কে এই দেশের নাগরিক? ভারতে নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির ধারণা, স্ববিরোধ ও লড়াই: প্রথম পর্ব

লেখক অর্কদীপ গোস্বামী · 03 Sep 2026, 12:38 PM
কে এই দেশের নাগরিক? ভারতে নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির ধারণা, স্ববিরোধ ও লড়াই: প্রথম পর্ব

(মূল ইংরেজি রচনা অবলম্বনে বাংলা ভাষান্তর)

নোট: লেখাটি দুই পর্বে। প্রথম পর্বে ভারতীয়https://www.mha.gov.in/MHA1/ACtRule.html নাগরিকত্বের আইনি ও মতাদর্শগত ভিত কীভাবে তৈরি হলো, তার ঐতিহাসিক বিবর্তন দেখা হবে। দ্বিতীয় পর্বে আসবে অভিবাসন, উদ্বাস্তু এবং সাম্প্রতিক নাগরিকত্ব-ব্যবস্থার বদল। বিষয়গুলি একে অন্যের সঙ্গে জড়ানো, কিন্তু এক লেখায় সবটা ধরা দুরূহ। তাই দুই পর্বে ভাগ করে দেখা—নাগরিকত্বের প্রশ্ন কোথা থেকে এল, এবং আজ এসে কোথায় দাঁড়িয়েছে।

ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক ইতিহাসের এমন এক সময়ে আমরা দাঁড়িয়ে যখন ‘কে এই দেশের নাগরিক?’, এই প্রশ্নটা দেশভাগের পর আর কখনও সম্ভবত এতখানি রাজনৈতিক হয়ে ওঠেনি। সারা দেশে ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস বা এনআরসি চালুর প্রস্তাব, নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন ২০১৯, ২০২৪-এর সংশোধনী বিধি, তারও পরে ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশান বা এসআইআর—সব মিলিয়ে নাগরিকত্ব আবার ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে। এর সঙ্গে জুড়েছে ক্রমবর্ধমান ধর্ম-জাতিকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ। ফলে পুরোনো একটা প্রশ্ন নতুন করে ফিরে এসেছে: ভারত নামক রাজনৈতিক সমাজটা আসলে কী, এবং তার ‘আপন’ মানুষ কারা? যে-যার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে এই সব ব্যবস্থা সমর্থন বা বিরোধিতা করতেই পারেন। কিন্তু একটা কথা অস্বীকার করা কঠিন—আজকের ভারতে নাগরিকত্ব আর একবার নির্ধারিত হয়ে যাওয়া সাংবিধানিক সত্য নয়; আইন তাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে, আমলাতন্ত্র নথিপত্র দিয়ে যাচাই করছে, রাজনীতি নিরন্তর টানাটানি করছে। অর্থাৎ, আজকের বিতর্কটা শুধু কাগজ বা অভিবাসন নিয়ে নয়। ভারত কাকে বলে, সেই ধারণাটাকেও নিয়ে।

গোড়ার কথা

১৯৪৭-এ ভারত ও পাকিস্তান নামে দুই নতুন ডোমিনিয়ন তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপমহাদেশে অঞ্চলে নাগরিকত্বের প্রশ্নও এক নতুন আইনি-রাজনৈতিক কাঠামোয় ঢুকে পড়ে। তার আগে ব্রিটিশ ভারতের মানুষ ছিলেন ব্রিটিশ প্রজা; দেশীয় রাজ্যের বাসিন্দাদের আইনি অবস্থান আরও জটিল। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে ‘নাগরিক’ হওয়া নিজেই অবশ্য খুব পুরোনো ধারণা নয়। প্রাক্-আধুনিক সাম্রাজ্যে মানুষ আধুনিক অর্থে নাগরিক ছিলেন না; আনুগত্য ছিল স্থানীয় ক্ষমতা, রাজবংশ, সাম্রাজ্য, ধর্ম বা সার্বভৌম শাসকের প্রতি। ১৭৮৯-এর ফরাসি বিপ্লব এবং পরবর্তী ‘মানুষ ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র’ আধুনিক নাগরিককে জাতিনির্মাণের অংশীদার হিসেবে গণ্য করার মতাদর্শগত ভিত গড়ে দেয়। প্রায় একই সময়ে ব্রিটেন ও উত্তর আমেরিকাতেও নাগরিকত্বের আলাদা আলাদা ধারা তৈরি হচ্ছিল। ভারতে এই প্রশ্নটা হঠাৎ ভয়াবহরকমের জরুরি হয়ে ওঠে দেশভাগের সময়—সীমান্ত রাতারাতি বদলেছে, কোটি মানুষ ঘর হারিয়ে এপার-ওপার হয়েছেন, এবং ঠিক সেই মুহূর্তেই ঠিক করতে হয়েছে, কে কোন রাষ্ট্রের নাগরিক।

সংবিধান তৈরির সময় গণপরিষদে নাগরিকত্ব নিয়ে দীর্ঘ উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সংবিধানের ৫ থেকে ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, সংবিধান কার্যকর হওয়ার মুহূর্তে কে, কারা ভারতীয় নাগরিক বলে গণ্য হবেন। নাগরিকত্বকে মৌলিক অধিকারের তালিকায় রাখা হয়নি। খসড়া কমিটির সভাপতি বি আর আম্বেদকর পরিষ্কার বলেছিলেন, এই অনুচ্ছেদগুলির মূল উদ্দেশ্য সংবিধান চালু হওয়ার দিন নাগরিক কে, তা নির্ধারণ করা। তার পরের কাজ সংসদের। ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ সংসদকে নাগরিকত্ব অর্জন, নাগরিকত্ব হারানো এবং সংশ্লিষ্ট অন্য বিষয়ে আইন করার ক্ষমতা দিল।

ভূমিকা আর না বাড়িয়ে, ভারতীয় নাগরিকত্বের ভিতটাকে একটু কাছ থেকে দেখা যাক। ইতিহাস এড়িয়ে এ প্রশ্ন বোঝার উপায় নেই। কারণ নাগরিকত্বের ধারণা কীভাবে বদলেছে তা না জানলে উত্তর তো মেলে না-ই, অনেক সময় প্রশ্নটাই ঠিক করে ধরা যায় না।

ভারতে নাগরিকত্বের আদি আইনি ভিত

স্বাধীন ভারতে নাগরিকত্বকে প্রথম পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামোয় বাঁধল নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫। দেশের ইতিহাসে প্রথম বার একটি আইন নির্দিষ্ট করে বলতে চাইল—ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক সমাজের সদস্য কে, এবং ভবিষ্যতে কে কীভাবে সেই সমাজের সদস্য হতে পারবেন।

আদি আইনে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পাঁচটি প্রধান রাস্তা ছিল:

১. জন্মসূত্রে: মোটামুটি ভাবে, ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ বা তার পরে ভারতে জন্মানো ব্যক্তি, আইনে বলা কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে।

২. বংশসূত্রে: ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০-এর পরে ভারতের বাইরে জন্মালে নির্দিষ্ট শর্তে ভারতীয় পিতা-মাতার সূত্রে নাগরিকত্ব; আদি আইনে মূলত পিতার সূত্রেই।

৩. নিবন্ধনের মাধ্যমে।

৪. স্বাভাবিকীকরণ বা ন্যাচারালাইজেশানের মাধ্যমে।

৫. নতুন কোনও ভূখণ্ড ভারতীয় ইউনিয়নের অংশ হলে, সেই সূত্রে।

জন্ম, রক্ত আর আদি প্রজাতন্ত্র

আন্তর্জাতিক আইনে নাগরিকত্বের দুটো বড় নীতি বারবার ফিরে আসে—jus soli, অর্থাৎ ‘মাটির অধিকার’: রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে জন্ম হলেই নাগরিকত্ব; এবং jus sanguinis, অর্থাৎ ‘রক্তের অধিকার’: পিতা-মাতার নাগরিকত্ব থেকে নাগরিকত্বের সূত্র। ১৯৫৫-এর আইন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে jus sanguinis মেনেছিল বটে, কিন্তু আদি কাঠামোর ঝোঁক ছিল স্পষ্টত jus soli-র দিকে। সদ্য স্বাধীন প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক কল্পনাটাও সেখানে ধরা পড়ে। ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী বা সংস্কৃতি নয়; রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে থাকা এবং সমান নাগরিক-সদস্যত্ব ছিল নাগরিকত্বের প্রধান ভিত্তি। বলা যায়, স্বাধীনতার শুরুর বছরগুলিতে ভারতীয় নাগরিকত্বের আইনি ধারণা মোটের ওপর এক নাগরিক-সাংবিধানিক জাতীয়তাবাদের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।

জাতি ও অন্তর্ভুক্তির আর এক মতাদর্শ

জাতীয় অন্তর্ভুক্তি নিয়ে মতাদর্শগত লড়াইয়ের একদিকে ছিল সংবিধান-প্রণেতাদের বড় অংশের নাগরিক-সাংবিধানিক জাতীয়তাবাদ। অন্যদিকে, হিন্দুত্বের সঙ্গে যুক্ত জাতি-ভাবনা—যেখানে জাতিকে মূলত জাতি-সংস্কৃতি ও ধর্মের এক গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হয়। এখানে একটা কথা আগে পরিষ্কার করা দরকার। ‘জাতি’ কী, কে তার ভিতরের লোক, এই প্রশ্নের উত্তর সরল ঐতিহাসিক রেখা ধরে তৈরি হয় না। একটি বিশেষ সময়ে কোন মতাদর্শ সামাজিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করছে, তার সঙ্গে উত্তর বদলায়। জাতি চিরস্থায়ী নৃতাত্ত্বিক বস্তু নয়; রাজনৈতিকভাবে কল্পিত সমাজ, যার সীমানা টানা হয় নির্দিষ্ট নৈতিক ও মতাদর্শগত মানদণ্ড দিয়ে। ইতিহাসে জাতির ধারণা বদলায়; ইতিহাস নিজে কোনো একমাত্র, অপরিবর্তনীয় সংজ্ঞা লিখে দিয়ে যায় না।

“
নাগরিক-সাংবিধানিক ধারণায় ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী, ভাষা বা সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্বিশেষে ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সমান রাজনৈতিক সদস্যত্ব নাগরিকত্বের ভিত্তি। হিন্দুত্বের জাতি-ভাবনা উল্টো পথে যায়: জাতির সদস্যত্ব নির্ধারিত হয় মূলত জাতিগত-সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও সভ্যতাগত পরিচয়ে, ভারতকে কল্পনা করা হয় ‘হিন্দু জাতি’র রাজনৈতিক সমাজ হিসেবে।

ফলে ‘দেশের লোক’ কাকে বলব, তা শেষ পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক ও নৈতিক পছন্দের সঙ্গেও যুক্ত। মোটা কথায়, লড়াইটা গ্রহণ এবং বর্জনের, কাকে রাখবো, কাকে তাড়াবো, তা নিয়ে দুই রাজনৈতিক সমাজের মধ্যে। নাগরিক-সাংবিধানিক ধারণায় ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী, ভাষা বা সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্বিশেষে ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সমান রাজনৈতিক সদস্যত্ব নাগরিকত্বের ভিত্তি। হিন্দুত্বের জাতি-ভাবনা উল্টো পথে যায়: জাতির সদস্যত্ব নির্ধারিত হয় মূলত জাতিগত-সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও সভ্যতাগত পরিচয়ে, ভারতকে কল্পনা করা হয় ‘হিন্দু জাতি’র রাজনৈতিক সমাজ হিসেবে। সে কাঠামোয় তথাকথিত হিন্দু সভ্যতার বাইরে থাকা মানুষের ‘জাতীয়’ অবস্থান স্বভাবতই অনিশ্চিত, শর্তসাপেক্ষ।

সাংবিধানিক টানাপোড়েন

এই পালটা ধারণা সংবিধানের চূড়ান্ত বন্দোবস্ত নির্ধারণ করেনি, কিন্তু গণপরিষদের আলোচনায় জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব এবং নাগরিকত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক অধিকারের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ যে ছিল না, তা নয়। ২৯ এপ্রিল ১৯৪৭-এর আলোচনায় ওড়িশার ভুবনানন্দ দাস প্রশ্ন তুলেছিলেন, খুব বিস্তৃত জন্মসূত্রের বিধান হলে ভারতে জন্মানো বিদেশি পিতা-মাতার সন্তানও কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিক হয়ে যাবে? সভার সভাপতি রাজেন্দ্র প্রসাদও প্রস্তাবিত নিয়মের ফল কী হতে পারে, সে প্রশ্ন তুলেছিলেন। আইনজীবী-লেখক কে এম মুনশি—পরবর্তীতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা—বলেছিলেন, ভবিষ্যতে ইউনিয়নের আইনেই নাগরিকত্বের প্রশ্ন আরও পূর্ণভাবে নির্ধারিত হবে। আমেরিকার উদাহরণ টেনে আল্লাদি কৃষ্ণস্বামী আইয়ার মন্তব্য করেছিলেন: “নাগরিক হলেই রাজনৈতিক অধিকার পাওয়া যায়, এমন কোনও সাধারণ আইনি নিয়ম নেই; আমেরিকার নাগরিকত্ব আইনে নাগরিক কেবল নাগরিক অধিকার পান—এ কথা আমরা জানি।” অর্থাৎ, নাগরিকত্ব এবং নাগরিক বনাম রাজনৈতিক অধিকারের সম্পর্ক গোড়া থেকেই বিতর্কের বাইরে ছিল না। তফাত এই যে, সে বিতর্কের ভাষা ছিল আইন ও সংবিধানের; প্রকাশ্য ধর্ম-জাতিকেন্দ্রিক নাগরিকত্বের নয়।

পালটা ধারণা: ‘হিন্দু জাতি’

ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রকাশ্য ধর্ম-জাতিকেন্দ্রিক ধারণাকে মতাদর্শগতভাবে সবচেয়ে স্পষ্ট আকার দেন ভি ডি সাভারকর এবং এম এস গোলওয়ালকর। হিন্দুস্তানকে ‘হিন্দু জাতি’র একমাত্র স্বদেশ বলে মেনে নিতে হবে—এই যুক্তিতে গোলওয়ালকর লিখেছিলেন:

“…‘জাতি’ সম্পর্কে আধুনিক ধারণা আমাদের বর্তমান অবস্থায় প্রয়োগ করলে অনিবার্য সিদ্ধান্ত এই যে, এই দেশ হিন্দুস্তানে হিন্দু জাতি, তার হিন্দু ধর্ম, হিন্দু সংস্কৃতি ও হিন্দু ভাষা… জাতির ধারণাকে সম্পূর্ণ করে; অর্থাৎ হিন্দুস্তানে প্রাচীন হিন্দু জাতিই আছে এবং থাকা উচিত, হিন্দু জাতি ছাড়া অন্য কিছু নয়। যারা জাতীয়—অর্থাৎ হিন্দু জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষার—অংশ নয়, তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রকৃত ‘জাতীয়’ জীবনের সীমানার বাইরে পড়ে।”

ভারতীয় জাতির এই ধারণা সংবিধানের সমান নাগরিক-সদস্যত্বের ধারণার সরাসরি বিপরীত। গোলওয়ালকর নিজেই সমান নাগরিকত্বের ভাবনাকে ভারতকে এক ‘সরাইখানা’ বানানোর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। বর্জনের যুক্তিটা তাঁর আর একটি বক্তব্যে আরও নগ্ন:

“বিদেশি উপাদানের সামনে দুটো পথ মাত্র—জাতীয় জাতির মধ্যে মিশে গিয়ে তার সংস্কৃতি গ্রহণ করা, অথবা জাতীয় জাতি যতদিন অনুমতি দেয় ততদিন তার দয়ার ওপর বেঁচে থাকা।”

জাতি, জাতীয়তা এবং ‘দেশের লোক’ হওয়ার বিভিন্ন তত্ত্বের পুরো জটিলতা এই ছোট লেখায় আলোচনা করা সম্ভব নয়। এখানে এইটুকুই যথেষ্ট: প্রধান মতাদর্শগত ধারাসমূহ চিহ্নিত করা। কারণ, ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রশ্ন আজও যেসব পরস্পরবিরোধী ধারণা ঘিরে আবর্তিত হয়, তাদের শিকড় এখানেই।

নাগরিকত্ব প্রশ্নের বিবর্তন

এ পর্যন্ত, আলোচনায় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী নাগরিকত্ব-ভাবনা পাশাপাশি দেখা গেল। একটিতে নাগরিকত্ব ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের নাগরিক-সাংবিধানিক সম্পর্ক—ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সমান রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব যার ভিত। অন্যটি জাতি-বেষ্টনীতে অন্তর্ভুক্তিকে বংশ, সংস্কৃতি বা সভ্যতাগত পরিচয়ের সঙ্গে বাঁধতে চায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনের ইতিহাসকে অনেকাংশে এই দুই ধারণার টানাপোড়েনের ইতিহাস হিসেবে পড়া যায়।

অসম বদলে দিল হিসেব

ভারতের নাগরিকত্ব-ব্যবস্থাকে বদলে দেওয়া প্রথম বড় রাজনৈতিক কাজিয়া দিল্লিতে নয়, অসমে। পরবর্তীকালের সর্বভারতীয় নাগরিকত্ব বিতর্কের সঙ্গে এই লড়াইয়ের উৎস এক নয়। অসমের প্রশ্নের পিছনে ছিল ঔপনিবেশিক অভিবাসন-নীতি, জনবিন্যাসের বদল, ভাষার টানাপোড়েন এবং জাতিগত নিরাপত্তাহীনতার জটিল আঞ্চলিক ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনকালে কৃষিজমি চাষ ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের জন্য প্রশাসন বিশেষত বাংলার ঘনবসতিপূর্ণ জেলা থেকে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অভিবাসন উৎসাহিত করেছিল। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর, এবং বিশেষত ১৯৭১-এ বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার পরে, অভিবাসন চলতেই থাকে। অসমিয়া সমাজের এক বড় অংশের মধ্যে জনবিন্যাস, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, জমি ও কাজের অধিকার, ভাষা ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে উদ্বেগও তীব্র হয়।

এই উদ্বেগ থেকেই ১৯৭৯-১৯৮৫-র অসম আন্দোলন, যার নেতৃত্বে অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (AASU) এবং অল অসম গণসংগ্রাম পরিষদ। মূল দাবি: নির্ধারিত কাট-অফ তারিখের পরে অসমে ঢোকা ‘অবৈধ অভিবাসী’দের চিহ্নিত করে বের করে দিতে হবে। আন্দোলনের সামাজিক-রাজনৈতিক উৎস ছিল অসমের বিশেষ ইতিহাসে; সর্বভারতীয় নাগরিকত্বের বিমূর্ত ধারণায় নয়। তথাপি, ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনের পরবর্তী গতিপথে এর প্রভাব গভীর। ১৯৮৫-র অসম চুক্তিতে ২৪ মার্চ ১৯৭১ নির্ণায়ক কাট-অফ হলো; ২৫ মার্চ বা তার পরে অসমে প্রবেশকারীদের আইনমাফিক চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হল, এর আগের সময়ে যারা এসেছেন, তাঁদের জন্য আলাদা বন্দোবস্ত থাকল।

অসম আন্দোলনের গুরুত্ব তাই আঞ্চলিক রাজনীতিতে শেষ হয় না। স্বাধীন ভারতে নাগরিকত্বকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী গণ-সঙ্ঘায়নের প্রথম বড় উদাহরণ এটি। আরও গুরুত্বপূর্ণ, ১৯৫৫-এর আইনের ভূখণ্ডকেন্দ্রিক নাগরিকত্বের ধারণা থেকে রাষ্ট্রের চোখ সরে যেতে থাকল বংশ ও নথির প্রমাণ এবং দেশে প্রবেশের ঐতিহাসিক তারিখের দিকে। আন্দোলনের চালিকাশক্তি মূলত আঞ্চলিক, জাতিগত ও ভাষাগত উদ্বেগ; ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ নয়। কিন্তু আন্দোলনের আইনি-রাজনৈতিক অভিঘাত বংশসূত্র ও নথিনির্ভর নাগরিকত্বের যুক্তিকে শক্ত করল।

নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ১৯৮৬—কার্যকর হচ্ছে ১লা জুলাই ১৯৮৭—আগেকার বিস্তৃত জন্মসূত্রের নাগরিকত্ব-ধারণাকে সংকুচিত করল। ভারতে জন্মানোই আর যথেষ্ট নয়; পিতা-মাতার নাগরিকত্ব, এবং বিশেষ প্রেক্ষিতে নথি দিয়ে বৈধ অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করার ক্ষমতাও ক্রমশ নাগরিকত্বের শর্ত হয়ে উঠল।

অসমের অভিবাসন ও স্থানীয় পরিচয়ের প্রশ্ন থেকে শুরু হওয়া এক আঞ্চলিক সংঘাত এইভাবেই সারা ভারতের নাগরিকত্ব-ভাবনায় দীর্ঘ ছায়া ফেলল। সুতরাং, অসম আন্দোলনজনিত আইনবদল আসলে প্রজাতন্ত্র গড়ে ওঠার প্রথম কয়েক দশকের বিস্তৃত জন্মভিত্তিক নাগরিকত্ব থেকে প্রথম বড় সরে আসা; পরের নাগরিকত্ব-মাইগ্রেশন-পরিচয় বিতর্কের ভিতও এখানেই তৈরি হতে থাকে।

নাগরিকত্বের নতুন বাঁক ও সাম্প্রতিক পর্ব

পরের নির্ণায়ক বাঁক নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০০৩; কার্যকর হয় ৩ ডিসেম্বর ২০০৪। আগের সংশোধনীরা ১৯৫৫-এর jus soli-ভিত্তিক কাঠামো ইতিমধ্যেই সংকুচিত করেছিল, কিন্তু ২০০৩-এর বদল আরো মৌলিক। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, নাগরিকত্ব আইনের ভিতরেই ‘illegal migrant’ বা ‘অবৈধ অভিবাসী’ নামে আইনি শ্রেণি ঢুকে গেল। অন্য আইনে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ আগে থেকেই ছিল; এখন এই শ্রেণিটাই নাগরিকত্ব আইনের কেন্দ্রে জায়গা পেল।

জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়মও আমূল বদলাল। সংশোধিত ৩ নম্বর ধারায়, ৩ ডিসেম্বর ২০০৪ বা তার পরে ভারতে জন্মানো কেউ নাগরিক হবেন তখনই, যদি বাবা-মা দুজনেই ভারতীয় নাগরিক হন; অথবা একজন নাগরিক এবং অন্যজন সন্তানের জন্মের সময়ে ‘অবৈধ অভিবাসী’ না হন। ১৯৫৫-এর তুলনায় এটা বড় বদল। আদি আইনে সীমিত কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া ভারতের ভূখণ্ডে জন্মই নাগরিকত্বের জন্য মোটামুটি যথেষ্ট ছিল।

“
অসম আন্দোলনের গুরুত্ব তাই আঞ্চলিক রাজনীতিতে শেষ হয় না। স্বাধীন ভারতে নাগরিকত্বকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী গণ-সঙ্ঘায়নের প্রথম বড় উদাহরণ এটি। আরও গুরুত্বপূর্ণ, ১৯৫৫-এর আইনের ভূখণ্ডকেন্দ্রিক নাগরিকত্বের ধারণা থেকে রাষ্ট্রের চোখ সরে যেতে থাকল বংশ ও নথির প্রমাণ এবং দেশে প্রবেশের ঐতিহাসিক তারিখের দিকে।

জন্মের অধিকার থেকে নথির প্রমাণে

এই বদলের দীর্ঘমেয়াদি ফল স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক দশকেরও বেশি পরে, অসমে ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস বা এনআরসি হালনাগাদের সময়। লক্ষ লক্ষ মানুষকে নথি দিয়ে প্রমাণ করতে হলো, তাঁরা বা তাঁদের পূর্বপুরুষ আইননির্দিষ্ট কাট-অফ তারিখের আগে থেকে বৈধভাবে এখানে আছেন। অসম চুক্তির ধারাবাহিকতায়, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এনআরসি হয়েছিল, কিন্তু এর ফলে নাগরিকত্বের নতুন বাস্তব চোখের সামনে এল—বংশ, নথি এবং ভারতে বসবাসের ‘বৈধ’ প্রমাণের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা।

২০০৩-এর সংশোধনকে তাই ভারতীয় নাগরিকত্ব-ধারণায় নির্ণায়ক মোড় বলা যায়। সংবিধানের কাঠামো ও ১৯৫৫-এর আইন যেখানে ভারতীয় ভূখণ্ডে জন্মানোকে কেন্দ্র করে নাগরিক অংশীদারিত্বের নাগরিক ধারণার দিকে ঝুঁকেছিল, ২০০৩-পরবর্তী আইনে জন্মের সঙ্গে পিতা-মাতার নাগরিকত্ব এবং অভিবাসন-অবস্থা জুড়ে গেল। ২০১৯-এর নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন বা সিএএ বদল তীব্রতর করে। আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা নির্দিষ্ট হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টান অভিবাসীদের জন্য নাগরিকত্বের বিশেষ রাস্তা তৈরি হয়। সমর্থকদের যুক্তি, প্রতিবেশী মুসলিম-প্রধান রাষ্ট্রে নিপীড়িত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য এটি মানবিক ব্যবস্থা। সমালোচকদের জবাব, ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনের আদি নীতি, যা কিনা ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্ম-নিরপেক্ষতার, এখানেই ভাঙছে।

সংসদ ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করছে—এভাবে এই বদলকে দেখা যায়। প্রজাতন্ত্রের নাগরিক পরিচয়ের মৌল চরিত্র বদলে যাচ্ছে—এভাবেও। যেভাবেই দেখা হোক, ভারতীয় নাগরিকত্বের ইতিহাসে এই অধ্যায় স্পষ্টত জলবিভাজিকা। ফলে, আজকের বিতর্ক নিছক অভিবাসন-নীতি বা আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে নয়। গভীরতর প্রশ্ন: ভারতীয় নাগরিকত্ব কি ব্যক্তি ও প্রজাতন্ত্রের মধ্যেকার নাগরিক সম্পর্ক হিসেবে থাকবে, নাকি বংশকুলুজি, জাতিগোত্র ইত্যাদি এবং ‘সভ্যতাগত’ পরিচয় নাগরিকত্ব নির্ণয়ে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে?

আরো ধর্ম, আরো মোড় — শরণার্থী ও ‘অবৈধ অভিবাসী’-র আইনি ফারাক

২০১৪। লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপির জয় দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক গতিপথে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। সেই বিপুল পরিবর্তনের সমস্তটা বর্তমান লেখার বিষয় নয়। আমাদের প্রশ্ন: ভারতীয় নাগরিকত্বের কাঠামোর ভিতরে ধর্ম-জাতিকেন্দ্রিক ‘জাতীয় অন্তর্ভুক্তি’র ধারণা ধীরে ধীরে কীভাবে আইনি জায়গা করে নিল।

আইনের কাঠামোয় ধর্মের প্রবেশ

মনে করা হয়, অভিবাসন ও নাগরিকত্বে ধর্মের ভিত্তিতে প্রকাশ্য ফারাক প্রথম তৈরি করেছে ২০১৯-এর সিএএ। কিন্তু, তার আগের কিছু প্রশাসনিক বদল বাদ দিলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থাকে।

২০১৫-তে কেন্দ্রীয় সরকার ফরেনার্স অর্ডার, ১৯৪৮ এবং পাসপোর্ট (এন্ট্রি ইনটু ইন্ডিয়া) রুলস, ১৯৫০ সংশোধন করে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে ‘ধর্মীয় নিপীড়ন বা তার আশঙ্কায়’ পালিয়ে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে যাঁরা ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ বা তার আগে বৈধ কাগজ ছাড়া ভারতে ঢুকেছিলেন, অথবা যাঁদের কাগজের মেয়াদ ফুরিয়েছিল, তাঁদের ওই অভিবাসন আইনের কিছু বিধান থেকে ছাড় দেওয়া হয়। ২০১৬-র সংশোধনে আফগানিস্তানও একই কাঠামোয় ঢোকে। এই ব্যবস্থায় নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি, নাগরিকত্ব আইনের ‘অবৈধ অভিবাসী’ সংজ্ঞাও বদলায়নি। চালু অভিবাসন আইনের ভিতরেই, ধর্মভিত্তিক আলাদা ছাড়ের ব্যবস্থা তৈরি হয়ে গেল।

পরে ফরেন এক্সচেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট য়্যাক্ট বা ফেমার-র অধীনেও সমান্তরাল ছাড় আসে। ওই ছয় সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট দীর্ঘকালীন ভিসাধারীরা শর্তসাপেক্ষে প্রবাসী ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে, এবং বসবাস বা অন্য কাজের জন্য সীমিত পরিমাণে স্থাবর সম্পত্তি কিনতে পারবেন। নাগরিকত্ব এল না, কিন্তু প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীভুক্ত মানুষের জন্য আলাদা আইনি বন্দোবস্ত আরো পাকা হলো।

ছাড় থেকে সিএএ

আইনি পারম্পর্যের নিরিখে দেখলে ২০১৯-এর সিএএ আলটপকা ঘটনা নয়; কয়েক বছর ধরে চলা প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার পরিণতি। ২০১৫-১৬-র ছাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে নাগরিকত্ব আইন আবার সংশোধিত হলো। আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সেই একই ছয় ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ, যাঁরা ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ বা তার আগে ভারতে এসেছেন এবং সংশ্লিষ্ট ছাড়ের আওতায় পড়েন, তাঁদের নাগরিকত্ব আইনে ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলা হবে না। পাশাপাশি নিবন্ধন বা ন্যাচারালাইজেশনের বিশেষ নাগরিকত্ব-রাস্তা তৈরি হলো। ভারতে বাধ্যতামূলক বসবাসের প্রয়োজনীয় সময়ও কমানো হলো।

“
এই ব্যবস্থায় নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি, নাগরিকত্ব আইনের ‘অবৈধ অভিবাসী’ সংজ্ঞাও বদলায়নি। চালু অভিবাসন আইনের ভিতরেই, ধর্মভিত্তিক আলাদা ছাড়ের ব্যবস্থা তৈরি হয়ে গেল।


সিএএ-র ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ কাট-অফকে ‘খামখেয়ালি’ বলা হয় হামেশা। নতুন আইনের নৈতিক বা সাংবিধানিক যুক্তি যথার্থ কি না, সে তর্ক ভিন্ন, বৈধ। আইনের ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায় আগের সরকারি বিজ্ঞপ্তিগুলিতে—ওই ছাড়ের জন্য ২০১৪-র শেষ দিনটিই ইতিমধ্যে কাট-অফ হিসাবে দেখানো ছিল। অর্থাৎ সিএএ সম্পূর্ণ নতুন নীতি শুরু করার বদলে ধর্মভিত্তিক যে আলাদা আইনি ব্যবস্থা আগে থেকেই চালু হয়ে গিয়েছিল, তাকে বাড়িয়েছে এবং আইনে পাকাপোক্ত করেছে—এভাবেও পড়া যায়।

সিএএ-সংক্রান্ত সাংবিধানিক প্রশ্ন অদ্যাবধি অমীমাংসিত। সমাবস্থায় স্থিত অভিবাসীদের ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করা সংবিধানের সাম্য ও ধর্মনিরপেক্ষতার অঙ্গীকারের সঙ্গে মেলে কিনা, এ প্রশ্নে রাষ্ট্র নির্বিকার নিরুত্তর। আইনকে বুঝতে হলে অবশ্যই ২০১৯-এর আগেকার আইনি এবং মতাদর্শজনিত ঘটনাক্রমের ধারাবাহিকতায় বুঝতে হবে; একক আইন হিসেবে নয়। এই অর্থে, সিএএ-ও ভারতীয় সাংবিধানিক ইতিহাসে বিশেষ মুহূর্ত—নাগরিকত্ব আইনের ভিতর প্রকাশ্য বিভাজনরেখা হয়ে উঠল ধর্ম, নাগরিকত্ব লাভের জন্য অন্য ছয় সম্প্রদায় জন্য বানানো বিশেষ রাস্তা থেকে মুসলমানরা বাদ রইলেন।

শেষ কথা: বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ

সাম্প্রতিক রাজনীতি, বিশেষত ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়, সাংবিধানিক নাগরিকত্ব বনাম জাতিধর্ম আধারিত নাগরিকত্ব বিতর্ককে বিজেপির জাতি-ধারণার দিকে আরো ঠেলে দিয়েছে। নির্বাচনী সাফল্য এমন এক নাগরিকত্ব-ভাবনার রাজনৈতিক বৈধতা বাড়িয়েছে যেখানে ধর্ম ও সভ্যতাগত পরিচয়, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং তথাকথিত অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সম্প্রদায়-রক্ষার ওপর ক্রমেই বেশি জোর পড়ে।

এই পথ ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক চরিত্রই বদলে দেবে কি না, বলা যায় না। সংবিধান ইচ্ছাকৃতভাবেই ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকত্ব নিয়ে আইন করার ক্ষমতা সংসদের হাতে রেখেছে। অর্থাৎ নাগরিকত্ব কোনও একবারে-স্থির সাংবিধানিক বন্দোবস্ত নয়, আইন ও রাজনীতিতে পরিবর্তনশীল ধারণামাত্র। ক্ষমতায় যারা থাকে, ‘জাতি’ সম্পর্কে তাদের ধারণা যে এই আইনি ক্ষমতার ব্যবহারকে প্রভাবিত করবে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।

ভারতীয় নাগরিকত্বের ইতিহাস অতএব কখনই স্থির বা নিছক আইনের ইতিহাস নয়। সংবিধান চালুর সময়কার বিধান, ১৯৫৫-এর নাগরিকত্ব আইন, একের পর এক সংশোধন, এনআরসি ও সিএএ নিয়ে বিতর্ক—প্রতিটি পর্যায়ে ‘ভারতীয় জাতি’ বলতে কী বোঝা হবে, বৃহত্তর সেই রাজনৈতিক লড়াই আইনের ভিতরে এসে পড়েছে। কে দেশের মানুষ, কে নয়, তার আইনি সংজ্ঞাও বদলেছে রাজনৈতিক বাস্তব ও মতাদর্শগত বিরোধের সঙ্গে তাল রেখে।

শেষ পর্যন্ত, প্রশ্ন শুধুমাত্র এটা নয়, কে নাগরিক হতে পারবেন। প্রশ্ন, প্রজাতন্ত্র নিজেকে কী ধরনের রাজনৈতিক সমাজ হিসেবে দেখতে চায়? ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী বা ভাষা নির্বিশেষে সমান নাগরিকত্বের ওপর দাঁড়ানো নাগরিক-সাংবিধানিক জাতি? নাকি যৌথ ধর্মীয়-ঐতিহাসিক পরিচয়ে বাঁধা এক ‘নির্মিত’ জাতি? প্রশ্নের উত্তর নাগরিকত্ব আইনের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে না; আগামী দশকগুলিতে ভারতীয় গণতন্ত্রের চরিত্রও অনেকাংশে নির্ধারণ করবে।

(চলবে)

আলোকচিত্র: কুশল কর