আজকের পৃথিবী ও পুঁজির রাজনীতি: দ্বিতীয় পর্ব

লেখক ও. পি. রানা · 20 Sep 2026, 12:01 PM
আজকের পৃথিবী ও পুঁজির রাজনীতি: দ্বিতীয় পর্ব

(মূল ইংরেজি রচনা অবলম্বনে বাংলা ভাষান্তর)

মার্কিন নীতি ও কার্যকলাপের ধ্বংসাত্মক ফল

পঞ্চাশের দশকেও, মার্কিনি নীতি ও কর্মকাণ্ড ইরানের অন্যতম জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দুর্বল করে, শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করে ফেলতে সাহায্য করেছিল। প্যালেস্তিনীয় মানুষের বুকে যেমন স্বাধীন প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের ‘পরাজিত স্বপ্ন’ থেকে গেছে, ইরানের মানুষের কাছেও ১৯৭৯-এর বিপ্লবের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত—তার সঙ্গে জুড়ে আছে আরো পুরোনো হতাশা, ১৯০৫-১১-র সাংবিধানিক বিপ্লব এবং ১৯৫৩-তে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেঘকে উৎখাত। ১৯৭৯-এর বিপ্লবের ব্যর্থতার শিকড়ও ১৯৫৩-র কু দেতা-তে খোঁজা যায়—মোসাদ্দেঘের বিরুদ্ধে ব্রিটেন ও আমেরিকার যৌথ ষড়যন্ত্র।

তাঁকে সরানোর জন্য শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির লাগাতার চেষ্টা সত্ত্বেও, ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত মোসাদ্দেঘ ইরানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সামরিক অভ্যুথ্বানের আগে পর্যন্ত তিনি একগুচ্ছ সামাজিক-রাজনৈতিক সংস্কার করেছিলেন—সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা, ভূমিসংস্কার, ধনীদের ওপর বেশি কর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ইরানের তেলশিল্প জাতীয়করণ। ব্রিটিশ সরকার তেলশিল্প জাতীয়করণের তীব্র বিরোধিতা করে। তাদের দাবি, ১৯১৩ থেকে অ্যাংলো-পার্শিয়ান অয়েল কোম্পানি—পরবর্তীকালের ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম—এই শিল্প গড়ে তুলেছে, অতএব তাতে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ থাকা উচিত। মোসাদ্দেঘ সরাসরি দাবি খারিজ করেন। তাঁকে উৎখাত করার পরে রেজা পাহলভি নিজের ক্ষমতা পোক্ত করেন এবং ১৯৫৪-তে ব্রিটেনের সঙ্গে ‘কনসোর্টিয়াম অ্যাগ্রিমেন্ট’ করেন; তাতে ইরানের তেল উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ কার্যত ইরান ও বিদেশি কর্পোরেশনের এক কনসোর্টিয়াম-এর মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। আশ্চর্য নয় যে ১৯৭৯-এর বিপ্লবে অংশ নেওয়া বহু মানুষ, এমনকি নেতৃত্বের অনেকে, মোসাদ্দেঘের ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক সংস্কার ফিরিয়ে আনার দাবি করেছিলেন। ১৯৭৯-এ ক্ষমতা নেওয়া ধর্মতান্ত্রিক শাসন সমাজের ওপর দখল বাড়ালে সে দাবি সোজাসুজি বাতিল হয়ে যায়।

আজকের ইরানি সমাজ গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে—ব্যাপক দুর্নীতি, শ্রেণিবৈষম্য, পরিবার-ভাঙন, বেকারি, সামাজিক অন্যায়, আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা, লিঙ্গবৈষম্য—এমন ছবি বারবার সামনে আসে। তথাপি, অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে বা অন্যায় হলে মানুষ রাস্তায় নামেন। ধর্মগুরু শাসকেরা সাম্প্রতিক গণআন্দোলনকে নির্মমভাবে দমন করবার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে, আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানে হামলা চালায়। তার পর থেকে, শাসকরা বিরোধীদের ওপর দমন আরও বাড়িয়েছে।

দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে আমেরিকা একের পর এক দেশে স্বৈরাচারি শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের আন্দোলন বানচাল করেছে, একনায়কদের সাহায্য করেছে। শুরুর দিককার মনরো ডকট্রিন (1823), যেখানে পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় শক্তির নতুন উপনিবেশ বা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল। পরে রুজভেল্ট কোরোলারি (1904) আমেরিকার হস্তক্ষেপের অধিকার দাবি করে; ভবিষ্যৎ লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্যের যুক্তি সেখানেই আরো পাকা হয়। বাণিজ্যপথ দখলে রাখতে আমেরিকা মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানে বারম্বার ঢুকেছে—কলাযুদ্ধ বা 'বানানা ওয়ার্স’ ও ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’ (১৮৯৮ থেকে ১৯৩০-এর দশক)। ১৯০৩-এ পানামাকে কলম্বিয়া থেকে আলাদা করে ফেলার জন্য পানামা খাল তৈরি ও পরে তা নিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। হাইতি (১৯১৫-৩৪), নিকারাগুয়া (১৯১২-৩৩), ডমিনিকান রিপাবলিক (১৯১৬-২২) দখল করে তাদের অর্থব্যবস্থা কব্জা করা হয়েছে মার্কিন বাণিজ্যপথ সুরক্ষিত করার নামে। এহেন হস্তক্ষেপের প্রধান উদ্দেশ্যের অন্যতম ছিল মার্কিন কর্পোরেশনের বিনিয়োগ—বিশেষত ফল ও ব্যাঙ্কিং শিল্পে—রক্ষা করা, এবং মার্কিন পুঁজির বিস্তার।

“
আজকের ইরানি সমাজ গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে—ব্যাপক দুর্নীতি, শ্রেণিবৈষম্য, পরিবার-ভাঙন, বেকারি, সামাজিক অন্যায়, আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা, লিঙ্গবৈষম্য—এমন ছবি বারবার সামনে আসে। তথাপি, অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে বা অন্যায় হলে মানুষ রাস্তায় নামেন। ধর্মগুরু শাসকেরা সাম্প্রতিক গণআন্দোলনকে নির্মমভাবে দমন করবার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে, আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানে হামলা চালায়।

যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে বাজার ও পুঁজি বাড়ানোর মার্কিন কৌশল কোরিয়া যুদ্ধের (১৯৫০-৫৩) প্রায় অর্ধশতাব্দী আগেই ফিলিপিন্স-এ যুদ্ধে (১৮৯৯-১৯০২)-এ দেখা যায়। স্পেনের কাছ থেকে দ্বীপপুঞ্জ ‘নিয়ে’ নেবার পরে(জাতীয়তাবাদী নেতা এমিলিও আগুইনালদো-র প্রথম ফিলিপিন প্রজাতন্ত্রকে অগ্রাহ্য করে ১৮৯৮-এ কুড়ি মিলিয়ন ডলারে দেশটিকে স্পেন-এর কাছ থেকে ‘কেনা’ হয়), আমেরিকা যুদ্ধে নামে। ১৮৯৯-এর ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধে আমেরিকানরা গ্রাম ও ফসল পুড়িয়েছে, বন্দিদের নির্যাতন করেছে, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প-এ ঠেলে দিয়েছে, স্থানীয় কর্তাদের সঙ্গে নিয়ে সরকার বানিয়ে জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ ভেঙেছে। বাজার ও পুঁজি বাড়ানোর মূল মার্কিনি কৌশল বদলায়নি; সময় ও পরিস্থিতি বুঝে কায়দা বদলেছে।

পশ্চিম এশিয়ায় এখন সে কায়দাবদলই দেখা যাচ্ছে, আপাতত তা খুব কাজ করছে বলেও মনে হয় না। আগস্টের মাঝামাঝি ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করার চেষ্টা ফের থমকে গেলে ট্রাম্প হুমকি দেন, হরমুজ প্রণালী-কে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড’ বলে ঘোষণা করবেন। তাঁর ভাষায়, ‘ইরানকে হারানোর কাজ শেষ করলেই—ইরান খুব খারাপভাবে হারছে—খুব শিগগির হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড বলে ঘোষণা করব’। তেহরান এখনও অনড়: হরমুজ খুললে তা ইরানের কর্তৃত্বেই হবে। আমেরিকা ইরানে হামলা ফের শুরু করেছে, ইরানও পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন মিত্রদের, বিশেষত যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে, নিশানা করছে।

সংকট গভীরতর

পৃথিবীর নানা অঞ্চলে নিজের দখলদারি বাড়ানোর আগ্রাসী মার্কিন চেষ্টা, তীব্রতর অস্ত্র প্রতিযোগিতা, আমেরিকা-রাশিয়ার নতুন ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’, আমেরিকা-চিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মহাকাশের সামরিকীকরণ এবং যুদ্ধে যন্ত্রমেধার ব্যবহার—সব মিলিয়ে পরমাণু যুদ্ধের বিপদ বহুগুণ বেড়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জলবায়ুর অস্থিতিশীলতা। পরমাণু-বিজ্ঞানীদের মুখপত্র বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস সেকারণে শেষের সে দিন বা ‘ডুমসডে ক্লক’-কে মধ্যরাত থেকে ৮৫ সেকেন্ড দূরে এনে রেখেছে—বিপর্যয়ের এত কাছে এর আগে কখনো পৃথিবী পৌঁছোয়নি। জলবায়ু-বদলের গতি এমন যে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, আমরা হয়তো উত্তপ্ত বিশ্ব হয়ে ওঠার পথে বা ‘হটহাউস আর্থ’ ট্র্যাজেক্টরি-র দিকে এগোচ্ছি, যেখানে দিনেদিনে শক্তিধর হয়ে ওঠা জলবায়ু সংকট থেকে পরিত্রাণ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। পৃথিবী ইতিমধ্যেই অতিকায় এল নিনো-র কবলে; মধ্য ও পূর্ব উষ্ণমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগ ও নিচের জলের তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে, হয়তো ২০২৭ হয়ে উঠতে চলেছে ইতিহাসের উষ্ণতম বছর। এত সাবধানবাণীর পরেও বড় বহুজাতিক তেল কোম্পানিরা জীবাশ্ম জ্বালানি আহরণ বাড়িয়ে চলেছে, ট্রাম্পের প্রায়-প্রকাশ্য মদতে। সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি করে এমন জ্বালানিও বাদ নয়—মুনাফা বাড়াতেই হবে। পুঁজিপতিরা যেন বিশ্বউষ্ণায়নের ফলে সুমেরুর বরফ গলাকেও উদ্‌যাপন করছে। বরফহীন মেরু তাদের কাছে নতুন এল ডোরাডো, পৃথিবীর কী হবে সে কথা না ভেবেই সেখান তেল-গ্যাস তোলা যাবে। আজকের প্রধান অর্থনীতিগুলি জলবায়ু-বিপর্যয় ঠেকানো বা মানুষের পক্ষে কাজ করার চেয়ে মুষ্টিমেয়ের সম্পদ সঞ্চয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়—এ সত্য লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না।

দ্রুত খারাপ হতে থাকা পৃথিবীর ছবি দেখে কেউ বলতে পারেন, চিন অন্তত উপরোক্ত বেশিরভাগ দোষ থেকে মুক্ত, বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত স্ববিরোধ সত্ত্বেও, আপাত-অপ্রতিরোধ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতির কারণে। ২০২৬-এর চিন, ১৯৪৯-এর চিন নয়। আজকের চিনা উন্নয়ন মডেলের ভিতর পুঁজিসঞ্চয়ের ধ্বংসাত্মক প্রবণতা ঢুকে আছে। বিশ্বব্যবস্থায় নিজেকে জুড়ে দেওয়ার চাপ, চিনা সমাজের প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে পুঁজির উপস্থিতি, দেশকে পুঁজিতন্ত্রের সংকটের মধ্যেই টেনে এনেছে। কাগজে-কলমে অবশ্য দেশ এমন এক পার্টির শাসনে, যারা পুঁজিতন্ত্রের সমালোচনা করে এবং সংকট পেরিয়ে সমাজতন্ত্রের পথে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়—চিনা নেতৃত্বের ভাষায় ‘চিনা চরিত্রের সমাজতন্ত্র’। সমালোচনা জনসমক্ষে দেখানোর জন্য, পুঁজিবাদী সমাজের থেকে নিজেদের আলাদা প্রমাণ করার জন্য। বাস্তবে চিনের সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পুঁজি এত গভীর ঢুকেছে যে অর্থনীতি কার্যত পুঁজিচালিত, মুনাফাসন্ধানী।

“
পুঁজিপতিরা যেন বিশ্বউষ্ণায়নের ফলে সুমেরুর বরফ গলাকেও উদ্‌যাপন করছে। বরফহীন মেরু তাদের কাছে নতুন এল ডোরাডো, পৃথিবীর কী হবে সে কথা না ভেবেই সেখান তেল-গ্যাস তোলা যাবে। আজকের প্রধান অর্থনীতিগুলি জলবায়ু-বিপর্যয় ঠেকানো বা মানুষের পক্ষে কাজ করার চেয়ে মুষ্টিমেয়ের সম্পদ সঞ্চয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়—এ সত্য লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না।

ক্রমশ বিষণ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে চিন আশার মশাল জ্বালাবে—এ প্রত্যাশা তাই দুরাশা। নিজের সংকট সামলাতে সে এত ব্যস্ত যে বাকি পৃথিবী নিয়ে ভাবার অবকাশ কম। জীবাশ্ম জ্বালানীর ওপর নির্ভরতা কমাতে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি বা রিনিউয়েবল এনার্জি, বিদ্যুৎচালিত গাড়ির উৎপাদন বাড়ানো, খাদ্যশস্যের জমি সুরক্ষিত রাখা, যন্ত্রমেধার সক্রিয় সাহায্যে বাণিজ্য ও সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, এসবে চিন বড় উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু পশ্চিম এশিয়া বা অন্য কোনও আঞ্চলিক/আন্তর্জাতিক সংকট মেটাতে অন্য শক্তির সঙ্গে সে সম্ভবত তখনই সংঘাত বা আলোচনায় নামবে, যখন সে সংকট তার স্বাভাবিক বাণিজ্যপ্রবাহ ও পুঁজিসঞ্চয়কে আঘাত করতে শুরু করবে।

তথাপি, আন্তর্জাতিক সমস্যার বড় অংশই কোনো না কোনোভাবে পশ্চিম এশিয়া প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত, প্যালেস্তাইন প্রশ্নের নিষ্পত্তি না হলে সে গিঁট খোলা যাবে না। বস্তুত, বহু বিশ্বসমস্যার উৎসেই প্যালেস্তাইন। দ্বিরাষ্ট্র বা ‘টু-স্টেট’ সমাধানে আজ আর তার নিষ্পত্তি সম্ভব নয়—প্যালেস্তিনীয় ও ইজরায়েলি, দুই পক্ষেরই বড় অংশ অসলো চুক্তিতে আস্থা রাখেন না। ফলে ইউরোপীয় শক্তিরা যত মরিয়া হয়ে’ দ্বিরাষ্ট্র কাঠামো ঠেলে দিক, সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। এডওয়ার্ড সাঈদ বলেছিলেন, প্যালেস্তিনীয় ভূখণ্ডে ইজরায়েলি বসতি ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে দুই জনগোষ্ঠীকে ভৌগোলিকভাবে এমনভাবে জড়িয়ে ফেলেছে যে আলাদা, কার্যকর প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র বাস্তবে অসম্ভব। তাঁর যুক্তি ছিল, দুর্বল ও টুকরো-টুকরো প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র বানালে স্থায়ী বর্ণঅধীনতা অথবা আপারথায়েড-ই তৈরি হবে; নৈতিক ও স্থায়ী সমাধান একমাত্র ঐক্যবদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ইজরায়েলের বিস্তারবাদী ও স্বৈরাচারী নীতির মধ্যে সাঈদ-এর গণতান্ত্রিক দ্বিজাতি বা ‘বাইন্যাশনাল স্টেট’-এর স্বপ্ন—যেখানে ইজরায়েলি ও প্যালেস্তিনীয় সমান অধিকার নিয়ে থাকবেন—সম্ভব বলে মনে হয় না। ‘বাইন্যাশনাল স্টেট’ কাগজেই থাকবে; সমতা, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ের তোয়াক্কা না-করা ইহুদি কর্তাদের চালানো রাষ্ট্রে, প্যালেস্তিনীয়রা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে যাবেন।

পশ্চিম এশিয়া ও পৃথিবী সামগ্রিকভাবে আজ যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে, বড় সরকার, নির্বাচিত নেতা বা কূটনীতিক, কারুরই আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সমস্যা মেটানোর খুব আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। বরং সমস্যা থেকে ফায়দা বাড়ানোর শিল্পে তাঁরা সিদ্ধহস্ত। সমস্যা জটিলতর, আরো বিস্ফোরক হয়ে উঠুক; বিশ্বে নিজেদের দখল শক্ত করা যাবে, সমরশিল্পে আরো মুনাফা হবে, কর্পোরেট পুঁজি বাড়বে।

ওয়েস্ট ব্যাংকে ইজরায়েলি বসতির বিরুদ্ধে, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এ জাতীয় ব্যবস্থা নিজেদের কলঙ্ক ধুয়ে ফেলার প্রতীকী চেষ্টার বেশি কিছু নয়। আমেরিকা আবার ইরানে হামলা শুরু করতেই পারে, কিন্তু ট্রাম্প জিতবেন না, ইরানও সম্ভবত আত্মসমর্পণ করবে না। শেষে ট্রাম্পকে নিজের কথাই গিলতে হতে পারে। তাতেও হরমুজ সংকট মিটবে না; পশ্চিম এশিয়া, পৃথিবীর অন্য কোথাও শান্তিও আসবে না।