হকারদের অধিকার, উচ্ছেদ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা: শক্তিমান ঘোষের সঙ্গে কথোপকথনে সওয়াল

লেখক সওয়াল ডেস্ক · 11 Sep 2026, 09:23 PM
হকারদের অধিকার, উচ্ছেদ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা: শক্তিমান ঘোষের সঙ্গে কথোপকথনে সওয়াল

(হকার অধিকার আন্দোলনের দীর্ঘদিনের কর্মী শক্তিমান ঘোষের সঙ্গে কথোপকথনে সওয়াল-এর প্রতিনিধি শৌনক মুখোপাধ্যায়)

ভারতের শহরগুলির অর্থনীতি ও জনজীবনে হকারদের উপস্থিতি এতটাই স্বাভাবিক যে তাঁদের অস্তিত্বকে আমরা প্রায়শই আলাদা করে ভাবি না। অথচ ফুটপাত, স্টেশন, বাজার কিংবা রাস্তার ধারে বসে যাঁরা প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেন, তাঁদের জীবিকা বরাবরই রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত, উচ্ছেদতড়িত এবং অনিশ্চিত। উন্নয়ন, নগরায়ণ, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং ‘অবৈধ দখল’—এই যুক্তিপুঞ্জের আড়ালে বারবার তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। একইসঙ্গে, হকারদের জীবিকার অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার জন্যও দীর্ঘ আন্দোলন হয়েছে।

এই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ শক্তিমান ঘোষ। হকার ও স্ট্রিট ভেন্ডরদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ১৯৯৬ সালের কলকাতার অপারেশন সানশাইন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে হকারদের অধিকার, পুনর্বাসন এবং আইনি স্বীকৃতির দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই, কলকাতার হকার আন্দোলন কীভাবে ধীরে ধীরে একটি সর্বভারতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে এবং কীভাবে সেই আন্দোলনের সূত্রে ২০১৪ সালের স্ট্রিট ভেন্ডরস (প্রোটেকশান অফ লাইভলিহুড য়্যান্ড রেগুলেশান অফ স্ট্রিট ভেন্ডিং) য়্যাক্ট প্রণয়নের দাবি ও প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছে।

বর্তমান সময়ে এই প্রশ্ন উঠে আসছে বাড়তি গুরুত্ব নিয়ে। ‘অমৃত ভারত স্টেশন’ প্রকল্পের মাধ্যমে রেলস্টেশনগুলির আধুনিকীকরণ, স্টেশন ও রেল-চত্বরের বাণিজ্যিকীকরণ, হকার ও রেলপাড়ের বসতি উচ্ছেদ, বুলডোজার-নির্ভর উচ্ছেদ অভিযান এবং শহরের জনপরিসর নিয়ে নতুন ধরনের নীতির মধ্যে দিয়ে হকারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অন্যদিকে, বেকারত্ব, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সময়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন হিসেবেও হকারি টিকে রয়েছে।

এই সাক্ষাৎকারে সওয়ালের প্রতিনিধি শৌনক, শক্তিমান ঘোষের সঙ্গে কথা বলেছেন হকার উচ্ছেদের ইতিহাস, অপারেশন সানশাইন, বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত নগরায়ণ প্রকল্প, রেলের সঙ্গে হকারদের সম্পর্ক, ২০১৪ সালের আইন, আদালতের ভূমিকা, অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্প, হকার-নির্ভর নগর অর্থনীতি এবং বর্তমান আন্দোলনের কৌশল নিয়ে। আলোচনায় উঠে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—জনপরিসর কার এবং শহরের উন্নয়ন কাদের জন্য?

শক্তিমান ঘোষের বক্তব্য একইসঙ্গে একটি দীর্ঘ আন্দোলনের স্মৃতিচারণ, রাষ্ট্রের নীতি ও রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকার সমালোচনা এবং ভবিষ্যৎ আন্দোলনের পথ নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান। তাঁর মতে, হকারদের প্রশ্নকে কেবল ‘এনক্রোচমেন্ট’ বা শহর পরিচ্ছন্ন রাখার প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখলে বিষয়টির সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়। জীবিকার অধিকার, আবাসনের অধিকার, জনপরিসরের ব্যবহার এবং নগর উন্নয়নের প্রশ্নকে একই কাঠামোর মধ্যে রেখে দেখাই এই বিতর্ককে বোঝার চাবিকাঠি।

কথোপকথন থেকে প্রশ্ন ওঠে—উন্নয়নের নামে শহর বদলালে সেখানে মানুষের বসবাসের, জীবিকা নির্বাহ করার জায়গা থাকে কী? রাষ্ট্র যখন উচ্ছেদের পথে হাঁটে, তখন নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলন, আইন ও আদালতের ভূমিকা কী হতে পারে?

কথোপকথন

সওয়ালঃ হকার অধিকার আন্দোলনে আপনাদের অবদান প্রশ্নাতীত। ২০১৪ সালের আইন হকার অধিকার সুরক্ষিত করার প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবু, প্রশ্ন থাকে, তখন রেল হকারদের আপনাদের আন্দোলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি?

শক্তিমানঃ এই বিষয়টা দেখতে গেলে আমাদের একটু পিছনের দিকে যেতে হবে। ১৯৯৬ সালের আন্দোলনের সময় আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম, বোধহয় সত্যিই রাস্তায় চলাচলের অসুবিধার জন্যই সরকার হকার উচ্ছেদের কথা বলছে। সরকার তখন বলছিল—হকাররা জবরদখল করছে, মানুষ চলাচল করতে পারছে না, দুর্ঘটনা হচ্ছে—এই ধরনের নানা যুক্তি।

পরবর্তীকালে আমরা বুঝতে পারলাম, আসলে এটা মূল উদ্দেশ্য নয়। পিছনে আরও অনেক বড় একটা উদ্দেশ্য ছিল। বিশ্বব্যাংকের বড় ভূমিকা ছিল। তথাকথিত নগরায়ণের মাধ্যমে কলকাতাকে ‘মেগা সিটি’তে পরিণত করার পরিকল্পনা হচ্ছিল। তার জন্য প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকার একটা প্রস্তাবও ছিল। শুধু কলকাতা নয়—একই সময়ে বোম্বে, দিল্লি, জয়পুরসহ দেশের বিভিন্ন শহরেও একই ধরনের পরিকল্পনা হচ্ছিল।

তখন আমরা বুঝলাম, বিষয়টা শুধু কলকাতার হকারদের সমস্যা নয়। এটা আসলে সর্বভারতীয় সমস্যা। আন্দোলনের গতিপথও একটু পরিবর্তিত হল, আমরা অল ইন্ডিয়া ফরমেশনের দিকে গেলাম। কারণ আক্রমণটা যখন শুধু কলকাতায় হচ্ছে না, তখন লড়াইটাও শুধু কলকাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।

সেই পরিপ্রেক্ষিতেই ২০০০ সালের ৭, ৮ ও ৯ জানুয়ারি লরেটোতে তিন দিনের একটা অল ইন্ডিয়া মিটিং ডাকা হয়। ভারতবর্ষের যেখানে যেখানে হকারদের সমস্যা, গণ্ডগোল বা উচ্ছেদের ঘটনা ঘটছিল, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে পুলিশের প্রতিনিধি, পার্লামেন্টের মেম্বার—বিভিন্ন স্তরের মানুষ সেই তিন দিনের সম্মেলনে এসেছিলেন।

সেখান থেকেই আমরা একটা বিষয় খুব জোর দিয়ে বলেছিলাম—হকারদের জন্য একটা নির্দিষ্ট পলিসি তৈরি করতে হবে। আর ওই আলোচনা থেকেই আমরা ন্যাশনাল হকার ফেডারেশন তৈরি করি। তখন আমাদের মূল সিদ্ধান্ত ছিল, গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে আন্দোলন করতে হবে এবং সরকারকে বলতে হবে—হকারদের জন্য জাতীয় নীতি তৈরি করো।

এর সভার খেই ধরে, ২০০১ সালে দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে স্ট্রিট ভেন্ডরদের নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ডাকা হয়। বিভিন্ন রাজ্যের মন্ত্রী, কর্পোরেশনের কমিশনার, পুলিশের প্রতিনিধি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের প্রতিনিধি—সবাই ছিলেন। আমরা সেখানে হকারদের যে সমস্যাগুলো, যে প্রশ্নগুলো তুলে ধরেছিলাম, সেগুলো নিয়েই আলোচনা হয়।

তারপর হকারদের জন্য একটা নীতি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়, ১৮ জনের একটা টাস্ক ফোর্স তৈরি হয়। সেই প্রথম টাস্ক ফোর্সে হকারদের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা সাতজন ছিলাম। রেলের একজন জেনারেল ম্যানেজারও টাস্ক ফোর্সের মধ্যে ছিলেন। অর্থাৎ, প্রথম দিকে রেলও এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল।

কিন্তু পরে আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা সময় দেখা গেল, রেলকে এই প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রেলের পক্ষ থেকে বলা হল, তাদের কনস্টিটিউশন বা আইনি কাঠামোর মধ্যে হকারদের রিহ্যাবিলিটেশনের কোনও ব্যবস্থা নেই। সেই যুক্তির ভিত্তিতেই রেলকে এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হল। এর ফল আমরা ২০০৪ সালের পলিসির সময় দেখতে পেলাম। ২০০৪ সালের যে হকার পলিসি তৈরি হল, সেখানে রেলের বিষয়টাই আর এল না। সরকার এই যুক্তির ভিত্তিতেই রেলকে হকারদের বিষয় থেকে সরিয়ে দিল।

আমরা কিন্তু তখনও বিষয়টা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কথা বলেছি। রেলের লোকজনকে বলেছি, আলোচনায় আসুন, কীভাবে রেলের হকারদের এই পলিসির মধ্যে ইনকর্পোরেট করা যায়, সেটা দেখা দরকার। কারণ রেলের হকাররাও তো হকার। তাঁদের সমস্যাটাকেও আলাদা করে দেখা যায় না। দুর্ভাগ্য, ২০১৪ সালে আইন পাশ হওয়ার পরেও আমরা যখন বারবার বিষয়টা বলার চেষ্টা করেছি, রেল সেইভাবে এগিয়ে আসেনি। এমনকি রেল ইউনিয়নগুলিও সেই অর্থে এগিয়ে আসেনি।

এখানেই আমার কাছে একটা প্রশ্ন আরও বড় হয়ে ওঠে। একটা সময় ইউপিএ সরকার বামপন্থীদের সমর্থনের উপর নির্ভরশীল ছিল। সেই সময় রেলের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন সিপিআই(এম)-এর বাঁকুড়ার বিখ্যাত নেতা বাসুদেব আচার্য। তিনি দীর্ঘদিন ওই স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তাহলে প্রশ্নটা হচ্ছে—এতদিন ধরে তিনি এত গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গায় ছিলেন, সেই কমিটির ক্ষমতাও যথেষ্ট ছিল, অনেকটা মন্ত্রীর সমতুল ক্ষমতা ছিল—তাহলে রেলের হকারদের বিষয়টা নিয়ে কেন একটা স্থায়ী নিষ্পত্তি হল না? কেন রেলের হকারদের বিষয়টা আইন বা পলিসির মধ্যে ইনকর্পোরেট করার জন্য সেই সময় থেকে একটা উদ্যোগ নেওয়া হল না?

আমাদের কাছে এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কারণ আমরা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেছি রেলের হকারদেরও এই আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু রেল, রেল ইউনিয়ন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব—কেউই সেভাবে এগিয়ে এল না। ফলে এত বছর পরেও রেলের হকারদের প্রশ্নটা একটা বড় অমীমাংসিত বিষয় হয়ে রয়ে গেল।

সওয়াল: আপনার কথায় একটা বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে যে, রেলের অবস্থানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ঔপনিবেশিক মানসিকতারও প্রতিফলন রয়েছে—অর্থাৎ, পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেওয়া বা হকারদের জীবিকার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে রেল নিজেকে দায়বদ্ধ মনে করে না। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, যেখানে জীবিকার অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই অবস্থান কতটা গ্রহণযোগ্য?

বর্তমান পরিস্থিতিতে আসা যাক। ২০২২ সালের পর থেকে ‘অমৃত ভারত স্টেশন’ প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন রেলস্টেশনের পুনর্নির্মাণ ও আধুনিকীকরণ হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের ঘটনাও সামনে এসেছে। অভিযোগ, স্টেশনকে তথাকথিত আধুনিক ও বাণিজ্যিক পরিসরে পরিণত করার জন্য হকারদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে—একদিকে যেমন তাঁদের জীবিকা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য সস্তায় পণ্য কেনাবেচার যে পরিসর ছিল, সেটাও সংকুচিত হচ্ছে।

আপনি বর্তমান উচ্ছেদ-প্রক্রিয়াকে কীভাবে দেখছেন? ‘অমৃত ভারত স্টেশন’ প্রকল্পের সঙ্গে হকার উচ্ছেদ ও রেল-চত্বরের বাণিজ্যিকীকরণের মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক কী আপনি দেখতে পাচ্ছেন? এই প্রক্রিয়ায় উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণের নামে আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে—আর কাঁরা তার মূল্য দিচ্ছেন?

শক্তিমান: না না, আপনি ঠিকই বলছেন। আসলে স্টেশনগুলোকে ঝাঁ-চকচকে করে তোলা হবে। সেখানে কেএফসি থেকে শুরু করে নানা ধরনের কর্পোরেট ব্র্যান্ড থাকবে। এয়ারপোর্টে যেমন দেখি, অনেকটা সেই ধরনের পরিবেশ তৈরি করা হবে—স্টেশনগুলোকে একরকম ‘মিনি এয়ারপোর্ট’-এর মতো করে তোলা হবে। সেখানে গরিব মানুষ বাঁচল কি মরল, তাদের জীবিকা থাকল কি থাকল না—সেটা নিয়ে কারুর কোনো মাথাব্যথা নেই। কর্পোরেটের যেমন নেই, তেমনই সরকারেরও নেই। কারণ, সরকারের চরিত্রটাই ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। ওয়েলফেয়ার স্টেটের যে চরিত্র, সরকার ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে আসছে। রাষ্ট্র যখন তার ওয়েলফেয়ার স্টেটের চরিত্রটা সরিয়ে দেয়, তখন সে মূলত প্রশাসনিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। প্রশাসনিক রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কাদের স্বার্থ রক্ষা করে, আমরা সবাই জানি।

তবে, আমরা এই লড়াই ছেড়ে দিইনি। যদিও আমরা নিজেরা সরাসরি রেল হকারদের নিয়ে কাজ করিনি, আমরা স্ট্রিট ভেন্ডরদের নিয়ে গোটা ভারতবর্ষে কাজ করি। আজ দেশের ২৯টা রাজ্যেই আমাদের সংগঠন আছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা আন্দোলন করছি। বহুবার পার্লামেন্ট ঘেরাও করেছি, এই আইন এবং হকারদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেছি। এখন আমরা একটা জায়গায় এসে বুঝতে পারছি যে, রেলের হকারদেরও যদি আইনের আওতায় নিয়ে আসা না যায়, তাঁদের বাঁচানো খুব কঠিন হবে। তাই এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, রেলের হকারদেরও আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসাটাই একমাত্র রাস্তা। রেল হকারদের নিয়ে এতদিন কাজ না করলেও, এই পরিস্থিতিতে আমরা সে দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি না। তাই, এখন আমরা সেদিকেই এগোচ্ছি। মূল লক্ষ্য—রেলের হকারদেরও আইনের সুরক্ষার মধ্যে নিয়ে আসা, তাঁদের জীবিকার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া।

“
বিচারপতি ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড়ের বাবা, বিচারপতি ওয়াই. ভি. চন্দ্রচূড়, ১৯৮৫ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছিলেন। সেখানে হকারদের হকিং বা রাস্তার উপর ব্যবসা করার অধিকারকে মৌলিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন, যদি আমার জীবিকার অধিকার থাকে, তাহলে আমি ইল্লিগাল হলাম কোথা থেকে?

সওয়াল: আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। হকার উচ্ছেদের ক্ষেত্রে বারবার যুক্তি দেওয়া হয়, মূল উদ্দেশ্য নাকি বেআইনি দখল বা ইল্লিগাল এনক্রোচমেন্ট বন্ধ করা—এর বাইরে নাকি অন্য কোনও উদ্দেশ্য নেই। এখানে একটা মৌলিক প্রশ্ন ওঠে। পাবলিক স্পেস বা জনপরিসর কার জন্য? দেশের সাধারণ মানুষই তো সে পরিসর ব্যবহার করবে। একদিকে যেমন মানুষের চলাচলের অধিকার, নিরাপদ ও উন্মুক্ত জনপরিসরের অধিকার রয়েছে, অন্যদিকে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবিকা ও জীবনধারণের অধিকারের প্রশ্নও এসেছে। তাহলে এখানে ভারসাম্য রক্ষার সূক্ষ্ম প্রশ্ন তৈরি হয়। একদিকে মানুষের অবাধ চলাচল এবং জনপরিসর ব্যবহারের অধিকার, অন্যদিকে সেই একই জনপরিসরের উপর নির্ভর করে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা।

তাহলে জবরদখলের যুক্তি কতদূর পর্যন্ত গ্রহণ করব? কোথায় জনস্বার্থের কারণে নিয়ন্ত্রণ বা উচ্ছেদ যুক্তিসঙ্গত, আর কোথা থেকে মানুষের জীবিকা ও জীবনধারণের অধিকারের প্রশ্নটি অগ্রাধিকার পাবে? দুইয়ের মধ্যে সীমারেখা কীভাবে নির্ধারণ করা উচিত? এক্ষেত্রে কী কোনো সুস্পষ্ট নীতি বা সাংবিধানিক বাউন্ডারি থাকা দরকার?

শক্তিমান: দেখুন, আমি ‘এনক্রোচমেন্ট’ বলে ব্যাপারটাকে বিশ্বাসই করি না। কারণ ভারতবর্ষের সংবিধান রাষ্ট্রকে একটা দায়িত্ব দিয়েছে—মানুষের রুটি, কাপড়, বাসস্থানের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব। রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করেনি। ফলে আমি রাস্তায় বসতে বাধ্য হয়েছি। তাহলে আমাকে আপনি কীভাবে ‘এনক্রোচার’ বলবেন? আজকের ভারতবর্ষে যে বেকারত্ব, তা গত কয়েক দশকের মধ্যে তীব্রতম। আজ একজন মানুষ চাকরি পায়নি বলেই রাস্তায় এসে হকারি করছে। আপনি এমন একজন মানুষকে দেখাতে পারবেন না, যে বুকে হাত দিয়ে বলবে—“আমি স্বেচ্ছায় হকার হতে এসেছি।” আমি হকার হতে বাধ্য হয়েছি। আমাকে রাষ্ট্র বাধ্য করেছে।

একজন মানুষ হকার হওয়ার আগে হাজারবার ভাবে। কারণ হকারি করা খুব সহজ ব্যাপার নয়। একজন মানুষ যখন হকারি শুরু করে, তার সামনে কার্যত দুটো রাস্তা খোলা থাকে—একটা ভিক্ষা করা, আরেকটা অপরাধের জগতে চলে যাওয়া। এর বাইরে তার সামনে অন্য কোনো রাস্তা থাকে না। তাই মানুষ হকার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বারবার ভাবে। যখন একজন মানুষের জীবনের সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, তখনই সে রাস্তায় একটা জায়গা খুঁজে নিয়ে হকারি করতে শুরু করে। সেই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? রাষ্ট্র। যদি সেই মানুষটা একটা চাকরি পেত, তাহলে সে হকারি করতে রাস্তায় আসত না। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করেনি। তাই আমাকে ‘ইল্লিগাল’ বলা যায় না। এটা শুধু আমার রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এর একটা সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি আছে। যারা আজ হকারদের ‘ইল্লিগাল’ বলছেন, তাঁদের সামনে এই বিষয়গুলো তুলে ধরা দরকার।

বিচারপতি ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড়ের বাবা, বিচারপতি ওয়াই. ভি. চন্দ্রচূড়, ১৯৮৫ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছিলেন। সেখানে হকারদের হকিং বা রাস্তার উপর ব্যবসা করার অধিকারকে মৌলিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন, যদি আমার জীবিকার অধিকার থাকে, তাহলে আমি ইল্লিগাল হলাম কোথা থেকে? সংবিধান আমাকে জীবনের অধিকার দিয়েছে। জীবনের অধিকার যদি থাকে, তাহলে সেই জীবন চালানোর জন্য জীবিকারও প্রয়োজন আছে। এই কারণেই সংবিধানের ১৯(১)(জি) এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদকে একসঙ্গে পড়ে আদালত হকারদের জীবিকার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে একজন হকারকে শুধুমাত্র ‘এনক্রোচার’ বা ‘ইলিগাল’ বলে চিহ্নিত করে উচ্ছেদ করে দেওয়া যায় না।

আমার কাছে তাই বিষয়টা পরিষ্কার—আমি বেআইনি নই। আমি একজন নাগরিক, আমার জীবিকার অধিকার আছে। সে অধিকারকে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

সওয়াল: আচ্ছা, তাহলে আরেকটা বিষয় জানতে চাই। হকার উচ্ছেদের ঘটনা তো নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন সরকারের আমলে আমরা উচ্ছেদ দেখেছি—অপারেশন সানশাইন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন উচ্ছেদ অভিযান পর্যন্ত।

বর্তমানে যে ধরনের উচ্ছেদ আমরা দেখছি, বিশেষ করে বুলডোজার ব্যবহার করে যেভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে এবং যাকে অনেকে ‘বুলডোজার রাজনীতি’ বলে চিহ্নিত করছেন, তার সঙ্গে আগের উচ্ছেদগুলোর কি কোনও মৌলিক পার্থক্য আপনি দেখতে পাচ্ছেন? অর্থাৎ, উচ্ছেদ তো আগেও হয়েছে। বর্তমান সময়ের উচ্ছেদের চরিত্র, উদ্দেশ্য, পদ্ধতি এবং তার পিছনে যে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দর্শন কাজ করছে—সেগুলোর মধ্যে কোনো নতুনত্ব বা মৌলিক পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন?

শক্তিমান: না, পার্থক্য অবশ্যই আছে। পার্থক্যটা হচ্ছে—রেল অনেক আগে থেকেই চেষ্টা করছিল, পশ্চিমবঙ্গ সরকারও বিভিন্ন সময়ে চেষ্টা করেছে। এই যে স্টেশনগুলোকে ঝকঝকে, ঝাঁ-চকচকে করা হবে, আধুনিক করা হবে—এর পিছনে আসলে যে বড় পরিকল্পনা আছে, সেটা হল রেলকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া। আমরা তো বলেই আসছি, রেলকে আদানির হাতে তুলে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া চলছে, তার সঙ্গে এই স্টেশনগুলোর বাণিজ্যিকীকরণের সম্পর্ক আছে। স্টেশনগুলো বাণিজ্যিক সম্পত্তিতে পরিণত হবে। সেই জায়গায় হকারদের মতো সাধারণ মানুষের জায়গা থাকবে না।

কিন্তু আগের সরকারগুলো যতই চেষ্টা করুক, এইভাবে বুলডোজার নামিয়ে উচ্ছেদ করতে পারেনি। কারণ তখন স্টেট মেশিনারি সেইভাবে তাদের সাহায্য করেনি। আজকের সঙ্গে আগের সময়ের এটাই একটা বড় পার্থক্য। যারা একসময় খুব খুশি ছিলেন, আনন্দে ছিলেন, ভেবেছিলেন ‘ভালো দিন’ আসছে, এখন তাঁরাই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন ব্যাপারটা কী। যাঁদের জন্য তাঁরা লড়াই করছেন, তাঁরাই এখন বলছেন—“ভাই, আমাদের ভালো দিন দরকার নেই, ওই আগের দিনটাই ফিরিয়ে দাও। পুরনো খারাপ দিনটাই ফিরিয়ে দাও।” মার খেতে খেতেই মানুষ বলছে—“কী ভুল করেছি!”

তাই যারা আজ রাস্তায় নেমেছেন, লড়াই করছেন, তাঁদের অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হবে। তাঁরা মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু আমার মাঝে মাঝে একটা কথা মনে হয়। রাতে শুয়ে ভাবি—এই নেতারা যদি ১৯৯৬ সালে থাকতেন, তাহলে কি অপারেশন সানশাইন হতে দিতেন? আজকে যাঁরা এত বড় বড় কথা বলছেন, হকারদের জীবিকার কথা বলছেন, তাঁদের একটা প্রশ্ন তো করতেই হয়—তখন তাঁরা কোথায় ছিলেন? সেদিনের সিপিআই(এম) এবং আজকে যাঁরা হকারদের অধিকার নিয়ে লড়ছেন, তাঁদের মধ্যে যে একটা বড় পার্থক্য আছে, অস্বীকার করা যায় না। আমরা তো সেই সময়ের ঘটনাগুলো নিজের চোখে দেখেছি।

রেলের হকার নিয়ে কাজ করি না, কিন্তু হকার উচ্ছেদের ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ সম্পর্ক আছে। আমি নিজে দেখেছি, কীভাবে ‘জবরদখলকারী’, ‘এনক্রোচার’ বলে হকারদের আঙুল তুলে দেখানো হয়েছে। সুভাষ চক্রবর্তী একসময় বলেছিলেন—“বালক ব্রহ্মচারীর মতো উড়িয়ে দেব।” তখন আমি বলেছিলাম, “সুভাষবাবু, এভাবে বলবেন না। তাহলে কিন্তু অনেকের অসুবিধা হয়ে যাবে।” কারণ ‘জবরদখলকারী’ কথাটা খুব সাবধানে ব্যবহার করতে হয়। স্বাধীনতার আগে-পরে পূর্ববঙ্গ থেকে এপারে আসা বহু মানুষ কলোনিতে জায়গা দখল করে বসতি তৈরি করেছিলেন। সেই ইতিহাসের সঙ্গে তৎকালীন বহু রাজনৈতিক নেতারও সম্পর্ক ছিল। পরে সম্পত্তি নিয়ে নানা ধরনের লেনদেনও হয়েছে। সবাইকে জবরদখলকারী বলতে শুরু করলে অনেককেই অস্বস্তিতে পড়তে হবে।

আমি তখন বলেছিলাম—আইন আছে। সুভাষবাবু জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কী আইন আছে?” আমি বলেছিলাম, হকারদের হকিং-এর অধিকার নিয়ে আদালতের রায় আছে, ‘হকিং ইজ আ ফান্ডামেন্টাল রাইট’। কিন্তু তখন যে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বলা হয়েছিল, “ওটা ছিঁড়ে ফেলে দেব”—সেটা আজ ভাবলেও অবাক লাগে। সেই ঔদ্ধত্যের ফলেই অপারেশন সানশাইনের সময় ১৮ জন হকার আত্মহত্যা করেছিলেন, ভুলে যেতে পারি না। আমরা তখন বলেছিলাম—“অপারেশন সানশাইন নয়, অপারেশন সানসেট—সূর্য ডুবে থাকবে না।

১৯৯৭ সালে বিধানসভায় এমন একটা আইনও পাস হয়েছিল, যেখানে হকিং অবস্থায় কাউকে ধরা হলে জরিমানার সঙ্গে ছয় মাসের জেলের বিধান ছিল, এবং সেটাকে নন-বেলেবল অফেন্স করা হয়েছিল। এটা কতটা উদ্ভট ব্যাপার, ভাবুন। যে দেশে ধর্ষণ, ডাকাতি, চুরি, এমনকি খুনের মতো গুরুতর অপরাধেও আইনের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্যে জামিনের সুযোগ থাকে, সেখানে একজন মানুষ রাস্তায় বসে হকারি করলে তাকে ছয় মাসের নন-বেলেবল অপরাধের আওতায় আনা হয়েছিল। সেই আইন আজও পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়নি।

আমরা এই ইতিহাস ভুলে যাইনি। এই কারণেই হয়তো আমরা সবসময় একসঙ্গে যেতে পারি না। আমাদের সামনে কিছু ঐতিহাসিক বাধা আছে। কাদের সঙ্গে যাব, কীভাবে যাব—এই প্রশ্নগুলো থেকেই যায়। তবে একটা কথা পরিষ্কার—স্ট্রিট ভেন্ডরদের উপর যখনই আক্রমণ আসবে, আমরা প্রস্তুত। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমাদের সংগঠন আছে, মানুষ আছে, দীর্ঘদিনের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা আছে।

“
আমাদের লড়াইয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল—আন্দোলন, সংলাপ এবং আদালত—এই তিন পথ একসঙ্গে চলবে। উচ্ছেদ করতে এলে আমরা আদালতে যাব, রাস্তায় নামব, আবার আলোচনাও চাইব। তবে আমরা নিয়ন্ত্রণের বিরোধী নই। যে হকাররা বেআইনিভাবে পুরো ফুটপাত দখল করে রাখছেন, পিচের রাস্তায় বসছেন, গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নির্দিষ্ট নিষিদ্ধ এলাকার মধ্যে বসছেন

সওয়াল: আপনার কথায় একটা বিষয় বারবার উঠে আসছে—ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, হকারদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কটা মূলত ভোটের সময় একরকম, আর ভোটের পরে আরেকরকম। বাম সরকার, তৃণমূল সরকার, কংগ্রেস—প্রত্যেকেই কোনও না কোনও সময় হকারদের সমর্থন চেয়েছে, আবার উচ্ছেদও করেছে। আজ বিজেপিকে ভোট দেওয়া অনেক হকারও বলছেন, “ভেবেছিলাম এবার শান্তিতে কাজ করতে পারব, অথচ উচ্ছেদ করা হচ্ছে।” তাহলে কি সমস্যাটা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়, বরং রাষ্ট্র ও হকারদের মধ্যকার একটা কাঠামোগত অসম সম্পর্কের? ভোটের রাজনীতি আর জীবিকার সংগ্রামের রাজনীতির এই পার্থক্যটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

আর একটা সমস্যা হচ্ছে—দমদমের মতো জায়গায় উচ্ছেদ হওয়া হকাররা বলছেন, তাঁরা প্রয়োজনে ফি বা ভাড়া দিতে প্রস্তুত, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কেউ কথা বলছে না। রেল বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও আলোচনাও হচ্ছে না; শুধু পুলিশ এসে উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আমার প্রশ্ন—আলোচনার দরজাই যদি বন্ধ থাকে, তাহলে সমাধানটা আসবে কোথা থেকে?

শক্তিমান: না, প্রথমত আমি মনে করি, তারা আলোচনা করতেই চায় না। কারণ তারা আসলে সমাধান চায় না। তারা বলপ্রয়োগ করে মানুষকে সরিয়ে দিতে চায়। প্রশ্ন হচ্ছে—কোথায় সরাবে? ভারতবর্ষের প্রায় চার কোটি হকারকে তুমি কোথায় সরাবে? তাঁদের পরিবার ধরলে সংখ্যাটা তো প্রায় ২০ কোটি মানুষের সঙ্গে যুক্ত। তাদের কি ছাদে পাঠাবে? নাকি দেশ থেকে হাঁটিয়ে বের করে দেবে? তারা তো ভারতবর্ষেই থাকবে। তাহলে রাষ্ট্র কী করবে? এই মানুষগুলোকে ভিখারি বানাবে, না কি অপরাধের পথে ঠেলে দেবে?

রাষ্ট্রের উচিত ছিল এই মানুষগুলোর জীবিকা কীভাবে সুরক্ষিত করা যায়, সেটা নিয়ে ভাবা। কিন্তু সেই আলোচনা তারা করতে চাইছে না। আমরা জানি, রাষ্ট্রের বর্তমান নীতির মধ্যে এই মানুষগুলোর জীবিকার অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনও ইচ্ছা নেই।

রেল কর্তৃপক্ষের অপরাধ শুধু হকার উচ্ছেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার থেকেও বড় বিষয়, রেলের জমিতে যে বস্তি বা ঝুপড়ি রয়েছে, সেখানকার মানুষদের ঘরবাড়িও ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, জীবিকার পাশাপাশি, আবাসের অধিকারও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আমি এটাকে অত্যন্ত গুরুতর বিষয় বলে মনে করি। আন্তর্জাতিক স্তরেও ভারতের কিছু অঙ্গীকার আছে। ভারত সরকার ইস্তাম্বুল কনফারেন্সে অংশ নিয়ে এমন ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছে, যার মধ্যে মানুষের পর্যাপ্ত আবাসনের অধিকারের বিষয়টি স্বীকৃত হয়েছে। একদিকে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক স্তরে মানুষের মাথার উপর ছাদের অধিকারকে স্বীকার করছে, আর অন্যদিকে সেই রাষ্ট্রেরই একটি প্রতিষ্ঠান মানুষের ঘর ভেঙে তাকে খোলা আকাশের নিচে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে—এটা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

হকারের জীবিকা যেমন একটা অধিকার, মানুষের মাথার উপর নিরাপদ ছাদও বেঁচে থাকার মৌলিক শর্ত। উচ্ছেদ যদি করতেই হয়, তাহলে পুনর্বাসন কোথায়, বিকল্প জীবিকা কোথায়, বিকল্প আবাসন কোথায়—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর রাষ্ট্রকে দিতে হবে। শুধু বুলডোজার দিয়ে মানুষ সরিয়ে দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দেখুন, সমাধান করার ইচ্ছা থাকলে সমাধান আছে। ধরুন, রেলের কোনও জমি এক বিঘা। তার একটা অংশে আপনি ইন-সিটু ডেভেলপমেন্ট করে ওই মানুষগুলোর ঘর করে দিতে পারেন, আর বাকি জমিটা যাত্রীদের বা রেলের প্রয়োজনের জন্য ব্যবহার করতে পারেন। রাজ্য সরকারের আবাসন প্রকল্প, ‘আমার বাড়ি’ বা ‘বাংলার বাড়ি’, কিংবা প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা—এই সমস্ত প্রকল্পের অর্থের সঙ্গে রেলের নিজস্ব অর্থ যুক্ত করেও তো একটা স্থায়ী ব্যবস্থা করা সম্ভব।

একইভাবে স্টেশনের ক্ষেত্রেও পরিকল্পনা করে একটা অংশ মানুষের জন্য নির্দিষ্ট করা যায়, আর বাকি অংশ যাত্রীদের চলাচলের জন্য রাখা যায়। অর্থাৎ প্রশ্নটা জমি আছে কি নেই, সেটা নয়—প্রশ্নটা সদিচ্ছার। হকারদের ক্ষেত্রে তো আইনি অবস্থানও পরিষ্কার। স্ট্রিট ভেন্ডরস অ্যাক্ট আসার আগেই সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে বলা হয়েছে, ফুটপাত শুধু হাঁটার জন্য নয়; দীর্ঘদিন ধরে যারা সেখানে ব্যবসা করছেন, তাঁদেরও অধিকার আছে। সোদন সিং মামলায় আদালত বলেছিল, তাঁদের অধিকারকে যুক্তিসঙ্গত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে (reasonable restrictions) নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, কিন্তু শুধু উচ্ছেদ করে দেওয়া যায় না। ২০১০ সালের ৮ অক্টোবরের একটি রায়ে বিচারপতি অশোক গাঙ্গুলিও বলেছেন, হকাররাই যানজটের প্রধান কারণ—এটা ঠিক নয়; যানজটের বড় কারণ ব্যক্তিগত গাড়ি, দুই-চাকার ও তিন-চাকার যানবাহন।

অর্থাৎ আদালতও বলেছে, মানুষের চলাচলের অধিকার যেমন আছে, তেমনই জীবিকার অধিকারও আছে। দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত কথাটা এসে দাঁড়ায় সদিচ্ছায়। রাষ্ট্র যদি সত্যিই সমাধান করতে চায়, সম্ভব। যদি উদ্দেশ্যই হয় মানুষকে সরিয়ে দেওয়া, তাহলে কোনো সমাধানই খুঁজবে না। সদিচ্ছা থাকলে নীতিতেও তা দেখা যায়। ইউপিএ-১ এবং ইউপিএ-২-এর সময় যে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আইন তৈরি হয়েছিল, সেগুলো তার একটা উদাহরণ—স্ট্রিট ভেন্ডরস অ্যাক্ট, রাইট টু এডুকেশন, রাইট টু ফুড, রাইট টু ইনফরমেশন, ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট, ১০০ দিনের কাজ—এই আইনগুলো হঠাৎ করে হয়নি। রাজনৈতিক উপলব্ধি ছিল। রাষ্ট্র শুধু সমাজের উপরের ২৩ শতাংশ মানুষের দায়িত্ব নিলে চলবে না; বাকি ৭৭ শতাংশ মানুষের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

সওয়াল: আরেকটা বিষয় নিয়ে জানতে চাই। এখন পর্যন্ত হয়তো রেল হকারদের উপরেই আক্রমণটা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান, কিন্তু গড়িয়াহাট, হাতিবাগানসহ কলকাতার বিভিন্ন বাজার ও ফুটপাথের হকারদের মধ্যেও একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় এখনও নোটিশ দেওয়া হয়নি, উচ্ছেদের নির্দিষ্ট ঘোষণা নেই—তবু তাঁরা আশঙ্কা করছেন, পরবর্তী আক্রমণ হয়তো তাঁদের উপরও আসতে পারে।

আশঙ্কা কতটা বাস্তব বলে আপনি মনে করেন? যদি সত্যিই বৃহত্তর পরিসরে হকার উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হয়, আন্দোলনের পথ কী হতে পারে? কীভাবে এই লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন?

শক্তিমান: দেখুন, প্রথমত একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। রেলে যেভাবে উচ্ছেদ শুরু হয়েছে, তার খবর হকাররা প্রতিদিন মোবাইলে দেখছেন। ফলে, অন্য জায়গার হকারদের মধ্যেও স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় নোটিশও দেওয়া হয়েছে। যেমন সল্টলেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল; আমরা সঙ্গে সঙ্গে আইনের ভিত্তিতে উকিলের চিঠি দিয়েছিলাম এবং সেই নোটিশ প্রত্যাহার করা হয়। নিউটাউনেও বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি করে এসে কয়েক দিনের মধ্যে উচ্ছেদ করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সেখানেও আমরা আইনি নোটিশ দিয়েছি।

কলকাতা কর্পোরেশনের ক্ষেত্রেও এমন একটি নোটিশ বেরিয়েছিল, পরে কমিশনার সেটাকে ভুয়ো বলে জানান। অর্থাৎ আমরা বুঝতে পারছি, একটা চাপের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। আমরা প্রস্তুত। আমাদের কাছে আইন আছে, এবং আমরা আন্দোলনের পাশাপাশি আইনের পথেও লড়ছি। এই লড়াই আমাদের আজকের নয়। ১৯৮১ সালে শিয়ালদহ ফ্লাইওভারকে কেন্দ্র করে আমাদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সরকারের সময়ে—সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের সময়, ১৯৯৬ সালের অপারেশন সানশাইনের সময়, ২০১১-এর পর তৃণমূল সরকারের বিভিন্ন উচ্ছেদ অভিযানে, এমনকি ২০১৭-১৮ সালেও—আমরা আন্দোলন করেছি এবং আদালতে গিয়েছি। অনেক ক্ষেত্রেই আদালত থেকে স্থগিতাদেশও পেয়েছি। ২০১৮ সালে হাইকোর্ট স্পষ্ট বলেছিল, পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।

তাই আমাদের হকাররা ভয় পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁরা লড়াই করতেও প্রস্তুত। গত তিরিশ বছরে অনেক পুরনো মানুষ নেই, তাঁদের জায়গায় তাঁদের সন্তান বা পরিবারের অন্যরা এসেছেন। কিন্তু আমরা আন্দোলনের ইতিহাসটা ভুলতে দিইনি। আমাদের লড়াইয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল—আন্দোলন, সংলাপ এবং আদালত—এই তিন পথ একসঙ্গে চলবে। উচ্ছেদ করতে এলে আমরা আদালতে যাব, রাস্তায় নামব, আবার আলোচনাও চাইব।

তবে আমরা নিয়ন্ত্রণের বিরোধী নই। যে হকাররা বেআইনিভাবে পুরো ফুটপাত দখল করে রাখছেন, পিচের রাস্তায় বসছেন, গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নির্দিষ্ট নিষিদ্ধ এলাকার মধ্যে বসছেন, কিংবা পুলিশের মদতে টাকা তুলে এই কাজ করছেন—তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হলে আমরা বিরোধিতা করব না। কারণ অধিকার যেমন আছে, তেমন কর্তব্যও আছে। রাজ্য সরকারের নিয়ম অনুযায়ী ফুটপাতের এক-তৃতীয়াংশ জায়গায় হকার বসতে পারেন। আমরা চাই সেই নিয়ম মেনে, একদিকে বসে, পথচারীদের চলাচলের জায়গা রেখে ব্যবসা করতে। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের মতো জায়গাতেও নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম আমরা মানি এবং মানানোর চেষ্টা করি।

আমাদের লড়াই হকারি বন্ধ করার বিরুদ্ধে নয়; অন্যায় উচ্ছেদের বিরুদ্ধে। নিয়ম মেনে হকারদের জীবিকা এবং সাধারণ মানুষের চলাচল—দুটোই নিশ্চিত করা সম্ভব। সমস্যা তখনই হয়, যখন নিয়ন্ত্রণের নামে উচ্ছেদ করার চেষ্টা হয়, আর কিছু হকারকে বেআইনি কাজ করার সুযোগ দিয়ে পুরো হকার সমাজকে দোষী করা হয়।

সওয়াল: শেষ একটা প্রশ্ন। এই মুহূর্তে আন্দোলন যেমন চলছে, তেমনই আপনারা আইনি লড়াইটাও চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আদালতের উপর অতীতে যে ধরনের আস্থা রাখা যেত, আজ অনেক ক্ষেত্রেই সেই আস্থা আগের মতো নেই। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় রায়ও মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে হকারদের মতো প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য আদালতের উপর কতটা ভরসা করা যায় বলে মনে করেন? আইনি লড়াইয়ের গুরুত্ব কি এখনও আগের মতোই আছে, নাকি আন্দোলনের অন্য পথগুলোকেও আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে?

শক্তিমান: দেখুন, আদালতের উপর আমাদের ভরসা আছে, কিন্তু অন্ধ ভরসা নেই। বিচারব্যবস্থার পরিবর্তন, বিচারপতিদের অবসরের পর বিভিন্ন পদে যাওয়া—এসব আমরা দেখছি। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নও উঠছে। ফলে বিচারব্যবস্থা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন আছে। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্যি যে, বিচারব্যবস্থার ভিতরেই এমন অনেক বিচারপতি রয়েছেন, যাঁরা মানুষের অধিকারের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন।

২০১৩ সালের ঘটনাটাই ধরতে পারি। সেই সময় স্ট্রিট ভেন্ডরস বিল নিয়ে সংসদে আলোচনা চলছিল। ঠিক সেই সময় সুপ্রিম কোর্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়—যতক্ষণ না নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে, ততক্ষণ হকারদের উচ্ছেদ করা যাবে না। প্রথমে যেখানে হকাররা বসছেন, তাঁদের সার্ভে করতে হবে, ভেন্ডিং সার্টিফিকেট দিতে হবে, টাউন ভেন্ডিং কমিটি গঠন করতে হবে এবং ভেন্ডিং ও নো-ভেন্ডিং জোন নির্ধারণ করতে হবে। প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে উচ্ছেদ বা সরানো যাবে না।

এরকম রায় আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি। কলকাতা হাইকোর্টেও সেক্টর ফাইভ, নিউটাউন, সিটি সেন্টারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা আইনি লড়াই করে ইতিবাচক নির্দেশ পেয়েছি। একটা উদাহরণ দিই। গ্র্যান্ড হোটেল নিয়ে একবার উচ্ছেদের নির্দেশ এসেছিল। আমরা সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলাম—কোথায় হকার থাকবে বা থাকবে না, সেটা একজন বিচারপতি বা প্রশাসন একতরফাভাবে ঠিক করতে পারেন না; আইনের অধীনে সেই সিদ্ধান্তের জন্য টাউন ভেন্ডিং কমিটি রয়েছে। শেষ পর্যন্ত এক-তৃতীয়াংশ জায়গায় হকারদের রাখার বিষয়টি স্বীকৃত হয় এবং বাকি অংশ পথচারীদের জন্য খালি রাখার ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ দুটো অধিকারকেই সমন্বয় করা সম্ভব হয়েছে।

তাই আমার মনে হয়, আদালতকে একেবারে অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। আবার আদালত সবসময় মানুষের পক্ষে রায় দেবে—এমন অন্ধ বিশ্বাসও করা যায় না। বিচারপতি কে, তিনি আইনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করছেন এবং আইনের সামাজিক উদ্দেশ্যকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন—তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে।

আমরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ইতিবাচক রায়ও দেখেছি, নেতিবাচক রায়ও দেখেছি। তাই আমাদের পথটা পরিষ্কার—আদালতে যাব, কিন্তু শুধু আদালতের উপর নির্ভর করব না। আন্দোলন, আলোচনা এবং আইনি লড়াই—এই তিনটাকেই একসঙ্গে চালাতে হবে।

সওয়াল: তাহলে আপনার বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু আদালতে মামলা করলেই হবে না—তার পাশাপাশি রাস্তায় গণআন্দোলনও জরুরি। যাদবপুরের সাম্প্রতিক ঘটনায়ও দেখা গেল, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের পরই আদালত থেকে অন্তত সাময়িক স্বস্তি এসেছে। আন্দোলনের পাশাপাশি আপনারা যে আইনি ও নীতিগত কিছু দাবি নিয়ে এগোতে চাইছেন, সেগুলো যদি সংক্ষেপে বলেন—আপনাদের পরবর্তী পরিকল্পনাটা কী?

শক্তিমান: দেখুন, রেলের ক্ষেত্রে আমাদের আলাদা করে নতুন কোনও আইন বা বড় কোনও দাবি নেই। ২০১৪ সালের Street Vendors Act অনেকেই ঠিকমতো না পড়ে, না বুঝে নানা কথা বলেন। আমার মতে, স্বাধীনতার পর ভারতবর্ষে যে আইনগুলো হয়েছে, তার মধ্যে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং ভালো আইন।

তাই আমাদের মূল দাবি নতুন আইন তৈরি করা নয়। আমাদের লড়াইটা হল—২০১৪ সালের আইনটাকেই কার্যকরভাবে রেল হকারদের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রয়োগ করা যায়, কীভাবে তাঁদের এই আইনের আওতায় আনা যায়। এই দাবিতেই আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।