হ কা র

হ কা র

হুতোম দেখেছিলেন, শোভাবাজারের রাস্তায় মহিলা মাছবিক্রেতা তথা 'মেচুনী'-রা প্রদীপ হাতে রাত্তিরবেলায় নোনা ইলিশমাছ বিক্রি করছেন। ক্রেতা দেখলেই 'ও গামচা কাঁদে ভালো মাচ নিবি? ও খেংরা গুপো মিন্‌সে চার আনা দিবি’ বলে ডাকাডাকিও করছেন। সেদিনের মেছুনীদের কি হকার বললে খুব ভুল হবে?

যাঁদের কথা মহেন্দ্রনাথ দত্তের পুরনো কলকাতার স্মৃতিচারণে, রাধাপ্রসাদ গুপ্তের লেখায়। কোথাও দইওয়ালা, কোথাও সাবানওয়ালা, কোথাও শাঁখা-সিঁদুরের ফেরিওয়ালা, কোথাও খাবারের পসরা, কোথাও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ানো মানুষ, কোথাও রাস্তার পাশে বসা ছোট ছোট দোকান। বিচিত্র পেশা, বিচিত্র হাঁক-ডাক, বিচিত্র বেচাকেনায় জমজমাট একটা শহর। কল্লোলিনী তিলোত্তমা। 

কলকাতার রাস্তা-ঘাট, বাজার, জনপদ, রেলস্টেশনের 'ভিতর ও বাহির'—কোনওটাই কখনও হকার-শূন্য ছিল না। এই মহানগরীর আড়ে-বহরে বেড়ে ওঠার প্রতিটা বাঁকে, প্রতিটা স্তরে তাঁরা ছিলেন। তাঁদের বাদ দিয়ে কলকাতা তথা শহরকে কল্পনা করাই অসম্ভব। 

অথচ, সেই হকাররাই এখন 'অবৈধ দখলদার'। তাঁদের জন্য নাকি ফুটপাতে চলাফেরা করা যায় না। অতএব, রাত-বিরেতে বুলডোজার নামে। স্টেশন-চত্বরে, রাস্তার পাশে হকারদের গুমটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। শহরকে 'দখলমুক্ত' আর 'ঝকঝকে' করে তোলার প্রক্রিয়া। উন্নয়ন আর হকার, ফুটপাত আর হকার-- এগুলো কি পরস্পর-বৈরী শব্দ? এমন তো হওয়ার কথা ছিল না!

 হুতোমের চোখে কলকাতার রাজপথ বামুন, বাবু, মেছুনী, রেস্তহীন গুলিখোর, ভিখিরি সবার জন্য অবারিত। সেখানে কোনও বাছবিচার নেই। রাস্তার আবার বাছবিচার! সেখানে ক্রেতা-বিক্রেতা-পথচারী সবার সম্মিলন। শহরও আসলে বাছবিচার করে না। বাছবিচার করে শাসক। নিয়ম বানায়।বৈধ-অবৈধ তকমা লাগে। শাসকের বুলডোজার গভীর রাতে সেই 'বাঁধা নিয়মের পথে 'অনিয়ম' ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।

আর, এত এত মানুষ, তাঁদের জীবিকার অধিকার? এই শহরের এতদিনকার বেঁচে থাকার, যৌথতার গল্পগুলো? তাদের কী হবে? হকারদের রক্ষাকবচ হিসেবে যে-আইন এসেছিল, তার কী হল? হকারদের প্রতিরোধ কি কোনও রাজনৈতিক ভাষা খুঁজে নিতে পারছে আদৌ? অবৈধ দখলদার বাদ দিয়ে হকারদের ঠিক কী চোখে দেখবে এই সময়?

আমাদের এবারের ক্রোড়পত্র এইসব নিয়েই।
অগোছালো শহরের মানুষ: কলকাতার হকার আন্দোলন, রাষ্ট্র ও জীবিকার রাজনীতি: প্রথম পর্ব
লেখক শুভেন্দু দাশগুপ্ত

অগোছালো শহরের মানুষ: কলকাতার হকার আন্দোলন, রাষ্ট্র ও জীবিকার রাজনীতি: প্রথম পর্ব

এই শহর যতটা তার পরিকল্পিত রাস্তা, উড়ালপুল, বাজার, বাড়ি, অফিস, পার্ক, রেললাইন এবং সরকারি দপ্তরের শহর, ততটাই তার ফুটপাত, খোলা মাঠ, বস্তি, রেললাইনের ধার, অস্থায়ী বাজার, চায়ের দোকান, রিকশা, ঠেলাগাড়ি এবং ছোট ছোট মানুষের জীবিকার শহর। হকারকে সরিয়ে দেওয়া তাই কেবল একজন বিক্রেতাকে একটা জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়। অনেক সময় তার সঙ্গে একটি গোটা অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে যায়। আমরা যাকে খুব সহজে ‘অগোছালো’ বলি, তার মধ্যেও একটা গভীর সামাজিক যুক্তি আছে।

আরও পড়ুন →
শহর কার? কলকাতার হকার, উচ্ছেদ ও উন্নয়নের রাজনীতি
লেখক সওয়াল ডেস্ক

শহর কার? কলকাতার হকার, উচ্ছেদ ও উন্নয়নের রাজনীতি

যাঁদের জীবনকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা, পরিকল্পনার টেবিলে তাঁদেরও জায়গা থাকতে হবে। নগর পরিকল্পনা তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করেই তৈরি করতে হবে। হকার-উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনের শিক্ষা এখানেই। কয়েকটা দোকান বাঁচানোর লড়াই নয়। জীবিকার অধিকার, জনপরিসরের অধিকার, নাগরিকত্বের অধিকার এবং শহরে দৃশ্যমান থাকার অধিকারের লড়াই। এই প্রশ্নের উত্তরই হকার-প্রশ্নের রাজনৈতিক অর্থ নির্ধারণ করে।

আরও পড়ুন →
হকারদের অধিকার, উচ্ছেদ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা: শক্তিমান ঘোষের সঙ্গে কথোপকথনে সওয়াল
লেখক সওয়াল ডেস্ক

হকারদের অধিকার, উচ্ছেদ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা: শক্তিমান ঘোষের সঙ্গে কথোপকথনে সওয়াল

কলকাতার হকার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ শক্তিমান ঘোষ। হকার ও স্ট্রিট ভেন্ডরদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই, কলকাতার হকার আন্দোলন কীভাবে ধীরে ধীরে একটি সর্বভারতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে এবং কীভাবে সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের Street Vendors (Protection of Livelihood and Regulation of Street Vending) Act প্রণয়নের দাবি ও প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছে। আলোচনায় উঠে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—জনপরিসর কার এবং শহরের উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত কাদের জন্য?

আরও পড়ুন →
হকার উচ্ছেদ এবং ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা: তিনটি সাক্ষাৎকার
লেখক সওয়াল ডেস্ক

হকার উচ্ছেদ এবং ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা: তিনটি সাক্ষাৎকার

অনাদি সাহু, অতনু চক্রবর্তী এবং জিয়াউল আলম― তিনজনই হকার উচ্ছেদকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন। তিনটি সাক্ষাৎকারের মধ্যে অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক অবস্থান ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে পার্থক্যও রয়েছে। এক জায়গায় তিনজনই স্পষ্টত একমত—হকার উচ্ছেদের প্রশ্নকে শুধু ‘অবৈধ দখল’ বা নগর-সৌন্দর্যায়নের প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখলে সংকটের প্রকৃত চরিত্র বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কর্মসংস্থানের অভাব, অ-প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির সংকট, ক্ষুদ্র ব্যবসার উপর চাপ, স্বনিযুক্ত শ্রমের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা।

আরও পড়ুন →
অগোছালো শহরের মানুষ: কলকাতার হকার আন্দোলন, রাষ্ট্র ও জীবিকার রাজনীতি: দ্বিতীয় পর্ব
লেখক শুভেন্দু দাশগুপ্ত

অগোছালো শহরের মানুষ: কলকাতার হকার আন্দোলন, রাষ্ট্র ও জীবিকার রাজনীতি: দ্বিতীয় পর্ব

একজন হকারকে সরানোর সিদ্ধান্ত কাগজে একটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। বাস্তবে সেটা বহু মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। তাই উচ্ছেদ অনেক সময় সমস্যার সমাধান নয়। সমস্যার স্থানান্তর। হকার আন্দোলনকে যদি শুধু জীবিকার আন্দোলন বলি, তাহলে তার অর্ধেক দেখি। এটা অর্থনৈতিক আন্দোলন, কারণ মানুষ তার আয় রক্ষা করতে চায়। এটা সামাজিক আন্দোলন, কারণ হকারের সঙ্গে ক্রেতা, উৎপাদক, বস্তিবাসী, রিকশাচালকের সম্পর্ক আছে। এটা নাগরিক আন্দোলন, কারণ জনপরিসরের ওপর মানুষের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন আছে।

আরও পড়ুন →