্রেফ আমলাতান্ত্রিক কাগজপত্রে আটকে রাখলে গুরুতর অন্যায় হয়।
ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল ও ন্যায্য প্রক্রিয়া
এনআরসি-তে বাদ পড়া মানুষ ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে গিয়ে নিজেদের বাদ পড়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর সুযোগ পান। নাম না থাকা মানেই বিদেশি ঘোষিত হয়ে যাওয়া নয়। ট্রাইব্যুনাল অর্থে কোয়াসি-জুডিসিয়াল বা আধা-বৈচারিক গোছের সংস্থা; এক্ষেত্রে, আইনমাফিক যার বিরুদ্ধে বিদেশি হওয়ার অভিযোগ এসেছে, তিনি প্রকৃতপক্ষে বিদেশি কি না, তা এই সংস্থা ঠিক করে। নাগরিক সমাজ, আইনজ্ঞরা ও একাধিক মানবাধিকার গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ট্রাইব্যুনালজনিত সমস্যা তুলে ধরছেন: বিচার করার নিরিখ বা মানদণ্ডেই অসঙ্গতি, সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে কমজোর অভিযুক্তদের কাছে যথেষ্ট আইনি সহায়তা পৌঁছোচ্ছে না, মামলার বিপুল চাপ এবং প্রক্রিয়াগত অনিয়ম। নাগরিকত্বের সিদ্ধান্ত শুধু পরিচয়পত্রের প্রশ্ন নয়। রাজনৈতিক অধিকার, কোথায় বসবাস করা যাবে, সরকারি সুবিধা পাওয়া যাবে কি না, আইনের চোখে মানুষের অবস্থান—সব তার সঙ্গে জড়িত। ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত মানুষের পুরো জীবন ওলটপালট করে দিতে পারে। প্রশ্ন নিছক প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে নয়, বরং অনেক বড়--বিচার কতটা ন্যায্য, স্বচ্ছ? বিচারব্যবস্থা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে কী?
ডিটেনশন সেন্টার: আইন ও মানবাধিকার
ডিটেনশন সেন্টার বা ‘আটকাগার’ মানে যেখানে ‘অবৈধ অভিবাসী’দের আটকে রাখা হয়। নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্কে এই ‘আটকাগারের’ মত ভীতিপ্রদ বিষয় দ্বিতীয়টি নেই। অভিবাসন-ব্যবস্থায় কাউকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হলে, দেশ থেকে তাড়ানো বা নির্বাসনের আগে, বিশেষ পরিস্থিতিতে, আইনি প্রক্রিয়া মেনে তাঁকে নির্ধারিত আটকাগারে রাখা যেতে পারে। আদালতের নির্দেশ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পরে অসমে আলাদা আটক-ব্যবস্থা তৈরি হয়। গোয়ালপাড়া জেলার মাটিয়া ট্রানজিট ক্যাম্প রাজ্যের সবচেয়ে বড় এ ধরনের আটকাগার। সমর্থকদের যুক্তি, সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধিকার আছে বহিষ্কার বা নির্বাসনের অপেক্ষায় থাকা বিদেশি নাগরিককে আটক রাখার। সমালোচকদের পালটা প্রশ্ন, যে দেশে কাউকে পাঠানো হবে, সেই দেশ যদি তাঁকে নিজের নাগরিক বলেই না মানে, নির্বাসন হবে কীভাবে? সেই অবস্থায় দীর্ঘ বা অনির্দিষ্ট আটক অর্থ, কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত না হয়েও অনির্দিষ্টকাল স্বাধীনতা হারানো।
সুপ্রিম কোর্ট একাধিক বার দীর্ঘকাল ধরে আটক থাকবার প্রসঙ্গ বিবেচনা করেছে। সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নাগরিক এবং অ-নাগরিক—দুজনের জন্যই প্রযোজ্য। মানবাধিকার প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিধিও উপযুক্ত বিচার বা পুনর্বিবেচনা ছাড়া অনির্দিষ্ট অভিবাসন-আটককে সমস্যাজনক বলে দেখে।
নিরাপত্তা বনাম নন-রিফাউলমঁ(non-refoulement)
রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের প্রতি ভারতের আচরণ সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিতর্কের অন্যতম। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশনিবাসী মুসলমান ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গারা দশকের পর দশক ধরে নিপীড়ন, বৈষম্য ও উচ্ছেদের শিকার। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য ঘটনা রাষ্ট্রপুঞ্জ নথিভুক্ত করেছে। অনেক রোহিঙ্গা আশ্রয়ের খোঁজে ভারতে এসেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান, তাঁরা বেআইনিভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন এবং দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিপদ। সুপ্রিম কোর্টের মামলাগুলিতে আবেদনকারীদের যুক্তি ছিল, রোহিঙ্গাদের নির্বাসন সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক নন-রিফাউলমঁ নীতির বিরোধী। নীতির সহজ মানে: যেখানে ফেরত পাঠালে মানুষের জীবন বা স্বাধীনতা গুরুতর বিপদের মুখে পড়বে, সেখানে তাঁকে জোর করে পাঠানো চলবে না।
ভারত উদ্বাস্তু প্রসঙ্গে আর্ন্তজাতিক বিধি বা রিফিউজি কনভেনশানের সদস্য নয়। তা সত্বেও আবেদনকারীদের বক্তব্য ছিল, নন-রিফাউলমঁ আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থার অংশ এবং জীবন ও মর্যাদার সাংবিধানিক সুরক্ষার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সংঘঠন বা ইউএনএচসিআর(UNHCR)-ও নন-রিফাউলমঁকে প্রথানুগ আন্তর্জাতিক আইনের অংশ হিসেবে স্বীকার করে।
সুপ্রিম কোর্ট, মহম্মদ সালিমুল্লা বনাম ভারত সরকার (২০২১) মামলায়, জম্মুতে আটক রাখা রোহিঙ্গাদের নির্বাসনের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেয়নি। তবে আদালত বলেছিল, আইন-নির্ধারিত প্রক্রিয়া না মেনে নির্বাসন হবে না। এই রায় আবার সেই পুরোনো টানাপোড়েনকেই ফিরিয়ে আনে—একদিকে প্রশাসন ও জাতীয় নিরাপত্তার দাবি, অন্যদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তিমানুষের সাংবিধানিক সুরক্ষা।
‘পুশ-ব্যাক’ ও অনানুষ্ঠানিক বহিষ্কারের অভিযোগ
সীমান্তে অনানুষ্ঠানিক ‘পুশব্যাক’ নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির কথা সবাই কমবেশি জানেন। আনুষ্ঠানিক নির্বাসনে সাধারণত আইনি সিদ্ধান্ত ও দুই রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সমন্বয় লাগে। ‘পুশব্যাক’ হচ্ছে, নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়া শেষ না করেই মানুষকে শারীরিকভাবে সীমান্তের ওপারে ঠেলে পাঠানো। সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠন মারফত এমন বহু ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে ভারতীয় নাগরিক বা দেশের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা মানুষদেরও সীমান্তে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।
সুনালি খাতুন
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের সুনালি খাতুনের ঘটনা ইতিমধ্যেই বহু-আলোচিত। গর্ভবতী সুনালি এবং তাঁর পরিবারের কয়েকজনকে ২০২৫-এর জুনে জবরদস্তি বাংলাদেশে পাঠানো হয়। কিছু আধিকারিকের সন্দেহ ছিল, তাঁরা অবৈধ অভিবাসী। পুশব্যাক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা কলকাতা হাইকোর্ট হয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যায়। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের পরে ২০২৫-এর ডিসেম্বরে সুনালি ও তাঁর ছেলে ভারতে ফেরেন। পরবর্তী মামলার পরে ২০২৬-এর জুলাইতে তাঁর স্বামী দানিশ শেখ, সুইটি বিবি এবং সুইটির দুই সন্তানও ফেরেন। ঠিক কী প্রক্রিয়ায় তাঁদের নাগরিকত্ব যাচাই করা হয়েছিল, বা কেন পুশব্যাক করা হয়েছিল, জানা যায়নি।
কর্তৃপক্ষ বেআইনি পুশ-ব্যাকের বহু অভিযোগ অস্বীকার করেছে বা বলেছে আইন মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তথাপি, এই বিতর্কই দেখিয়ে দেয় ‘ডিউ প্রসেস’ বা ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া কেন অপরিহার্য। প্রশাসনিক সন্দেহের বশে বিদেশি নাগরিক আর ভারতীয় নাগরিকের তফাত করা যায় না; আইনসম্মত, যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া দরকার। ভুল হলে মূল্য ভয়াবহ। বেআইনিভাবে কাউকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হলে তা নিছক অসুবিধের ব্যাপার নয়। পরিবার ও জীবিকা থেকে বিচ্ছেদ, আইনি সুরক্ষা হারানো, এমনকি রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি।
নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯
আগের পর্বে আমরা বলেছি, সাম্প্রতিক নাগরিকত্ব আইনগুলির কোনোটাই ২০১৯-এর সিএএ-র মতো বিতর্ক তৈরি করেনি। এই আইন পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আসা ছয় ধর্মীয় সম্প্রদায়ের—হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টান—অভিবাসীদের জন্য ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভের বিশেষরকমের দ্রুত বা ‘ফাস্টট্র্যাক’ রাস্তা বাতলেছে। যদি তাঁরা ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ বা তার আগে ভারতে এসে থাকেন এবং আইনের শর্ত পূরণ করেন, নতুন আইন মোতাবেক তাঁরা সবাই ভারতীয় নাগরিক। সংশ্লিষ্ট বিধান এখন নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫-র ৬বি ধারায়। সরকারের বক্তব্য, সিএএ মুসলিম-প্রধান প্রতিবেশী দেশে নিপীড়িত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রক্ষার্থে উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা। আইন-সমর্থকদের মতে, বৈষম্যের চিরাচরিত শিকার সংখ্যালঘুরা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে দ্রুত নাগরিকত্বের সুযোগ পাওয়ার যোগ্য।
একাধিক সাংবিধানিক আপত্তি উঠেছে। প্রথমত, এই বিশেষ আইনি রাস্তা মুসলমানদের বাদ দেয়—নিপীড়িত আহমদিয়া ও হাজারা মুসলমান, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাও এর বাইরে। নাগরিকত্ব আইনের সাধারণ বিধানে মুসলমানরা ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার অযোগ্য নন। তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে সিএএ মারফত তৈরি ‘বিশেষ দ্রুত রাস্তা’ থেকে। দ্বিতীয়ত, আইন তিন প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা অভিবাসীর জন্য। মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা-সহ অঞ্চলের অন্য রাষ্ট্রের আওতায় বসবাসকারি নিপীড়িত সংখ্যালঘুরা বাইরে। তৃতীয়ত, সমালোচকদের যুক্তি, নাগরিকত্বের ‘বিশেষ রাস্তার’ প্রকাশ্য শর্ত হিসেবে ধর্মকে ঢোকানো, সাম্য এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার থেকে সরে আসা। সিএএ ও ২০২৪-এর বিধির সাংবিধানিক বৈধতাকে প্রশ্ন করে বহু মামলা সুপ্রিম কোর্টে ঝুলছে। ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে আদালত জানায়, ৫ মে থেকে চূড়ান্ত শুনানি শুরু হবে। সেইমতো, ৫ থেকে ১২ মে পর্যন্ত মামলাটি শুনেছে আদালত।
সিএএ নিয়ে বিতর্ক ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের চরিত্র নিয়ে মতভেদ। নাগরিকত্ব বলতে মূলত কী নাগরিক-সাংবিধানিক পরিচয়? না, নাগরিকত্ব-নীতির বৈধ ভিত্তি হয়ে উঠবে ধর্ম, বা সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত মানদণ্ড?
নাগরিকত্ব, নথি ও গণতন্ত্র
একুশ শতকের নাগরিকত্ব বিতর্কে অদ্ভুত এক স্ববিরোধ ওতপ্রোত। নাগরিকের আইনি পরিচয় ঠিক করতে আধুনিক রাষ্ট্র ক্রমেই কাগজপত্র, ডেটাবেস এবং বায়োমেট্রিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করছে। অথচ, দারিদ্র্য, স্থানান্তরণ, নিরক্ষরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতার কারণে লক্ষকোটি সাধারণ মানুষের কাছে নাগরিকত্ব প্রমাণ করার মতো কাগজই নেই। নথির ঘাটতি ব্যক্তির অপরাধ নয়; রাষ্ট্রের অক্ষমতারও ফল। প্রশাসনিক গাফিলতিকে যখন নাগরিকের তাঁর নিজের দেশে থাকবার অধিকারের সঙ্গে সমার্থক করে তোলা হয়, নাগরিক কী ‘ঘুসপেটি’-র অস্তিত্বগত প্রশ্নে বদলে দেওয়া হয়, বিপদ তখনই।
সাংবিধানিক গণতন্ত্র অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করবে, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা করবে—ধরে নিতে হয়। সংবিধানের সীমার মধ্যে থেকে কোন শর্তে নাগরিকত্ব নির্ধারিত হবে, সীমান্ত কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, এ সব নিয়ে কী আইন হবে—প্রত্যেক রাষ্ট্রের ঠিক করবার ক্ষমতা আছে। গণতন্ত্রে যা বৈধ, তা আইনের চোখেও সমান। অর্থ, আইনের শাসনের মানে, ব্যক্তির স্বাধীনতা, নাগরিকত্ব বা বসবাসের অধিকার কেড়ে নিতে পারে এমন সিদ্ধান্ত যদি নিতেই হয়, আইনসম্মত, ন্যায্য এবং পুনর্বিবেচনাযোগ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিতে হবে।
সীমানার বাইরে নাগরিকত্ব
অন্য প্রশ্নও ওঠে। নাগরিকত্ব কী শুধুই আইনি পরিচয়? নাকি বসবাস, শ্রম, অংশগ্রহণ এবং যৌথ সাংবিধানিক অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সমাজের অংশ হয়ে ওঠা? নাগরিকত্বের মূল উৎস জন্ম, বংশ, নাগরিক অংশগ্রহণ, না সাংবিধানিক আনুগত্য? আধুনিক গণতন্ত্র বিভিন্ন অনুপাতে এই সব নীতি মিলিয়ে নিজের নিজের নাগরিকত্ব আইন বানায়। ভারতের সাংবিধানিক কল্পনা ঐতিহাসিকভাবেই গ্রহণ-মূলক নাগরিক ধারণার দিকে ঝুঁকেছে, অবশ্য সীমান্ত ও অভিবাসন নিয়ে রাষ্ট্রের বৈধ উদ্বেগও অস্বীকার করেনি। সাংবিধানিক ভিত বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী গণতন্ত্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার মধ্যে বাছাবাছি ক্করবার দরকার হয় না।
নাগরিকত্ব আধুনিক পৃথিবীতে সবচাইতে ক্ষমতাধর আইনি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম। ভোট ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সরকারি সুবিধা, চলাচলের স্বাধীনতা, নিরাপদে বসবাস, রাষ্ট্রের সুরক্ষা—সবকিছুর সঙ্গেই তা সরাসরি যুক্ত। নাগরিকত্ব হারানো তো বটেই, নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহের মধ্যে পড়ে যাওয়ার অর্থও, মানুষের আইনি এবং অস্তিত্বগত নিরাপত্তা ভেঙে যাওয়া।
ভারতের অভিজ্ঞতা, আইনপত্র দিয়ে নাগরিকত্ব বোঝা যায় না। ইতিহাস, দেশভাগ, অভিবাসন, আঞ্চলিক রাজনীতি, আদালতের ব্যাখ্যা, আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা-অক্ষমতা এবং ‘জাতি’ সম্পর্কে প্রতিদ্বন্দ্বী ধারণা—সব মিলিয়ে নাগরিকত্ব তৈরি হয়। এনআরসি, ডিটেনশন সেন্টার, রোহিঙ্গা, তথাকথিত পুশব্যাক এবং সিএএ নিয়ে বিতর্ক অর্থে নীতি নিয়ে মতভেদ নয়; ভারতীয় সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র বলতে কী বোঝা হবে, তা নিয়েও বিরোধ। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি নাগরিক চিহ্নিত করা, সীমান্ত রক্ষা—সবই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈধ ক্ষমতা। তথাপি, সার্বভৌমত্বের বৈধতা আসে সাংবিধানিক সংযম থেকে। প্রক্রিয়াকে ন্যায্য হতে হবে, প্রমাণনির্ভর হতে হবে, আদালতের পুনর্বিবেচনার অধীন থাকতে হবে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বেশি, দায়ও তত বড়—নাগরিক ভুল করে ‘দেশের নয়’ হয়ে যাবেন না, উদ্বাস্তু মানুষ হিসেবে ন্যূনতম সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হবেন না।
শেষ পর্যন্ত ‘কে এই দেশের?’, এ প্রশ্নের উত্তর কাগজ দেয় না। প্রজাতন্ত্র যে নীতি অনুসরণ করছে, উত্তর তৈরি হয় সেখানে। নাগরিকত্বের জটিলতাকে অস্বীকার করা ভারতের সংবিধানের, সংবিধান-অনুসারী সরকারের কাজ নয়। তার কাজ রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যেও আইনের শাসন, সাম্য এবং মানবিক মর্যাদাকে নাগরিকত্ব নির্ধারণের মাপকাঠি করে রাখা—রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার নামে নাগরিকের সার্বভৌমত্বকে ইচ্ছামতো অস্বীকার করা নয়।
আলোকচিত্র: কুশল কর
