যন্তর-মন্তরের আন্দোলন: ক্ষোভের জয়, অসমাপ্ত রাজনীতি: দ্বিতীয় পর্ব

লেখক অনিতেশ চক্রবর্তী · 18 Sep 2026, 07:38 PM
যন্তর-মন্তরের আন্দোলন: ক্ষোভের জয়, অসমাপ্ত রাজনীতি: দ্বিতীয় পর্ব

আন্দোলন কী সর্বভারতীয়?

যন্তর-মন্তরের আন্দোলনকে বারবার সর্বভারতীয় আন্দোলন বলা হয়েছে। দিল্লি তার কেন্দ্রীয় প্রতীক হয়েছে, দেশের নানা জায়গায় প্রতিবাদ ছড়িয়েছে। তবে কয়েকটা বড় শহরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়া এবং সত্যিকারের সর্বভারতীয় গণআন্দোলন তৈরি হওয়া তো এক নয়।

রাজস্থানের কোন পরীক্ষার্থী, বিহারের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, কলকাতার কলেজপড়ুয়া, উত্তর-পূর্বের কোন ছাত্র কিংবা পূর্ব-মধ্য ভারতের আদিবাসী অঞ্চলের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী, এঁরা একই সেন্টারে পাশাপাশি বসে পরীক্ষা দিতে পারেন বটে, তাঁদের প্রত্যেকের পরীক্ষা আসলে আলাদা। পরীক্ষার প্রশ্ন সবার জন্য এক হতে পারে, সামাজিক অবস্থান, সুযোগ এবং পরীক্ষাপ্রস্তুতির পরিকাঠামো তো নয়। একজনের কাছে পাঁচ বছর ধরে পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ আছে, অন্যজনের কাছে নেই। ছাত্র হিসেবে কেউ নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করতে পারেন, আরেকজনকে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের উপার্জনের কাজেও হাত লাগাতে হয়। কারুর ব্যক্তিগত শিক্ষক, দ্রুত ইন্টারনেট, ভালো স্কুল, আলাদা ঘর এবং ইংরেজি ভাষার সুবিধা। অন্যজন হয়তো এমন পরিবারের, যেখানে তিনিই প্রথম উচ্চশিক্ষার স্বাদ পাচ্ছেন। অতএব, প্রশ্নপত্র সকলের জন্য এক হলেই প্রতিযোগিতা সমান হয়ে যায় না। এই বিন্দুতে মেধার রাজনীতি আরো জটিল, বহুস্তরীয় হয়ে ওঠে।

ধরা যাক, আগামীকাল থেকে দেশের সমস্ত প্রশ্নপত্র একশো শতাংশ সুরক্ষিত হয়ে গেল। কোথাও ফাঁক নেই, মাছিও গলতে পারে না। প্রশ্ন ফাঁস হল না, পরীক্ষাকেন্দ্রে কোথাও কোনো অনিয়ম হল না। তাতেও কিন্তু ধনী এবং গরিব পরীক্ষার্থী, দলিত এবং উচ্চবর্ণের পরীক্ষার্থী একই জায়গা থেকে দৌড় শুরু করবেন না। করা সম্ভব নয়। স্বচ্ছ পরীক্ষা ও সকলের জন্য সমান সুযোগের মাঝখানে বড়সড় ফাঁক থেকেই যায়। ফাঁক অর্থনৈতিক এবং সামাজিক, রাজনৈতিকও বটে।

এখানে এসে আন্দোলনের রাজনৈতিক ভাষা জটিলতর। স্বচ্ছ পরীক্ষার দাবি থেকে ন্যায্য শিক্ষার দাবি, সেখান থেকে ন্যায্য সমাজের প্রশ্নে পৌঁছনোর একটা রাস্তা খুলে যায়। তাই, আন্দোলনের সর্বভারতীয় হওয়া মানে শুধু দেশের নানা শহরে মিছিল বার হওয়া নয়। দিল্লির যন্তর-মন্তরের পাশাপাশি জেলার সরকারি স্কুল, গ্রামের কলেজ, আদিবাসী ছাত্রাবাস, পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাও আন্দোলনের রাজনৈতিক ভাষায় ঢুকতে হবে। নইলে, ভূগোল সর্বভারতীয় হলেও আন্দোলনের সামাজিক পরিসর সংকীর্ণ হয়ে থেকে যেতে পারে।

পরীক্ষার্থীর অধিকার থেকে ছাত্রের অধিকার। ছাত্রের অধিকার থেকে শিক্ষার অধিকার। সেখান থেকে সামাজিক অধিকারের প্রশ্নে পৌঁছনো। রাজনৈতিক সম্ভাবনা এখানেই।

আন্দোলনের দাবিদাওয়া ও রাজনৈতিক অভিমুখ

নিট-পরীক্ষার প্রস্তুতি ঘিরে তৈরি হয়ে ওঠা বিপুল বাজারকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। পরীক্ষার্থী যত বেশি, আসন যত কম, পরীক্ষার ফলের সঙ্গে ভবিষ্যৎ জীবন যত বেশি জড়ানো, পরীক্ষায় এগিয়ে থাকার জন্য বাড়তি প্রস্তুতি কেনার প্রয়োজন তত বাড়ে।

শিক্ষা শুধু শিক্ষা নয়, পণ্যও। যে পরিবার বাড়তি খরচ বহন করতে পারে, তার সন্তান সুবিধা নিয়ে মাঠে নামে। যে পরিবার পারে না, সে লড়াই শুরু করে পিছিয়ে থেকেই। অথচ, রাষ্ট্র এই অসম প্রতিযোগিতার গায়েই মেধার স্টিকার সেঁটে দেয়। যেন পরীক্ষার ঘরের কয়েক ঘণ্টার প্রতিযোগিতাই শেষ কথা। আগেপরের উদগ্র সামাজিক-অর্থনৈতিক ফারাকের কোনো অস্তিত্ব নেই। কুৎসিত মজা। বলা হচ্ছে, প্রতিযোগিতা সকলের জন্য সমান, অথচ সে প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি সকলের জন্য সমান নয়, হতে পারবে না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব তো শুধু প্রশ্নপত্র পাহারা নয়। সরকারি স্কুলের মান, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে পরীক্ষার প্রস্তুতির সুযোগ, সরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা ও আসন বাড়ানো এবং উচ্চশিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ, সবকিছুকেই আলোচনায় আনতে হয়। নিট-এর ক্ষেত্রে যেমন সংখ্যার মধ্যেই বিরাট সংকট রয়েছে। লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষায় বসছেন, আসন নগণ্য। মার্কশিটে একটা মাত্র নম্বরের মূল্য যেমন বিপুল, একটা অনিয়মের সামাজিক মূল্যও। পরীক্ষাকে আরো ‘সুরক্ষিত করা’ পরীক্ষা-সংক্রান্ত চাপ কমানোর একমাত্র রাস্তা হতে পারে না। শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। সরকারি মেডিক্যাল কলেজে আসন বাড়ানোর দাবি একারণে শুধু নিট পরীক্ষার্থীদের স্বার্থের প্রশ্ন নয়। দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার, পরিকাঠামোর প্রশ্ন।

পরীক্ষার এই অস্বাভাবিক গুরুত্বের পিছনে আরো বড় সংকট, বেকারত্ব। দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণের জীবন আজ পরীক্ষাকেন্দ্রিক। স্কুলের পরে পরীক্ষা, কলেজে ঢুকতে পরীক্ষা, পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পরীক্ষা, একটা না হলে আর একটা, তারপর আরো একটা। ভারতীয় তরুণরা পরীক্ষার প্রতি রহস্যময় কারণে আকৃষ্ট, এমন তো নয়। পরীক্ষার বাইরে মর্যাদাপূর্ণভাবে বাঁচার রাস্তা ক্রমশ সরু হয়ে এলে, গুটিকয় দরজার সামনে ভিড় বাড়বেই। ভিড় বাড়লে প্রতিযোগিতা বাড়বে। প্রতিযোগিতার গুরুত্ব বাড়লে পরীক্ষার দাম বাড়বে, পরীক্ষার দাম বাড়লে প্রশ্নপত্রের বাজারদর বাড়বে। এই অর্থে, প্রশ্নপত্র ফাঁসকে নিছক ঘোটালা কিম্বা অপরাধগল্প হিসেবে দেখলে সর্পতে রজ্জুভ্রম হবে। পিছনে বৃহত্তর অর্থনীতির চক্কর আছে, এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ‘পরীক্ষা সৎভাবে নেওয়া হোক’, জরুরি দাবি। পরের প্রশ্নটাও একইরকম জরুরি। কোটি কোটি তরুণের ভবিষ্যৎ কেন কিছু পরীক্ষা, র‌্যাঙ্ক এবং অল্প কিছু আসনের মধ্যে আটকে থাকবে? প্রশ্ন থেকেই কর্মসংস্থানের প্রশ্নে পৌঁছনো যায়, সেখান থেকে অর্থনীতিতে। সম্ভবত এই জায়গাতেই পরীক্ষার্থী-কেন্দ্রিক আন্দোলন বৃহত্তর যুব আন্দোলনে বদলে যেতে পারে, সে রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়।

গোলমেলে প্রশ্ন তুলতেই হয়। নিট-সংকট এহেন রাজনৈতিক ক্ষোভে পরিণত হল কেন, কিভাবে?

অপরাধের ব্যাপকতা অন্যতম কারণ নিশ্চয়। নিটের সঙ্গে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িত, বিশেষভাবে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ভবিষ্যৎ-আকাঙ্ক্ষা এ পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত। পরীক্ষার্থীদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বেশি। নিট নিয়ে হইচইও। অথচ, সমসময়ে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় কত রকমের সংকটঃ হাজার হাজার সরকারি স্কুলে শিক্ষক নেই, দেশের অধিকাংশ স্কুলে পরিকাঠামো বলতে নেই, বিস্তীর্ণ আদিবাসী এলাকায় উচ্চশিক্ষা পৌঁছয়নি সেভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, ছাত্রাবাসের অভাব, বৃত্তির টাকা আটকে থাকছে। জাত, শ্রেণি, লিঙ্গ, ভাষা এবং অঞ্চলের ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষায় পৌঁছনোর সুযোগেও বিপুল ফারাক। সবকিছু নিয়েই কমবেশি ক্ষোভ আছে। আন্দোলনও আছে।

“
‘পরীক্ষা সৎভাবে নেওয়া হোক’, জরুরি দাবি। পরের প্রশ্নটাও একইরকম জরুরি। কোটি কোটি তরুণের ভবিষ্যৎ কেন কিছু পরীক্ষা, র‌্যাঙ্ক এবং অল্প কিছু আসনের মধ্যে আটকে থাকবে? প্রশ্ন থেকেই কর্মসংস্থানের প্রশ্নে পৌঁছনো যায়, সেখান থেকে অর্থনীতিতে। সম্ভবত এই জায়গাতেই পরীক্ষার্থী-কেন্দ্রিক আন্দোলন বৃহত্তর যুব আন্দোলনে বদলে যেতে পারে, সে রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়।

সব ক্ষোভ সমানভাবে দৃশ্য হয়ে ওঠে না, যন্তর-মন্তর পর্যন্ত পৌঁছয়ও না। সমাজের যে অংশ নিজের কথা বলার সুযোগ বেশি পায়, সংবাদমাধ্যমের নজর তার উপরে বেশি পড়ে। সমাজমাধ্যমে আলোড়ন তৈরি করার ক্ষমতাও এই অংশের বেশি। তাদের সংকট দ্রুত জাতীয় সংকট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, সমাজের প্রান্তিকতম অংশ বছরের পর বছর তীব্রতর শিক্ষাসংকটের মধ্যে থাকে, থেকেই যায়, অথচ চেনা রাজনৈতিক পরিসরে তারা সচরাচর ব্রাত্য। এদিক থেকে দেখলে, নিট আন্দোলনের সামনে নিজস্ব সামাজিক বলয়ের বাইরে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরীক্ষার্থীদের ক্ষোভ যদি স্বচ্ছ পরীক্ষার দাবিতেই আটকে থাকে, তা হলে গুরুত্বপূর্ণ দাবি আদায় করেও বৃহত্তর শিক্ষাসংকটকে দিব্যি অক্ষত রাখা সম্ভব। পরীক্ষার্থীর অধিকার থেকে ছাত্রের অধিকার, ছাত্রের অধিকার থেকে শিক্ষার অধিকার এবং সেখান থেকে সামাজিক অধিকারের প্রশ্নে পৌঁছতে পারলে আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র আমূল বদলে যেতে পারে। এই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে, বামপন্থী ছাত্র-যুব রাজনীতির সামনেও বড়সড় পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে।

নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক ভাষা বদলেছে। তারা মিম ব্যবহার করে, ব্যঙ্গ ব্যবহার করে, সামাজিক মাধ্যমে সংগঠিত হয়। তারা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের প্রতি সন্দিহান, নিজেদের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য বিষয়ে সচেতন। এদের ভাষ্যকে অগভীর বলে দূরে সরিয়ে দেওয়া সহজ। আন্দোলনকে তড়িঘড়ি চেনা রাজনৈতিক ভাষা এবং সংগঠনের ভিতরে টেনে আনার চেষ্টাও। দুই-ই সমস্যাজনক।

আন্দোলনকে ‘দখল’ করা বামপন্থার কাজ নয়। দূরে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে ‘রাজনৈতিকভাবে অপরিণত’ বলে বিদ্রূপ করলে তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হবে না। বেশি দরকারি, নিট প্রসঙ্গ থেকে শিক্ষা, বেকারি, অর্থনৈতিক নীতি এবং সেসঙ্গে শ্রেণি, জাত এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রসঙ্গে পৌঁছে যাওয়া, পরীক্ষাব্যবস্থার গলদের সঙ্গে সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বুনিয়াদি গলদের নিগুঢ় সম্পর্ককে দৃশ্যমান করে তোলা, সে কাজ প্রতিনিয়ত করে যাওয়া। একজন তরুণ পরীক্ষায় বাড়তি প্রস্তুতির সুযোগ না পেলে পিছিয়ে পড়ছে, কেন? সরকারি স্কুলে সমমানের শিক্ষা কেন পাচ্ছে না? সরকারি মেডিক্যাল আসনের জন্য এত মানুষ কেন লড়ছে? পড়াশোনা শেষ করেও চাকরি নিশ্চিত নয়, কেন?

পুরোনো, মৃতপ্রায় রাজনৈতিক স্লোগান নয়। ওপরের প্রশ্নগুচ্ছে এই প্রজন্মের প্রতিদিনের জীবন বিধৃত। সেই জীবনের ভিতরকার শ্রেণি, ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের সম্পর্কটা দেখতে, দেখাতে পারলে রাজনৈতিক সংলাপ তৈরি হতে পারে। স্লোগান মুখস্থ করিয়ে বিশেষ লাভ হবে বলে মনে হয় না।

আন্দোলন ও রাষ্ট্রঃ আন্দোলন থেকে শেখা

আন্দোলনের অন্য গুরুত্বপূর্ণ দিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ অপরাধ নয়। অবস্থান, স্লোগান, অনশন, সরকারের কাছে দাবি, গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ। আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশি চাপ, বলপ্রয়োগ, গ্রেপ্তার, মামলা ইত্যাদি নিছক আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন হয়ে থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন।

যন্তর-মন্তরের আন্দোলন বিজেপি সরকারকে যারপরনাই অসুবিধেয় ফেলছে। প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর কাছেও যথেষ্ট অস্বস্তির কারণ রয়েছে। আন্দোলনকারি তরুণদের একটা অংশ প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনাস্থা দেখিয়েছেন। এতদ্বারা প্রমাণিত হয় না, তাঁরা রাজনীতিবিরোধী। তাঁদের বহু প্রশ্নের (চাকরি কোথায়? পরীক্ষা নিরাপদ নয় কেন? সরকারি কলেজে আসন কম কেন? বাড়তি প্রস্তুতির সুযোগ না থাকলে প্রতিযোগিতায় টিঁকে থাকা কঠিন কেন? পরীক্ষা বাতিল হলে হারানো সময় এবং টাকার দায় কে নেবে) উত্তর না দিয়ে, স্রেফ বিজেপি-বিরোধী স্লোগানের জোরে এই তরুণদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা কঠিন। কোনো বিরোধী দল যদি আন্দোলনটাকে নিজের ছাত্র বা যুব শাখা গোছের করে ফেলতে চায়, আন্দোলনের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা যথেষ্ট। আন্দোলন এবং প্রতিষ্ঠিত বিরোধী রাজনীতির সম্পর্কটা সব মিলিয়ে গোলমেলে। দু'পক্ষেরই একে অন্যকে প্রয়োজন হতে পারে, পরস্পরকে নিয়ে সংশয়ের কারণও কম নেই।

বিরোধীরা স্বাভাবিকভাবেই এমন আন্দোলন চাইবে, যা সরকারকে দুর্বল করবে, জমে ওঠা ক্ষোভকে নির্বাচনী রাজনীতির দিকে নিয়ে যাবে। আন্দোলন যদি সেই সীমা না মানে? ক্ষোভ যদি শুধু বিজেপি-বিরোধিতায় আটকে না থেকে শিক্ষা, কাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং শেষ পর্যন্ত প্রচলিত বিরোধী রাজনীতিকেও প্রশ্ন করতে শুরু করে? দেশের রাজনৈতিক অঙ্কই বদলে যেতে পারে।

যন্তর-মন্তরের ভবিষ্যৎ শুধু সরকারের আচরণের উপর নির্ভর করছে না। বিরোধীরা আন্দোলনকে কীভাবে দেখছে, সিজেপি তাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাইছে, সবচেয়ে বড় কথা, প্রথম বার রাস্তায় নামলেন যে তরুণরা, তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতাকে কীভাবে বুঝছেন, তার উপরেও অনেককিছু নির্ভর করছে।

আন্দোলনের প্রধান সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে যে অংশের মধ্যে, এর আগে তাঁরা রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দেননি। যাঁরা প্রথম এমন আন্দোলনের মধ্যে থাকলেন, একসঙ্গে রাস্তায় নামলেন, অনভ্যস্তভাবে স্লোগান দিলেন, রাত জাগলেন, পুলিশের লাঠি খেলেন, এ সবকিছুর মধ্য দিয়ে তাঁরা সমষ্টিগত কাজের নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলেন। এবং, যে রাজনীতি এতদিন দূরবর্তী দ্বীপমাত্র ছিল, সরাসরি সেই রাজনীতির গর্ভে ঢুকে পড়লেন।

অভিজ্ঞতা অমূল্য। প্রথম বার নিজের চোখের সামনে দেখা পুলিশ কিভাবে কথা বলে, প্রশাসন কিভাবে সময় নেয়, সংবাদমাধ্যম কিভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে একই ঘটনাকে সম্পূর্ণ অন্যভাবে দেখায়। বিরোধী নেতা কখন, কী উদ্দেশ্যে পাশে দাঁড়ান, কখন তাঁর নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ সামনে চলে আসে, পুরোটাই চোখের সামনে ঘটছে। পাশের অচেনা মানুষটাও যে একই কারণে আন্দোলিত হচ্ছেন, রেগে গেছেন, পথে নেমেছেন, এ আবিষ্কারও নতুন। এমন অভিজ্ঞতা আগে হয়নি।

সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক শিক্ষা। পাঠ্যবইয়ের, সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ দেখে পাওয়া শিক্ষা নয়। সরাসরি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া। এ শিক্ষার তুলনা হয় না। আজ যে তরুণ নিট-এর জন্য রাস্তায় নেমেছেন, আগামী বছর হয়তো অন্য কোনও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। আন্দোলনে ফিরে আসা হয়তো হবে না। এমনও হতে পারে, প্রথমবার রাস্তায় নেমেই তিনি বুঝে নিচ্ছেন, প্রশ্নটা শুধু নিট-এর নয়। পরীক্ষার সঙ্গে সরকারি শিক্ষা, শিক্ষার সঙ্গে পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষমতা, জড়িত। চাকরি, রাষ্ট্রের নীতি, শ্রেণি, জাত, অঞ্চল, সবই কোনও না কোনওভাবে জড়িয়ে। এই অভিজ্ঞতার রাজনৈতিক সম্ভাবনা সবচাইতে বেশি। আন্দোলন কতজনকে রাস্তায় আনল, তার পাশাপাশি কতজনকে প্রথম বার নিজের জীবন, নিজের সমস্যা এবং চারপাশের ব্যবস্থাটাকে রাজনৈতিকভাবে দেখতে শেখাল, সেটাও তার সাফল্যের নিরিখ, হয়তো বড় নিরিখ।

এই কারণেই যন্তর-মন্তরের আন্দোলনকে শুধু ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। যে তরুণ প্রথম বার নিজের চোখে দেখলেন, সংগঠিতভাবে রাষ্ট্রকে চাপে ফেলা যায়, দাবি আদায় করা যায়, দানবীয় বলে মনে হওয়া সরকারকেও কখনো কখনো পিছু হটতে হয়, সে অভিজ্ঞতাটা সঙ্গে থেকে গেল।

রাজনীতিতে এই স্মৃতির দাম নেহাত কম নয়।

“
বিরোধীরা স্বাভাবিকভাবেই এমন আন্দোলন চাইবে, যা সরকারকে দুর্বল করবে, জমে ওঠা ক্ষোভকে নির্বাচনী রাজনীতির দিকে নিয়ে যাবে। আন্দোলন যদি সেই সীমা না মানে? ক্ষোভ যদি শুধু বিজেপি-বিরোধিতায় আটকে না থেকে শিক্ষা, কাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং শেষ পর্যন্ত প্রচলিত বিরোধী রাজনীতিকেও প্রশ্ন করতে শুরু করে? দেশের রাজনৈতিক অঙ্কই বদলে যেতে পারে।

আন্দোলনের পর কী?

আরব বসন্তের বহু দেশ শেষ পর্যন্ত উন্নততর গণতন্ত্রে পৌঁছয়নি। মিশরে হোসনি মুবারকের দীর্ঘ শাসনের পতনের পরে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন মুসলিম ব্রাদারহুড-সমর্থিত মহম্মদ মোরসি। পরের ইতিহাস আরো গোলমেলে। সামরিক অভ্যুত্থানে মোরসি ক্ষমতাচ্যুত হলেন, শেষ পর্যন্ত আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির স্বৈরাচারী কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে চলে গেল দেশ। টিউনিসিয়া, সিরিয়া, লেবানন, কোথাও আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রমুখী শক্তি ক্ষমতায় এল না। অন্যত্র, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট তার বিশ্বব্যাপী প্রভাব, আন্দোলনের নতুন ভাষা, প্রতীক এবং বিপুল রাজনৈতিক অভিঘাত সত্ত্বেও রাষ্ট্রক্ষমতার কোনও স্থায়ী পুনর্গঠন ঘটাতে পারেনি। ইউরোপ থেকে আরব দুনিয়া হয়ে লাতিন আমেরিকা, গত দেড় দশকের এমন বহু আন্দোলনের শুরুতে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সম্ভাবনা এবং শেষের রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মধ্যে ফারাক যোজনব্যপী।

ভিনসেন্ট বেভিন্সের কথা এসেছে। তাঁর মূল প্রশ্নও এখানে। রাস্তায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি থেকে রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হতে পারে, সরকার পড়ে যেতে পারে, পুরনো বন্দোবস্ত মুহূর্তের মধ্যে বাতিল হয়ে যেতে পারে। সে শক্তির ভবিষ্যৎ নিজে থেকে নির্ধারিত হয় না। আন্দোলন কী চায়, তার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে আন্দোলনের পরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতা বা রাজনৈতিক পরিসর কে বা কারা দখল করছে।

এই ইতিহাস মাথায় রেখেও দিল্লির সাম্প্রতিক ভিড়কে অন্যভাবে দেখতে হয়। আলাদা করতে হয়। আন্দোলন সরাসরি প্রায়-ফ্যাসিবাদি রাষ্ট্র এবং শাসকশক্তির দিকে আঙুল তুলছে। প্রশ্ন করছে, শাসকের কর্তৃত্বকে বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে অস্বীকার করছে, তাকে দর-কষাকষিতে নামাচ্ছে এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে পিছু হটতেও বাধ্য করছে। আন্দোলন সম্ভাবনামুখর, তার মধ্যে অসংখ্য নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা জন্ম নিচ্ছে। নিচ্ছে বলেই আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিণতি আনন্দময় হবে, বলা যায় না। সুতরাং, ভিড় দেখে স্বপ্নাবিষ্ট হওয়া নয়। তথাপি, ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলন, জনজোয়ার নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। ইতিহাস যে ভয় মনের গভীরে ঢুকিয়ে দিয়েছে, তা নাকচ করে ফের স্বপ্ন দেখার সাহসও জোগায়।