কেমন আছে জ্যোতিনগর ? জল, বাস্তু, পরিচয়ের লড়াই

লেখক সওয়াল ডেস্ক · 01 Oct 2026, 06:49 PM
কেমন আছে জ্যোতিনগর ? জল, বাস্তু, পরিচয়ের লড়াই

এ কলকাতার মধ্যে রয়েছে আরেক কলকাতা। যেখানে মাসের পর মাস আসে না কলের জল। কেটে যায় ইলেক্ট্রিকের লাইন। স্থানীয় বাসিন্দাদের হয়ে কোনো কাজ করবেন না, তাঁরা কোনো পরিষেবা পাবেন না―হুমকি দেন বিধায়ক। অপরাধ? তাঁরা সংখ্যালঘু। সওয়ালের প্রতিনিধি পৌঁছেছিলেন সেই ‘আর-এক কলকাতায়।’  এখানে সেই গল্প।

একটি সওয়াল প্রতিবেদন। আলোকচিত্র:কুশল কর


উত্তর কলকাতা। গঙ্গার পূর্ব পাড় ঘেঁষে চলেছে স্ট্রান্ড ব্যাংক রোড। সেই রাস্তা ধরে কাশিপুর জেটির পর জ্যোতিনগর কলোনি। কাছেই দ্বিশতাব্দীপ্রাচীন গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরি। কলের শহর যত কলেবরে বেড়েছে, গঙ্গাতীরে গড়ে উঠেছে কতশত এমন জনপদ। শ্রমজীবীদের কলকাতা।

জ্যোতিনগরে বাস করেন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। প্রায় সকলেই ধর্মে মুসলমান। যাঁদের পেট চলে দিনমজুরি করে, রাজমিস্ত্রির কাজ, রিকশা চালানো, কারখানার শ্রমে। মহিলারা আশপাশের কারখানায় কাচের বোতল পরিষ্কার করা বা কাচ ভাঙার কাজ করেন। শহরের শ্রমজীবী এই মানুষদের ঘর, জ্যোতিনগর।

২৩ ফেব্রুয়ারি। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বন্দরের এস্টেট অফিসার জ্যোতিনগর কলোনি উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। বলা হয়, প্রায় ৩,৪৭৮ বর্গমিটার বন্দর-সংলগ্ন জমি জুড়ে তৈরি হয়েছে এই কলোনি। বাসিন্দাদের ‘দখলদার’ এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে ১৫ দিনের মধ্যে জায়গা খালি করতে বলা হয়। কলকাতার এই প্রান্তে কয়েক দশকের বাস যাঁদের, তাঁদেরই উচ্ছেদের ফতোয়া জারি হল।

১৩ মে। সদ্য নির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি প্রকাশ্য সভায় জানিয়ে দিলেন, মুসলিমরা তাঁকে ভোট দেননি। তাই আগামী পাঁচ বছর তাঁদের কোনও কাজ তিনি করবেন না। এমনকি কোনও সার্টিফিকেটও দেবেন না। পরে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে দেওয়া প্রতিক্রিয়াতেও নিজের বক্তব্য থেকে সরেননি তিনি।

৯ জুন। জ্যোতিনগরের বাসিন্দারা জানতে পারেন, তাঁদের উচ্ছেদের নির্দেশ হয়ে গিয়েছে প্রায় সাড়ে তিন মাস আগেই। ভিটে হারানোর আশঙ্কা তখন আর কানাঘুষো নয়, সরকারি নোটিসেই স্পষ্ট। যে গলিতে জন্মেছেন তাঁরা, বাড়ির বড়দের জন্মাতে দেখেছেন, সে এলাকা ছেড়ে এবার কোথায় যাবেন মানুষগুলো?

২৯ জুলাই। সকাল থেকে কলোনি এলাকার পাঁচটি সরকারি কলেই জল বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে মূল রাস্তার বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়। যে কলগুলিতে প্রতিদিন ভোর পাঁচটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত জল আসত, রাতারাতি শুকিয়ে যায়। গোটা বসতি পড়েছে চরম জলসঙ্কটে। এক বালতি জলের জন্য এখনও পাড়ি দিতে হচ্ছে কয়েক কিলোমিটার। গঙ্গার ঘোলা, দূষিত জলই তাঁদের ভরসা।

“
কে জানে, মুসলিমের ঘরে জন্মেছি বলেই হয়তো আমাদের উপর এত অত্যাচার। আমাদের বাচ্চাকাচ্চা আছে, তাদের কথাও একবার ভাবল না।

এলাকায় বিদ্যুৎ ফিরলেও জল ফেরেনি। আশ্চর্যের কথা, জ্যোতিনগরের প্রায় ১৫০ মিটার অংশের পাঁচটি কলে জল নেই। কিন্তু আশপাশের সব কলে জল আছে। ফলে বালতি, ড্রাম, হাঁড়ি ভরে দূর থেকে জল আনাই হয়ে উঠেছে রোজকার কাজ। শিশুদের বিকেলও কাটতে থাকে ভ্যান ঠেলে, খাবার জলের বোঝা বয়ে। দূষিত জল ব্যবহার করতে করতে তাদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে চামড়ার রোগ।

সিভিল কোর্টে উচ্ছেদ মামলা না মেটায়, ১৯ আগস্ট কলকাতা হাইকোর্টে যান বাসিন্দারা। আদালত উচ্ছেদের উপরে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয়। সেই দিনই এক সাক্ষাৎকারে রীতেশ তিওয়ারি জ্যোতিনগরের বাসিন্দাদের মধ্যে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ থাকার অভিযোগ তোলেন। প্রায় ৫০০০ বাসিন্দার পিঠে এখন বসেছে অনুপ্রবেশকারীর তকমা। ফলে নতুন সরকারের নীতি অনুযায়ী তাঁরা সমস্ত পরিষেবা থেকে বঞ্চিত।

“
আমাদের জন্ম এই দেশেই। তা হলে আমরা যাব কোন দেশে? জান থাকতে, যা-ই করুক, আমরা এই জায়গা ছাড়ব না।

২৫ সেপ্টেম্বর প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের পানীয় জল ফেরানোর দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা হয়। জ্যোতিনগরের বাসিন্দারা এখন এককাট্টা। তাঁরা জানেন, তাঁদের উল্টোদিকে প্রশাসন। তাঁদের অভিযোগ, ভিটেছাড়া করার সব রকম পন্থাই নেওয়া হচ্ছে। তাঁরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত লড়বেন। বাপ-দাদাদের ভিটে ছেড়ে অন্য কোথাও যাবেন না।

তথ্যসূত্র: অল্ট নিউজ | দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস | আনন্দবাজার পত্রিকা | হিন্দুস্তান টাইমস | আজতক বাংলা | ন্যাশনাল হেরাল্ড | আউটলুক ইন্ডিয়া | সিয়াসত | দ্য অবজার্ভার পোস্ট | মাধ্যমম | দৈনিক স্টেটসম্যান