শহর কার? কলকাতার হকার, উচ্ছেদ ও উন্নয়নের রাজনীতি

লেখক সওয়াল ডেস্ক · 11 Sep 2026, 08:14 PM
শহর কার? কলকাতার হকার, উচ্ছেদ ও উন্নয়নের রাজনীতি

“আমরা ফুটপাত দখল করতে আসিনি। আমরা ফুটপাতের পাশে দাঁড়িয়ে বাঁচতে এসেছি। শহরটা যদি আমাদের জন্য না হয়, তাহলে এত বছর আমরা কোথায় ছিলাম? শুধু ওনারাই ভালো থাকবেন? আমাদের রুজি-রুটি নেই?”

— প্রতিমা দাস, যাদবপুর-সংলগ্ন এলাকার হকার

আমরা ঠিক করেছিলাম, সওয়াল-এর ওয়েব-ম্যাগাজিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ-পর্বের বিশেষ ক্রোড়পত্র হবে ‘হকার’। কেন এমন একটি বিষয় বেছে নেওয়া, এই সময়ে দাঁড়িয়ে তার খুব একটা ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।

রাজ্যে পালাবদলের পর রাতারাতি নানা স্টেশন-চত্বর, ফুটপাত, রাস্তার ধারে বুলডোজার নেমেছে। স্থানীয় মানুষ, বিক্রেতারা রাতভর চেষ্টা করেছেন নিজেদের সহায়-সম্বল বাঁচাতে। পারেননি। বহু নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মীও উচ্ছেদ ঠেকাতে রাত জেগেছেন, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন সাধ্যমতো। ব্যর্থ হয়েছেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই।

শহরের প্রায় সমস্ত ফুটপাত খালি করার সরকারি নিদান এসে গেছে। সরকারি জমিতে হকার থাকবে না, রেলের জমিতে হকার থাকবে না। ফুটপাতে এক মহিলা তাঁর শিশুর জন্য দুধ গরম করতে গিয়ে পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রীর ধমকির মুখে পড়ছেন। স্টেশনের বাইরে সার বেঁধে পড়ে আছে গুমটি দোকানের শব।

শহর বদলাচ্ছে। শহরের ইতিহাসের সঙ্গে লেপ্টে থাকা নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে। পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছেন হাজার-হাজার মানুষ। এই অবস্থায় ‘হকার’ শব্দটা আর নিছক একটা অর্থনৈতিক অস্তিত্ব হয়ে নেই। তা ক্রমশ হয়ে উঠছে আগ্রাসী ব্যবস্থার উল্টোদিকে দাঁড়ানো এক ‘অপর’ ভাষ্য—অগণিত মানুষের সম্মিলিত চাওয়া-পাওয়া, বেঁচে থাকা এবং লড়াইয়ের ভাষ্য। এক আদ্যোপান্ত রাজনৈতিক অস্তিত্বের চিহ্ন। অন্তত আমরা একে সেভাবেই দেখতে চাইছি।

হকার ও হকার-সমস্যা নিয়ে আমরা সম্প্রতি অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক শুভেন্দু দাশগুপ্তের লেখা রয়েছে এই ক্রোড়পত্রে। রয়েছে হকার আন্দোলনের নেতা ও সংগঠক শক্তিমান ঘোষের সাক্ষাৎকার। আমরা কথা বলেছি সিটুর রাজ্য সভাপতি অনাদি সাহু, সচিব জিয়াউল আলম, এআইসিসিটিইউ-এর সদস্য অতনু চক্রবর্তীর সঙ্গেও। তাঁদের কথাও থাকছে এখানে। এছাড়াও আমরা অসংখ্য হকারের সঙ্গে কথা বলেছি। কেউ সদ্য উচ্ছেদ হয়েছেন, কেউ উচ্ছেদের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

এই সমস্ত কথোপকথন, সাক্ষাৎকার ও আলোচনার ভিতর দিয়ে আমরা হকার নামক অস্তিত্ব এবং তাকে ঘিরে সমস্যার জটিল ইতিহাসটা জানা-বোঝার চেষ্টা করেছি। সাম্প্রতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে কীভাবে এই বিষয়টিকে দেখব, তা শেখারও চেষ্টা করেছি।

তাই, আমাদের মনে হয়েছে, আমাদের নিজস্ব ভাবনাটাও এই সংখ্যায়, এই ক্রোড়পত্রে থাকুক।হয়তো খানিক অগোছালো। হয়তো খানিক অসম্পূর্ণ। তবু থাকুক।


বেনিয়মের অর্থনীতি, বেনিয়মের রাজনীতি

কলকাতার হকার বললে প্রথমেই একগুচ্ছ অতি চেনা লব্জ মাথায় চলে আসে।

– সমস্ত ফুটপাত হকারদের দখলে চলে যাচ্ছে।

– পথচারীরা ঠিকভাবে চলাফেরাই করতে পারছেন না।

– ফুটপাত ছাপিয়ে রাস্তাও জবরদখল হয়ে যাচ্ছে।

– যানজট বাড়ছে।

– রাস্তাঘাট নোংরা হচ্ছে।

– শহরটা ক্রমে কদাকার ও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠছে।

এমন আরও কত কী। এখান থেকে অবধারিতভাবে একটা প্রশ্নের সামনে এসে দাঁড়াতেই হয়: ফুটপাত কি তাহলে সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য নয়?

অবশ্যই ফুটপাত সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা। সন্দেহ বা দ্বিধা থাকার কথা নয়। হকারদের নিয়ে আমাদের যাবতীয় বোঝাপড়া যদি এই প্রশ্নে ঘুরপাক খেতে থাকে, তাহলে কলকাতা বা শহরতলির ‘হকার’ নামক গোটা বিষয়টাই আসলে না-বোঝা থেকে যায়। হকার কেন, এতে এই বিরাট-বিপুলা কলকাতা শহরের প্রকৃত চরিত্রকেও বোঝা সম্ভব হবে না।

কলকাতা মানে তো নিছক সাজানো-গোছানো রাস্তাঘাট, উড়ালপুল, অফিসপাড়ার উঁচু উঁচু বাড়ি, বাজার, পার্ক, রেললাইন আর সরকারি দপ্তর নয়। কলকাতার মধ্যেই অন্য কলকাতা আছে। সেখানে ফুটপাত জুড়ে হাজার হাজার মানুষের ছোটোখাটো ব্যবসার পসরা। বাজারহাট। ইতিউতি বস্তি। অসংখ্য চায়ের দোকান। রিকশা। ঠেলাগাড়ি। রেলস্টেশনের আশপাশে চাকা-লাগানো গাড়িতে নানা ছোট ছোট খাবারের দোকান। পরিকল্পিত, নিয়ম-নিগড়ে বাঁধা মেগালোপলিসের আঁটোসাটো কাঠামোর বাইরে অগুনতি মানুষের বেঁচে থাকার নিজস্ব আখ্যান, বিকল্প জীবন-জীবিকা। সবটা মিলিয়ে কলকাতা।

যাকে আমরা পুঁজির ভাষ্যমাফিক ‘বেনিয়ম’ বলি, সে বিশৃঙ্খলার মধ্যে হামেশা ঢুকে বসে থাকে সমাজের নিজস্ব নানা যুক্তির, চলনের গূঢ়তর সব ইঙ্গিত। বা বলা ভালো, সংকেত। প্রখ্যাত অধ্যাপক ও রাজনৈতিক কর্মী শুভেন্দু দাশগুপ্তও সেদিন এ-কথাই বলছিলেন আমাদের।

“আমার দোকানটা আপনার চোখে হয়তো ছোট। কিন্তু আমার কাছে এটাই অফিস। এখান থেকেই ছেলের স্কুলের ফি যায়, মেয়ের ওষুধ যায়, ঘরের বাজার যায়।” বলেছিলেন বালিগঞ্জ স্টেশন সংলগ্ন এক হকার পাপ্পু দাস। বিষয়টা এমনিতে এরকমই সাদাসিধে: ‘ক্রেতা যেখানে, ব্যবসাও সেখানে।’ যে সমস্ত অঞ্চলে কম দামে নানা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার তাগিদ থাকে মানুষের, সেইসব অঞ্চল ঘিরেই বাজার গড়ে ওঠে। বিপুল সংখ্যক মানুষের চাহিদাকে মনে রেখে বাজারের নানা জিনিসপত্রের দাম তুলনায় সস্তাও হয়। তার আশেপাশেই মানুষ কাজকর্মের সন্ধান করে। দিনের শেষে সেখানেই মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজেন শ্রমিক-মজুর। সে ঠাঁই জুটেও যায়।

জনবসতির বিস্তার ছড়িয়ে পড়ে কাছেপিঠে অনেকখানি জায়গা জুড়ে। রোজকার মেলামেশা, ভাব-ভরসা, বিনিময় ঘিরে সমাজে কত মানুষ একে-অন্যের ঘনিষ্ঠ, আপনজন হয়ে ওঠেন। রাষ্ট্র মানুষের জন্য ঝক্কিহীন, সংকটহীন দিনযাপনের উপযুক্ত ব্যবস্থা তৈরি করে দিতে পারে না, মানুষ রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও নিয়ম-কানুনের ফাঁকফোকর খুঁজে কোনোমতে নিজেদের জিইয়ে রাখার উপায় খুঁজে নেন। জীবন-জীবিকা চালানোর নানা বন্দোবস্ত করে নেন। শহরের ভিতরে খেটে-খাওয়া মানুষদের নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র গড়ে ওঠে।

‘বেনিয়ম'-এর বাজারে নিয়মগুলোও অদ্ভুত। ক্রেতা এখানে ঠিক বিক্রেতাকে খুঁজে নেন, চিনেও নেন ক্রমে। বিক্রেতাও জেনে-বুঝে নেন ক্রেতাকে। দিনে কতক টানা বাঁধাধরা ক্রেতার দেখা না মিললে বিক্রেতা উদ্বিগ্ন হন। পথচলতি একে-ওকে ডেকে খোঁজ নেন। উদ্বেগকে অর্থনৈতিক স্বার্থ দিয়ে বুঝতে গেলে ভুল হবে। আটপৌরে এইসব দৃশ্যে পুঁজিপরিসরের বাইরে থাকা সমাজের কলজেটা ধুকপুক করে। পারস্পরিক পরিচিতির ভিত্তিতে কত বিক্রেতাই তাঁদের ক্রেতাদের ধারে পণ্য দেন। পরে হিসেব মিলবে কি না, তা নিয়ে দু’বার ভাবেন না। ফাঁক পেলে হকারে-খদ্দেরে একে-অন্যের সুখ-দুঃখ, পরিবার-পরিজন, জীবনের ওঠাপড়া নিয়ে গল্পও জমে ওঠে। দিনকালের খবর ছড়িয়ে পড়ে। একজনের অসুখের খবর আরেকজনের কাছে পৌঁছয়। বিয়ের নিমন্ত্রণ বাজার পেরিয়ে যায়। একজনের চাকরি হারানোর কথা আরেকজন জানতে পারেন। অর্থনীতি যাকে ব্যাখ্যা করতে চায় ‘ডিমান্ড’ এবং ‘সাপ্লাই’-এর দুর্ভেদ্য তত্ত্ব মেনে, রোজকার জীবনে সেই তাত্ত্বিক সমীকরণকে হাওয়ায় উড়িয়ে নিবিড় সংযোগ গড়ে ওঠে মানুষের সঙ্গে মানুষের। স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের। ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের। এই বাজারদুনিয়া বিত্তবান মানুষের জন্যও বন্ধ নয়। চাইলে যে-কেউই এখান থেকে ‘সস্তায়’ সবজি, জামাকাপড়, খাবার সবই কিনতে পারেন। অথচ এর কেন্দ্রে থাকে তুলনায় বিত্তহীন মানুষের অর্থনীতিতে ভর করে বেঁচে থাকা একটি সমাজ।

হাওড়ার বালির স্টেশন সংলগ্ন এক হকারের কথায়, “অনেকেই শুধু আমার ক্রেতা নয়। অনেকে কুড়ি বছর ধরে এখানে আসে। ওর মেয়ের বিয়ে হয়েছে, ওর ছেলের চাকরি হয়েছে। সব খবর আমরা জানি। দোকানটা তুলে দিলে শুধু আমার টেবিলটা যাবে না, এই সম্পর্কগুলোও যাবে।” সেকারণে একজন হকারকে স্রেফ ‘ফুটপাত দখলকারী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া চলে না। হকারের অস্তিত্ব আদপে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার অংশ, একই সঙ্গে পুঁজিনির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন ছোটো উৎপাদক, খদ্দের, পরিবহণশ্রমিক, বস্তিবাসী, দিনমজুর। জড়িয়ে আছেন অসংখ্য এমন মানুষ, যাঁদের জীবিকা কর্পোরেট অফিস বা আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রের গণ্ডি মেনে গড়ে ওঠেনি, টিকেও নেই।

“
রাষ্ট্র বলে, শহর চলবে কঠিন নিয়মে। ফুটপাত-নির্ভর মানুষ বলেন, সেই কঠিন নিয়মই তাঁদের বাঁচা দুঃসাধ্য করে তুলছে। আইন তৈরির এবং তৈরি আইন সময়-সুযোগ বুঝে প্রয়োগ করার ক্ষমতাটুকু অবশ্য দু-পক্ষের হাতে সমান থাকে না। এটাই ক্ষমতার মৌলিক অসমতা। নিয়ম সবার জন্য এক হতে পারে, কিন্তু নিয়ম তৈরির ক্ষমতা সবার হাতে নেই।

‘বেনিয়ম’ কী? তা ঠিক করে দেয় কে?

‘বেনিয়ম’ শব্দটা ক্ষেত্রবিশেষে প্রবলভাবে রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে। হয়ে উঠতে পারে ক্ষমতার পালটা বয়ান, ক্ষমতাহীন মানুষের অস্তিত্বের উদযাপন।

যারা শহরকে সাজিয়ে-গুছিয়ে অত্যাধুনিক, জিডিপি-নির্ভর নগর হিসেবে গড়ে তুলতে চান, তাঁদের কাছে ফুটপাতের ওপর বসে থাকা দশটা দোকানের মানে ‘জবরদখল’। সারাদিনের কাজে বেরিয়ে পড়ার আগে পেট ভরাতে চাওয়া কোনও দিনমজুরের কাছে সেই একই ফুটপাত তাঁর সাধ্যের মধ্যে খাবার জোগাড়ের বাজার। নিম্ন-আয়সম্পন্ন পরিবারের কাছে এই ‘সস্তা’ খোলা বাজার এমন বহু পণ্যের জোগান দেয়, যা বড় দোকান থেকে একই দামে কেনা সম্ভব নয়। গাড়ি-রাস্তার পাশের ফুটপাত তাঁদের কাছে যতখানি চলাচলের পথ, ততটাই রসদ জোগাড়ের। অতএব ফুটপাতে পথচারীদের চলাচল বাধাহীন, মসৃণ হওয়া উচিত কি না, প্রশ্নটা সেখানে আটকে থাকে না। ফুটপাত হয়ে ওঠে সমাজের বিপুল সংখ্যক মানুষের অধিকারের জায়গা। বলা বাহুল্য, পথচারীদের যাতায়াতের পথ মসৃণ হওয়াই কাঙ্ক্ষিত। আসল প্রশ্নটা আরও খটমটে। পথচারীর নির্বিঘ্নে চলাচলের অধিকার এবং অ-প্রাতিষ্ঠানিক জীবিকার অধিকারকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতেই হবে? দেখাতেই হবে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে?

বস্তি, রাস্তার বাজার, রিকশা-স্ট্যান্ড বা রাস্তার ধারে গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন। বাইরে থেকে দেখলে যা ‘বিশৃঙ্খল’, দেখার ধরণ বা পক্ষ খানিক বদলে নিলে সে বিশৃঙ্খলাকেই মনে হতে পারে বেঁচে থাকার সংযত সামাজিক সিম্ফনি। অ-প্রাতিষ্ঠানিক বলি বা অসংগঠিতই বলি, এহেন অর্থনীতির নিজস্ব একরকম ছন্দ আছে। সংযোগস্থাপনের সুর-লয় আছে। খাস কিছু রীতি-রেওয়াজও আছে। কেউ গভীর রাত পর্যন্ত বসে থাকেন, কারণ তাঁর ক্রেতার ভিড় বাড়ে রাতেই। কেউ দোকান খোলেন ভোরের আগে, কারণ বাজার বসে ভোরে। কেউ একই দিনে একাধিক পেশার ভার সামলান। বৃষ্টি-বাদলায় ট্রেন লেট হয়। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছোট হকার-বাজারেরও পাততাড়ি গোটাতে দেরি হয়। ঘণ্টা-মিনিটের বাঁধাধরা অঙ্ক কষে এই বাজারের হিসেব মেলানো সম্ভব নয়। অথচ প্রশাসন বারবার বিচিত্র এই বাজারব্যবস্থাটাকে বাঁধাধরা, নির্দিষ্ট একটা খোপে এনে ফেলতে চায়। নির্দিষ্ট জায়গা। নির্দিষ্ট সরকারি কাগজপত্র। নির্দিষ্ট লাইসেন্স। দোকানের ঝাঁপ খোলা-বন্ধের নির্দিষ্ট সময়। একটা আঁটোসাটো নিয়মের রাজত্ব।

রাষ্ট্র বলে, শহর চলবে কঠিন নিয়মে। ফুটপাত-নির্ভর মানুষ বলেন, সেই কঠিন নিয়মই তাঁদের বাঁচা দুঃসাধ্য করে তুলছে। আইন তৈরির এবং তৈরি আইন সময়-সুযোগ বুঝে প্রয়োগ করার ক্ষমতাটুকু অবশ্য দু-পক্ষের হাতে সমান থাকে না। এটাই ক্ষমতার মৌলিক অসমতা। নিয়ম সবার জন্য এক হতে পারে, কিন্তু নিয়ম তৈরির ক্ষমতা সবার হাতে নেই। কে ‘বৈধ’, কে ‘অবৈধ’, কে ‘শৃঙ্খলিত’ আর কে ‘বেনিয়ম’, সেই সিদ্ধান্তের অধিকারও সমানভাবে বণ্টিত নয়। ফলে ‘বেনিয়ম’ অনেকসময় কোনও নিরপেক্ষ বাস্তবতার নাম নয়, ক্ষমতার তৈরি করা একটা সংজ্ঞা। এতে আক্রান্ত হন তাঁরাই, যাঁরা নিজেদের পক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম লিখে তৈরি করতে পারেন না।


‘বেনিয়মের’ আড়ালের ইতিহাস

বিশ্বের আরও নানান শহরের মতো কলকাতারও নিজস্ব যে ‘অ-প্রাতিষ্ঠানিক’ অর্থনীতি আছে, তাকে দেশভাগ এবং উদ্বাস্তু-স্রোতের ইতিহাস থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে পূর্ববঙ্গ থেকে যে বিপুল সংখ্যক মানুষ স্বর্গভ্রষ্টের মতো এই শহরে এসে পড়লেন, তাঁদের বেঁচে থাকার, টিকে থাকার ইতিহাসকে হিসেবের মধ্যে না ধরলে কলকাতার অর্থনীতি জানা বা বোঝা সম্ভব নয়। ১৯৪৭-এর পর পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুরা সকলেই তো আর সরকারি চাকরি বা স্থায়ী বাসস্থান পাননি। সংগঠিত বাজারে কারবার করার সুযোগও সকলের ছিল না। সদ্য স্বাধীন, টলোমলো ভারত রাষ্ট্রও সে সময়ে পরিকল্পিতভাবে সমস্ত উদ্বাস্তুর পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিতে পারেনি। রাতারাতি ভিনদেশ হয়ে ওঠা এপার বাংলায় এসে পড়া সেই মানুষগুলোকেই রুজি-রোজগারের সংস্থান নিজেদের খুঁজে নিতে হয়েছিল। কেউ ছোট ব্যবসায়ী, কেউ হকার, কেউ রিকশাচালক, কেউ মুটে-মজুর, কেউ ক্ষুদ্র উৎপাদক, কেউ কারিগর হয়ে উঠলেন ধীরে ধীরে। রাস্তার ধারে, খোলা মাঠে, বস্তি-সংলগ্ন চত্বরে গজিয়ে উঠল বাজার। অস্থায়ী বন্দোবস্তের এই চল কালক্রমে পাকাপাকিভাবে একরকম অলিখিত অর্থনৈতিক নিয়মে বদলে গেল। এ ইতিহাস মনে রাখলে ফুটপাতকে কেবলমাত্র ‘জবরদখল’ শব্দ দিয়ে চেনা-জানার প্রয়োজন হয় না। বহু মানুষের কাছে ফুটপাত হয়ে উঠছিল স্বতঃস্ফূর্ত কর্মক্ষেত্র।

উদ্বাস্তু মেয়েদের স্বনির্ভরতার ইতিহাসটাও মনে রাখা জরুরি। সামান্য দুধ ফেরির মতো ছোটোখাটো ব্যবসা ফেঁদে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা বহু নারী নতুন, অচেনা শহরে রোজগার করা শুরু করেছিলেন। তাঁরা ফুটপাতকে ‘বেআইনিভাবে দখল করা’ সরকারি জমি হিসেবে দেখেননি। ফুটপাত তাঁদের কাছে ছিল বেঁচে থাকার, লড়ে নেওয়ার জমি। এই ইতিহাসের দিকে না তাকালে আমাদের শহরের জৈবিকভাবে বেড়ে ওঠা নিসর্গকে ঠিকভাবে বোঝা মুশকিল।

শহর এবং সম্পদ

নগরোন্নয়ন সম্পর্কে আধুনিক চিন্তাভাবনা আজ ‘শহর’-কে মূলত অর্থনৈতিক একটি সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখিয়েছে। ফুটপাত হয়ে উঠছে ‘নগর পরিকাঠামো’-র অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেখানে সরকারের ইচ্ছে ব্যতিরেকে কিছু করা যাবে না। জমি এবং তার মালিকানা হয়ে উঠছে বাণিজ্যিক সম্পত্তি। বাজারহাট হয়ে উঠছে সংগঠিত বাণিজ্যিক এলাকা। পার্ক হয়ে উঠছে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ‘জনসম্পদ’। অথচ ফুটপাত তো সকলের। পার্কও তো সকলের। যা সকলের, তাকে কোনও বিশেষ নিয়মের অধীনে বা নিয়ন্ত্রণে দেখার মানে কি ওই ‘সকলের’ অধিকার খর্ব করা নয়?

অধিকার-হরণ বা যাই বলি, সবই হচ্ছে উন্নয়নের নামে। উন্নয়নের বুলিগুলো ঝকমকে। আধুনিকীকরণ। পরিচ্ছন্নতা। সৌন্দর্যায়ন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। শুনলে মনে হয়, উন্নয়নই ব্রহ্ম। শহর যত ঝিকিমিকি, ঝাঁ-চকচকে হবে, জনসাধারণের মোক্ষলাভ তত নিশ্চিত।

অথচ এই চোখধাঁধানো বুলির উল্টোপিঠে বারবার যে প্রশ্ন উঠে আসছে, তাকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়– ক্রমাগত ভোল বদলাতে চাওয়া ঝাঁ-চকচকে শহরে গরিব মানুষ যাবে কোথায়? সৌন্দর্যায়নের নামে যদি গরিবকে একফালি ফুটপাত থেকেও রাতারাতি উচ্ছেদ করে দিতে হয়, তাহলে সৌন্দর্যায়ন আর নিছক সৌন্দর্যায়নে আটকে থাকে না। তা হয়ে ওঠে শ্রেণির লড়াইয়ের প্রশ্ন।

সমস্যাটা নগর-পরিকল্পনার নয়। শহরের পরিকল্পনা দরকার। রাস্তা সচল থাকা, পথচারীদের নিরাপত্তাও দরকার। আবর্জনা সাফ করা দরকার। অগ্নি-নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য সমান জরুরি। এই সব পরিকল্পনার নামে যখন শহর থেকে গরিব মানুষদের উপস্থিতিটাই মুছে ফেলার কাজ চলে, সেখানেই গন্ডগোল, খটকা, প্রশ্ন। শহরের পরিকল্পনায় যে বদল আসে, তাতে দারিদ্র্য ঘুচে যায় না, চোখের আড়ালে চলে যায়। বলা ভালো, চোখের সামনে থেকে একটা বাস্তবকে জোর করে ‘না-বাস্তব’ করে তোলার চেষ্টা চলে। হাজার লক্ষ মানুষের রুটি-রুজি-বেঁচে থাকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। প্রশ্নটা আরো বড় হয়ে ওঠে—‘উন্নয়ন’ বলতে আসলে কী বুঝি?

‘অপারেশন সানশাইন’: উচ্ছেদের একাল-সেকাল

নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্বে হকার উচ্ছেদ নিয়ে বলতে গিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা তুলে ধরেছেন হকার আন্দোলনের নেতা শক্তিমান ঘোষ এবং অধ্যাপক শুভেন্দু দাশগুপ্ত। তাঁদের কথায় উঠে আসে, ‘হকার-মুক্ত শহর’ ব্যাপারটা কেবল এখনকার নয়। এই রাজ্যে যেমন বাম আমলেই ঢাকঢোল পিটিয়ে হয়েছিল ‘অপারেশন সানশাইন’।

আজ সংসদীয় বামদলের নেতা-কর্মীরা হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রাস্তায় প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। অথচ বামফ্রন্টের আমলেই সেই হকারদের ভাতে মারার প্রশাসনিক ‘অপারেশন’ চলেছিল। তৃণমূল জমানাতেও একাধিকবার হকার উচ্ছেদের চেষ্টা হয়েছে। আজ বিজেপির আমলে সেই প্রকল্প আরো অতিকায় ও নির্ণায়ক আকার ধারণ করেছে। এ থেকে অন্তত একটা বিষয় স্পষ্ট: হকার-উচ্ছেদ কোনো বিশেষ সরকারের একচেটিয়া নীতি নয়। রাজা আসে। রাজা যায়। লাল-নীল-গেরুয়া জমানা বদলায়। হকারদের অস্তিত্ব-সংকট থেকে যায়।

প্রশ্ন হল, দল-মত নির্বিশেষে যারাই সরকারে যায়, তারাই হকার উচ্ছেদের প্রকল্প চালু করে কেন? কারণ সম্ভবত শহর সম্পর্কে উদ্ভট, অবাস্তব ধারণা, শহরকে হতে হবে নির্বিকল্প ঝাঁ-চকচকে। গূঢ়তর উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। জনপরিসরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সরকারের জমি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। হাজারো মানুষের হাতে পড়ে রাস্তা-জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ যদি বিকেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে, তাহলে রাষ্ট্র ও পুঁজির যুগলবন্দি চাপের মুখে পড়ে। রাস্তা বা জমিকে ঘিরে যে অনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি, তার ওপরেও সরকারি নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন। অতএব, হকার নামক ব্যাপারটি দল ও দলীয় সরকার-নির্বিশেষে রাষ্ট্রের চোখে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

বিভিন্ন বাজারলীন গণমাধ্যমও সুরে সুর মেলায়। উচ্ছেদকে সমাজগ্রাহ্য করে ফেলবার প্রক্রিয়া তো সহজ নয়। মানুষের সামাজিক ও স্বতঃস্ফূর্ত বিভিন্ন আচরণকে প্রভাবিত করেই তা করতে হয়। বোঝাতে হয়, আপনি রাস্তা থেকে সস্তায় দরদাম করে জামা-গয়না-প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনলেও, আসলে এতে আপনারই অসুবিধা। ফুটপাত তো আপনাদের হাঁটার জন্য। একটি স্বাভাবিক সম্পর্ককে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে এভাবে। যা সরকারের, আরো ভালো করে বলতে গেলে পুঁজির স্বার্থ, তাকে ‘মানুষের স্বার্থে’ পরিণত করার প্রচার চলে।

অতএব হকারের অধিকার নিয়ে লড়াই আমাদের আরও দুটো প্রশ্নের সূত্র ধরিয়ে দেয়: জনপরিসরের অধিকার আসলে কার? এবং, কে বা কারা, কীভাবে সেই অধিকার অধিগ্রহণ করবে?

“
তাই উচ্ছেদের বিকল্প হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন। হকারদের অপরাধী না বানিয়েও নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়। ব্যবসার অধিকার সুনিশ্চিত করা যায়। জীবিকা ধ্বংস না করেও বিক্রির জায়গা পরিকল্পনা করা যায়। পথচারীর চলাচল নিশ্চিত করেও ছোট ব্যবসার জন্য জায়গা রাখা যায়। নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি বানানো যায়। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পনার সংজ্ঞা বদলানো।


নথি ও নাগরিকত্বের রাজনীতি

এর সঙ্গে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ জড়িয়ে। নাগরিকত্ব। অগুনতি দিনমজুর, ফুটপাতবাসী, হকার বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটান। স্থায়ী ঠিকানা নেই। আইনস্বীকৃত বসবাসের প্রমাণ নেই। পরিযায়ী-জীবন, দুর্যোগ, উচ্ছেদ ও স্থানান্তরের মধ্যে নাগরিকত্বের জরুরি নথিও হারিয়ে যায়। সমস্যাটা স্পষ্ট। একজন মানুষ কয়েক দশক ধরে একটি শহরে কাজ করতে পারেন। শহরের অর্থনীতি বাড়িয়ে তুলতে সস্তায় শ্রম দিতে পারেন। শহরের কোনও প্রান্তে সন্তানদের বড় করতে পারেন। বাজারের সামাজিক-আর্থিক কাঠামোর সক্রিয় অংশ হতে পারেন। এতকিছুর পরেও সরকারি নথিতে দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যেতে পারেন কার্যত অদৃশ্য। হকাররা অনেকেই এমনই এক অংশের প্রতিনিধি। তাঁদের শ্রম দৃশ্যমান। তাঁদের অর্থনৈতিক অবদান দৃশ্যমান। তাঁদের আইনি নিরাপত্তা অদৃশ্য। নগর এবং নাগরিকত্বের প্রাতিষ্ঠানিক ধারণার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংঘাত তৈরি হতে থাকে। শ্রমজীবী মানুষ যে শহরে থাকেন, গায়ে-গতরে খেটে পেট চালান, সেই শহরের রাস্তায় বা ফুটপাতে আর পাঁচজন ‘নথিভুক্ত’ নাগরিকের সমান অধিকার তাঁর থাকে না। এবং যে কোনও মুহূর্তে তাঁরা সরকারি উচ্ছেদের মুখে ‘নেই’-এর খাতায় চলে যেতে পারেন। ফের ছিন্নমূল। ফের জীবিকাহীন।

উচ্ছেদের বিপক্ষে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন

হকার-আন্দোলনের ইতিহাসের মতোই তার রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলন মানে শুধু মিছিল বা বিক্ষোভ নয়। কখনও কখনও আন্দোলন প্রচলিত ব্যবস্থার ভিতরেই বিকল্পের দাবি তোলে। ল্যান্সডাউন মার্কেটের এমনই এক চমৎকার উদাহরণ আমাদের বলছিলেন শক্তিমান ঘোষ। বিভিন্ন হকার সংগঠন সেখানে একসঙ্গে বাজার কেনা/পরিচালনার জন্য দরপত্র জমা দিয়েছিলেন। যাঁদের সাধারণত ‘জবরদখলকারী’ বলে চিহ্নিত করা হয়, তাঁরাই একদিন সম্পত্তি ও দরপত্রের আনুষ্ঠানিক ভাষার ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল বাজার অধিগ্রহণের অধিকার। বাজার যদি সম্পত্তি হয়, তবে সেখানে শ্রম দেন যে মানুষ, তিনি/তাঁরা সে সম্পত্তির অংশীদার হতে পারবেন না কেন? অন্তত যৌথভাবে বাজার পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের অধিকার তাঁদের থাকবে না কেন? এই উদ্যোগকে শুধু উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে দেখলে তার রাজনৈতিক তাৎপর্য ধরা পড়ে না। এর মধ্যে ছিল বিকল্প নগরব্যবস্থার স্পষ্ট কল্পনা। উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে হকাররা কেবল নিজেদের জায়গা রক্ষা করতে চাননি। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছিলেন– শহরের সম্পদ, বাজার এবং জনপরিসরের ওপর কার অধিকার থাকবে।

উচ্ছেদ তাই নিছক অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়। এর অভিঘাত এসে পড়ে সম্পূর্ণ সামাজিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর। রেলস্টেশন, প্ল্যাটফর্ম কিংবা রাস্তার ধারের ছোট বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার দীর্ঘদিনের পরিচয়, ধার-বাকির সম্পর্ক, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং নির্ভরতার ওপর যে অর্থনীতি গড়ে ওঠে, তা কোনও সরকারি নথিতে ধরা পড়ে না। অথচ সেটিই বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সচল রাখে। প্রশাসন গায়ের জোরে এলাকা খালি করতে পারে। সামাজিক অর্থনীতিকে এভাবে মুছে ফেলা যায় না। তাকে অন্যত্র ঠেলে দেওয়া যায়, ছিন্ন করা যায়, দুর্বল করা যায়। তার অভিঘাত থেকেই যায়, সামাজিক গণ-স্মৃতিতে।

একই কথা বস্তি উচ্ছেদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কাউকে অন্য কোথাও একটা ঘর দিয়ে পাঠিয়ে দিলেই পুনর্বাসন সম্পূর্ণ হয় না। একটা ঠিকানার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কাজ, স্কুল, বাজার, চিকিৎসা, যাতায়াত, প্রতিবেশী এবং সামাজিক সম্পর্ক। সেই জগৎ ভেঙে দিয়ে শুধু চার দেওয়াল তুলে দেওয়া আসলে পুনর্বাসন নয়, স্থানান্তরণ। তাই উচ্ছেদের বিকল্প হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন। হকারদের অপরাধী না বানিয়েও নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়। ব্যবসার অধিকার সুনিশ্চিত করা যায়। জীবিকা ধ্বংস না করেও বিক্রির জায়গা পরিকল্পনা করা যায়। পথচারীর চলাচল নিশ্চিত করেও ছোট ব্যবসার জন্য জায়গা রাখা যায়। নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি বানানো যায়। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পনার সংজ্ঞা বদলানো। শহরকে দেখার রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ বদলানো।

যাঁদের জীবনকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা, পরিকল্পনার টেবিলে তাঁদেরও জায়গা থাকতে হবে। নগর পরিকল্পনা তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করেই তৈরি করতে হবে।

শহর তুমি কার?

ফুটপাতেই ধরা পড়ে গোটা নগরজীবনের অসংখ্য সম্পর্ক। সকালে সবজি বিক্রেতা বসেন, অফিসযাত্রী জলখাবার কেনেন, রিকশাচালক চা খান, স্কুলপড়ুয়া খাতা-কলম কেনে, কেউ ওষুধ নেন, কেউ ধার চান, কেউ পুরনো পরিচিতের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলেন। রাত নামলে অন্য শ্রমজীবী মানুষেরা সেই একই পরিসর ব্যবহার করেন। কাগজে-কলমে ফুটপাত পরিষ্কার করে দেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। বাস্তবে তা ভেঙে দিতে পারে চালু বাজার, অসংখ্য জীবিকা, একাধিক পাড়া, বহু বছরের সামাজিক সম্পর্ক। একজন হকারের দোকান ভাঙা তাই শুধুমাত্র কিছু টেবিল, বাঁশ-ত্রিপলের ছাউনি বা বসার জায়গা সরিয়ে দেওয়া নয়। আসলে একটা সামাজিক জগতের ভিত নড়িয়ে দেওয়াও।

হকার-উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনের শিক্ষা এখানেই। কয়েকটা দোকান বাঁচানোর লড়াই নয়। জীবিকার অধিকার, জনপরিসরের অধিকার, নাগরিকত্বের অধিকার এবং শহরে দৃশ্যমান থাকার অধিকারের লড়াই। প্রশ্ন হকার থাকবে কি থাকবে না-তে আটকে থাকে না। হয়ে দাঁড়ায়, শহর কাদের জন্য? কাদের শ্রমে শহর চলে? কাদের উপস্থিতি শহরের স্বাভাবিক দৃশ্য? কাদের উপস্থিতি ‘অবৈধ’, ‘অগোছালো’ বা ‘কুৎসিত’? কোন চোখ বা রাজনীতি দেখার এই বৈষম্য তৈরি করে? শহর কি শুধু আইনি মালিকদের? নাকি যারা প্রতিদিন শ্রম, ঘাম, পণ্য, পরিষেবা এবং সম্পর্কের অসংখ্য অদৃশ্য জাল দিয়ে তাকে সচল রাখেন, তাঁদেরও?

এই প্রশ্নের উত্তরই হকার-প্রশ্নের রাজনৈতিক অর্থ নির্ধারণ করে। হকার নিয়ে কথা বলা মানে কেবল হকার নিয়ে কথা বলা নয়। প্রশ্ন শহরের গণতন্ত্রের, জনপরিসরের, জীবিকার এবং উন্নয়নের সংজ্ঞারও।

(আলোকচিত্র: কুশল কর)