হকার উচ্ছেদ এবং ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা: তিনটি সাক্ষাৎকার

লেখক সওয়াল ডেস্ক · 11 Sep 2026, 09:29 PM
হকার উচ্ছেদ এবং ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা: তিনটি সাক্ষাৎকার

গত জুন মাস থেকে কলকাতা, শহরতলি এবং রাজ্যের অন্যান্য জায়গায় শুরু হওয়া হকার-উচ্ছেদের পরিপ্রেক্ষিতে সওয়ালের পক্ষ থেকে আমরা কথা বলেছিলাম পশ্চিমবঙ্গের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের তিন বর্ষীয়ান নেতার সঙ্গে। সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস তথা সিটুর রাজ্য সভাপতি অনাদি সাহু এবং রাজ্য সম্পাদক জিয়াউল আলম, এবং অল ইন্ডিয়া সেন্ট্রাল কাউন্সিল অফ ট্রেড ইউনিয়নস (এআইসিসিটিইউ)-র রাজ্য সভাপতি অতনু চক্রবর্তী। এঁদের সামগ্রিক বক্তব্য অনেকক্ষেত্রেই সওয়ালের সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে মেলে না। তবু, আমাদের মনে হয়েছে, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবৎ যুক্ত এই তিন নেতার অভিজ্ঞতা ও মতামত যথাযথভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। ফলে, তিন কথোপকথনই ‘হকার' ক্রোড়পত্রে সংযুক্ত হল।

সাম্প্রতিক হকার উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে কলকাতা এবং রাজ্যের জনপরিসরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা ফুটপাত দখল, যান চলাচল বা নগরোন্নয়ন কী সৌন্দর্যায়নের প্রশ্নে আটকে নেই। এই তিন সাক্ষাৎকারেও আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে এক প্রধান প্রশ্ন ফিরে ফিরে এসেছে—উন্নয়ন ও নগর পরিকল্পনায় শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকার জায়গা কোথায়?

হকার উচ্ছেদকে তিনজনই বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন। তিনটি সাক্ষাৎকারের মধ্যে অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক অবস্থান ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে পার্থক্যও রয়েছে। এক জায়গায় তিনজনই স্পষ্টত একমত—হকার উচ্ছেদের প্রশ্নকে শুধু ‘অবৈধ দখল’ বা নগর-সৌন্দর্যায়নের প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখলে সংকটের প্রকৃত চরিত্র বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কর্মসংস্থানের অভাব, অ-প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির সংকট, ক্ষুদ্র ব্যবসার উপর চাপ, স্বনিযুক্ত শ্রমের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা।

তিন কথোপকথনেই ঘুরেফিরে এসেছে সংলাপ, জমির ব্যবহার, আইনি অধিকার ও পুনর্বাসনের দাবি। পথচারীর চলাচলের অধিকার যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি জীবিকার অধিকার। প্রশ্ন, শহরের জনপরিসরকে কি এমনভাবে ভাবা, পরিকল্পনা করা যায় না, যেখানে এই দুই অধিকারকে প্রতিপক্ষ না বানিয়ে, সহাবস্থানের পথ তৈরি করা সম্ভব? সেসঙ্গে, কথোপকথনে উঠে এসেছে উচ্ছেদের সঙ্গে কর্পোরেটকেন্দ্রিক উন্নয়নের সম্পর্ক, রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং শ্রমজীবী মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

তিন কথোপকথনই, সহজ অথচ মৌলিক এক প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করায়—শহর বেড়ে উঠছে যাঁদের শ্রমে, যাঁরা প্রতিদিন তাকে সচল রাখছেন, সে শহরে তাঁদের অধিকার কতখানি?

অনাদি সাহু, সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (সিটু), রাজ্য সভাপতি, পশ্চিমবঙ্গ

সওয়াল: পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক দিন ধরে, অর্থাৎ নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে নতুন করে হকার উচ্ছেদ শুরু হয়েছে। এই বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?

অনাদি সাহু: দেখুন, উদার অর্থনীতির ফলে গোটা দেশে এমনিতেই কর্মসংস্থান ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র, রেল, ব্যাঙ্ক, বিমা থেকে শুরু করে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োগ কমেছে। ফলে, বেকারত্ব বেড়েছে। দেশভাগের সময় বহু ছিন্নমূল মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম হকারি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই মানুষগুলোকেই পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা হচ্ছে। অথচ স্ট্রিট ভেন্ডরস অ্যাক্ট-এর মূল নীতি হল, বিকল্প ব্যবস্থা না করে হকার উচ্ছেদ করা যাবে না। কর্মসংস্থান করতে না পারলে রাষ্ট্র মানুষের শেষ অবলম্বনটুকু কেড়ে নিতে পারে না।

বুলডোজার দিয়ে দোকান ভেঙে দেওয়া, সামগ্রী নষ্ট করা কিংবা আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও উচ্ছেদ চালানো অমানবিক ও স্বৈরাচারী। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের পরিবার, শিক্ষা, খাদ্য ও চিকিৎসার উপর। এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সিটু-সহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন রেল কর্তৃপক্ষ, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছে। বামপন্থী রাজনৈতিক দল, শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে।

আমাদের দাবি, অবিলম্বে উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে এবং হকারদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের জীবিকা ও পুনর্বাসনের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে।

সওয়াল: আপনি ২০১৪ সালের স্ট্রিট ভেন্ডরস অ্যাক্ট-এর কথা বললেন। কিন্তু সেখানে হকারদের স্বীকৃতি থাকলেও রেল হকারদের সুরক্ষার সরাসরি কোনও ব্যবস্থা নেই। আন্দোলন আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এটা কি বড় দুর্বলতা হয়ে উঠছে বলে মনে হয়?

অনাদি সাহু: রেল হকার বা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের জমিতে হকারির বিষয়টি ২০১৪ সালের স্ট্রিট ভেন্ডরস অ্যাক্ট-এ নির্দিষ্টভাবে বলা নেই। কিন্তু আইনের মূল স্পিরিট তো স্পষ্ট—পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ করা যাবে না। পার্লামেন্টে যখন পথহকারদের কথা আলোচনা হয়েছে, তখন যদি এই মানবিক দিকটি বিবেচনা করা হয়ে থাকে, রেল হকারদের ক্ষেত্রে তা কেন প্রযোজ্য হবে না? সব কথা আইনে আলাদা করে লেখা থাকে না। আইনপ্রণেতারা তো বিষয়টির বৃহত্তর উদ্দেশ্য ও মানবিক দিকটিও বুঝবেন।

আমাদের দেশের আইন অনেক ক্ষেত্রেই অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়েই তৈরি হয়েছে। তাহলে, রাষ্ট্র যদি মানুষকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে না পারে, তাকে উচ্ছেদ করে কর্মহীন করার অধিকার রাষ্ট্রের কোথা থেকে আসে? তার পরিবারে ছোট বাচ্চা আছে, বয়স্ক মানুষ আছেন—তাঁদের খাবার, ওষুধ, জীবনযাপন কীভাবে চলবে? রাষ্ট্র বা সমাজের কি কোনো দায় নেই?

আজ অমানবিকভাবে হকার উচ্ছেদ করা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে কেউ তো বলেনি যে ক্ষমতায় এসে লক্ষ লক্ষ মানুষকে কর্মহীন করে দেওয়া হবে। তাহলে, এই উচ্ছেদের নৈতিক ও সামাজিক দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে কীভাবে?

সওয়াল: উচ্ছেদের পক্ষে বারবার একটা যুক্তি দেওয়া হচ্ছে--‘ইলিগ্যাল এনক্রোচমেন্ট’। কিন্তু জনপরিসরে যেমন মানুষের হাঁটাচলার অধিকার আছে, তেমনই জীবন-জীবিকা নির্বাহের অধিকারও আছে। তাহলে এই দুটোকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হচ্ছে কেন? এমন সীমারেখা কি তৈরি করা সম্ভব নয়, যেখানে পথচারীর অধিকারও থাকবে, আবার হকারের জীবিকার অধিকারও রক্ষা করা যাবে?

অনাদি সাহু: আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই। মানুষের যাতায়াতের জন্য রাস্তা দরকার, পরিকাঠামোর উন্নয়ন দরকার। কিন্তু সেটা আলোচনা করে, পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করে—সবকিছুকে একসঙ্গে নিয়েই করা সম্ভব। কেউ কারও বিরোধী নয়। সমস্যা হচ্ছে, সরকার সে আলোচনা চাইছে না। বরং, জনপরিসর কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। যেখানে গরিব মানুষ দশ-পনেরো-কুড়ি টাকায় চা বিক্রি করতেন, সেখানে এখন একশো-দুশো টাকায় চা বিক্রির ব্যবস্থা হবে। এতে কারা উপকৃত হবে?

গ্রামবাংলার গরিব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ প্রতিদিন লোকাল বা দূরপাল্লার ট্রেনে যে পরিষেবা এই হকারদের কাছ থেকে পান, কর্পোরেট বা বড় শপিং মল কি সেই পরিষেবা দেবে? তাই আজ রাজ্য ও কেন্দ্র—উভয় সরকারের এই নীতি শুধু হকারদের কর্মহীন করছে না, সাধারণ মানুষের স্বার্থ এবং রাষ্ট্রের সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও অস্বীকার করছে। এটা অন্যায়, অমানবিক। আমরা তা মেনে নিতে পারি না।

সওয়াল: এখান থেকেই একটা আরও বড় প্রশ্ন আসে। আমরা যে উন্নয়নের কথা বলছি, সেই উন্নয়নের ধারণাটা কি এমন এক কর্পোরেটকেন্দ্রিক শহর তৈরি করতে চাইছে, যেখানে শহরকে প্রতিদিন সচল রাখছেন যে শ্রমজীবী মানুষ, তাঁদেরই ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হবে? এই ধরনের নগরভাবনাকে কীভাবে দেখছেন?

অনাদি সাহু: উন্নয়ন কার জন্য? মানুষের জন্যই তো। তাহলে মানুষের আর্থিক উন্নতি, কর্মসংস্থান, জীবন-জীবিকার উন্নতি না ঘটিয়ে শুধু ঝাঁ-চকচকে ইমারত বা রাস্তাঘাট তৈরি করলেই উন্নয়ন হয় না। মুষ্টিমেয় কর্পোরেটের জন্য দোকানপাট, বাজার, বাণিজ্যিক পরিসর তৈরি হবে, এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হবে—এই উন্নয়নের ধারণা আমরা মানি না। গত এক দশকে দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য যতটা বেড়েছে, তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচক ও পরিসংখ্যানেও প্রতিফলিত হয়েছে। অর্থাৎ মুষ্টিমেয় মানুষের উন্নতি হয়েছে, কিন্তু বৃহত্তর মানুষের জীবনযাত্রায় সে উন্নতির প্রতিফলন নেই। সরকার যদি কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নতি করতে না পারে, বদলে যদি বুলডোজার চালিয়ে মানুষকে উচ্ছেদ করে, তার ফল হকারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আজ হকাররা চরম সংকটে পড়ছেন, আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে। এভাবে বৃহত্তর সামাজিক ক্ষত তৈরি হচ্ছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সমাজের উপর পড়বে। মানুষের জীবন-জীবিকা ধ্বংস করে কোনো উন্নয়নই শেষ পর্যন্ত সমাজের অগ্রগতির পক্ষে হতে পারে না।

সওয়াল: এই আন্দোলনে রাস্তার লড়াইয়ের পাশাপাশি আইনি লড়াইও চলছে। কিছু ক্ষেত্রে আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এসেছে, সাময়িক স্বস্তি মিলেছে। অতীতে বিভিন্ন গণআন্দোলনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্ট থেকে মানুষের পক্ষের গুরুত্বপূর্ণ রায় আমরা দেখেছি। কিন্তু, ইদানীং আদালতের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। এই পরিস্থিতিতে আদালতের উপর কতটা ভরসা রাখা যায় বলে মনে হয়?

অনাদি সাহু: দেখুন, আমাদের রাজ্যে এবং সারা দেশেই বিভিন্ন সময়ে আদালত থেকে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। গণআন্দোলনের ক্ষেত্রে আদালতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ রায় মানুষের পক্ষে গেছে—অস্বীকার করার উপায় নেই। আবার, এমন রায়ও এসেছে, যেগুলো জনস্বার্থের দিক থেকে আমরা মেনে নিতে পারিনি।

হকারদের ক্ষেত্রেও আদালত থেকে যে নির্দেশ বা স্থগিতাদেশ আসছে, সেগুলোর অনেকটাই সাময়িক—দু’সপ্তাহ, তিন সপ্তাহের জন্য। ফলে কিছুটা সময় পাওয়া যাচ্ছে, সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এমনও দেখা যাচ্ছে, স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও রেল কয়েকজনকে ছাড় দিয়ে বাকিদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আদালতের নির্দেশ এবং আইনের প্রতি সরকারের যে মর্যাদা দেখানো উচিত, অনেক ক্ষেত্রে তা দেখা যাচ্ছে না। আমরা চাই, আদালত রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্বের কথাটা স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিক এবং নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার—বেঁচে থাকা, কাজ করা, জীবন-জীবিকা নির্বাহ—যাতে ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করার দিকে নজর দিক। দায়িত্ব শুধু বিচারব্যবস্থার নয়, প্রশাসন, সরকার এবং সমাজের সকলের।

“
উন্নয়ন কার জন্য? মানুষের জন্যই তো। তাহলে মানুষের আর্থিক উন্নতি, কর্মসংস্থান, জীবন-জীবিকার উন্নতি না ঘটিয়ে শুধু ঝাঁ-চকচকে ইমারত বা রাস্তাঘাট তৈরি করলেই উন্নয়ন হয় না। মুষ্টিমেয় কর্পোরেটের জন্য দোকানপাট, বাজার, বাণিজ্যিক পরিসর তৈরি হবে, এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হবে—এই উন্নয়নের ধারণা আমরা মানি না।

সওয়াল: বর্তমান আন্দোলনে বামপন্থী দল এবং বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনগুলি এখন অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছে। একটা প্রশ্ন বারবার উঠছে—যাঁরা একসময় অপারেশন সানশাইন করেছিলেন, তাঁরা আজ কোন মুখে হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন? শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে এ প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দেবেন? এবং, অপারেশন সানশাইন এবং হালের ‘বুলডোজার রাজ’-এর মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য কি দেখছেন?

অনাদি সাহু: দেখুন, শ্রমিক সংগঠন হিসেবে আমরা কখনওই চাইনি হকার বা গরিব মানুষের জীবন-জীবিকা বিপন্ন করে, আলাপ-আলোচনা ছাড়া কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হোক—সেটা কেন্দ্রীয় সরকার করুক বা রাজ্য সরকার। অপারেশন সানশাইনের সময়ও আমরা দেখেছি, হকারদের পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার চেষ্টা হয়েছিল। গ্যালিফ স্ট্রিট, শ্যামবাজার-সহ বিভিন্ন এলাকায় হকারদের সরানোর আগে বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শিয়ালদহের কাছে ফ্লাইওভার নির্মাণের সময়ও হকারদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে সরানো হয়েছিল। পরে ফ্লাইওভারের নীচেই তাঁদের জন্য স্টল তৈরি করে পুনর্বাসন দেওয়া হয়। আজও সেখানে ‘শিশির মার্কেট’ রয়েছে।

অর্থাৎ বামফ্রন্ট সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল—উন্নয়ন হবে, কিন্তু মানুষকে সর্বস্বান্ত করে নয়। পুনর্বাসন, আলোচনা এবং মানুষের জীবন-জীবিকাকে সঙ্গে নিয়েই উন্নয়নের পরিকল্পনা করতে হবে। আমরা আজও সেই নীতিই চাই—মানুষের উন্নয়ন এবং দেশের উন্নয়ন, দুটোই যেন পাশাপাশি এগোয়।

অতনু চক্রবর্তী, অল ইন্ডিয়া সেন্ট্রাল কাউন্সিল অফ ট্রেড ইউনিয়নস (এআইসিসিটিইউ), রাজ্য সভাপতি, পশ্চিমবঙ্গ

সওয়াল: সাম্প্রতিক হকার উচ্ছেদকে কীভাবে দেখছেন?

অতনু চক্রবর্তী: এই সরকারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বুলডোজার রাজ। ভেঙে দাও, উচ্ছেদ করো, তারপর এক্সক্লুসিভ শহর তৈরি করো। আমাদের সংবিধান ও সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ইনক্লুসিভনেস। সেটাকেই ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। এ রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই দেখলাম, হকার, গরিব দোকানদার এবং অন্যান্য দরিদ্র মানুষকে নির্মমভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। তাঁদের ভোটাধিকার যেমন সংকুচিত করা হচ্ছে, তেমনই জীবন ও জীবিকার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে।

এর সঙ্গে শহরের জমির প্রশ্নও যুক্ত। আরবান ল্যান্ড সিলিং অ্যাক্ট পুনর্বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, শহরের জমি কার স্বার্থে ব্যবহার করা হবে? বড় পুঁজির স্বার্থে শহরকে নতুন করে সাজানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে এই উচ্ছেদকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।

সওয়াল: সরকারের যুক্তি, উন্নয়ন এবং নাগরিক পরিষেবার জন্যই উচ্ছেদ দরকার। রেলের ক্ষেত্রে, যাত্রী নিরাপত্তার কথাও বলা হচ্ছে। এ যুক্তি কি গ্রহণযোগ্য?

অতনু চক্রবর্তী: প্রতি উচ্ছেদের পিছনে অজুহাত থাকে। সৌন্দর্যায়ন, যাত্রী নিরাপত্তা, শহরের উন্নয়ন। কিন্তু, উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা, ফ্লাইওভার বা স্মার্ট সিটি নয়। যাঁরা শহরকে প্রতিদিন তৈরি করছেন, তাঁদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তাও উন্নয়নের অংশ। সরকারের চোখে গরিব মানুষ যেন শহরের জঞ্জাল, উন্নয়নের বাধা। তাই তাঁদের সরিয়ে উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের জন্য একটি নির্দিষ্ট ধরনের শহর তৈরি করা হচ্ছে। আমরা এর বিরুদ্ধে বলছি, শহর সবার। কলকাতার উপর প্রত্যেক শহরবাসীর সমান অধিকার রয়েছে।

সওয়াল: এর মধ্যে হকারদের সাম্প্রদায়িকভাবে ভাগ করার চেষ্টাও কি দেখতে পাচ্ছেন?

অতনু চক্রবর্তী: অবশ্যই। মেটিয়াবুরুজ, রাজাবাজার বা গার্ডেনরিচের হকারদের আলাদা করে চিহ্নিত করা হচ্ছে। অথচ, বড়বাজারের কথা বলা হচ্ছে না। অর্থাৎ, হকারদের মধ্যেও ধর্মীয় বিভাজন তৈরির চেষ্টা চলছে। একটি বিশেষ সম্প্রদায়কেই যেন শহরের সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়। এটা বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। প্রথমে হকার, তারপর নিম্ন-মধ্যবিত্ত, ধীরে ধীরে শহরের দরিদ্র মানুষকে প্রান্তে ঠেলে দিয়ে শহরকে মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য তৈরি করা।

সওয়াল: শহরের অর্থনীতিতে হকার বা সামগ্রিক ভাবে অসংগঠিত ক্ষেত্রের গুরুত্ব আসলে কতখানি?

অতনু চক্রবর্তী: ভারতের বিপুল সংখ্যক শ্রমিক অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন। এঁদের বড় অংশ স্বনিযুক্ত। হকার ও ছোট ব্যবসায়ীরা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁরা শুধু নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করেন না, শহরের স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখেন।

অর্জুন সেনগুপ্তের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কমিশন ফর এন্টারপ্রাইজেস ইন দ্য আনঅর্গানাইজড সেক্টরের রিপোর্টে দেখা গিয়েছিল, কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লি ও আহমেদাবাদের হকারদের বড় অংশ বন্ধ কারখানার শ্রমিক। অর্থাৎ, শিল্প বন্ধ হওয়ার পর বহু দক্ষ শ্রমিক বাধ্য হয়ে হকারি বা অন্যান্য অ-প্রাতিষ্ঠানিক কাজে এসেছেন। সরকারের দায়িত্ব ছিল তাঁদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান করা। বদলে, তাঁদের জীবিকার শেষ অবলম্বনটুকু কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

সওয়াল: ২০১৪ সালের স্ট্রিট ভেন্ডরস অ্যাক্ট-এ হকারদের অধিকার স্বীকৃত হলেও রেল হকাররা একই ধরনের সুরক্ষা পান না। আজকের পরিস্থিতিতে এটা কি আন্দোলনের দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

অতনু চক্রবর্তী: আইনি সুরক্ষার অভাব অবশ্যই সমস্যাজনক। আমাদের দাবি, রাস্তার হকারদের মতো রেল হকারদের জন্যও পৃথক আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে।

তবে সবকিছু শুধু আইনের উপর নির্ভর করতে পারে না। একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ভিত্তি হওয়া উচিত মানবতা ও সাংবিধানিক নৈতিকতা। সরকার যখন বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে পারছে না, তখন মানুষকে জীবিকা থেকে উচ্ছেদ করার অধিকারও তার থাকতে পারে না।

সওয়াল: তাহলে ‘পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়’—এই দাবিটাকেই কি আপনি নীতিগতভাবে সঠিক বলে মনে করেন?

অতনু চক্রবর্তী: সম্পূর্ণ ন্যায্য। আদালতের বিভিন্ন রায়েও বলা হয়েছে, উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের জীবন ও জীবিকার অধিকারকে বিবেচনা করতে হবে। পুনর্বাসন মানে শুধু অন্য কোথাও বসিয়ে দেওয়া নয়। এমন জায়গায় পুনর্বাসন করতে হবে, যেখানে তাঁরা আবার ব্যবসা করতে পারবেন।

হকারদের ঘিরে একটি স্থানীয় অর্থনীতি তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ কম দামে পণ্য পান, ছোট ব্যবসা টিকে থাকে, স্থানীয় বাজার সচল থাকে। তাই হকারদের উচ্ছেদ শুধু তাঁদের জীবিকার প্রশ্ন নয়, শহরের অর্থনীতিরও প্রশ্ন।

আমাদের দাবি তাই শুধু পুনর্বাসন নয়। কাজের পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থাও করতে হবে।

সওয়াল: পালটা যুক্তি একটা আসে—ফুটপাত তো পথচারীরও। তাহলে, পথচারীর হাঁটাচলার অধিকার এবং হকারের জীবিকার অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কী সম্ভব?

অতনু চক্রবর্তী: অবশ্য সম্ভব, সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে। সুপ্রিম কোর্টও হকারদের রাস্তায় ব্যবসা করার অধিকার স্বীকার করেছে। পথচারীদের চলাচলের অধিকারও রয়েছে। তবে, সমস্যা শুধু হকারদের নিয়ে কেন হবে? কলকাতার বহু রাস্তায় বেআইনি পার্কিংয়ের কারণে রাস্তার বড় অংশ দখল হয়ে থাকে। সেখানে এহেন কঠোর ব্যবস্থা দেখা যায় না। এর সমাধান, ন্যায্য ভারসাম্য তৈরি, কাউকে বলির পাঁঠা বানানো নয়।

সওয়াল: হকারদের অনেকেই বলছেন, লাইসেন্স নিতে বা নির্দিষ্ট ফি দিয়ে ব্যবসা করতে তাঁরা রাজি। তাঁদের সঙ্গে বসে সমাধান খোঁজার চেষ্টা কি সরকারের তরফে হচ্ছে?

অতনু চক্রবর্তী: সরকারের সদিচ্ছা থাকলে সমাধান সম্ভব। আমরা বহুবার বলেছি, সমস্ত হকারকে লাইসেন্স দেওয়া হোক। এতে সরকারও নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব পাবে, এবং হকারদের পেশার আইনি স্বীকৃতি তৈরি হবে। যেখানে প্রয়োজন, নতুন হকার্স মার্কেট বা নির্দিষ্ট ভেন্ডিং জোন তৈরি করা যেতে পারে। এর জন্য হকার সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, এবং সরকারের মধ্যে আলোচনা দরকার। সরকার সে আলোচনার পথই বন্ধ করে দিয়েছে।

সওয়াল: আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার কথা কি ভাবছেন? সেই উদ্যোগ আপাতত কতটা এগিয়েছে?

অতনু চক্রবর্তী: ট্রেড ইউনিয়নের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও শ্রমজীবী মানুষের অন্যান্য অংশকে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। কলকাতার ভারতসভা হলে নাগরিক সভা হয়েছে। যাদবপুর অঞ্চলে হকারদের পাশাপাশি অটোচালক, রিকশাচালক-সহ অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে যৌথ যোগাযোগের উদ্যোগও তৈরি হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে, নিচ থেকে ইউনাইটেড অ্যাকশন এবং কেন্দ্রীয় স্তরে ট্রেড ইউনিয়নগুলির যৌথ আন্দোলন গড়ে তোলা।

সওয়াল: এই লড়াইয়ের একটা দিক আদালতেও চলছে। আদালতের উপর কতটা নির্ভর করা যায় বলে মনে হয়?

অতনু চক্রবর্তী: আদালতের রায়ের জন্য অপেক্ষায় থেকে আন্দোলন থামিয়ে রাখা যাবে না। আন্দোলনের মাধ্যমেই অধিকার অর্জন করতে হয়। রাস্তার লড়াই যত শক্তিশালী হবে, আদালতও তত বেশি মানুষের অধিকারের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবে।

সওয়াল: শেষ প্রশ্ন। ১৯৯৬ সালের অপারেশন সানশাইনের প্রসঙ্গ বারবার ফিরে আসছে। প্রশ্ন উঠছে, বাম আমলেও তো হকার উচ্ছেদ হয়েছিল। তাহলে, অপারেশন সানশাইন আর এখন যে উচ্ছেদ হচ্ছে, এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কোথায়?

অতনু চক্রবর্তী: প্রথমত, অপারেশন সানশাইনকে সিটু সমর্থন করেনি। তখন, ট্রেড ইউনিয়নগুলি তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনাও হয়েছিল। উচ্ছেদ হওয়া হকারদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতিও পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তীকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারও বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ করেছে এবং হকারদের অধিকার রক্ষার আইন কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা তখনও বিরোধিতা করেছি।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে অপারেশন সানশাইনের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। আজকের উচ্ছেদের সঙ্গে শহরের জমি, বৃহৎ পুঁজি এবং একটি নির্দিষ্ট ধরনের এক্সক্লুসিভ শহর তৈরির বৃহত্তর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রকল্প যুক্ত। আমাদের কাছে মূল প্রশ্ন হচ্ছে, শহর কাদের জন্য? উত্তরটা স্পষ্ট—শহর সকলের।

“
শহর তৈরি করেছেন কারা? মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, গঞ্জাম-সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শ্রমজীবী মানুষ। রাস্তা, রেল, বিমানবন্দর, বাড়ি, নিকাশি ব্যবস্থা থেকে শুরু করে শহরের দৈনন্দিন পরিষেবা—সবকিছুর সঙ্গে তাঁদের শ্রম জড়িয়ে আছে। আজ এনক্রোচার বলে তাঁদের সরিয়ে দিলে শহর চলবে কীভাবে?

জিয়াউল আলম, সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (সিটু), রাজ্য সম্পাদক, পশ্চিমবঙ্গ

সওয়াল: গত দেড়-দু’মাস ধরে শহর এবং রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় যে উচ্ছেদ অভিযান চলছে—কোথাও নোটিশ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও বুলডোজার নামছে, মানুষের জীবিকা, এমনকি ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?

জিয়াউল আলম: সময়কালটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন সরকার গঠনের পরই ধ্বংসলীলা শুরু হয়েছে। যাঁরা পরিবর্তন চেয়েছিলেন এবং বিজেপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিলেন, তাঁদেরই এক বড় অংশ এখন বলছেন, মহাভুল করেছেন। কারণ, তাঁদের রুটি-রুজি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, মাথার উপর যে সামান্য ছাদ ছিল, সেটাও ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। এটা শুধু উচ্ছেদ নয়, মানুষের জীবন ও জীবিকার উপর আক্রমণ।

সওয়াল: এখানে আইনি সমস্যাও আছে। ২০১৪ সালের স্ট্রিট ভেন্ডরস অ্যাক্ট-এ রেল হকারদের সরাসরি সুরক্ষা নেই। আজ যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, আইনি সুরক্ষা না থাকা কতটা সমস্যার হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

জিয়াউল আলম: ২০১৪ সালের আইনে রেল হকারদের বাদ রাখা হয়েছে। আমাদের দাবি, রেল হকারদেরও আইনি স্বীকৃতি ও সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। এর সঙ্গে আরেকটি বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন জড়িত। রেলের জমি ও স্পেসকে ক্রমশ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, সেখানে হকারদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় এক পরিষেবা সরিয়ে, তাঁদের অনলাইন ব্যবসা বা বড় কর্পোরেট সাপ্লাই চেনের উপর নির্ভরশীল করে তোলার প্রবণতাও এর সঙ্গে যুক্ত।

একইভাবে, শহরের হকার ও ছোট ব্যবসায়ীদেরও উচ্ছেদ করা হচ্ছে। নোটবন্দি ও জিএসটির ধাক্কায় ছোট ব্যবসা এমনিতেই দুর্বল। বিপুল সংখ্যক বেকার মানুষের কাছে স্ব-উদ্যোগই অনেক সময় জীবিকার একমাত্র পথ। সেই পথও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। স্ব-উদ্যোগী মানুষের জীবিকাকে স্বীকৃতি দিতে হবে, মর্যাদা দিতে হবে, এবং নিয়মের আওতায় আনতে হবে। যখন-তখন হুলিয়া জারি করে উচ্ছেদ করা চলবে না।

সওয়াল: উচ্ছেদের নোটিশ কীভাবে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়েও অনেক অভিযোগ শুনছি। কোথাও বলা হচ্ছে নোটিশে স্বাক্ষর নেই, কোথাও আবার কোনও লিখিত নোটিশ ছাড়াই এসে উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আপনারা কী দেখছেন?

জিয়াউল আলম: বহু ক্ষেত্রে যে নোটিশ দেওয়া হচ্ছে, তাতে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের স্বাক্ষর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। অনেক জায়গায় প্রশাসন সরাসরি ভয় দেখিয়ে চলে যাচ্ছে। তবে মানুষ প্রতিরোধ করছেন। আদালতও বিভিন্ন ক্ষেত্রে রেলকে জমির মালিকানার নথি দেখাতে বলছে, উচ্ছেদের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করছে। ফলে বিষয়টি এত সহজে চাপা দেওয়া যাচ্ছে না।

সওয়াল: আদালতের কিছু নির্দেশে আপাতত কিছু জায়গায় স্বস্তি মিলেছে। প্রশ্ন হল, এ লড়াইয়ে আদালতের উপর শেষ পর্যন্ত কতটা ভরসা করা যায়?

জিয়াউল আলম: আদালতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে একমাত্র ভরসা আদালত হতে পারে না। রেল হকারদের জীবিকা প্রয়োজনীয় যাত্রীবান্ধব পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ রেলে যাতায়াত করেন। প্ল্যাটফর্ম, স্টেশন এবং চলন্ত ট্রেনে তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী সস্তা ও সহজলভ্য পরিষেবা হকাররা দিয়ে থাকেন। তাঁদের আই-কার্ড দেওয়া যেতে পারে, পরিচয় নথিভুক্ত করা যেতে পারে, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মের মধ্যে এনে এই জীবিকাকে উন্নত করা সম্ভব। বুলডোজার দিয়ে মানুষকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া সমাধান নয়। আমরা চাই, ২০১৪ সালের আইনের আওতায় রেল হকারদেরও আনা হোক, রেল এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতি তৈরি করুক।

সওয়াল: তাহলে, আদালতে লড়াই চললেও শেষ পর্যন্ত কি রাস্তার আন্দোলনের উপরেই বেশি জোর দিতে হবে?

জিয়াউল আলম: অবশ্যই। শেষ পর্যন্ত জনতার দরবারই সবচেয়ে বড় আদালত। যখন দৈনন্দিন জীবিকার ওপর নির্ভর মানুষ, অন্য শ্রমজীবী মানুষ এবং নাগরিক সমাজ একসঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, রাষ্ট্র এবং আদালত উভয়কেই সেই বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে।

সওয়াল: হকার উচ্ছেদের পক্ষে বারবার পথচারীদের অধিকারের কথা বলা হচ্ছে। যুক্তি, ফুটপাত মানুষের হাঁটার জন্য। অন্যদিকে হকারের জীবিকার প্রশ্নও আছে। দুই অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য কি বাস্তবে রক্ষা করা সম্ভব?

জিয়াউল আলম: অবশ্য সম্ভব। ফরমাল ও ইনফরমাল অর্থনীতি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ইনফরমাল সেক্টর ছাড়া ফরমাল সেক্টরের সাপ্লাই চেনও টিকবে না। হকারদের সরিয়ে দিয়ে প্যাকেটজাত বা ব্র্যান্ডেড পণ্যকে একমাত্র বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যথাযথ উন্নয়ন নয়। একজন মানুষ ভাঁড়ের চা খাবেন না মেশিনে তৈরি চা খাবেন, স্থানীয় পণ্য কিনবেন না ব্র্যান্ডেড পণ্য কিনবেন—সেটা তাঁর পছন্দের বিষয়। পথচারীদের চলাচলের জায়গা নির্ধারিত করতে হবে, সে কারণে হকারদের জীবিকা ধ্বংস করা যাবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট জায়গা, নিয়ম ও সময় নির্ধারণ করে দুই অধিকারকেই রক্ষা করা সম্ভব।

সওয়াল: এখানেই শহর নিয়ে প্রশ্ন আসে। আমরা কি এমন একটা নগরোন্নয়নের মডেলের দিকে যাচ্ছি, যেখানে শহরকে যাঁরা তৈরি করেন, শহরকে প্রতিদিন সচল রাখেন, সেই শ্রমজীবী মানুষ ধীরে ধীরে শহর থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবেন?

জিয়াউল আলম: এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। শহর তৈরি করেছেন কারা? মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, গঞ্জাম-সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শ্রমজীবী মানুষ। রাস্তা, রেল, বিমানবন্দর, বাড়ি, নিকাশি ব্যবস্থা থেকে শুরু করে শহরের দৈনন্দিন পরিষেবা—সবকিছুর সঙ্গে তাঁদের শ্রম জড়িয়ে আছে। আজ এনক্রোচার বলে তাঁদের সরিয়ে দিলে শহর চলবে কীভাবে? নতুন আবাসিক এলাকায় গৃহপরিচারক, নিরাপত্তাকর্মী, ডেলিভারি কর্মী, মেরামতির কর্মী, ছোট দোকানদার, পরিষেবা প্রদানকারী মানুষ কোথা থেকে আসবেন? অতএব, নগর পরিকল্পনাকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। শ্রমজীবী মানুষের জন্য আবাসন, জীবিকা, পরিচয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনের সময় তাঁদের ব্যবহার করে, পরে ফেলে দেওয়া যাবে না। এটা ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট নয়, এটা বিকৃত উন্নয়ন।

সওয়াল: একটা জায়গা পরিষ্কার করে জানতে চাই। দাবি হিসেবে বারবার শুনছি, ‘পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়’। সেটাই কি যথেষ্ট? নাকি আপনাদের অবস্থান আরো এক ধাপ এগিয়ে—হকার উচ্ছেদই করা যাবে না?

জিয়াউল আলম: উন্নয়নের জন্য কোনো জায়গা সত্যি প্রয়োজন হলে, কিছু পুনর্বিন্যাস করতে হতে পারে। রেলের তৃতীয় বা চতুর্থ লাইন হতে পারে, মেট্রো হতে পারে, রাস্তা চওড়া হতে পারে। সেকারণে মানুষকে উচ্ছেদ করে রাস্তায় ফেলে দেওয়া যায় না। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে রেল, রাজ্য সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকে যৌথভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিকল্প জায়গা দিতে হবে, জীবিকা নির্বাহের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

অন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, জমির মালিকানা। রেল বহু জায়গাকে নিজেদের জমি বলে দাবি করছে, অথচ সেখানে মানুষের পাট্টা, দাগ-খতিয়ান বা অন্যান্য নথি রয়েছে। সেগুলিও যাচাই করতে হবে। মানুষ যত বেশি উচ্ছেদের মুখে পড়বেন, তত বেশি জায়গা থেকে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়বে।

সওয়াল: তাহলে এই আন্দোলনকে শুধু হকারদের আন্দোলনের মধ্যে আটকে না রেখে আরও বড় সামাজিক আন্দোলনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা কি রয়েছে?

জিয়াউল আলম: এটা ইতিমধ্যেই, স্বাভাবিকভাবেই, সামাজিক আন্দোলনের দিকে এগোচ্ছে। মানুষ অমানবিক নয়। তাঁরা চান আলোচনা হোক, বাস্তবসম্মত সমাধান বের হোক, জীবিকা ও বাসস্থানের ক্ষেত্রে মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত হোক। নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ ইতিমধ্যেই যুক্ত হচ্ছেন। ভারতসভা হল, সুবর্ণবণিক হল এবং বিভিন্ন জেলা ও এলাকায় সভা হচ্ছে। স্থানীয় স্তর থেকেও বিকল্প প্রস্তাব আসছে। সরকার ও রেল কর্তৃপক্ষের সেই প্রস্তাবগুলির প্রতি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। হুলিয়া জারি করে সমস্যার সমাধান হয় না।

সওয়াল: হকারদের অনেকেই বলছেন, নির্দিষ্ট ফি দিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা করতে রাজি। তাঁদের অভিযোগ, কেউ কথাই বলছে না। যদি সংলাপই বন্ধ থাকে, সমাধান আসবে কীভাবে?

জিয়াউল আলম: সংলাপ ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়। যেমন ট্যাক্সি বা অ্যাপ-ক্যাবের জন্য নির্দিষ্ট জায়গার প্রয়োজন হয়, তেমনই রেলস্টেশনের বাইরে বা আশপাশে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি করা যায়। শিয়ালদহের মতো জায়গায় যাত্রীদের চলাচলে বাধা না দিয়ে ছোট ছোট নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করা যেতে পারে। রেগুলেশন থাকবে, নির্দিষ্ট ফি থাকবে এবং যাত্রীদের প্রয়োজনীয় পরিষেবাও বজায় থাকবে। সরকারের কাজ মানুষের পছন্দকে গলা টিপে বন্ধ করা নয়, বরং বিভিন্ন ধরনের পরিষেবার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।

সওয়াল: শেষ প্রশ্ন। ১৯৯৬ সালের অপারেশন সানশাইনের প্রসঙ্গ এখন আবার ফিরে আসছে। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন—যাঁরা তখন হকার উচ্ছেদ করেছিলেন, তাঁরা আজ কোন মুখে হকারদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন? শ্রমিক সংগঠনের নেতা হিসেবে এর উত্তর কীভাবে দেবেন? সেই সময়ের উচ্ছেদ ও আজকের উচ্ছেদের মধ্যে মূল পার্থক্য কোথায়?

জিয়াউল আলম: অপারেশন সানশাইনের সময়ও পুনর্বাসনের প্রশ্ন ছিল এবং বহু ক্ষেত্রে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। সেই সময়ের হকার উচ্ছেদ নিয়েও আলোচনা হয়েছিল এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলি তার বিরোধিতা করেছিল। আজকের পরিস্থিতিতে মূল পার্থক্য, বিকল্প পরিকল্পনা বা সংলাপ ছাড়াই হুলিয়া জারি করে উচ্ছেদ। এমনকি আগে সরকার যে জায়গায় পুনর্বাসন দিয়েছিলো, সেখানেও উচ্ছেদের চেষ্টা হচ্ছে।

কোনো জায়গা উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হলে, সরকারকে বিকল্প প্রস্তাব দিতেই হবে। মানুষকে এত নির্মমভাবে সরিয়ে দেওয়া যায় না। বড় কর্পোরেটের জন্য সরকার যতটা সহায়ক, গরিব, নিম্নবিত্ত এবং স্বল্প পুঁজির মানুষের প্রতি ততটাই নির্মম। ফলে অর্থনীতি এবং শহর—দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আলোকচিত্র: কুশল কর