অগোছালো শহরের মানুষ: কলকাতার হকার আন্দোলন, রাষ্ট্র ও জীবিকার রাজনীতি: প্রথম পর্ব
অবশ্যই হাঁটার জন্য।
কিন্তু হকারদের নিয়ে আমাদের আলোচনা যদি এই প্রশ্নেই শুরু হয়ে শেষ হয়ে যায়, তাহলে আমরা আসলে কলকাতার হকারদের বুঝতে পারব না। বরং কলকাতা শহরটাকেই বুঝতে পারব না। কারণ এই শহর যতটা তার পরিকল্পিত রাস্তা, উড়ালপুল, বাজার, বাড়ি, অফিস, পার্ক, রেললাইন এবং সরকারি দপ্তরের শহর, ততটাই তার ফুটপাত, খোলা মাঠ, বস্তি, রেললাইনের ধার, অস্থায়ী বাজার, চায়ের দোকান, রিকশা, ঠেলাগাড়ি এবং ছোট ছোট মানুষের জীবিকার শহর।
আমরা যাকে খুব সহজে ‘অগোছালো’ বলি, তার মধ্যেও একটা গভীর সামাজিক যুক্তি আছে।
মানুষ যেখানে ক্রেতা পায়, সেখানে বসে। যেখানে সস্তায় পণ্য পাওয়া যায়, সেখানে বাজার তৈরি হয়। যেখানে থাকার জায়গা পায়, সেখানে বসতি তৈরি করে। যেখানে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সেখানে চলে যায়। যেখানে অন্য মানুষের সাহায্য পায়, সেখানে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করে। রাষ্ট্রের পরিকল্পনা অনেক সময় এই জীবনকে আগে থেকে তৈরি করে না। মানুষ নিজের প্রয়োজনেই সেই পরিকল্পনার ফাঁক পূরণ করে।
তাই হকারকে শুধুমাত্র ফুটপাতের ওপর বসে থাকা একজন বিক্রেতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। হকার আসলে একটি বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার দৃশ্যমান অংশ। তার পেছনে আছে ছোট উৎপাদক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহণ শ্রমিক, বস্তিবাসী, দৈনিক মজুর, নিম্নবিত্ত ক্রেতা এবং শহরের সেই অসংখ্য মানুষ, যাদের জীবিকা কখনও কোনও চকচকে অফিসে বসে তৈরি হয় না।
হকারকে সরিয়ে দেওয়া তাই কেবল একজন বিক্রেতাকে একটা জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়। অনেক সময় তার সঙ্গে একটি গোটা অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে যায়।
এই কথাটা বুঝতে হলে আমাদের কলকাতার একটু পুরনো সময়ে ফিরে যেতে হবে।

আমার ছোটবেলার বাজার
আমি যে কলকাতাকে চিনেছি, সেখানে বাজার মানেই পাকা মার্কেট ছিল না।
বিশেষ করে উদ্বাস্তু-অধ্যুষিত অঞ্চল, দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন এলাকা, শহরতলি কিংবা উত্তর শহরতলির অনেক জায়গায় বাজার বসত রাস্তায়, খোলা মাঠে, ফুটপাতে। সকালে সেখানে বাজার বসেছে। কয়েক ঘণ্টা পরে বাজার উঠে গেছে। বিকেলে হয়তো সেখানে আর বাজারের কোনও চিহ্নই নেই। মাঠ পরিষ্কার। ছেলেরা সেখানে খেলতে নেমেছে। পরদিন আবার অন্য সময়ে বাজার বসেছে।
তখন কেউ খুব একটা অবাক হয়ে ভাবত না, বাজার কেন এখানে বসছে। কারণ মানুষকে বাজার করতে হবে। মানুষকে খাবার কিনতে হবে। বিক্রেতাকে বিক্রি করতে হবে। এই দুটো প্রয়োজনের মধ্যে একটা জায়গা তৈরি হয়ে যেত।
উত্তর কলকাতার পুরনো বাজারগুলির একটা আলাদা ইতিহাস আছে। সেখানে পরিকল্পিত বাজার ছিল। পাকা বাজার ছিল। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাজার তৈরি হয়েছে। নির্দিষ্ট জমি ছিল। কাঠামো ছিল।
কিন্তু কলকাতার সব অংশ তো একইভাবে তৈরি হয়নি।
দেশভাগের পরে যে বিশাল উদ্বাস্তু জনপদ তৈরি হল, সেখানে পরিকল্পিত বাজারের পরিকাঠামো কোথায়? দক্ষিণ কলকাতার অনেক নতুন বসতি, উত্তর শহরতলি, বিটি রোড ধরে ছড়িয়ে পড়া অঞ্চল, শিয়ালদা থেকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়া জনবসতি, হাওড়ার দিকে রেললাইনের আশেপাশের অঞ্চল, নদী পেরিয়ে গড়ে ওঠা নতুন বসতি, এসব জায়গায় মানুষ নিজেরাই জীবনের প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার তৈরি করেছে।
সকালবেলা বাজার বসেছে। বিকেলবেলা সেই জায়গা অন্য কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। কোথাও মাঠে বাজার বসেছে, বাজার উঠে গেলে সেখানে ছেলেরা খেলেছে। শহর যেন একসঙ্গে অনেক কাজ করেছে।
আজকের চোখে এই ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তখন সেটা ছিল জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ।
আর একটা বিষয় এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বাজার শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। সেখানে সামাজিক সম্পর্কও তৈরি হত।
আমি বাজারে গেলাম। মাছ কিনলাম। মাছওয়ালাকে চিনি। তাকে নাম ধরে ডাকি। সে আমাকে চেনে। অনেকদিন বাজারে যাইনি। সে জিজ্ঞেস করে, “অনেকদিন আসোনি তো, কী হয়েছিল?”
আমি বলি, “শরীরটা ভালো ছিল না।”
সে হয়তো বলে, “এবার ভালো মাছ এসেছে।”
এটা অর্থনীতির বইয়ের ভাষায় বোঝানো কঠিন। সেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্পর্ককে চাহিদা ও জোগানের সম্পর্ক বলা যায়। কিন্তু শহরের বাস্তব জীবনে এর মধ্যে আরও কিছু ছিল।
ছিল পরিচয়।
ছিল আস্থা।
ছিল অভ্যাস।
ছিল পাড়ার সম্পর্ক।
ছিল খোঁজখবর নেওয়া।
একজন বিক্রেতা জানত, কোন বাড়িতে কে থাকে। একজন ক্রেতা জানত, কোন বিক্রেতার কাছ থেকে ভালো জিনিস পাওয়া যায়। কেউ কয়েকদিন না এলে তার খবর নেওয়া হত।
অর্থাৎ বাজার ছিল একটা সামাজিক প্রতিষ্ঠানও।
এই সম্পর্কগুলোকে কেবল টাকা দিয়ে বোঝা যায় না।

উদ্বাস্তু শহরের অর্থনীতি
কলকাতার হকার অর্থনীতির ইতিহাস দেশভাগের ইতিহাস থেকে আলাদা নয়।
১৯৪৭-এর দেশভাগের পরে পূর্ববঙ্গ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ পশ্চিমবঙ্গে এসে পড়লেন। তাঁদের সবাইকে রাষ্ট্র চাকরি দিতে পারেনি। সবাইকে পাকা বাড়ি দিতে পারেনি। সবাইকে দোকান দিতে পারেনি। পরিকল্পিত বাজার তৈরি করে প্রত্যেককে সেখানে বসাতে পারেনি।
তাহলে মানুষ কী করল?
নিজেদের রাস্তা নিজেরাই তৈরি করল।
কেউ ছোট ব্যবসা শুরু করলেন। কেউ হকার হলেন। কেউ রিকশা চালালেন। কেউ কারখানায় ঢুকলেন। কেউ পরিবহণ ব্যবস্থায় কাজ পেলেন। কেউ বাড়িতে ছোট উৎপাদন শুরু করলেন। কেউ ফুটপাতে বসে পণ্য বিক্রি করলেন।
উদ্বাস্তু মহিলাদের জন্য হরিণঘাটার দুধ বিক্রির স্টলগুলির কথা মনে পড়ে। পুরনো কলকাতায় এই দুধের স্টলগুলির অনেকটাই ফুটপাতে বসত। উদ্বাস্তু কলোনির মহিলারা সেখানে কাজ করতেন।
এই ঘটনাটাকে শুধু দুধ বিক্রির ইতিহাস হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
এর মধ্যে উদ্বাস্তু নারীর সামাজিক পুনর্গঠনের ইতিহাস রয়েছে।
পূর্ববঙ্গের যে নারী হয়তো অন্য ধরনের সামাজিক জীবনে ছিলেন, দেশভাগের পরে তাঁকে নতুন শহরে এসে জীবিকা খুঁজতে হয়েছে। রাষ্ট্র তাঁকে কাজের একটা সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু সেই কাজের জায়গা ছিল ফুটপাত।
অর্থাৎ ফুটপাত এখানে শুধু ‘দখল করা সরকারি জমি’ নয়। রাষ্ট্রের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ইতিহাসেরও একটা অংশ।
একইভাবে সরকারি বাস ব্যবস্থার কথাও মনে পড়ে। উদ্বাস্তুদের একটা বড় অংশ পরিবহণ ব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছিলেন। চালক, কন্ডাক্টর, মেকানিক, বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে তাঁদের উপস্থিতি ছিল।
এখানে ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি এবং প্রশাসনকে আলাদা করে দেখা যায় না।
একটা মানুষের দেশভাগ হয়েছে।
সে কলকাতায় এসেছে।
সে নতুন বসতি তৈরি করেছে।
তার কাজ দরকার হয়েছে।
সে বাজার তৈরি করেছে।
তার জন্য পরিবহণ দরকার হয়েছে।
তার জন্য ফুটপাত দরকার হয়েছে।
তার জন্য স্কুল দরকার হয়েছে।
তার জন্য দোকান দরকার হয়েছে।
একটা সুতো আরেকটা সুতোর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
এই বুননের একটা সুতো কেটে দিলে গোটা কাপড়টাই কেঁপে ওঠে।
‘অগোছালো’ শব্দটির রাজনীতি
আজ আমরা খুব সহজে বলি, কলকাতা অগোছালো।
হকার আছে।
বস্তি আছে।
রাস্তার ওপর দোকান আছে।
রিকশা আছে।
ফুটপাতে মানুষ বসে আছে।
পার্কে মানুষ ঘুমায়।
রাস্তার পাশে চা বিক্রি হয়।
সবকিছু যেন একটা সমস্যা।
কিন্তু একটা প্রশ্ন করা দরকার।
অগোছালো কার চোখে?
একজন নগর পরিকল্পনাবিদের চোখে ফুটপাতের ওপর দশটা দোকান ‘encroachment’ হতে পারে। কিন্তু যে শ্রমিক প্রতিদিন সেই দোকান থেকে সস্তায় খাবার কিনে কাজে যায়, তার কাছে সেটা বাজার।
যে মহিলা ট্রেন ধরার আগে হকারের কাছ থেকে সবজি কিনে নেন, তার কাছে সেটা সুবিধা।
যে ছোট উৎপাদক বড় দোকানে পণ্য ঢোকাতে পারেন না, তার কাছে হকারটাই বাজার।
যে বস্তিবাসী কম দামে জামাকাপড়, সবজি, মাছ, রান্নার জিনিস কিনতে চান, তার কাছে হকারের বাজারটাই তার নাগালের বাজার।
অর্থাৎ ‘অগোছালো’ শব্দটির মধ্যে একটা শ্রেণিগত দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে।
কারও কাছে যা বিশৃঙ্খলা, অন্য কারও কাছে তা জীবনধারণের ব্যবস্থা।
এই পার্থক্যটাই আমাদের বুঝতে হবে।
শহর যখন পণ্য হয়ে ওঠে
একটা সময় শহরকে মূলত মানুষের বসবাসের জায়গা হিসেবে ভাবা হত।
তারপর ধীরে ধীরে শহরকে অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ল।
বিশ্বায়নের যুগে এই পরিবর্তন আরও শক্তিশালী হল।
ফুটপাত হয়ে উঠল ‘urban asset’।
রাস্তা হয়ে উঠল ‘infrastructure’।
পার্ক হয়ে উঠল ‘public property’।
বাজার হয়ে উঠল ‘commercial space’।
প্রতিটি জায়গার একটা নির্দিষ্ট মালিকানা, নির্দিষ্ট ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট নিয়ম তৈরি হতে থাকল।
জওহরলাল নেহরু ন্যাশনাল আরবান রিনিউয়াল মিশনের মতো নগর উন্নয়নের প্রকল্পগুলির সময় পরিকল্পিত, নিয়ন্ত্রিত, ‘আধুনিক’ শহরের ধারণা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।
শহরকে সুন্দর করতে হবে।
শহরকে আধুনিক করতে হবে।
শহরকে আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে।
শহরকে পরিষ্কার করতে হবে।
কথাগুলো শুনতে আপত্তিকর নয়। বরং খুব আকর্ষণীয়।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এই আধুনিক শহরে গরিব মানুষের জায়গা কোথায়?
শহরকে সুন্দর করতে গিয়ে যদি সেই মানুষটাকেই সরিয়ে দিতে হয়, যে শহরকে প্রতিদিন নিজের শ্রম দিয়ে চালায়, তাহলে সেই সৌন্দর্যের অর্থ কী?
বড় শপিং মল থাকবে, কিন্তু ফুটপাতের হকার থাকবে না কেন?
কর্পোরেট অফিস থাকবে, কিন্তু ছোট চায়ের দোকান থাকবে না কেন?
কোটি কোটি টাকার জমি থাকবে, কিন্তু একজন মানুষ তার ঠেলাগাড়ি নিয়ে দাঁড়ানোর জায়গা পাবে না কেন?
এখানে আধুনিকতার একটি নির্দিষ্ট ধারণা কাজ করে। দৃশ্যমান দারিদ্র্যকে শহরের ত্রুটি হিসেবে দেখা হয়।
দারিদ্র্য দূর করা হয় না। দরিদ্র মানুষকে দৃশ্যের বাইরে সরিয়ে দেওয়া হয়।

অপারেশন সানশাইন: একটি মোড়
কলকাতার হকার উচ্ছেদের ইতিহাসে ‘অপারেশন সানশাইন’ একটা বড় মোড়।
বামফ্রন্ট সরকারের আমলে এই উচ্ছেদ শহরের জনপরিসর, হকারদের অধিকার এবং নগর পরিকল্পনা নিয়ে বড় বিতর্ক তৈরি করেছিল।
বাম সরকারের এই ভূমিকার সমালোচনা অবশ্যই করা দরকার। হকারদের জীবিকার ওপর আঘাত, প্রশাসনিক শক্তির ব্যবহার এবং উচ্ছেদের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
কিন্তু ঘটনাটাকে শুধু একটা রাজনৈতিক দলের ভুল হিসেবে দেখলে আমরা একটা বড় পরিবর্তনকে দেখতে পাব না।
কারণ এর মধ্যে একটা ধারণাগত পরিবর্তনও ছিল।
শহরকে গুছিয়ে তুলতে হবে।
জনপরিসরকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
ফুটপাতকে নির্দিষ্ট ব্যবহারে সীমাবদ্ধ করতে হবে।
রাস্তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
পার্কের ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করতে হবে।
শহরের প্রতিটি জায়গাকে প্রশাসনিক নিয়মের মধ্যে আনতে হবে।
এখানেই হকার আন্দোলনের গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য।
এটা শুধু উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়াই নয়।
এটা শহর সম্পর্কে দুটি ভিন্ন ধারণার সংঘর্ষ।
একটি ধারণা বলে, শহরকে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে।
অন্যটি বলে, শহরের নিয়ম মানুষের জীবন থেকে তৈরি হয়।
পথ কি শুধু হাঁটার জন্য?
এই প্রশ্নটা শুনতে খুব সাধারণ।
কিন্তু কলকাতার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে এর উত্তর অনেক জটিল।
সত্তরের দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছিল, পথ শুধু চলাচলের জায়গা নয়।
পথে সভা হয়।
পথে মিছিল হয়।
পথে গান হয়।
পথে নাটক হয়।
পথে অবস্থান হয়।
পথে মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হয়।
পথ একটা সামাজিক ভূমি।
একসময় পথের ওপর নাটক করা সম্ভব ছিল। পথের ওপর গান করা সম্ভব ছিল। পথের ওপর সভা করা সম্ভব ছিল। মানুষের বিভিন্ন ব্যবহার একই জায়গায় পাশাপাশি থাকতে পারত।
তারপর ধীরে ধীরে বলা হতে লাগল, এখানে সভা করা যাবে না।
এখানে নাটক করা যাবে না।
এখানে বসা যাবে না।
এখানে বিক্রি করা যাবে না।
এখানে রাত কাটানো যাবে না।
এখানে দাঁড়ানো যাবে না।
অর্থাৎ যে জায়গা আগে নানা ধরনের সামাজিক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত ছিল, সেটা ক্রমশ নির্দিষ্ট ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে উঠল।
এর প্রভাব শুধু সংস্কৃতিতে পড়ল না।
অর্থনীতিতেও পড়ল।
শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনের ওপর পড়ল।
হকারকে সরালে কে ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
হকার উচ্ছেদের সময় আমরা সাধারণত একজন মানুষকে দেখি।
সে তার দোকান হারাচ্ছে।
কিন্তু তার পেছনে আরও অনেক মানুষ থাকে।
ধরা যাক, একজন হকার জামাকাপড় বিক্রি করেন।
পণ্যটা কোথা থেকে এল?
হয়তো কোনও ছোট উৎপাদক বানিয়েছেন।
হয়তো কোনও ক্ষুদ্র কারখানায় তৈরি হয়েছে।
হয়তো বাড়িতে তৈরি হয়েছে।
তারপর সেটা হকারের কাছে এসেছে।
হকার সেটা বিক্রি করেছেন।
কে কিনল?
হয়তো বস্তির একজন শ্রমিক।
হয়তো একজন রিকশাচালক।
হয়তো নিম্নবিত্ত পরিবারের একজন মহিলা।
হয়তো একজন ছাত্র।
এইভাবে একটা অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
গরিব উৎপাদক।
গরিব বিক্রেতা।
গরিব ক্রেতা।
এই তিনজনের মধ্যে সম্পর্কটা ভেঙে গেলে ক্ষতি শুধু হকারের হয় না।
উৎপাদক তার বাজার হারায়।
হকার তার বিক্রির জায়গা হারায়।
ক্রেতা তার সস্তা বাজার হারায়।
এ কারণেই হকার উচ্ছেদ একটা বড় অর্থনীতিতে আঘাত করতে পারে।
হকার ও বস্তিবাসী
হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বস্তিবাসীদের উপস্থিতির একটা গভীর অর্থ ছিল।
কারণ তারা জানত, হকারের কাছ থেকেই তারা সস্তায় জিনিস পায়।
একদিকে বস্তি উচ্ছেদ হলে হকাররা সেখানে যায়।
অন্যদিকে হকার উচ্ছেদ হলে বস্তিবাসীরা প্রতিবাদে আসে।
এই সম্পর্কটা খুব সহজ।
যে মানুষ কম আয় করেন, তিনি এমন বাজার খুঁজবেন যেখানে তার সামর্থ্যের মধ্যে জিনিস পাওয়া যায়।
হকার সেই বাজার তৈরি করেন।
তাই হকার এবং বস্তিবাসীর সম্পর্ক শুধু প্রতিবেশী সম্পর্ক নয়।
এটা অর্থনৈতিক সম্পর্ক।
বস্তিবাসী হকারের ক্রেতা।
হকার বস্তিবাসীর বিক্রেতা।
একজনের জীবিকা অন্যজনের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
এই সম্পর্ক ভাঙলে দুজনেই ক্ষতিগ্রস্ত হন।
রিকশাচালকদের সমর্থন কেন এসেছিল
হকার আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রিকশাচালকদের সমর্থন।
কেন?
কারণ রিকশাচালকরা বুঝেছিলেন, আজ হকারকে সরানো হচ্ছে, কাল তাদেরও সরানো হতে পারে।
ফুটপাত বন্ধ হচ্ছে।
পার্ক বন্ধ হচ্ছে।
রাস্তায় দাঁড়ানো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
সাইকেলের জায়গা কমছে।
শহরের প্রতিটি জায়গা নির্দিষ্ট ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
হাতে-টানা রিকশার চালকদের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে।
তাঁদের মধ্যে অনেকেই রাতে ফুটপাতে বা পার্কের আশেপাশে ঘুমাতেন। পার্কে রাতের বেলা তালা পড়তে শুরু করল। যুক্তি ছিল, পার্কে অসামাজিক কাজ হয়।
কিন্তু ‘অসামাজিক কাজ’ বলতে কী বোঝানো হত?
অনেক সময় সেখানে মানুষ খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ত।
যাদের অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, তাদের জন্য সেই পার্ক ছিল রাত কাটানোর জায়গা।
রাষ্ট্রের চোখে পার্ক সরকারি সম্পত্তি।
মানুষের চোখে পার্ক ছিল পাড়ার একটা ভূমি।
এই দুই ধারণার সংঘর্ষ এখানেও।
হকার বুঝলেন, রিকশাচালকও বুঝলেন।
আজ যদি ফুটপাত থেকে হকার যায়, কাল রাস্তা থেকে রিকশাচালক যাবে।
আজ পার্কে রাত কাটানো নিষিদ্ধ, কাল হয়তো অন্য কোনও জনপরিসরও নিষিদ্ধ হবে।
এইভাবে বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎকে অন্যের বর্তমানের মধ্যে দেখতে শুরু করেছিলেন।
‘আমি নাগরিক নই?’
হকার আন্দোলনের অভিজ্ঞতার আরও গভীরে গেলে আমরা এমন কিছু মানুষের কাছে পৌঁছাই, যাদের নাগরিকত্বের বাস্তব প্রমাণই নেই।
কালীঘাটের ফুটপাতের মানুষদের নিয়ে কাজ করার সময় এমন অভিজ্ঞতা সামনে এসেছিল।
ফুটপাতে থাকা মানুষের জন্মপ্রমাণপত্র নেই।
নথি নেই।
ঠিকানা নেই।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, সে কি নাগরিক?
আইনের কাগজে হয়তো সে অনুপস্থিত।
কিন্তু সে তো সেখানে বাস করছে।
সে কাজ করছে।
সে শহরে শ্রম দিচ্ছে।
সে বাজার করছে।
সে কর দিক বা না-ই দিক, রাষ্ট্রের নানা পরিষেবা ব্যবহার করছে।
তার সন্তান জন্মাচ্ছে।
তবু তার অস্তিত্বের সরকারি প্রমাণ নেই।
এখানে হকার একটা প্রতীক হয়ে ওঠে।
প্রশ্নটা শুধু হকারের নয়।
প্রশ্নটা সেই বিপুল সংখ্যক মানুষের, যারা সরকারি নথি, আইনি কাঠামো, পরিষেবা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার বাইরে বা প্রান্তে বেঁচে থাকে।
তাদের জীবন আছে, কিন্তু কাগজে তারা নেই।
তাদের শ্রম আছে, কিন্তু স্বীকৃতি নেই।
তাদের সামাজিক সম্পর্ক আছে, কিন্তু রাষ্ট্রের নথিতে তার অস্তিত্ব নেই।
এই মানুষগুলিই যখন রাস্তায় নামে, তখন রাষ্ট্রের কাছে একটা নতুন ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়।
অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি আসলে প্রান্তিক নয়
আমরা ‘informal economy’ বা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি শব্দটা এমনভাবে ব্যবহার করি, যেন সেটা মূল অর্থনীতির বাইরে একটা ছোট অংশ।
তৃতীয় বিশ্বের শহরে ব্যাপারটা অনেক বেশি জটিল।
এখানে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি প্রায়ই মূল অর্থনীতির বিশাল অংশ।
যে মানুষ রাস্তায় চা বিক্রি করেন, তিনি অনানুষ্ঠানিক।
যে মহিলা বাড়িতে খাবার তৈরি করে বিক্রি করেন, তিনিও অনানুষ্ঠানিক।
যে ছোট কারিগর বাড়িতে পণ্য তৈরি করেন, তিনিও অনানুষ্ঠানিক।
যে হকার সেই পণ্য নিয়ে বাজারে যান, তিনিও অনানুষ্ঠানিক।
যে বস্তিবাসী সেই পণ্য কেনেন, তিনিও সেই অর্থনীতির অংশ।
অর্থাৎ এটা বিচ্ছিন্ন কোনও দ্বীপ নয়।
এটা শহরের একটা বিশাল সামাজিক জাল।
এই জালকে শুধু ‘আইনের বাইরে থাকা মানুষ’ বলে দেখলে তার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বোঝা যায় না।

‘দশটা থেকে পাঁচটা’ দিয়ে এই জীবন বোঝা যায় না
অনানুষ্ঠানিক জীবনের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল তার সময়ের নমনীয়তা।
একজন হকার হয়তো রাত ন’টা পর্যন্ত বসেন।
কারণ তখন ক্রেতা আসে।
আরেকজন ভোরবেলা কাজ শুরু করেন।
কারণ তখন বাজারের সময়।
কেউ দুপুরে কাজ করেন।
কেউ সন্ধ্যায়।
কেউ দিনে একাধিক কাজ করেন।
কাজের জায়গা বদলায়।
কাজের সময় বদলায়।
আয়ের উৎস বদলায়।
কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়ম অনেক সময় এই জীবনকে একটা নির্দিষ্ট ছকে আনতে চায়।
নির্দিষ্ট সময়।
নির্দিষ্ট দোকান।
নির্দিষ্ট জায়গা।
নির্দিষ্ট লাইসেন্স।
নির্দিষ্ট নথি।
নির্দিষ্ট ব্যবহার।
এখানেই একটা মৌলিক সংঘাত তৈরি হয়।
রাষ্ট্র বলে, নিয়ম না থাকলে শহর চলবে না।
মানুষ বলে, এই নিয়মে আমার জীবন চলবে না।
দুটো কথার মধ্যেই সত্য আছে।
কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্য সমান নয়।
নিয়ম বানানোর ক্ষমতা রাষ্ট্রের।
নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা গরিবের।
আইন কি সবসময় মুক্তি দেয়?
হকারদের জন্য আইন দরকার।
অবশ্যই দরকার।
উচ্ছেদের হাত থেকে সুরক্ষা দরকার। প্রশাসনিক হয়রানি থেকে সুরক্ষা দরকার। জীবিকার অধিকার দরকার। নির্দিষ্ট জায়গা দরকার। নিরাপত্তা দরকার।
কিন্তু আইন মানেই মুক্তি নয়।
প্রশ্ন হল, আইন কে বানাচ্ছে?
কার সঙ্গে কথা বলে বানাচ্ছে?
কোন জীবনকে সামনে রেখে বানাচ্ছে?
যে মানুষ এতদিন অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে নিজের কাজ চালিয়েছে, তাকে আইনের মধ্যে আনা মানেই তার ক্ষমতায়ন নয়।
কখনও আইন তাকে আরও বেশি প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল করে।
তখন প্রশ্ন শুরু হয়,
লাইসেন্স আছে?
নথি আছে?
অনুমতি আছে?
নির্দিষ্ট জায়গায় বসেছ?
নির্দিষ্ট সময়ে বসেছ?
নিয়ম মেনেছ?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে না পারলেই তার জীবিকা বিপন্ন।
তাই আইন শুধু লেখা থাকলেই হবে না।
আইনের চরিত্র বুঝতে হবে।
আন্দোলন শুধু মিছিল নয়
হকার আন্দোলনের ইতিহাসে এই কারণেই ড্রাফট, দাবিপত্র, মিটিং, আলোচনা, প্রশাসনের সঙ্গে দরকষাকষির গুরুত্ব আছে।
আন্দোলন শুধু রাস্তায় মিছিল নয়।
আন্দোলন কখনও একটা খসড়া তৈরি করা।
তারপর সেটা প্রশাসনের কাছে নিয়ে যাওয়া।
আলোচনা করা।
বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া।
কখনও আংশিক স্বীকৃতি পাওয়া।
আবার সেই স্বীকৃতি হারিয়ে যাওয়া।
এইসব ছোট ছোট প্রক্রিয়ার মধ্যে একটা আন্দোলন তার রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করে।
ল্যান্সডাউন মার্কেটের ঘটনাটা এই দিক থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
হকারদের সংগঠন নিলামে অংশ নিয়ে বাজারটাকেই কিনে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
এই ঘটনাটা শুনলে প্রথমে অদ্ভুত লাগে।
যে মানুষদের সাধারণত বাজারের ‘দখলদার’ বলা হয়, তারা বলছেন, বাজার যদি সম্পত্তি হয়, তাহলে আমরা সেই সম্পত্তির জন্য বিড করব।
এটা শুধু বাজার কেনার চেষ্টা ছিল না।
এটা রাষ্ট্রের যুক্তির বিরুদ্ধে একটা পাল্টা যুক্তি।
তোমরা বলছ, বাজার তোমার নয়।
ঠিক আছে।
তাহলে আমরা বাজার কিনতে চাই।
অর্থাৎ আন্দোলনকারী রাষ্ট্রের ভাষাকেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।
এই ধরনের ঘটনা দেখায়, হকার আন্দোলন কেবল প্রতিরোধের আন্দোলন নয়। এর মধ্যে রাজনৈতিক কল্পনাও আছে।
(চলবে...)
(আলোকচিত্র: কুশল কর)
